রোজ কিছু চিঠি থাকে! অলৌকিক কে ডাকপিওন,
রেখে যায় রোদ্দুরের চৌকো খামগুলি!’
এই পঙিক্ত ক-টির শব্দবিন্যাস নরেশ গুহর। তাঁর চেতনায় চিঠির একটা রূপ-রূপক যে স্পষ্ট ছাপ ফেলেছিল তা বেশ বোঝা যায়। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘দুরন্ত দুপুর’-এর (১৩৫৮) আরেকটি কবিতায় তাঁর প্রত্যাশার মানবীর কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার আকস্মিক যোগের সম্ভাবনায় পুলকিত তিনি উচ্চারণ করেন :
‘কলকাতায় ফিরে যদি—যদি আজ বিকেলের ডাকে
তার কোনো চিঠি পাই?’
এইসব উদাহরণ থেকে চিঠি সম্পর্কে তাঁর কোমল দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়।
চিঠি পাওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের কথা জানা গেল, কিন্তু চিঠি লেখার ক্ষেত্রে তাঁর আলস্য ও শৈথিল্যের বিষয় কিছুটা বিব্রত কণ্ঠে নিজেই কবুল করেছেন। তার প্রমাণ মেলে সুরজিত্ দাশগুপ্তকে লেখা ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারির একটি চিঠিতে, সময়মতো চিঠির জবাব দিতে না পারায়, সরাসরি বলেছেন : ‘আপনার কাছে আমার লজ্জা রাখবার জায়গা নেই’। আবার ওই একই জনকে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ তারিখে যে চিঠি লিখেছেন, তার শুরুতেই জানিয়েছেন : ‘কাল রাত্রিতে জমে ওঠা চিঠির স্তূপ ঘাঁটতে বসেছিলাম। তার মধ্যে থেকে আপনার ঠিকানা লেখা দুটি চিঠির কাগজ বেরিয়ে এলো। আপনার চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লেখার ইচ্ছেটা ঐ ঠিকানা লেখার সাঁকো অব্দি দুবার গিয়ে ফিরে এসেছে বোঝা গেল।’ এ-ও তাঁর অসীম আলস্যের আরেক নিদর্শন। এই যে নরেশ গুহ, তাঁর লেখা চিঠির সূত্রে তাঁর প্রতি চকিত অবলোকনের কিছুটা সুযোগ মিলবে এখানে।
দুই
নরেশ গুহর চিঠিপত্র সংকলনের সুযোগ ও তাঁর সম্পর্কে নানা তথ্যের জন্যে প্রথমেই শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় পত্রপ্রাপক সুরজিত্ দাশগুপ্তকে। নিষ্ঠ গবেষক ও নরেশ গুহর ঘনিষ্ঠজন ডক্টর ভূঁইয়া ইকবাল তাঁর তথ্যভাণ্ডার থেকে অকাতরে সহায়তা করেছেন— এমনকি যখন তিনি চক্ষুপীড়ায় গুরুতর অসুস্থ, তখনো আমার চাহিদাপূরণে বিমুখ হননি। হঠাত্ই কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে বা তথ্যসংশয় মোচনে রাত-বিরেতে ভরদুপুরে শরণ নিয়েছি নরেশ গুহর অনুজপ্রতিম স্নেহভাজন কবি বেলাল চৌধুরীর। আমার ছাত্র ডক্টর মাসুদ রহমানের কথাও এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। নরেশ গুহ এবং আনুষঙ্গিক তথ্যের জন্যে যেসব বই ও পত্রিকার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ১. ‘বুদ্ধদেব বসু’ : ভূঁইয়া ইকবাল (ঢাকা, ১৯৯২), ২. ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ : বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত (পুনর্মুদ্রণ : কলকাতা, ১৪০৫), ৩. বুদ্ধদেব বসুর অগ্রন্থিত গদ্য : ‘‘কবিতা’ থেকে’ : দময়ন্তী বসু সিং সম্পাদিত (কলকাতা, ২০১০), ৪. ‘বুদ্ধদেব বসুর চিঠি : কনিষ্ঠা কন্যা রুমিকে’ : দময়ন্তী বসু সিং সম্পাদিত (কলকাতা, প্রকাশকালের উল্লেখ নেই), ৫. ‘কবিতা থেকে কবি : নরেশ গুহ’ : স্নিগ্ধা বন্দ্যোপাধ্যায় (কলকাতা, ১৪১৫), ৬. ‘কবির অন্তরমহল : তিরিশের কবিদের পত্রাবলি’ : আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত (ঢাকা, ২০০৯), ৭. ‘অহর্নিশ’ (নরেশ গুহ সংখ্যা : কলকাতা, ১২ বর্ষ বিশেষ সংকলন, গ্রীষ্ম ১৪১৬)।
তিন
নরেশ গুহ কবি—মূলত কবি, যদিও তাঁর অন্য পরিচয়ও উপেক্ষণীয় নয়। জন্মেছিলেন পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর ময়মনসিংহের টাঙ্গাইল মহকুমার বিন্যাফৈর গ্রামে, ১৯২৩ সালের মার্চ মাসের ৩ বা ৪ তারিখে। সম্পন্ন-সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পুরো নাম ছিল—নরেশচন্দ্র গুহবক্সি, আধুনিক হওয়ার খেয়ালে কলেজজীবনে ‘চন্দ্র’ আর ‘বক্সি’ ছেঁটে ফেলেন নাম থেকে। সন্তোষের জাহ্নবী হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পরীক্ষা দিয়েই ১৯৩৯ সাল থেকে কলকাতার বাসিন্দা। সেখানে পড়াশোনার প্রতিষ্ঠান : রিপন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর মার্কিন মুলুকের নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। অধ্যাপনাই ছিল মূল পেশা—কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রথমে প্রায় আট বছর চারুচন্দ্র কলেজ এবং পরে একনাগাড়ে ১৯৫৬ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। তবে এর আগে ও পরের আবার দুটি অধ্যায় আছে : কর্মজীবনের শুরুতে দু-বছর মতো ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কাজ করেছিলেন, তারপর সিগনেট প্রেসে কিছুকাল এবং সবশেষে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ হিসেবে। প্রয়াত হন ৪ জানুয়ারি ২০০৯। কিছুটা প্রচারকুণ্ঠ ছিলেন, তাই সাহিত্যচর্চায় আত্মতাগিদের অভাব ও নিজেকে বিকশিত করার উত্সাহ-উদ্যোগহীনতা দেখা যায়। হয়তো আলস্য, হতাশা বা পেশাগত ব্যস্ততাও এর খানিকটা কারণ হতে পারে। তাই লেখক হিসেবে যতখানি প্রচার-পরিচিতি, প্রভাব-প্রতিষ্ঠা এবং স্বীকৃতি-সমাদর তাঁর জন্যে প্রত্যাশিত ছিল, তা পাননি। অন্য অনেকের মতো নিজেকে বিজ্ঞাপিত করার রুচি ও উদ্যোগ তাঁর ছিল না—ভাবতে অবাকই লাগে একমাত্র সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৫) ছাড়া আর কোনো উল্লেখযোগ্য সম্মাননা-স্বীকৃতি-পুরস্কারলাভের জন্যে তাঁর নাম বিবেচিত হয়নি।
চার
আগেই বলেছি, কবি হিসেবেই তাঁর মূল পরিচিতি। তাই নরেশ গুহর সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে তাঁর নামের আগে ‘কবি’ অভিধাটি অবশ্যই জুড়ে দিতে হয়। ছিয়াশি বছরের জীবনে তাঁর কবিতার সংখ্যা অন্যদের তুলনায় যথেষ্ট কম। ‘কবিতাসংগ্রহ’
(১৯৯৩) বাদ দিলে তাঁর কবিতার বই বেরিয়েছে মাত্র তিনটি : ‘দুরন্ত দুপুর’ (১৯৫২), ‘তাতার সমুদ্র-ঘেরা’ (১৯৭৬) ও ‘বিদিশার ইনি আর উনি’ (১৯৯৩)। প্রথম ও দ্বিতীয় বইয়ের প্রকাশের ফারাক চব্বিশ বছর, তৃতীয় বইটি বের হয় দ্বিতীয় বইয়ের সতেরো বছর পর। কিন্তু স্বতন্ত্র স্বরের স্বল্পপ্রজ এই কবি যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর সমসময়ে। এক অনুজ-কবি, শঙ্খ ঘোষ, যা বলেছেন তা নির্ভুল সাক্ষ্য হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে : ‘আমি যখন ছাত্রবয়সে কবিতা লিখতে শুরু করি তখন মিষ্টি কবিতার লেখক হিসেবে নরেশবাবুর একটা প্রসিদ্ধি ছিল। ওঁর কবিতায় স্নিগ্ধতা, মসৃণতা ছাত্রবয়সে টানত। ‘দুরন্ত দুপুর’ প্রকাশের পর চল্লিশের কবিদের মধ্যে তখন তিনিই ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি।’
কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধও লিখেছেন। ইংরেজি-বাংলায় লেখা বেশকিছু প্রবন্ধ গ্রথিত হয়েছে ‘অন্তরালে ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ (১৯৯৪) ও ‘In Praise of Two Bengali Novels and other Essays’ (১৯৯৭) বইয়ে। গবেষণার ভারী কাজও করেছেন। সন্দর্ভ রচনা করেন ইয়েটস সম্পর্কে, বেরিয়েছে তা বই হয়েও—‘W. B. Yeats : An Indian Approach’ (১৯৬৮)।
অনুবাদেও তাঁর ভালো হাত ছিল। ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ডের গল্পের তরজমা বের হয় ‘পার্টির পরে’ (১৯৪৬) নামে। জাঁ পল সার্ত্রের নাটকের ভাষান্তর ‘কপাট’ প্রকাশ পায় ১৯৯৬-এ। কবিতা-প্রবন্ধ বা অন্য রচনা যে বেশকিছু অগ্রথিতই রয়ে গেছে, তা সহজেই অনুমান করা চলে।
পাঁচ
বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে পরিচয়, সঙ্গ-সান্নিধ্য ও তাঁর সারস্বত-কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগ নরেশ গুহর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এক কথায় বুদ্ধদেবের স্নেহচ্ছায়ায় তাঁর জীবন গড়ে উঠেছে। বুদ্ধদেবের মনোযোগ তিনি লাভ করেন ১৯৪১-এ, মাত্র আঠারো বছর বয়সে। কবিতাই ছিল এই যোগাযোগের প্রথম সেতু—বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘শরতে ঘাসের এক ফালি জমি’ নামের কবিতা ১৩৪৮-এর চৈত্র-সংখ্যায় প্রকাশের মাধ্যমে এই পত্রিকার সঙ্গে নরেশের সম্পর্ক রচিত হয়। পরে বুদ্ধদেবের ‘কবিতা’-পরিবারেরই একজন হয়ে ওঠেন। কবিতাভবন থেকে ১৯৪৬-এ বের হয় তাঁর প্রথম বই ‘পার্টির পরে’—ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ডের ছোটগল্প ‘দি গার্ডেন পার্টি’র অনুবাদ। ‘দুরন্ত দুপুর’ নরেশ গুহর প্রথম কবিতার বই। অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সিগনেট প্রেস থেকে এটি বেরুনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুদ্ধদেব ‘কবিতা’য় (আশ্বিন ১৩৫৮) একটু বড় করেই এই বইয়ের আলোচনা করেন। সেইসময়ের বাংলা কবিতার যে নৈরাশ্যকর ও উত্থানহীন অবস্থা, তার বিপক্ষে নরেশ গুহর আবির্ভাব যে নতুন সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল, সে-কথাটি স্পষ্ট করেই তিনি বলেছেন : ‘... কবিতার পর কবিতা পড়লে কোনো-একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবার লক্ষণ যেন দেখা যায় না। কিন্তু— বলতে পেরে সুখী হচ্ছি— এই অসংবদ্ধতার অভিযোগ থেকে অন্তত একজন কবি মুক্ত হ’তে পেরেছেন। তিনি নরেশ গুহ। তরুণতর কবিদের মধ্যে তিনি যে অগ্রণী, সে-বিষয়ে যদি বা কারো সন্দেহ থাকে তা দূর হবে তাঁর সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘দুরন্ত দুপুর’ পড়লে। এ-বইয়ের অধিকাংশ রচনাই ইতিপূর্বে ‘কবিতা’য় বেরিয়েছিলো, এদের সঙ্গে আমার পুরোনো চেনা— এবং এ-কথা স্বীকার করতেও আমার দ্বিধা নেই যে এই কবির রচনার প্রতি প্রথম থেকেই আমার পক্ষপাত জন্মে গেছে।... ভালো লেগেছে সেই কবিতার স্নিগ্ধতা, স্বপ্নিলতা, রচনাশিল্পের সৌষ্ঠব। ভালো লেগেছে লিরিকের দিকে ঝোঁক, নিচু গলায় নরম ক’রে বলার দিকে উন্মুখতা। এই উন্মুখতারই প্রথম ফসল ‘দুরন্ত দুপুর’।’ এই বক্তব্যের সঙ্গে বুদ্ধদেব আরও যোগ করেছেন : ‘ ‘দুরন্ত দুপুর’ বিষণ্ন মধুর শান্ত রসের কাব্য। একটি ব্যথিত হূদয়ের স্বগতোক্তি এখানে শুনতে পাই আমরা— কিন্তু ব্যথিত ব’লে বিক্ষুদ্ধ নয়।’ বুদ্ধদেব তাঁর কাব্যবিচারের অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে প্রথম কবিতার বইয়ের আলোকে নির্ভুল সনাক্ত করেছেন নরেশ গুহর কবিস্বভাব ও কাব্য-নির্মাণের কৌশলকে। ‘দুরন্ত দুপুর’-এর পেছনের মলাটে কবি ও কবিতা সম্পর্কে যে ধারণা দেওয়া হয়, তাতে ‘কবিতা’ পত্রিকার এই মন্তব্যটি উদ্ধৃত হয়েছিল : ‘তরুণতরদের মধ্যে সবচেয়ে সুরেলা কবি নরেশ গুহ’। বলা বাহুল্য এই উপাধিবাচক উক্তিটিও বুদ্ধদেব বসুরই। নরেশ গুহর মেধা ও মনীষার স্বীকৃতিও দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব। নরেশ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন বুদ্ধদেবেরই আনুকূল্যে। তিনি সে মর্যাদা পুরোপুরিই রক্ষা করেছিলেন। বুদ্ধদেবের অবর্তমানে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগটিকে নরেশ গুহ ও তাঁর সহকর্মীরা ভালোভাবেই গুছিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। উপকৃতজনের অকৃতজ্ঞতার দুর্নাম কখনো কোনোভাবেই নরেশকে স্পর্শ করতে পারেনি। বুদ্ধদেব-পরিকরদের মধ্যে সবমিলিয়ে কে যোগ্য ও শ্রেষ্ঠ—এই প্রশ্নের জবাবে নরেশ গুহর নাম এলে বোধকরি কেউ আপত্তি করবেন না।
নরেশ গুহ সহায়ক হিসেবে বুদ্ধদেবের কাজেকর্মে কতখানি নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য ছিলেন তার প্রমাণ মিলবে ‘কবিতা’ বা ‘বৈশাখী’ প্রকাশের কাজকর্মে। পৌষ ১৩৬১ থেকে পৌষ ১৩৬৫ পর্যন্ত মুদ্রিত নামে তিনি ছিলেন ‘কবিতা’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। বুদ্ধদেবের বইপুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্রেও অকাতর শ্রম ও অঢেল সময় দিয়েছেন। ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’র সংকলন ও সংস্করণের কাজে তাঁর সহায়তার কথা দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞপ্তিতে (ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬) বুদ্ধদেব বসু স্মরণ করেছেন এইভাবে : ‘এই সংস্করণের সম্পাদনায় আমাকে মূল্যবান সাহায্য করেছেন শ্রী নরেশ গুহ; এ-জন্য, এবং অন্য অনেক সহযোগের জন্য, তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ আছি।’ বুদ্ধদেব তাঁর ‘ভাসো আমার ভেলা’ (১৯৬৩) গল্পের বইটি নরেশ গুহ ও তাঁর স্ত্রী চিনুকে উত্সর্গ করে তাঁর স্নেহ-প্রীতি-শুভেচ্ছার পরিচয় দেন। আর নরেশ গুরুকৃত্য সম্পন্ন করেন ইয়েটস সম্পর্কে তাঁর গবেষণাগ্রন্থটি (১৯৬৮) বুদ্ধদেব বসুর ষাটতম জন্মবর্ষে তাঁর নামে উত্সর্গ করে।
ছয়
আলস্য বা ব্যস্ততা থাকলেও চিঠিপত্র যে নরেশ গুহ একেবারে কম লেখেননি, তার নিদর্শন দুর্লভ নয়। এখানে নানা বিষয়ে লেখা তাঁর ষোলোটি চিঠি, যা আগে কখনো প্রকাশিত হয়নি, সংকলিত হলো। সবগুলো চিঠিই সুরজিত্ দাশগুপ্তকে লেখা এবং চিঠিগুলো তাঁরই সৌজন্যে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হতে পারল।
