বাংলাদেশের ঈদোত্সবের কালক্রমিক ইতিহাস নির্মাণ করা এখনো সম্ভব হয়নি। এ কাজের উপযোগী সুস্পষ্ট ও অনুপুঙ্খ ধারাবাহিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। কোনো ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী বাংলাদেশে ঈদোত্সবের উদ্ভবের ইতিহাস ও আনুষঙ্গিক ঘটনাপঞ্জি নির্ভরযোগ্য দলিলপত্র ঘেঁটে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হননি। ফলে কখন, কীভাবে ঈদোত্সবের শুরু হলো তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে নানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সূত্র থেকে বাংলাদেশে রোজাপালন এবং ঈদ-উল-ফিতর বা ঈদ-উল-আজহা উদ্যাপনের খবর পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও এদেশে নামাজ, রোজা ও ঈদপর্বের প্রচলন হয়েছে তার বেশকিছু আগে থেকেই। এতে অবশ্য বিস্মিত হবার কিছু নেই। কারণ, বঙ্গদেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলমান সুফি, দরবেশ ও ধর্ম-প্রচারকেরা বাংলাদেশে আসেন। এদের অধিকাংশই উত্তর ভারত হয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। অন্যদিকে আরবীয় ও অন্যান্য মুসলিম দেশের বণিকেরা চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এই বহিরাগত মুসলমান বণিক, ধর্ম সাধক ও ইসলাম প্রচারকেরা নিজস্ব পরিমণ্ডলে তাদের প্রধান ধর্মীয় পর্ব হিসেবে ঈদ পালন করতেন। এদের ঈদ উদ্যাপন ছিল সীমিত গণ্ডিবদ্ধ। একে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় পর্ব উদ্যাপন বলা গেলেও সর্বজনীন সামাজিক উত্সব হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তবে বাংলাদেশে ঈদোত্সবের ভিত্তি হিসেবে এর গুরুত্ব একেবারে উপেক্ষণীয় নয়। মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় উত্সব তথা সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার পরিচয়ের ক্ষেত্রে এই দুইটি উত্স অর্থাত্ ক. উত্তর ভারত হয়ে আসা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক; চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে আগমনকারী বণিক ও ভাগ্যান্বেষণকারীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও জীবন-জীবিকার বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে এবং খ. বহিরাগত মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উত্সব ঈদের সঙ্গে পরিচয়।
পাহাড়পুরের মহাস্থানগড়ে খননকালে প্রাপ্ত খলিফা হারুনর রশিদের আমলের রৌপ্যমুদ্রা (৭৮৮-তে উত্কীর্ণ) থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের দিকেই বাংলাদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ফলে সুফি, দরবেশ এবং তুর্কি আরব বণিকদের মাধ্যমেই বাংলায় শুধু ঈদ উদ্যাপন নয়; নব্য ধর্মান্তরকারী মুসলমানদের মধ্যে রোজা, নামাজ ও ঈদ উদ্যাপনের প্রাথমিক সূচনা হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে আগেই আমরা বলেছি যে, সে যুগে তা ছিল বহিরাগত ধর্ম প্রচারক, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের ধর্মীয় কৃত্য বা উত্সব। এদেশবাসীর ধর্ম সামাজিক পার্বণ নয়। বাংলায় ইসলাম প্রচার কোনো রাজা-বাদশার নেতৃত্বে যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে ঘটেনি। বরং এ কৃতিত্ব মগদুম শয়খ জালালুদ্দীন তবয়েজির। তবে এ ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি বা তরবারি ব্যবহার না হওয়ায় বাংলার নব্য মুসলমান ইসলামি সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু ঔত্সুক্য ও কৌতূহল দেখালেও তা হুবহু গ্রহণের বাধ্যবাধকতায় পড়ে নাই। ফলে নব্য ধর্মান্তরিতদের নিজস্ব সংস্কৃতি পরিত্যাগ করার প্রশ্নও আসেনি। তাই বাংলার মুসলমান তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারা, এদেশীয় আচার-বিশ্বাস-সংস্কার বজায় রেখেই ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেন। ফলে বাংলার মুসলমান জাতি ও সংস্কৃতিতে বাঙালি এবং ধর্মে হলেন মুসলমান। এজন্য বাংলার মুসলমানকে বিদেশি ধর্মীয় উত্সবের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে অনেক সময় লেগেছে। তাই ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হলেও এর পরবর্তী কয়েক বছরেও ঈদ উত্সবের ব্যাপকতা বা বর্ণাঢ্যতার কোনো খবর পাওয়া যায় না।
