‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না সালাহউদ্দিন কাদের’

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৪
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপির বিরুদ্ধে মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। গতকাল রবিবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী এএইচএম আহসানুল হক হেনা। তিনি বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার বাবার ভাল সম্পর্ক ছিল না। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। একাওরে কানো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন—এ মর্মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেননি। ওই সময় তিনি বড় মাপের নেতা ছিলেন সেই মর্মেও আইও’র কাছে কোনো প্রমাণ নেই। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কার্যক্রম আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। আহসানুল হক হেনা ট্রাইব্যুনালে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ১০৪ সদস্যের শান্তি কমিটিতে সালাহউদ্দিন কাদের ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নাম নেই। সালাহউদ্দিন কাদের কোনো রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, আল বদর, আল শামস, রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষ কিভাবে তার বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির অভিযোগ আনছে তা বুঝতে পারি না। তিনি বলেন, বাবার কারণে তার ছেলে দোষী হতে পারে না। বাবা যেকোন মতাদর্শের হতে পারেন। তাই বলে ছেলেও একই মতাদর্শের হবে এটা ঠিক নয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননের বাবা আব্দুল জাব্বার খান কনভেনশন মুসলিম লীগ করতেন। কিন্তু ছেলে হিসেবে রাশেদ খান মেনন বাবার মতাদর্শ গ্রহণ করেননি। সুতরাং বাবার কারণে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দোষী বলা যাবে না। তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে সালাহউদ্দিন কাদের কোনো নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়েছিলেন—এ কথা কোনো সাক্ষী বলতে পারেনি। সালাহউদ্দিন কাদেরকে আগে চিনতো এ কথাও কোনো সাক্ষী বলেনি। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিজের মতো করে মামলা সাজিয়েছেন। বলা হচ্ছে, ফজলুল কাদেরের বাড়ি গুডস হিলে নিয়ে অনেককে নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু নির্যাতিতদের আনা-নেয়ার সময় কেউ কি দেখেনি। গুডস হিলের চারপাশের কোনো ব্যক্তিকে সাক্ষী করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইও বলেন, প্রয়োজন মনে করেননি। এটা কোন ধরনের ধৃষ্টতা। গুডস হিলকে টর্চার সেল বলা হয়েছে। সেখানে একটি ছুরি, লাঠিও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সম্পর্ক ভালো ছিল না। পাকিস্তানের জান্তা সরকার কনভেনশন মুসলিম লীগের অফিস, সম্পদ, ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করেছিল। ১৯৭১ সালে জাতীয় পরিষদে অনুপস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের অনেক সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণা করেছিল সামরিক সরকার। কিন্তু ফজলুল কাদের চৌধুরী যে আসনে হেরেছিলেন সে আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়নি। পাকিস্তানি আর্মিদের সঙ্গে সালাহউদ্দিন কাদেরের কোনো ছবি আইও পায়নি। তিনি স্বাধীনতা বিরোধী বক্তব্য, বিবৃতি দিয়েছেন এ মর্মে পত্রিকার কোনো কাটিংও আইও’র কাছে নেই। বরং তিনি স্বীকার করেছেন ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে কুণ্ডেশ্বরীর নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণে গল্পের শেষ নেই। তারা বলছে, ছমিরের বাড়িতে সালাহউদ্দিন কাদের গাড়ি চালিয়ে যান। আসার সময় গাড়ি চালান তার চালক। তাহলে যাওয়ার সময় তার চালক কোথায় ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে সেদিন চালক নিহত হয়। কিন্তু সেই চালকের নাম-ঠিকানা কিছুই বলা হয়নি। ছমির উদ্দিনের বউ, ছেলে বেঁচে আছেন তাদের এ ঘটনায় সাক্ষী করা হয়নি। সাক্ষী করা হয়েছে অন্যদের। সাক্ষী ডা. সফিউল্লাহ এখানে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি নাকি সালাহউদ্দিন কাদেরের চিকিত্সা করেছিলেন। সাক্ষ্য দিয়ে যাওয়ার পর তিনি হলফনামা দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ তাকে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছে। তিনি সালাহউদ্দিন কাদেরের কোনো চিকিত্সা করেননি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা যুক্তিতর্কে আবেগতাড়িত হয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু বিচারে আবেগের কোনো স্থান নেই। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের নবম সাক্ষী পরাগ ধর এখানে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রথম দিন তিনি সালাহউদ্দিন কাদেরের পিতার নাম বলেছেন। সাক্ষ্যে সালাহউদ্দিন কাদেরের বিষয়ে কিছু বলেননি। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষ তাকে বৈরী ঘোষণা করে জেরা করতে পারত। কিন্তু তারা তা না করে ১০ দিন পর সেই সাক্ষীর পুনরায় জবানবন্দি নিয়েছেন। সেদিন সাক্ষী এসে বলেছেন, ফজলুল কাদের চৌধুরীর জায়গায় সালাহউদ্দিন কাদেরের নাম হবে। এর পেছনে একজন প্রসিকিউটর রয়েছেন। তারা ট্রাইব্যুনালে ‘ফাউল প্লে’ করেছেন। উল্লেখ্য, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে সব অভিযোগের ব্যাপারে তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেনি। সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে ৪১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া চারজনের জবানবন্দিকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সালাহউদ্দিন কাদেরসহ চারজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।