সুরজিত্ দাশগুপ্ত সৃজনধর্মী ও মননশীল—এই দুই ধারার লেখক হিসেবেই পরিচিত। পত্রিকা-সম্পাদক হিসেবে অল্পবয়সেই মনোযোগ পান—দূরের দার্জিলিং থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘জলার্ক’ পত্রিকা নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। পত্রিকা প্রকাশ, নিজের সাহিত্যচর্চা ও শখের পত্রমিতালির সূত্রে লেখক ও অন্যান্য পেশার অনেক খ্যাতিমান মানুষের সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে এবং সেই সম্পর্ক কারও কারও সঙ্গে গাঢ় ও গভীর হয়ে ওঠে—নরেশ গুহ তাঁদেরই একজন।
এখানে যে ষোলোটি চিঠি ছাপা হলো, তা ১৯৫২ থেকে ১৯৫৫—এই সময়ের মধ্যে লেখা। সুরজিতের ভাষ্য, এর আগে-পরের আরও বেশ কিছু চিঠি ছিল, তা হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যায়। ষাট সালের পর নরেশ গুহর সঙ্গে তাঁর আর চিঠিপত্র আদানপ্রদান হয়েছে বলে সুরজিত্ মনে করতে পারেন না। আর ততদিনে সুরজিত্ দার্জিলিং-শান্তিনিকেতন ঘুরে কলকাতায় এসে থিতু হয়েছেন। তাই কলকাতাবাসী নরেশ গুহর সঙ্গে চিঠিপত্রের যোগাযোগ উঠে যায়—প্রয়োজনে সরাসরি সাক্ষাত্ বা টেলিফোনেই কথাবার্তা হতো, সেও কালেভদ্রে।
সুরজিতের পত্র-যোগাযোগের ক্লান্তিহীন প্রয়াস ও মানসতা প্রসঙ্গে নরেশ গুহ বলেছেন : ‘বিশ্বের সবাইকে প্রায় আপনি পত্রসখা করেছেন।’ কথাটি ‘বিশ্বের’ না বলে ‘বাংলার’ বললে তা প্রায় আক্ষরিকঅর্থেই সত্য হবে। নরেশও সুরজিতের এই ‘পত্রসখা’র একজন হয়ে উঠেছিলেন। নরেশের পত্রাবলি প্রায়শই বিবরণধর্মী, আবার কখনো ব্যাখ্যামূলক, ব্যক্তি বা ঘটনার প্রসঙ্গও এসেছে, আছে ব্যক্তিগত অনুভূতির ছোঁয়া। আমরা চটজলদি সংকলিত চিঠিগুলোর প্রকৃতি-প্রসঙ্গের কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হব।
সাত
১৯৩৯ সাল থেকে নরেশ গুহ কলকাতায় থাকলেও, এই মহানগরী তাঁকে যে খুব আকৃষ্ট ও অধিকার করতে পেরেছিল, তা নয়—একটা কেমন যেন পিছুটান তাঁর থেকেই গিয়েছিল। কলকাতা কখনোই তাঁকে মোহপাশে বাঁধতে পারেনি, তাঁর কবিতাতেও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শান্তিনিকেতন তাঁকে খুব টানত, চিঠিতে সেসব কথা আছে। শান্তিনিকেতন থেকে সদ্য ফিরে আসা নরেশ ১৯৫৩-এর ৯ মার্চের চিঠিতে লিখছেন : ‘ভালো লাগছে না কলকাতায়। দুপুরগুলো অসম্ভব ফাঁকা। বিকেলগুলো অসহ্যরকম বিরস। হঠাত্ হঠাত্ আশ্চর্য ফাল্গুনের সমারোহ দেখে অন্য কিছুর কথা মনে পড়ে। কিন্তু সে কথা যাক। অতীত নিয়ে হাহুতাশ করার বাসনা নেই। আমরা একদিন আনন্দের মধ্যে সেই আশ্রমপ্রাঙ্গণে মিলতে পেরেছিলাম—এটুকুই যথেষ্ট।’
নরেশ গুহ ‘কবিতা’ পত্রিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। পত্রিকা নিয়ে যথেষ্টই ভাবতে হতো। তাঁর তরফে মাঝে-মধ্যেই খবর মেলে পত্রিকার প্রকাশনা ও বিতরণের কিংবা ভিপি প্যাকেট ফেরত আসায় পত্রিকার ক্ষতির বিষয়ের। গ্রাহক খুঁজে দেওয়ার অনুরোধও পেশ করেন। কতখানি দরদ থাকলে বলা যায় : ‘কবিতা আত্মহত্যা করলেও কবিতার মুখ থাকবে, কিন্তু অর্থাভাবে তার অপমৃত্যু যেন না হয়’ (চিঠি : ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩)।
জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে নরেশ গুহ ও সুরজিত্ দাশগুপ্ত, এই দুজনেরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল—এঁদেরকে লেখা জীবনানন্দের চিঠিপত্রে সম্পর্কের গভীরতা বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। সুরজিতের ‘জলার্ক’ পত্রিকার জীবনানন্দ স্মরণসংখ্যা সমাদর ও প্রশংসা পেয়েছিল। ‘কবিতা’রও স্মরণসংখ্যা প্রকাশিত হয়, তার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে নরেশ জানান : ‘তাড়াহুড়ো ক’রে জীবনানন্দ বিষয়ে কিছু করা অশোভন। তাই পরবর্তী সংখ্যা [কার্তিক] পুরোটা এই আশ্চর্য কবির আলোচনা এবং স্মৃতিচারণায় উত্সর্গিত হবে।’ জীবনানন্দের মৃত্যুতে নানা শোকসভা-পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ—এসব আকস্মিক উত্সাহ নরেশ গুহকে সুখী করতে পারেনি—কেননা এর বেশিরভাগই ছিল মেকি। কিছুটা বিরক্ত হয়ে ক্ষোভের সঙ্গে নরেশ মন্তব্য করেছেন : ‘বহুকাল জীবনানন্দ অনাদৃত ছিলেন। সম্প্রতি কিছু লোকে ভালোবাসতে শুরু ক’রেছিল। হঠাত্ হোমযাগযজ্ঞাদি আরম্ভ হয়ে গেলে কাব্যরসিকের মনে নানা রকম খট্কা লাগে’ (চিঠি : ৮ নভেম্বর ১৯৫৪)।
১৯৫৩ সালে অন্নদাশঙ্কর রায় ও আরও কারও কারও উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে সাহিত্যমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলায় পূর্ববঙ্গ থেকে যোগ দেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, কবি শামসুর রাহমান ও কবি কায়সুল হক। শেষের দুজনের সঙ্গে নরেশ গুহর আগে থেকেই পরিচয় থাকলেও সেই সম্পর্ক আরও গভীর ও গাঢ় হয় সাহিত্যমেলার সুবাদে। শামসুর রাহমান ও কায়সুল হক সুরজিতেরও বিশেষ বন্ধু ছিলেন। নরেশ চিঠিতে বারবার এঁদের দুজনের কথা বলেছেন। রাহমান ও তাঁর কবিতার কথা উঠে এসেছে, প্রশংসামুখর নরেশের মন্তব্য : ‘এমনিতেও খুব ভালো লেগেছিল শামসুরকে। যেন কাব্যজগতের ব্যগ্র উপলব্ধির মধ্যে অবগাহনের সাড়া জেগেছে এই নতুন কবির মনে’ (চিঠি : ১৩ জুন ১৯৫৩)। ওঁদের চিঠি না পাওয়ায় বা পেতে দেরি হওয়ায় উত্কণ্ঠা বেড়েছে নরেশের। পূর্ববঙ্গের এই বন্ধুদের জন্যে স্মৃতিকাতর নরেশ লিখেছেন : ‘শামসুর রহমানরা [রাহমানরা] আমার এখানে দুদিন ছিলেন। তার ফলে সাহিত্যমেলার আমেজ কেটেও কাটছিলো না। থেমে যাওয়া গানের রেশ তখনো হাওয়ায় কাঁপছিল। কদিন আগে তারাও চলে গেছে। এখন সত্যি সমাপ্তি’ (চিঠি : ৯ মার্চ ১৯৫৩)।
শামসুর রাহমানও নরেশ গুহর প্রতি যে আন্তরিক আকর্ষণ বোধ করতেন, সেইসঙ্গে শ্রদ্ধা ও মান্যও, তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে নরেশকে লেখা তাঁর চিঠিপত্রে। ২২ জানুয়ারি ১৯৫৩ ঢাকা থেকে রাহমান যে চিঠি নরেশকে লিখেছেন, তাতে বলেন : ‘বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়, আপনার হূদয়ের ধ্বনি আর উত্তাপের কথা।’ শামসুর রাহমান ওই চিঠিতেই আশা করেছেন : ‘সম্বন্ধের যেটুকু ধূসরতা এখন গড়ে উঠেছে আমাদের মধ্যে তা’ একদিন উজ্জ্বলতার চেহারায় এগিয়ে আসবে...।’ রাহমানের এই ‘বিশ্বাস’ যথার্থই একসময় দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছিল। সম্পর্ক আরও একটু গাঢ় হয়ে উঠলে রাহমান নরেশকে লিখেছিলেন : ‘আপনার মনে সুখ নেই। সত্যি বলতে কি আমরা কেউই সুখী নই। জাগতিক অর্থে যেটা সুখ আমরা বোধ করি তা’ কখনও পাবো না। আর সেই সুখ পাবো না বলেই আমরা কবি’ (চিঠি : ১৫ জুন ১৯৫৩)। ওই একই চিঠিতে রাহমান নরেশকে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি করেছিলেন এই কথা বলে : ‘বোধ হয়, আপনার জীবনে এমন কিছু ঝড় বয়ে গেছে যার স্মৃতি আপনি মুছে ফেলতে পারেন না। তাই কি?’