তাছাড়া আরও একটি প্রণিধানযোগ্য কারণে ঈদোত্সব জনজীবনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। সে কারণটি হলো, অভিজাত বা অর্থবিত্তে সঙ্গতিপন্ন এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা সাধারণত ধর্মান্তরিত হন না। তাই বাংলায় যারা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, তারা ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু। এদের শানশওকতের সঙ্গে ঈদোত্সব করার মতো সঙ্গতি বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না। সঙ্গতি যে ছিল না সেটা বোঝা সহজ। কিন্তু ইচ্ছা কেন ছিল না তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষই সাধারণত নানা মানুষ ও ভিন্ন পরিবেশের সংস্পর্শে আসেন। শিক্ষার প্রভাব ও নানা মত-পথ-ধর্ম-গোত্রের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসে। তারা কতক পরিমাণে কসমোপলিটান এবং বিশ্বের প্রভাবশালী ভাবধারার দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েন এবং তাদের জীবনাচরণ ও বিশ্বদৃষ্টিতে নানা সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। নিম্নবিত্ত ও নিরক্ষর মানুষের ক্ষেত্রে তা সাধারণত ঘটে না। বাংলার ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ক্ষেত্রেও তা ঘটে নাই। তাছাড়া তারা তাদের আচার, বিশ্বাস, সংস্কারকে আঁকড়ে ধরে থেকেছে। ফলে মুসলিম ধর্মকেই তাদের ক্ষেত্রে নানাভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে। বাংলার ইসলামে তাই স্থানীয় প্রভাব পড়েছে প্রচুর এবং তাতে শাস্ত্রীয় ইসলামের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে ভিন্নতাও সৃষ্টি হয়েছে। বাংলায় ইসলামের এই বৈশিষ্ট্যকে ‘লৌকিক ইসলাম’ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
কৃষিভিত্তিক বাংলার এই লৌকিক ইসলামের ঈদোত্সবেও তাই নিম্নগোষ্ঠীয় গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস-সংস্কার এবং ঐতিহ্যবাহী বিনোদন উপকরণই যুক্ত হয়েছে। হা-ডু-ডু খেলা, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠিখেলা, বর্ষাকালে ঈদ হলে নৌকা বাইচ ইত্যাদি।
দুই
বাংলায় ঈদোত্সবের সূচনা হয়েছে তুর্কি-আরব বণিক ও বহিরাগত ধর্ম সাধক আউলিয়া-দরবেশ বা ধর্ম প্রচারকদের মাধ্যমে। তবে তা ছিল নিতান্তই তাদের ধর্মীয় কৃত্য-এদেশবাসীর ধর্ম-সামাজিক উত্সব বা পার্বণ নয়। এদের রোজা পালনের নির্ভরযোগ্য তথ্যও এখন পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের তথ্যনির্ভর একটি গ্রন্থের নাম ‘তাযকিরাতুল সোলহা’। এ গ্রন্থে বলা হয়েছে, আরব দেশ থেকে আগত শেখউল খিদা নামের এক সুফি সাধক হিজরি ৩৪১ সন মুতাবিক ৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ধর্ম প্রচার মানসে ঢাকায় এসেছিলেন। অনুমান করা হয়, শেখউল খিদা সম্ভবত চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের আমলে (৯০৫-৯৫৫ খ্রি.) বাংলায় আসেন। বাংলার এ অঞ্চলে ইসলাম-আগমনপূর্ব যুগে আরও কিছু সুফি সাধক এসেছিলেন বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমি ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দে নেত্রকোনা অঞ্চলে এবং বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুর পরগনার রামপালে আস্তানা গেড়ে ধর্ম প্রচার শুরু করেন। এঁরা ব্যক্তিগত জীবনে এবং সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নামাজ, রোজা ও ঈদ পালন করতেন। তবে পূর্ব বাংলার জনজীবনে এদের ধর্মকর্ম ও ঈদ পর্বের প্রভাব পড়েছিল বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশে আরবি শব্দ সালাত, সিয়ামের পরিবর্তে ফার্সি, খোদা, নামাজ, রোজা শব্দের ব্যাপক প্রচলনে বোঝা যায় আরবীয়রা নয়; ইরানিরাই বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
