সংবিধান অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এখনো মতৈক্য হয়নি। বরং নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততোই দূরত্ব বাড়ছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে সংকট, বাড়ছে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে, সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষই রোজার ঈদের পর মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। হাইকোর্ট দলীয় নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করায় ঈদের সরকারি ছুটির পরদিন থেকেই রাজপথে নামছে জামায়াত। সবমিলিয়ে ঈদের পর অন্তত তিন মাস রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংকটের প্রধান কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর এবং শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের পারস্পরিক আস্থাহীনতা।
একাধিক প্রবীণ রাজনীতিবিদের মতে, রাজনীতিবিদরা একে অপরের উপর আস্থা রাখতে না পারার কারণে রাজনৈতিক সংকট দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে। বিভিন্ন কারণেই শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের কেউ কাউকে বিশ্বাস করছেন না। ক্ষমতার বাইরে থাকলে কোনো দলই নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না। এমনকি ক্ষমতার পটপরিবর্তনে একই দলের ভেতরেই পরস্পরকে নির্ভর করার মতো ভরসার জায়গা পাচ্ছেন না নেতা-নেত্রীরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সুরাহার পথেও প্রধানতম অন্তরায় পারস্পরিক এই অবিশ্বাস। তাদের মতে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও জোটের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস থাকলে অনেক সমস্যারই সহজ সমাধান পাওয়া যেত। অবশ্য আস্থা না রাখার মতো বেশকিছু ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক বছরে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুলিস্তানের সমাবেশে তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা ও গুলি চালানো হয়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। নিহত হন মহিলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সভানেত্রী আইভী রহমানসহ প্রায় ২৪ জন। ভয়াবহ সেই হামলায় গ্রেনেডের স্প্লিন্টার এখনো শরীরে বহন করে পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন কেউ কেউ। এ ঘটনা রাজনৈতিক চরম অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল।
একইভাবে ২০১১ সালে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ আইনের চোখে যাই হোক না কেন, তা রাজনীতিবিদদের পরস্পরের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের কারও কারও মতে, ’৯০ সালের পর শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতার পালাবদল পর্বে এই দুটি ঘটনা দুই নেত্রীর একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস প্রায় চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বলতে গেলে ব্যক্তিগতভাবে এই অবিশ্বাসের কারণে তারা দুই জনের কেউই ক্ষমতার বাইরে থাকা নিরাপদ বোধ করছেন না।
একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, রাজনীতিবিদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আগেও ছিল; কিন্তু গত ওয়ান ইলেভেনের সময় সেই মাত্রা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। কারণ সংস্কারের নামে ওই সময় রাজনীতিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। নেতাদের ধরে নিয়ে দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ানো হয়েছে। এমনকি এসব সাক্ষ্যের ভিডিও পর্যন্ত বাজারে ছাড়া হয়েছিল। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা অতি উত্সাহ থেকেও দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন সেসময়। কোনো কোনো সংগঠনে দল ভাঙারও উদ্যোগ নেয়া হয়। আর এতে করে রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরো বেড়েছে। শুধু অন্য দলের নয়, নিজ দলের নেতারাও এখন একে অপরকে বিশ্বাস করছেন না।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেন রাজনীতিবিদদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে এটা সত্য; কিন্তু গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তা আরো বেড়েছে। সে কারণেই নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও নির্বাচনের অনেক ইস্যুই ঠিক হয়নি। জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলেও আওয়ামী লীগ সরকার এ নিয়ে টালবাহানা করছে। তাই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করার আর কোনো বিকল্প নেই।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের প্রতি বিশ্বাস এবং সম্মান রক্ষার জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। তাই রাজনীতিবিদদের ক্ষমতায়ন চাইলে অনির্বাচিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর শাসন চাওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আন্দোলনের দল। তাই আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে ব্লাকমেইল করা যাবে না।’
রাজনীতিতে আস্থাহীনতা বাড়ার জন্যও প্রধান দুই দল একে অপরকে এভাবে দুষছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, বর্তমান সংবিধান অনুসারে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার কথা, তবে পারস্পরিক আস্থাহীনতার কারণে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নে রাজনৈতিক সমঝোতা সৃষ্টির পথে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা করছে দুই পক্ষ।
সরকারি দল আওয়ামী লীগ দুই মাস আগেও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার কথা বলেছে, আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে বারবার আহ্বান করেছে। এখন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো দূরের কথা, এ নিয়ে আলোচনার কথাও আর বলছে না সরকারি দল। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে এখনো অনড়। বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, সরকার তাদের দাবি মেনে নেবে-এরকম আস্থা বিরোধী দলের নেই। আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধানের আশাও করছেন না তারা। এজন্য তারাও আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায়ের কৌশল নিয়েছেন। আর এ কারণেই তারা নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংসদের গত অধিবেশনে মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করে নেন।
বিরোধী দলের একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃর্বহাল করতে পারলে নির্বাচনে তাদের জয় নিশ্চিত হবে, এরকমই বিশ্বাস তাদের। তাই তারাও এখন আর আলোচনায় বসতে আগ্রহী নন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইতিমধ্যে বলেছেন ‘তত্ত্বাবধায়কের দাবি আদায়ে ঈদের পর আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় এবং নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে ঈদের পর আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব। লাগাতার হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘট করব। আমরা সড়ক, রেল ও নৌ-পথ অবরোধ করব। প্রয়োজনে সারাদেশ অচল করে দেয়া হবে।
সরকারি দল আওয়ামী লীগও বলেছে-তারাও ঈদের পর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে। দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন ‘ঈদের পর আমরাও রাজপথে থাকব। রাজনৈতিকভাবেই বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলা করা হবে।’ আর দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন ‘বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। বিএনপি না এলেও সেই নির্বাচন হবে।’
এদিকে, প্রধান দুই দল ঈদের পর রাজপথে নামার দিনক্ষণ না দিলেও, এবার ঈদের ছুটির পরিদন থেকেই মাঠে নামছে জামায়াত। হাইকোর্ট দলীয় নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করায় আগামী ১২ ও ১৩ আগস্ট সারাদেশে টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতালের ডাক দিয়েছে দলটি। জানা গেছে, এ দুইদিন ছাড়াও ঈদের পর কয়েকদিনের জন্য লাগাতার আন্দোলনে যেতে পারে জামায়াত। অন্যদিকে, একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার আপিলের রায় হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের শুনানিও শুরু হচ্ছে ঈদের পর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরইমধ্যে বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের মেয়াদেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের একাধিক রায় কার্যকর করা হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সবকিছু মিলিয়ে ঈদের পর রাজনীতি সহিংস হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