শামসুর রাহমান ঠিকই অনুমান করেছিলেন নরেশ গুহর জীবন সম্পর্কে। কলকাতার জীবনে তাঁকে টিকে থাকার জন্যে একটা সময়ে কঠোর-কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। পরান্নে-পরাশ্রয়ে গ্লানিময় জীবন যাপন করতে হয়েছে। ভাইবোনদের লেখাপড়া-ভরণপোষণের শক্ত দায় গ্রহণ করতে হয়েছে। এসব করতে গিয়ে নিজেকে সংগত কারণেই অনেককিছু থেকে বঞ্চিত করতে হয়েছে। কখনো কখনো তাঁর লেখায়—তাঁর চিঠিপত্রে একধরনের নৈরাশ্য-নৈঃসঙ্গ-উদ্ভ্রমের আভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক সময় মনে হয়েছে এই নাগরিক জনারণ্য থেকে তিনি দূরে কোথাও যেতে চান—নির্জন-দুর্গম কোনো জায়গায়—একদম আদিম নিসর্গের বুকের ভেতর আশ্রয় যেন বা তাঁকে শান্তি-স্বস্তি দেবে। মাঝে-মধ্যেই চিঠিতে তাঁর মানসিক অবস্থার খবর পাওয়া যায়, যেমন :
মৃত্যুর মতো অন্ধকার একটা অবসাদ আমাকে পেয়ে বসেছে (চিঠি : ১৪ আগস্ট ১৯৫৩)।
এ জীবনে শান্তি নেই। মনেই হয় না জীবিতের সংসারে বেঁচে আছি। তাই কিছুই করি না, কিছুই লিখি না, ভাবি না, চিঠির জবাব লেখা হয় না, নিমন্ত্রণে যাওয়া হয় না (চিঠি : ঐ)।
আপনার শেষ চিঠিতে কাশফুলের দূর-দৃশ্য, শিউলির ঝরে পড়ার কথা শুনে ধিক্কার দিচ্ছি নিজের ভাগ্যকে (চিঠি : ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩)।
বিজয়ার সময় আমি রাঁচী পাগলাগারদের রেলিং ধরে উন্মাদ দর্শনে ব্যস্ত ছিলাম। ওখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে নিজেকে,— নিজেদের— বিশেষ পৃথক বলে মনে হোলো না (চিঠি : ২৭ অক্টোবর ১৯৫৩)।
... আসাযাওয়ার পথ কি আমার খুশীতে খোলে, না বন্ধ হয়? কতো অদৃশ্য সুতোয় যে হাতপা বাঁধা তা ভাবতে বসলে মাথা ঘোরে (চিঠি : ৫ মার্চ ১৯৫৪)।
মনের বিশৃঙ্খল অবস্থাটা গুছিয়ে নেবার জন্যে কয়েকবছর অজ্ঞাতবাস প্রয়োজন (চিঠি : ২০ জুলাই ১৯৫৪)।
এসব চিঠিতে যে মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যায়, তিনি যে মোটের ওপর সুখী বা তৃপ্ত নন—একটা উদাস-রহস্যঘেরা জীবনের মালিক তিনি, তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারা যায়। কখনো কখনো মনে হয়, এ এক প্রচ্ছন্ন নীলকণ্ঠ কবি-মানুষের জীবনভাষ্যের সংকেত-রেখা।
‘আর, দেখ, চিঠির বাক্সটা যেই খুলি
চিঠি : ১
চৈত্র, ১৩৫৯
কলকাতা
প্রীতিভাজনেষু,
আমার মনের স্বভাবটা অবকাশের মাধুর্য অভিলাষী, তাই উদয়াস্ত আমাকে বিচিত্র অকাজের মজুরীতে নিযুক্ত করা হয়েছে। আপনার পত্রে উল্লিখিত চৌরঙ্গীর বিজন জনতার শোভা কখন দেখব বলুন তো? সরকারী বাসের মাথায় চড়ে কদাচিত্ দ্রুত পর্যটন করতে করতে চোখে পড়ে কি রকম যেন একটা রং বদলের সাড়া পড়ে গেছে কলকাতা শহরের প্রকৃতি-পল্লীতে। অদৃশ্য মজুররা পুরনো ঝুলকালি ঝেড়ে দেখতে দেখতে বৃক্ষশাখায় রং ফিরিয়ে দিচ্ছে, যেমন লাটসায়েব আসবেন বলে একবার আমাদের সেই দেশলাই বাক্সের মতো চারকোণা কলেজটাতে রাতারাতি হোয়াইটওয়াশ করে দিয়েছিলো সেই রকম। দিন কয়েক বেশ লাগে দেখতে। তারপর নানা বিপাকে ঘুরপাক খেতে খেতে হঠাত্ একদিন ফাঁকা বিকেলে তাকিয়ে দেখা যায়— কখন এরই মধ্যে সেই ঝক্ঝকে রং কালচে হয়ে উঠেছে, বেরিয়ে এসেছে সনাতন চূণবালি খসা দেয়ালগুলোর আসল মূর্তি। লাটসায়েব আসেন, চলে যান, রং করা দেয়ালের কাজ ফুরোয়, আর আমরা যারা সেই দেয়ালে বারোমাস মাথা ঠুকি— তাদের কী প্রয়োজন শোভায়, সৌন্দর্যে? জানালা দিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছে— আরো একটা বসন্ত তাহলে গেলো। স্টেট্্সম্যান লিখেছে গতকাল হাওয়ার তাপ উঠেছিল ১০২ ডিগ্রী। এখবরটা সত্যি খবর। শ্রীযুক্ত বসন্ত কালটি হচ্ছেন বিলিতি কেতার লাটসায়েব, বুঝতে পারছেন তো?
আপনার পাঠানো ফটোতে আমি কিন্তু মিনিট কয়েক চেষ্টা করেই নিজেকে আবিষ্কার করলুম। বেশ উঠেছে। তবু আপনি এত বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন কেন? কিছুই না উঠতেও তো পারতো? তার চাইতে এটা মন্দ হোলো? সাহিত্যমেলা উপলক্ষে যা কিছু ছবি ধরতে পেরেছেন— সবই এককপি করে পাঠিয়ে দেন তো খুশি হই। নারাণবাবুদের সঙ্গে তোলা সেই ছবিগুলো কি গেছে? — (তবে) শুধু থাক/একবিন্দু ... ইত্যাদি। আর সেই সঙ্গে আমাদের গ্রুপ ফটোর নেগেটিভটিও পাঠাবেন। পরের ডাকেই ফিরিয়ে দেব।
আমার বইটার অনেকগুলো কপি আমি বিলি করেছি, তখনো হাতে ছিল। আপনাকে বলতে লজ্জা নেই— যাঁদের দিয়েছিলাম তাঁরা অনেকে বোধ করি পাতা খুলেও দেখেন নি। এখন আমার মনে হচ্ছে তাঁরা ঠিকই করেছিলেন। কেননা আমিও তাঁদেরই দলে। বইটা নিজের কাছেও এককপি নেই। তাই আমিও তাঁদের মতোই সেটার পাতা উল্টে দেখি না। নিজের জিনিসের প্রতি সামান্য এই মমতাটুকুও নেই শুনে আপনি আশা করি অবাক হবেন না। তবে শিগ্যিরই ভাবছি আর একটা বই ছাপাব। কে ছাপাবেন জানি না। আমার পূর্বতন প্রকাশক নিশ্চয়ই গররাজী হবেন। যাই হোক— মনে মনে সে বইটার একটা ডাকনামও ঠিক করেছি— ‘অরণ্যে রোদন’। কী বলেন? লোকে মুখ ভ্যাঙ্গাবে?
শামসুররা গিয়ে কোনো চিঠি লেখেন নি— সেটা বড়ো আশ্চর্য ঠেকছে। কায়সুল লিখেছিলেন— পৌঁছা সংবাদ। আশংকা হচ্ছে কলকাতায় আমি তাঁদের উপযুক্ত সমাদর করতে পারি নি। বাড়িতে মহিলা নেই বলে এটা তাঁরা ক্ষমা করবেন আশা করি।
কিন্তু আজ থাক। আপনাকে চিঠি লিখতে গিয়ে আবার অনেক সব অবান্তর দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ওসব দূরে ঠেকিয়ে রাখাই ভালো। এখন আমি দাড়ি কামিয়ে, খেতে বসব। বেলা একটায় ক্লাশ চেঁচানো আছে— দেড়শো ছেলের ক্লাশে শেষ বেঞ্চেও গলার আওয়াজ পৌঁছে দিতে হবে। ভেবে একটু আধটু হূত্কম্প না হচ্ছে তা নয়। তার আগে আরাম করে এখন একটি সিগারেট খাই। ইতি
বুধবারের বেলা বারোটা
নরেশ গুহ
চিঠি : ২
১৭/১/৫৩
প্রীতিভাজনেষু,
আপনার কাছে আমার লজ্জা রাখবার জায়গা নেই। বিশ্বের সবাইকে প্রায় আপনি পত্রসখা করেছেন। আমার নিবিড় আলস্যের সঙ্গে আপনার এই আশ্চর্য আগ্রহের তুলনা করে বিস্মিত হই। আমার দিক থেকে এইটুকু শুধু সাফাই তা জলপাইগুড়ির ঠিকানা লেখা খামখানা এলোমেলো কাগজের অরণ্য থেকে সন্ধান করে আমি বের করেছি, এবং ঠিকানা কেটে সেখানাই এবার শান্তিনিকেতনে পাঠালুম। কবিতা পড়ে নিজের থেকে যাঁরা আমাকে চিঠি লেখেন, বলাবাহুল্য, তাঁদের সংখ্যা হাতের আঙুলে গোনা যায়। আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা তাই অনেকখানি। তবু যে সময়মত চিঠির উত্তর পান নি তার জন্যে আমাকে অকৃতজ্ঞ ভাবলে— বলুন— আমি কি অপ্রস্তুত হতে পারি?
কিন্তু না, আলস্য জিনিশটা মারাত্মক রোগ। নিজের থেকে কিছুতেই তার হাতে আর ধরা দেওয়া নয়, নতুন ইংরিজী সালে এই রকম একটা সংকল্প করেছি। তার ফলে আজ সতেরোই জানুয়ারী, শনিবারের ছুটির সন্ধ্যাটি চিঠি লিখেই কাটছে। ছুটি বলতে এই শনিবারটাই, সপ্তাহে একদিন। রবিবার তো ছুটি শেষ হওয়ার শোকেই মুহ্যমান। এরপর আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন?
আপনাদের ওখানে শুনছি ফেব্রুয়ারীতে ‘সাহিত্যমেলা’র আয়োজন হয়েছে। সম্ভাবনা আছে, তখন একবার যাবো। সে সময় সাক্ষাতে কথা হতে পারবে। ইতিমধ্যে আপনাকে দুটি অনুরোধ জানিয়ে রাখি :
দয়া করে, আশ্রমে কোনো উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হলে তার খবরটা আগেই আমাকে জানাবেন। কলকাতা থেকে কোনোক্রমে যদি পালাতে পারি তাহলে মাঝে মাঝে আপনাদের সঙ্গে উত্সবে মিলিত হতে চাই।
Santiniketan কাগজের একটি সংখ্যা আমাকে পাঠাবেন। আমার প্রতি কী প্রতিশোধ আপনি নিয়েছেন সেটা একবার দেখতে চাই। একেই বোধ করি বলে অহিংস প্রতিশোধ? নাকি অহিংসা আর প্রতিশোধ কথাদুটোর যুগ্মব্যবহার অসিদ্ধ?
আপনি সুনীলবাবুর কবিতার বই ছাপিয়েছেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। অন্ততঃ আরো একটু বড় আকারে করলে সম্পূর্ণ তৃপ্তি হোতো।
আমার প্রীতিনমস্কার জানবেন,
ইতি
নরেশ গুহ
চিঠি : ৩
২/২/৫৩
প্রীতিভাজনেষু,
আপনাদের আশংকার একেবারে কোনোই ভিত্তি নেই। সুনীলবাবু আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন এবং তিনি আমার একজন প্রকৃত মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। অতএব তাঁর কোনো কথা কিংবা কোনো চিঠির আমি ভুল তাত্পর্য গ্রহণ করব— সেটা হতেই পারে না। এ বিষয়ে আপনারা মনে কোনো সংশয় না রাখলে আমি নিশ্চিন্ত হব।
তাছাড়া সুনীলবাবু আমাকে যে চিঠি লিখেছেন তাতে প্রশংসার মাত্রা এত বেশী আছে যে বর্তমান পত্রলেখক সেজন্যে রীতিমতো লজ্জিত। তবে কিনা যাদের স্নেহ করা যায় তাদের যত্সামান্য সাফল্য দেখলেই খুশী হয়ে আমরা প্রচুর বাহবা দিয়ে বসি। সেই প্রশংসাবাণীকে স্নেহের দান বলেই আমি তাই গ্রহণ করেছি, আমার প্রাপ্য বলে নয়। এবং তিনি অনেক দ্বিধার সঙ্গে সামান্য যেটুকু সমালোচনা (বিরূপ অর্থে) করেছেন তা নিয়ে তিনি সংকুচিত বোধ করলে আমি দুঃখিত হব। কেননা সেইসব ত্রুটিবিচ্যুতি বিষয়ে লেখক হিসেবে নিজের আমার কম জানা নেই। আমার সেই জানার সঙ্গে সহূদয় আরো যাঁদের মন্তব্যের মিল দেখতে পাই তাঁদের আমি যথার্থ হিতৈষী বলে মনে করি। হিতৈষী তাঁরা নন যাঁরা দায়িত্বশূন্য গদগদ ভাষণে আশুসন্তুষ্টির উপায় খোঁজেন। আপনি আশা করি আমাকে সেই যশোলিপ্সুদের প্রতিভূ মনে করবেন না যাঁরা ঈশ্বরপ্রেরিত প্রতিভা নিয়ে বৃন্তহীন পুষ্পসম বাংলাদেশে বিকশিত হন।
সুনীলবাবুকে চিঠি দিতে আমি দেরী করেছি তার একমাত্র কারণ হচ্ছে এই যে তাঁর সুলিখিত আলোচনাটি হাতে পেয়ে নিছক প্রাপ্তিসংবাদ দিতে ভালো লাগছিলো না। আমারো ইচ্ছে ছিল ‘মিলিতা’ কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে ধীরেসুস্থে আমার মনের কথাটি তাঁকে লিখে জানাব। কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। শান্তিনিকেতনের অঢেল সময় নিয়ে আপনারা বুঝতেই পারবেন না কী রকম ছট্্ফট্্ করতে করতে এখানে শীতের এই হ্রস্বাকার দিনগুলো আমার কেটে যাচ্ছে। কিছুদিন থেকে সকাল বেলাটা আমার কোনো কাজেই লাগে না। বেলা দশটা এগারোটা থেকে দিন সুরু হয়। এবং তারপর থেকে রাত্রি একটা কোনোদিন দুটো পর্যন্ত সময় কীভাবে যে রাহাজানি হয়ে যায় তা একমাত্র আমিই জানি। যাই হোক, আত্মজীবনী থাক। আমার আত্মকথা শোনার জন্য আপনি আমার চিঠি পড়বেন না। কিন্তু কথা হচ্ছে সুস্থির ভাবনার অবকাশ যদি বিরল হয়েই থাকে তাহলেও তো প্রিয়জনদের সঙ্গে চিঠি লেখা বারণ হতে পারে না। কাজেই পরাজিত মনে সুনীলবাবুকেও এই সঙ্গে আমি চিঠি লিখলুম।
সাহিত্যমেলার খবর পেয়েছি। নিমাইবাবু অশোকবাবুর চিঠি পেয়েছি এবং তাঁদের জানিয়েছি যে আমার সাধ্যমত তাঁদের কাজে লাগার জন্য আমি প্রস্তুত থাকলুম। ইতিমধ্যে ‘টুকরো কথা’ নামক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সংবাদ ছাপা হতে গেছে। তার মানে ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মাসিকপত্রের গ্রাহকবৃন্দ এ সংবাদ পাবেন, যদিও দৈনিক সংবাদপত্র সে কাজ আগেই করেছে।
আপনি সেদিন এসেই পালালেন। শীতমেঘলা দুপুরে আমরা বহুদিন পরে সেদিন একটুখানি ছুটি উপভোগ করছিলাম। অর্থাত্ ক্যারমখেলা চলছিল ছোটোদের সঙ্গে। সাহিত্যমেলায় হয়তো শান্তিনিকেতনের অতিথি হতে যাচ্ছি। শুনেছি ওখানে যে বসন্তোত্সব হয় তার নাকি তুলনা নেই। অনেককাল পরে আমার প্রধান একটি কৌতূহল হরণ হতে চলেছে।
শীতশেষে কী সুন্দর দিন আজকাল। একটু আগে রোদে পিঠ দিয়ে বসে ভাবছিলুম ব্রিটেনের পুবসীমায় আর হল্যাণ্ডের পশ্চিমে কী প্রভূত ক্ষতি সাধিত হয়েছে কদিন আগে। অতলান্তা কুপিতা হয়েছেন। এখানে শীতশেষের শান্তি।
আপনাদের প্রীতিমুগ্ধ
নরেশ গুহ
চিঠি : ৪
শ্রীসুরজিত্ দাশগুপ্ত
KAVITA BHAVAN
CALCUTTA 29
৯ মার্চ, ১৯৫৩
প্রীতিভাজনেষু,
আনন্দের দিনগুলি ফুরোলো, যদিও কলকাতায় নববসন্তের লাবণ্য এখনো ম্লান হয় নি। কতবারই তো গেছি শান্তিনিকেতনে, ভালোও লেগেছে। প্রথম ঊনিশশো ঊনচল্লিশে। তারপর এই তিপ্পান্ন পর্যন্ত অসংখ্যবার যেতে হয়েছে। কিন্তু কবুল করি— এমন ভালোলাগার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সাহিত্যমেলার উদ্যোক্তাদের নমস্কার করি। তাঁরা জানেনও না কী আনন্দ আমি পেয়েছি। সাহিত্যমেলার উপরন্তু ছিল আমাদের চতুর্থ দিনের হৈ হৈ করা সকাল দুপুর। বিকেলটা আপনি দেখলেন না, শান্তিনিকেতনে ফিরে শুনবেন। আপনার বন্ধুরা সবাই ইস্টিশান অব্দি গিয়েছিলেন। গাড়ি ছাড়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের মজা করা ফুরোয় নি। তারপর গাড়ি যখন সবুজ আলোর সীমানা ছাড়িয়ে মাঠের পথে ছুট দিল তখন আসন্ন সন্ধ্যার আবছায়ায় কারো মুখ বিষণ্ন হয়েছিল কিনা তা কে জানে।
ভালো লাগছে না কলকাতায়। দুপুরগুলো অসম্ভব ফাঁকা। বিকেলগুলো অসহ্যরকম বিরস। হঠাত্ হঠাত্ আশ্চর্য ফাল্গুনের সমারোহ দেখে অন্য কিছুর কথা মনে পড়ে। কিন্তু সে কথা যাক্। অতীত নিয়ে হাহুতাশ করার বাসনা নেই। আমরা একদিন আনন্দের মধ্যে সেই আশ্রমপ্রাঙ্গণে মিলতে পেরেছিলাম— এটুকুই যথেষ্ট। ভালোকে চিরকাল টিঁকিয়ে রাখতে হলে পৃথিবী তার বাসযোগ্যতা হারাতো।
শামসুর রহমানরা [রাহমানরা] আমার এখানে দুদিন ছিলেন। তার ফলে সাহিত্যমেলার আমেজ কেটেও কাটছিলো না। থেমে যাওয়া গানের রেশ তখনো হাওয়ায় কাঁপছিল। কদিন আগে তারাও চলে গেছে। এখন সত্যি সমাপ্তি।
আপনাকেও ধন্যবাদ যে আমাদের সেই দ্রুতধাবমান আনন্দমুহূর্তের কিছুটা অংশ আপনার ক্যামেরাযন্ত্রে ধরে রেখেছেন। উত্কণ্ঠিত ভাবে অপেক্ষা করছি। ছবির কপি পাঠান। আশা করি এখন দুঃসংবাদ শুনতে হবে না যে ছবিগুলো বরবাদ গেছে। সেটা একটা বড়ো ক্ষতি বলে মনে করব তাহলে।
‘দুরন্ত দুপুরের’ আলোচনা করেছেন দেখে কৃতজ্ঞ বোধ করছি। ওটুকু হচ্ছে লেখার জন্যে উপরন্তু আত্মপ্রসাদ ভোগ করা। আসলে আমার কোনো দেখা আপনার যদি ভালো লাগে তার জন্যে আমার দিক থেকেই কৃতজ্ঞতার কারণ বেশী থাকবে। সুখী করার চাইতে বড়ো সুখ খুব অনেক নেই পৃথিবীতে। আপনার ‘জলার্ক’ শামসুরকে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু— আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি— ফটো পাঠাতে দেরী করবেন না।
ছুটির সুখ ফুরলো এবার কাজের পালা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাতার স্তূপ এসে পড়ে আছে। এখনো স্পর্শ করি নি, কাল প্যাকেট খোলা যাবে। এবং তারপর থেকে মাসখানেক সময় কাটবে চরম দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে।
সাহিত্যমেলার সঙ্গে আপনারা যাঁরা জড়িত ছিলেন, যাঁদের আশ্চর্য কর্মক্ষমতা দেখে আমি স্তম্ভিত,— আমার অভিনন্দন গ্রহণ করবেন। শহুরে বাবুদের কাছে শান্তিনিকেতনের পক্ষ থেকে শক্তি আর সৌন্দর্যের এই মিলিত রূপটি প্রকাশ করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। প্রীতিনমস্কারান্তে,