১২০৪-এ গৌড় বঙ্গ মুসলিম অধিকারে এলেও পূর্ব বাংলায় ১২২৯-এ এসে বিপতির শাসনে আসে। তখন দিল্লির সুলতান ইলতুিমশ। এ সময় থেকে পূর্ব বাংলায় নামাজ, রোজা, ঈদ ও অন্যান্য মুসলিম উত্সব ধীরে ধীরে শুরু হয়ে থাকে।
ঢাকা ও সন্নিহিত অঞ্চলে রোজা কায়েমের নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া যায় মির্জানগর ‘বাজাস্তানী গাইবী’ গ্রন্থে। তিনি ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার ইসলাম খাঁর সঙ্গে ঢাকায় আসেন। ইসলাম খাঁ মুঘল শহর ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে। মির্জা নাথান তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘সপ্তদশ শতকের গোড়াতে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আরবি শাবান মাসের ২২তম থেকেই রোজার আয়োজন শুরু হতো। এ সময় থেকে মসজিদ সংস্কার ও আবাসিক গৃহাদি পরিচ্ছন্ন করার কাজ চলত। বাড়ির কর্ত্রী পানি ঠান্ডা রাখার জন্য নতুন সুরি ক্রয় করতেন। ইফতারের সময় এ ঠান্ডা পানি পান করা হতো। ইফতার সামগ্রী তৈরি করার জন্য গোলাপজল, কেওড়া ও তোকমা ব্যবহার করা হতো। সারা রোজার মাস ব্যবহার করার জন্য প্রচুর পরিমাণ পান ও পান মসলাও মজুত করা হতো (দেলওয়ার হাসান)।
ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ও সপ্তদশ শতকের কবি ভারতচন্দ্রের কবিতায় মুসলমানদের রোজা পালন সম্পর্কে সুস্পষ্ট দৃষ্টি পাওয়া যায়। মুকুন্দরামের বর্ণনায় শরিয়তি ইসলামের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা (প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ে)-চণ্ডীমঙ্গল এবং ভারতচন্দ্রে সমন্বয়বাদিতার (দেবদেবী পূজা বিনা কি হবে রোজায় অন্নদামঙ্গল)। ঢাকা শহরে রোজার নানা আনুষঙ্গিককৃত্যের বিবরণ পাওয়া যায় মির্জা নাথানের বইয়ে। নাথান রোজা ও ঈদের দিনে মুঘল সেনা ছাউনিতে যেসব রীতি চালু ছিল, তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। আসলে শহর ঢাকায় এসব রীতি মুঘলরাই প্রবর্তন করেন। রমজান মাসের শুরু থেকে শেষদিন পর্যন্ত সৈন্যরা একে অন্যের তাঁবুতে মিলিত হয়ে পানভোজন করতেন। নাথানের বর্ণনায় পাওয়া যায়, মুবারিজ খাঁ নামক কোনো এক মুঘল কর্মচারী রোজার শেষ দিনে এক বিরাট ভোজের আয়োজন করেছিলেন। তাতে সৈন্য-সামন্তসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগদান করেছিলেন। রোজাদারদের খাওয়ানোর সামাজিক রীতিও মুঘলরাই চালু করেন। ঈদের চাঁদ দেখাও ছিল এক আনন্দময় ব্যাপার। ‘চাঁদ দেখা যাওয়ার বিষয়টি মানুষকে জানানোর জন্য তোপধ্বনি করা হতো। আর দূর-দূরান্তের মানুষকে চাঁদ দেখা যাওয়ার সংবাদ জানানোর জন্য ভারী কামান দাগা হতো’ (প্রাগুক্ত)।
ঈদের নামাজ আদয়ের জন্য ঈদগাহ নির্মাণের কৃতিত্বও মুঘলদের। ঢাকার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হাকিম হাবীবুর রহমান বলেন, বাংলার সুবাদার শাহ সুজার নির্দেশে তাঁর প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাশেম ১৬৪০ সালে ঢাকা শহরের ধানমণ্ডি এলাকায় একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল ২৪৫ ফুট ও প্রস্থ ১৩৭ ফুট। ভূমি থেকে উচ্চতা বারো ফুট।
ঈদগাহের পশ্চিম দিকে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে সেখানে মেহরাব ও মিনার নির্মাণ করা হয়। মুঘল আমলে দরবার, আদালত, বাজার ও সৈন্য ছাউনির কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল এ ঈদগাহ। প্রথম দিকে এখানে শুধু সুবাদার, নায়েবে নাজিম ও অভিজাত মুঘল কর্মকর্তারা এবং তাঁদের স্বজন-বান্ধবেরাই নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই ঈদগাহর পাশে উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে একটি মেলারও আয়োজন করা হয়। রেনেলের মানচিত্রে এই সেতু সংলগ্ন স্থানে একটি সুন্দর সেতুরও অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। ঈদগাহটি এখন সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। তবে এর পূর্বদিকে নতুন মসজিদ নির্মাণ করে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঢাকা শহরে সেকালে ঈদ উদ্যাপন এবং ঈদের বর্ণাঢ্য মিছিলের অঙ্কিত আকর্ষণীয় চিত্র জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এক সময় ঢাকায় হিন্দুদের জৌলুসপূর্ণ জন্মাষ্টমি মিছিল, শিয়াদের মহররমের তাজিয়াসহ মিছিল এবং ঢাকাবাসীর ঈদ মিছিল ছিল নজরকাড়া আয়োজন। তিনটিই এখনো টিকে আছে; কিন্তু কোনোটিরই আগের জেল্লা ও শানশওকত নেই। তার ধ্বংসাবশেষ এখনো বর্তমান আছে। তবে ঠিক কখন এদেশে ঈদের নামাজের সূত্রপাত, তার সন-তারিখ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
দেলওয়ার হাসান বলেন, ‘নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খান’ গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেনী বিলগ্রামী লিখেছেন যে, ‘নবাব সুজাউদ্দীনের অধীনস্থ মুর্শিদকুলী খান (১৭০৪-১৭২৫) ঈদের দিনে ঢাকায় দুর্গ থেকে ঈদগাহ ময়দান পর্যন্ত এক ক্রোশ পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে দিতেন। নবাবের সহযাত্রী হয়ে ওমরা-রাজ কর্মচারী এবং মুসলমান জনসাধারণ শোভাযাত্রা করে ঈদগাহ মাঠে যেতেন।’ ঈদের নামাজে যাওয়ার এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্থানীয় হিন্দুদের উত্সবের জাঁকজমকের প্রভাব পড়েছিল বলে মনে করা হয়। কারণ হিন্দুরা তাদের উত্সবে এ ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ শোভাযাত্রার আয়োজন করতেন।
ঢাকার নবাব পরিবারের সামপ্রতিককালে প্রকাশিত ডায়েরিতে ঢাকার ঈদের বর্ণনা আছে। ঢাকার নরওয়াব খাজা আহসানউল্লার (১৮৪৬-১৯০১) বিভিন্ন পঞ্চায়েত থেকে কাসিদা দল বের হওয়া শুরু হয়। নওয়াব পরিবারের ডায়েরি (অনুপম হায়াত্ সম্পাদিত) থেকে ১৯০৪ খিষ্টাব্দের ২৮ ফেব্রুয়ারির ঈদ উদ্যাপনের একটি চিত্র তুলে ধরছি : ‘আজ রবিবার, পবিত্র বকরি ঈদ। নামাজ শেষে আমিও অন্যান্যের মতো কোলাকুলি করি। নওয়াব সাহেব আমাকে আদেশ দেন অন্যান্যকে নিয়ে বিনা খরচে ক্লাসিক থিয়েটারে নাটক দেখার জন্য। খাজা সলিমুল্লাহ তখন নওয়াব (কাজী কাইয়ুমের ডায়েরি)’। উপর্যুক্ত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নওয়াবরা ব্যক্তিগত জীবনে সেক্যুলার জীবনযাত্রা নির্বাহ করেও রাজনৈতিক সুবিধার স্বার্থে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করতেন। ঈদের নামাজ আর নাটকের সহ-অবস্থানেই তৈরি হয়েছিল তাদের আধুনিক জীবনবোধ।
তিন
বাংলাদেশে ঈদোত্সব এখন শুধু একটি ধর্মীয় উত্সবমাত্র নয়; বিরাট বহুমাত্রিক জাতীয় সামাজিক উত্সবও বটে। এর ধর্মীয় দিকটি অন্তঃসার হিসেবে কেন্দ্রে আছে বটে, কিন্তু পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে বিরাটভাবে। এর মধ্যে আছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-বিনোদনমূলক নান্দনিক নানা বিষয়। দেশে কোনো ধর্মীয় উত্সব সামাজিক তাত্পর্য লাভ করে তখনই, যখন সে দেশে বিশাল এক মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে। এই শ্রেণীর আর্থিক সামর্থ্য, সাংগঠনিক শক্তি ও উদেযাগ এবং বিনোদনগত চাহিদাই উত্সবের ব্যাপকতার উত্স। বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ছিল ইংল্যান্ড, কলকাতা ও ইসলামাবাদের পশ্চাত্ভূমি। ফলে পাটের মরসুম ছাড়া তাদের হাতে নগদ পয়সা থাকত না। আর কাঁচা পয়সা ছাড়া উত্সব হয় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেমন বিরাট মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠেছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি এবং বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের পাঠানো টাকায় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। তাই ঈদ এখন এত জমজমাট। ঢাকার নওয়াবদের ঈদের দিনে নাটক-সিনেমা দেখা এবং ঢাকার মিছিল এখন নানা বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা ও গভীরতা লাভ করেছে। ফ্যাশন ডিজাইন, ফ্যাশন প্যারেড এবং প্রায় সপ্তাহব্যাপী টেলিভিশন চ্যানেলের নাটক, আনন্দমেলা, সিনেমাসহ নানা অনুষ্ঠান এখন ঈদোত্সবের অপরিহার্য অঙ্গ।