নরেশ গুহ
চিঠি : ৫
১৩ জুন [১৯৫৩], শনিবার
প্রীতিভাজনেষু,
আপনি বড়োই আশাবাদী। তাই যথাসময়েরও আগে পাবো বলে চিঠিটা জরুরী টিকেটে পাঠিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য আজ ১৩ জুন সকাল সাড়ে দশটাতেও সে চিঠি পৌঁছায়নি এসে। এই ঘটনার মর্যাল : অবস্থা বিবেচনা করে, unassuming হওয়াই সাফল্যের সূত্র। ডাকবিভাগে unassuming হওয়া মানে— বিষয়টা যে জরুরী সেটা সর্ব উপায়ে গোপন করা।
যাই-হোক আর একটা প্রুফ না-হয় পাঠান। একবার চোখ বুলিযে না দিলে খুঁত্খুঁত্ করে মন।
অরণ্যে রোদন নিষ্ফল হবে বলেই গা করছি না অথচ নিজের প্রতি সুবিচারের জন্যেও সেটা প্রয়োজন বলে মনে করি। বই যতোক্ষণ না বেরোচ্ছে, ততক্ষণ লেখক নিজেও পুরোপুরি জানতে পারেন না যে ত্রুটি কোথায়, কোথায় সম্ভাবনা, কোথায় গৌরব। ‘দুরন্ত দুপুর’ না-ছাপা হলে কি বুঝতাম— লেখাগুলো কত তুচ্ছ? রবীন্দ্রনাথের দেশে, রবীন্দ্রনাথের পরে জন্মাবার যে কী দুঃখ! অথচ আমার মনের স্বভাবটা পূর্বমূখী। সোনায় মোড়ানো গতকালে জন্ম নেবার অভিলাষ আমি কখনোই পোষণ করি না। আমার বরং সেই চীনে কবির মতো মাঝে মাঝে দুঃখ হয় যে আগত ভবিষ্যত্কালে কত লোক, কত সুখদুঃখ নিয়ে থাকবে, অথচ আমি থাকবো না।
গ্রীষ্মের ছুটি ফুরিয়ে যাবার আগেই, ইচ্ছে আছে, দ্বিতীয় বইখানার নাম করে একটা খসড়া পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলব। এবং টাকার জোগাড় করতে পারলে কোনো এক সময় নিজের খরচেই ছাপাব। সে-টাকা অবিশ্যি কখনোই জোগাড় হবে না। কিন্তু সে চিন্তা আপাতত স্থগিত থাক। ইংরেজী করে বলতে গেলে বলতে হয়— সাঁকোটা একেবারে পায়ের সামনে এগিয়ে আসবে যখন— তখন সেটা পার হওয়ার কথা ভাবা যাবে।
আইয়ুব সাহেব গত পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা সংকলন করছেন। এ বিষয়ে কোনো ভাবে সহায়তা করতে যদি পারেন— দয়া করে আমাকে জানাবেন। কবিতা যাঁরা ভালোবেসে পাঠ করে থাকেন— তাঁরাই জানেন ভালো কবিতার সন্ধান।
শামসুর চিঠি লিখেছেন ঢাকা থেকে— পরপর তিনখানা। সঙ্গে দুটি নতুন কবিতা পাঠিয়েছেন। সুন্দর হয়েছে কবিতা দুটি। এমনিতেও খুব ভালো লেগেছিল শামসুরকে। যেন কাব্যজগতের ব্যগ্র উপলব্ধির মধ্যে অবগাহনের সাড়া জেগেছে এই নতুন কবির মনে।
আপনার পত্রিকা কবে ছাপা হয়ে বেরোবে? আগের সংখ্যা ক’খানা পেয়েছি। কিছু-কিছু অংশ ভালো লেগেছে। আর একটু মজবুত চেহারার হলে চোখের পক্ষে আরামের হয়।
বর্ষার আলাপ চলছে কলকাতায়। তাপ ঈষত্ নিম্নগামী, আকাশে উদাস-উদাস মেঘ। হঠাত্ একদিন গভীর রাত্রিতে বৃষ্টি মাথায় করে বাসায় ফিরতে হবে— রাস্তায় তখন লোক থাকবে না। প্রীতিনমস্কার জানবেন।
নরেশ গুহ
চিঠি : ৬
কলকাতা
১৪ আগষ্ট ’৫৩
প্রিয়বরেষু,
মৃত্যুর মতো অন্ধকার একটা অবসাদ আমাকে পেয়ে বসেছে। কোথায় গেল সাহিত্যমেলার সেই উজ্জীবন, শালবনে যখন মঞ্জরী আসে আসে, হাওয়া যখন অশোকে পলাশে লাল। আনন্দের পাখিরা ডাল ছেড়ে উড়ে চলে গেছে। শুনতে পাই দেশবিদেশের কবিরা এরকম অবসাদের মুহূর্তকে কবিতায় রূপবান করে সাজিয়ে রাখেন। কোথায়? অসতর্ক কোনো মুহূর্তে না-লেখা কবিতার ক্বচিত্ কোনো লাইন— যেন ভুল ক’রে— গুণগুণ করা ছাড়া আমাকে দিয়ে আর কিছুই তো হোলো না। খুব সাবধানে নিজেকে বাঁচিয়ে চলছিলাম কিছুদিন। সম্প্রতি হাল ছেড়ে দিয়েছি। কত অকাজের পাথর যে গলায় বেঁধে একটু একটু ক’রে ডুবে যাচ্ছি তার সংখ্যা হয় না। সেই অকাজের একটুখানি ফিরিস্তি দিই আপনাকে। ‘কবিতা’ পত্রিকা ছাপানোর জন্যে ছুটাছুটি করতে হয় প্রেসে। বন্ধু অম্লানের একটা বই ছাপা হোলো, সে কাজের যে কী হাঙ্গামা তা আমিই জানি। এখন আবার কলেজ লাইব্রেরিটি হাতে নিয়েছি। নিয়ে দেখি সে জায়গাটা একটি অব্যবস্থার অরণ্য হয়ে আছে। সে অরণ্য একা হাতে সাফ করতে হলে দশটা পালোয়ানের ক্ষমতা থাকা চাই। গলিয়াতের সঙ্গে লড়েছিল যে ছোকরা— কী যেন তার নাম?— বোধ করি বাইবেলের গল্প— সেই ছোকরার মতো খালি হাতে নেমে পড়েছি। কিন্তু সময় পাই কোথায়? একটা দিনে সাকুল্যে মাত্র চব্বিশটি ঘণ্টা! খাওয়া আছে, নাওয়া আছে, ক্লাশের পড়া তৈরি করা, পঞ্চাশ জনের মন জুগিয়ে চলা আছে (তা নেলে সমাজে থাকা কণ্টকময় হয়ে উঠবে।) বিকেলে প্রেস। রাত এগারোটায় ফিরব এখান থেকে, কিন্তু যাবো শোবার ঘরের দিকে নয়, কলেজের সেই অন্ধকূপ সদৃশ লাইব্রেরির দিকে। সেখানে পুঁথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে রাত আড়াইটে বাজবে। বাড়ি ফিরতে রাত তিনটে। কাল যে কখন ঘুম ভাঙবে— ঈশ্বর জানেন। ঘুম ভেঙেই হয়তো দেখব আকাশের মুখ ভার, ভিজে হাওয়ায় বিষণ্নতা! কাগজ খুলে কোন্্ সাংঘাতিক খবর বেরিয়ে পড়বে কে জানে। — এ জীবনে শান্তি নেই। মনেই হয় না জীবিতের সংসারে বেঁচে আছি। তাই কিছু্ই করি না, কিছুই লিখি না, ভাবি না, চিঠির জবাব লেখা হয় না, নিমন্ত্রণে যাওয়া হয় না। এমনকি নিমাই চট্টোপাধ্যায়েরা এভারেষ্ট কাফে কিনে রেখেছেন শুনেও একবার যাওয়া হয়ে ওঠে না সেদিকে। কাল শুনছি স্বাধীনতার ছুটি পড়েছে, তার মানে আর সকলের স্বাধীনতার। আমি তো বন্দী সেই সক্কাল থেকে। তার আগে আপনার চিঠির এই প্রাপ্তিসংবাদ লিখলাম অপিসে বসে বসে। ‘জন্মদিনে’ আপনার কাছে এতো যে ভালোলেগেছে— তার কারণ এই চিঠির গোড়ার দিকে পাবেন। ‘শতভিষা’ কাগজে সাহিত্যমেলার ডায়েরী লিখেছি পদ্যে। চোখে পড়েছে নাকি? সুন্দর কবিতা পাঠিয়েছেন শামসুর। ‘কবিতা’র বিশেষ সংখ্যা বেরোচ্ছে বাংলা কবিতার ইংরেজী অনুবাদ নিয়ে। কেমন আছেন আপনি? চিঠি লিখবেন।
প্রীতিনমস্কারান্তে,
নরেশ গুহ
চিঠি : ৭
১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩
প্রীতিভাজনেষু,
কাল রাত্রিতে জমে ওঠা চিঠির স্তূপ ঘাঁটতে বসেছিলাম। তার মধ্যে থেকে আপনার ঠিকানা লেখা দুটি চিঠির কাগজ বেরিয়ে এলো। আপনার চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর লেখার ইচ্ছেটা ঐ ঠিকানা লেখার সাঁকো অব্দি দুবার গিয়ে ফিরে এসেছে বোঝা গেল। তৃতীয় আলস্যকে আর প্রশ্রয় দিচ্ছি না।
আপনার শেষ চিঠিতে কাশফুলের দূর-দৃশ্য, শিউলির ঝরে পড়ার কথা শুনে ধিক্কার দিচ্ছি নিজের ভাগ্যকে। কলকাতার কৃপণ মাটিতে একটু আধটু গাছপালা যা জন্মায় তাদের সঙ্গে আমার মোটামুটি ভাব আছে। যাতায়াতের রাস্তায় হঠাত্ হঠাত্ তারা ছায়া ফেলে, পাতা দোলায়। একটা শিউলির চারাগাছকে চোখে চোখে রেখেছি। এখনো তার সময় হয় নি। অথচ শরতকালের হাওয়া দিচ্ছে এক একদিন নির্মল নীল দুপুরে। কাল থেকে অবিশ্যি জলঝড় চলেছে খুব ঘটা করে। তবু ওরি মধ্যে একফাঁকে ছোট্টো মেয়ের চোখের মতো নীল হয়ে আসে আকাশ। ক্যাল্লোরের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারি— ছুটি এসে গেল।— এই ‘এসে গেল’ কথাটা কিন্তু বেশ। থাকার জন্যে আসছে না, এসেই চলে যাবে। চলে গেল বলে!
আপনাদের কাব্যসভায় যাওয়া হয় নি সত্যি বলতে কী— সভাসমিতি আমার ভালোই লাগে না। পোষাকী কাপড় পরার অস্বস্তি ভোগ করতে হয়। তার চাইতে কেউ যদি ডেকে বলেন— এসে তুমি তিন রাত্রি মনের সুখে ঘুমিয়ে যাও, তাহলে আমি আর কিছুই চাইনে। চিন্তাভাবনায় জলাঞ্জলি দিয়ে, নির্দায় হয়ে শুয়ে পড়ব চৌকিতে। তার চাইতে ভালো আর কী?
আপনাদের ‘সাহিত্যমেলা’-র বই ছাপা হবে কিনা জানতে চেয়েছেন। নিমাই-র মুখেই শুনবেন। সে এবার শান্তিনিকেতনে যাওয়ার আগে কাগজপত্রগুলো সব সিগনেট প্রেসে রেখে গেছে। এখন তিন চার মাস আর কিছু করার নেই। দিলীপবাবু যাচ্ছেন ইউরোপে। ডিসেম্বরে ফিরে কাজটা তিনি হাতে নেবেন বলেছেন— জানিয়ে দেবেন কর্তৃপক্ষকে। বড়ই দেরী হয়ে গেল। একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমি তৈরি করেছি অবশ্য। চারপাতার ফোল্ডার হয়ে সেটা ছাপা হতে যাচ্ছে। মাসখানেক পরে আপনারা পাবেন।
ডিসেম্বরে যেমন ‘সাহিত্যমেলা’ ছাপা হওয়ার কথা— তেমনি আমার বইটিও হয়তো প্রেসে যাবে ঐ রকম সময়ে। এই ছুটিতে বসে পাণ্ডুলিপি তৈরি করার ইচ্ছে রয়েছে— যদি না অবশ্য দক্ষিণভারতে ভ্রাম্যমাণ হই। আপনাদের উত্তরবাংলায় কিন্তু গেছি আমি। খার্সং? শুনতে ভালো। জলপাইগুড়িতেও গেছি, দার্জিলিঙেও। কার্সিয়াঙে ছিলুম একদিন। দিনটি মনে থাকবে। কিন্তু কালিম্প যাওয়া হয় নি। যাবো একবার, ব্যবস্থা করবেন। আরো ইচ্ছে আছে মিস্্মী পাহাড়ে চড়ার। সেখানে রয়েছেন হাজং কবি মনোরঞ্জন রায় মশাই। যেতে লিখেছেন। মনোরঞ্জনবাবু আবার ওখানকার পলিটিক্যাল অফিসের কর্তাব্যক্তি। গিয়ে পড়তে পারলে রাজসম্মানই পাওয়া যাবে। অন্ততঃ রাজ-আতিথ্য।
কী সব বিশ্রী কথা শুনতে পাচ্ছি আপনাদের শান্তিনিকেতন নিয়ে? খুব নাকি হৈ চৈ চলছে ওখানকার রাজার নির্বাচন ব্যাপারে? কবে আমরা নিশ্চিন্ত মনে বলতে পারব— The king is dead, Long live the King.
‘কবিতা’ পেয়েছেন? পড়েছেন? যদি পড়ে থাকেন তো চুপ করে আছেন কেন? ভালোমন্দ দশকথা বলুন? তা নইলে মনে হবে যে ঘুমপাড়ানী ছড়া কাটছে ‘কবিতা’ পত্রিকা। নতুন বছর সুরু হোলো, আশ্বিনেই পাবেন প্রথম সংখ্যা। নতুন কিছু গ্রাহক চাই। অন্ততঃ পাঁচটি বন্ধুকে বলুন টাকা পাঠাতে। কবিতা আত্মহত্যা করলেও কবিতার মুখ থাকবে, কিন্তু অর্থাভাবে তার অপমৃত্যু যেন না হয়।
প্রীতিনমস্কারান্তে,
নরেশ গুহ
চিঠি : ৮
5 Satyen Datta Road
Calcutta 29
প্রীতিভাজনেষু,
বিজয়ার সময় আমি রাঁচী পাগলাগারদের রেলিং ধরে উন্মাদ দর্শনে ব্যস্ত ছিলাম। ওখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে নিজেকে,— নিজেদের— বিশেষ পৃথক বলে মনে হোলো না। সময় কেটেছে অতি বড় সুখে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে। বড় বাংলো, সুবর্ণরেখার নির্জন তীরে। এ নির্জনতা কাব্যের কাল্পনিক নির্জনতা নয়, যথার্থই দুর্গম নির্জনতা। সেই জনবিরল উন্মাদনগরী সমীপে কয়েকটা দিন প্রাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যে কুমীরের মতো, সাপের মতো, মোষের মতো— কাটিয়ে দিলুম। সে সুখের কথা ভাবলেও রোমাঞ্চ হয়।
‘কবিতা’র— ১ম সংখ্যা পেয়েছেন কি? আশা করি V.P. হয় নি। যদি সম্ভব হয় তাহলে ৪/৫ টি নতুন গ্রাহক দেবেন। V.P ফেরত্ এসে প্রতি বছর বড় ক্ষতি করে। শান্তিনিকেতনে কবে যাচ্ছেন?
প্রীতিনমস্কারান্তে,
২৭/১০/৫৩ নরেশ গুহ
চিঠি : ৯
১৯ নভেম্বর
১৯৫৩
প্রিয়বরেষু,
ব্যস্ত রয়েছি, নানাবিধ বিষয়ে। আপনার চমত্কার চিঠির যথাযোগ্য লম্বা জবাব পরে দিচ্ছি। সামান্য দুকথা জানাই। ‘সূর্যতামসী’ আর পাঠাবেন না। এখানে রয়েছে।
দ্বিতীয় : শনিবার, ২১ শে, সন্ধ্যার পরে রেডিওতে পদ্যপাঠের পালা আছে। সময় থাকলে কলকাতা শুনতে পারেন।
নতুন বই-এর বিষয়ে কড়া ক’রে ভাবছি।
প্রীতি নমস্কার
নরেশ গুহ
চিঠি : ১০
THE SIGNET PRESS
Publishers
10/2, Elgin Road
Calcutta
সবিনয় নিবেদন,
ডাকবিভাগ থেকে আপনার কাছে যদি খোঁজ নিতে যায় তাহলে দয়া করে জানাবেন যে ‘টুকরো কথা’ নামে বুলেটিনের আপনি নিয়মিত গ্রাহক। বার্ষিক চাঁদা ছ’আনা। চাঁদা নিয়ে ‘টুকরো কথা’ প্রচার করা হয় এটা প্রমাণ হলেই— ডাকবিভাগ প্রতি টুকরো কথা পাঠাবার ডাকখরচ কমিয়ে দেবেন এবং আমাদের প্রচারের সংখ্যাও কাজেই বাড়ানো সম্ভব হবে। বার্ষিক চাঁদা আমরা এখনো নিচ্ছি না, কিন্তু সেকথা ডাকবিভাগের জানার প্রয়োজন নেই।
আপনি এবিষয়ে সহযোগিতা করলে সুখী হব।
নমস্কারান্তে,
নরেশ গুহ
১১/১২/৫৩ সিগনেট প্রেসের পক্ষে
চিঠি : ১১
৫ মার্চ ১৯৫৪
কলকাতা
প্রীতিভাজনেষু,
আপনার উত্সাহ অপরিসীম, তাই নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যে পুরোনো কবিতা নতুন ক’রে ছাপালে বিক্রয়ের জন্যে ভাবতে হবে না। আমি জানি— হবে। খুব মর্মান্তিকভাবেই ঠেকে শিখতে হবে যে সাহিত্য আলোচনার কোনো বাজার দর নেই। আশার প্রতিকূল আশা নিয়ে ঐ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি। ইতিপূর্বেকার বিজ্ঞপ্তির জবাবে প্রায় ৪/৫ জন ভদ্রলোক আগ্রহ দেখিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁরা যদি এক এক কপি পুনমুর্দ্রিত কবিতা ৭৫্ টাকায় কিনতে ইচ্ছে করেন তাহলে অবশ্য চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু কিনবেন কি?
শান্তিনিকেতনে থেকে চলে আসতে গিয়ে আপনার মন খারাপ লাগবে এটা তো জানা কথাই। আমরা যারা কোনোদিন শান্তিনিকেতনে থাকি নি আমাদেরও মনের সঙ্গে কী একটা বন্ধন গড়ে উঠেছে ঐ আশ্রমটির। বলাবাহুল্য সে বন্ধনের সুতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গেলবার বসন্তোত্সব ভালো লেগেছিল। কিন্তু কোনো পিছনের দিকেই আমার আজকাল আর তাকাতে ইচ্ছে করে না। অমনি মনে হয়— কী ছেলেমানুষই না ছিলাম! কী ছেলেমানুষীই না ক’রে এসেছি। আমি তাকিয়ে আছি কালপরশুর দিকে, কালপরশু পেরিয়ে দূর দূর ভবিষ্যতের দিকে। সেখানে কী আছে, কিছু আছে কিনা, না থাকলে কী, এসব কথা আমি ভাবতে চাই না। কৌতূহল নিয়ে প্রতীক্ষা করে থাকাই যথেষ্ট। শুধু নিশ্চল প্রতীক্ষা নয়, একটু আধটু হাতপা নাড়তে হবে বইকি। হয়তো আমার বয়স বাড়ছে বলেই এরকম মনে হয়। কিংবা দ্বিতীয় যৌবনে পড়েছি বলেই হয়তো। যেমন ব্যাঙাচির লেজ, তেমনি মানুষেরও অতীত খসে যাওয়াই মঙ্গলের। খসে গিয়েও তবু যা থাকবে সেইটুকু নিয়ে মানুষের মনুষ্যত্ব। কিন্তু এসব দার্শনিকঘেঁষা তত্ত্বকথা থাক। আপনাকে তাহলে তো পরীক্ষা দিতে যেতেই হবে আর একবার শান্তিনিকেতনে। সেটা যদি বসন্তোত্সবের সময় হয় তাহলে দৈবে দেখা হয়েও যেতে পারে। কেননা খুব একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে, ঐ সময়ে আমিও হয়তো যেতে পারি ওদিকে।
শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে নীচু ক্লাশের ক’টি মেয়ে আমাকে লেখার খাতা উপহার দিয়েছিল, আপনার হয়তো মনে আছে। তার মধ্যে একটি ছোটো মেয়ে সেই থেকে আমাকে চিঠি লেখে। আমি তার মুখের চেহারা ভুলে গেছি। কোন্্ ক্লাশে পড়তো তাও। কিন্তু ছোটোদের মনের দরজা প্রকাণ্ড ক’রে খোলা। তাই অপরিচিত এই মানুষটির কাছে সেই ছোট্টো মেয়েটি মন খুলে চিঠির পাতায় যা’ খুশী বকে যায় এবং আমি তা উপভোগ করি। তার আদেশ এসেছে, যেন বসন্তোত্সবে অন্ততঃ শান্তিনিকেতনে যাই। কিন্তু আসাযাওয়ার পথ কি আমার খুশীতে খোলে, না বন্ধ হয়? কতো অদৃশ্য সুতোয় যে হাতপা বাঁধা তা ভাবতে বসলে মাথা ঘোরে।
‘কবিতা’ এবার U.S.P. করে পাঠিয়েছি সবাইকেই, কেননা ইদানীং ডাকঘর থেকে খুব খোয়া যাচ্ছিল পত্রিকা। এবার একটু অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা গেল। পরের সংখ্যা যাতে যথাসময় বেরোয় তার চেষ্টা করছি।
‘অরণ্য রোদন’-এর কথা বলে আর আমার বোঝা বাড়াবেন না। যেমন যেমন লিখেছি, ছাপা হ’য়েছে। কোনো এক বিশেষ খাতায় একত্র করা নেই সব লেখা। কাজেই পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজটা সরল নয় মোটেই। তাছাড়া আশ্বিনের আগে দিলীপ গুপ্ত মশাই সে বই যে ছাপতে পারবেন তাও মনে হয় না। কী হবে তাড়া ক’রে?
আমার প্রীতিনমস্কার গ্রহণ করবেন। আশা করি ভালো আছেন।
ইতি
নরেশ গুহ
চিঠি : ১২
কলকাতা
২০/৭/৫৪
প্রীতিভাজনেষু,
চিঠি লেখার পাট প্রায় তুলে দিয়েছিলাম। মনের বিশৃঙ্খল অবস্থাটা গুছিয়ে নেবার জন্যে কয়েকবছর অজ্ঞাতবাস প্রয়োজন। আপনাদের চিঠি পেয়ে সুখী হই, তারপর নিজের দায়িত্বের কথা ভাবলেই হূত্কম্প উপস্থিত হয়। শামসুরের চিঠির জবাবও আজই দিতে হ’বে। কায়সুল বোধ করি কলকাতা এসেছেন। যে কোনোদিন দেখা হ’য়ে যেতে পারে।
ঢাকা থেকে শামসুর ‘কবিকণ্ঠ’ নামে এক কবিতা পত্রিকা বের করছেন ব’লে লিখেছেন। এখনো ১ম সংখ্যা পাই নি। ‘সূর্যতামসী’ সম্পর্কে সিগনেট প্রেসকে যদি সরাসরি চিঠি লেখেন ভালো হয়। ও বিভাগটা আমার না। আমি আপনার চিঠি এবং তার সঙ্গে আমার চিরকূট দিলীপবাবুকে পাঠিয়ে দিয়েছি। দয়া ক’রে তাঁকে লিখে বাকিটা করুন।
কবিতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে আপনার ব্যস্ততা দেখে গর্ববোধ করছি। এইবার হাত দেব। কিন্তু চিঠির পাতা ফুরিয়ে এলো। অতএব ইতি
নরেশ গুহ
চিঠি : ১৩
৫ সত্যেন দত্ত রোড
প্রীতিভাজনেষু,
‘কবিতা’ পেয়েছেন? কায়সুল আ’র আসেন নি। চ’লে গেলেন নাকি দেখা না ক’রেই?
আপনাকে একটি অনুরোধ ‘রাতের অতিথি’ এক কপি কিনবেন। সম্ভব হ’লে আর এক কপি বিক্রয় ক’রে দেবেন। বিজ্ঞপ্তি দেখবেন কবিতার পৃষ্ঠায়। ভালো আছেন?
বাসা সমস্যা?
প্রীতিনমস্কারান্তে,
২৮/৮/৫৪ নরেশ গুহ
চিঠি : ১৪
1/9/54
প্রীতিভাজনেষু,
দিলীপবাবুর সঙ্গে আমার দেখা হ’চ্ছে না। আজ তাঁর কাছে একটা চিরকূট রেখে গেলাম। ‘সাহিত্যমেলা’ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তিনি জানালেই আপনাকে জানাব। বই সবটা কম্পোজ করা হ’য়ে গেছে। প্রথম প্রুফ দেখাও শেষ। আমার ধারণা পূজোর আগে ছাপাটা হয়ে উঠবে না। কারণ শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসে পূজোসংখ্যার কাজের চাপ। আমার দিক থেকে এবিষয়ে উত্সাহ দেখাতে কখনো কসুর করি নি। আপনি ইচ্ছে করলে অন্নদাশঙ্কর রায়ের কথা বলে একদিন— যেকোনো দিন— রাত আটটার পরে দিলীপবাবুর সঙ্গে দেখা করতে পারেন। কিংবা আমার পরের চিঠির জন্য অপেক্ষাও করতে পারেন।
‘রাতের অতিথি’ বিক্রয়ের জন্য আপনার উদ্যমকে ধন্যবাদ জানাই।— না, কায়সুল আসে নি। একেবারে উধাও?—
ইতি
নরেশ গুহ
পু:বাড়ি বিষয়ে আপনাকে সহায়তা করার জন্য অপরের উদ্যম এবং অধ্যবসায় কাজে লাগবে। আমি এ বিষয়ে অজ্ঞ এবং অকর্মণ্য।
চিঠি : ১৫ ৮/১১/৫৪
প্রীতিভাজনেষু,
জীবনানন্দ সংখ্যা ‘জলার্ক’ পেয়ে খুব কৃতজ্ঞ হলাম। চিঠিগুলি ছাপিয়ে ভালো ক’রেছেন। তবে আরো দুএকটি লাইন অপ্রকাশিত রাখলেই যেন ভাল হোতো। দ্বিতীয় কবিতাটি কিন্তু ‘কবিতা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।
কলকাতায়—সুখের কথা—জীবনানন্দকে নিয়ে নানা স্থানে আলোচনাসভা ইত্যাদি হচ্ছে। অনেক পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাও ছাপা হবে ব’লে শুনেছি। আমার কেবলি মনে হয় নিরাসক্ত, নিস্পৃহ অথচ প্রেমিক মন নিয়ে কাব্য আলোচনার মত সাবালক মন ক্রমেই বিরল হয়ে আসেছ দেশে। বহুকাল জীবনানন্দ অনাদৃত ছিলেন। সম্প্রতি কিছু লোকে ভালোবাসতে সুরু ক’রেছিল। হঠাত্ হোম যাগযজ্ঞাদি আরম্ভ হয়ে গেলে কাব্যরসিকের মনে নানা রকম খট্্কা লাগে।
কবিতার আশ্বিন সংখ্যা দিন দশেকের মধ্যে। অনেকটা ছাপা হয়ে গিয়েছিল। তাড়াহুড়ো ক’রে জীবনানন্দ বিষয়ে কিছু করা অশোভন। তাই পরবর্তী সংখ্যা পুরোটাই আশ্চর্য কবির আলোচনা এবং স্মৃতিচারণায় উত্সর্গিত হবে। সেসংখ্যা পৌষের পূর্বেই পাবেন।
প্রীতিনমস্কারান্তে,
নরেশ গুহ
চিঠি : ১৬ 8.6.55
প্রীতিভাজনেষু,
‘কবিতা’ এবং ‘বৈশাখী’ একসঙ্গে আপনার নামে ভি.পি. করতে ব’লেছি। ‘বৈশাখী’ বেরোতে এখনো দেরী আছে কয়েকটা দিন। পুনরায় আপনাকে অনুরোধ করি, ‘কবিতা’ সংক্রান্ত, চিঠি সোজা ‘কবিতাভবনে’ লিখলে সবদিক দিয়েই সুবিধা ব’লে তাই করবেন। আমি বিখ্যাত কুঁড়ে এবং অনেকসময় মনেও থাকে না। বিব্রত বোধ করা বিচিত্র নয়।
আমার কবিতাটি আপনার মন্দ লাগে নি, জেনে খুবই আনন্দিত হ’য়েছি। ‘মোড় নেবার’ কথা যা বলেছেন সেটা হবার নয়। মোড় পর্যন্ত এগোতে পারি হয়তো। সে ঐ আমাদের গলির মোড়। কলকাতার আকাশে মনসুন এসেছে বলে কাগজে খবর জানা গেল। আপনাকে চিঠি লেখা শেষ করে ব্যাপারটার সন্ধান নিতে বেরোব। ইতি
নরেশ গুহ
