শহরটা তার নিজের নয়—প্রথমবারের মতো এরকম আশ্চর্য একটা অনুভূতির পর তার আরও মনে হয়, নিজের শহর বিষয়টা আপেক্ষিক। নিজের শহর বলে কিছু নেই যদিও এটা সত্য, এ শহরেই তার জন্ম এবং তার পিতারও এটাই জন্মশহর। জন্ম সন ঠিক থাকলে জুলাইয়ের আঠালো গরমেই সে পঞ্চাশ পার করে একান্নর জমকালো অভিষেক ঘটিয়েছে। জমকালো এজন্য যে, সে মনে করে পঞ্চাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা, ক্রিকেট মাঠেও যাকে গণনা করা হয়। পঞ্চাশ বছর সে এ শহরেই কাটিয়েছে। এখানে, এ শহরের অনেক কিছুর বদল হয়েছে, অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে। যার নির্লজ্জ ও অসহায় সাক্ষী সে। শহরটা প্রাচীন, এর অনেক ইতিহাস আছে। পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া ইটগুলো সে ঐতিহ্যের নীরব ভাষা বহন করে। বিশেষত এ শহরের যে জায়গায় সে থাকে তার নামেরও রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। এবং সে এই ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে অন্য অনেকের চাইতে অনেক বেশি সজাগ ও সক্রিয়।
সে তার প্রিয় কলেজে যেটা তার তরুণ জীবনের সাথে স্মৃতির এক মিনার তৈরি করে রেখেছে, সেখানে দাঁড়িয়ে রাতের ফিকে অন্ধকার দেখে এবং পাশে জ্বলে থাকা মিটমিট করা বাতিগুলো দেখে। তারপর সে আবার ভাবে, নিজের শহর বিষয়টা আপেক্ষিক। নিজের শহর বলে কিছু নেই। এখানে তার জন্ম হয়েছে পঞ্চাশ বছর আগে তাই এটা তার শহর। তবে এটা নিশ্চিতভাবেই তার শহর না-ও হতে পারত। গতরাত দশটা পঁয়তাল্লিশে যে শহরটাকে পেছনে ফেলে এসেছে, যে ক্যাফেতে বসে চা খেয়েছে সেটা তার শহর হতে পারত। যেখাসে সে মেয়েটাকে রেখে এসেছে। মেয়ে মানে তার প্রেমিকা। হ্যাঁ, সে তাকে প্রেমিকাই ভাবছে। না, সে নিজে ভাবছে না মেয়েটা তার প্রেমিকা। এটা ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত। যদিও ঈশ্বরে সে কখনোই বিশ্বাসী নয় তবু এটা অন্য এক জন্মজন্মান্তরের বিষয়। সে কি জন্মজন্মান্তরে বিশ্বাসী? সে জানে না। তবে মেয়েটা তার প্রেমিকা এটাই ধ্রুব। যদিও আর এক সন্ধ্যায় যেটা গতকালের বিদায়ী সন্ধ্যার মতো এত শান্ত ও নির্জন ছিল না, ক্যাফেতে বসে মেয়েটা স্বভাবজাত আত্মগত বিনয় নিয়ে বলেছিল—
আপনার কাছে এটা প্রেম বা যা-ই হোক, আমার কাছে এটা একটা সুন্দর সম্পর্ক, আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।
আপাতভাবে এটা দ্ব্যর্থবোধক, বির্তক সৃষ্টিকারী অস্পষ্ট আধো মনোভাবের কথা এবং এটা অসর্মথিত হবার যথার্থ কারণ রাখে। সে যেভাবে তার স্বভাবকে গড়ে তুলেছে অথবা যে বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তি তাতে এটা তার অহংবোধে আঘাত সৃষ্টিকারীও। তাই এ ধরনের উচ্চারণে একপ্রকার ক্ষোভ জন্ম নেবার কথা এবং ওই সময় ওই মেয়ের সামনে থেকে ক্যাফে ত্যাগ করে পরদিনই তার নিজের শহরে চলে আসবার কথা। কিন্তু সে মেয়েটাকে তার পুরোটা সমর্পণ করেছিল এবং এটাও ছিল ঈশ্বর নির্দেশিত। যদিও সে আবারও মনে করিয়ে দিতে চায়, সে ঈশ্বর-বিশ্বাসী নয়। তবু তার সমর্পণ ছিল ধর্মীয় কোনো বাধ্যবাধকতার মতোই, যদিও এ বাধ্যবাধকতা শুধু তার জন্যই সে সৃষ্টি করেছিল, এটা আসলে সৃষ্টি হয়েছিল এবং তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সে মেয়েটাকে খুব দৃঢ় উচ্চারণে জানিয়েছিল—
আপনার সব শর্তই আমি মেনে নিচ্ছি। আপনার সকল কথা আমার জন্য বাণী। আর আমার এ সমর্পণ আপনার কাছে কোনো শর্তই দাবি করে না। আপনি সম্পূর্ণ মুক্ত এবং এটা আমার প্রেম। আমার একার, আমার অস্তিত্বের।
মেয়েটা উত্তর করেছিল— এটা আপনার নিজস্ব উপলব্ধি, কিন্তু সব সম্পর্ক প্রেম দাবি করে না।
এটা একটা বিনম্র প্রত্যাখ্যান। কিন্তু প্রেম এমন এক স্তর অতিক্রম করেছে, যেখানে প্রত্যাখান আর গ্রহণ অপ্রয়োজনীয়। তার কাছে প্রত্যাখানের কোনো বাণী পৌঁছানোর কোনো সুযোগই নেই। পরিপূর্ণ সমর্পণের কাছে প্রত্যাখান শব্দটাকে তার হাস্যকর, অপাঙেক্তয় মনে হচ্ছিল। এরকম একটি গুরুতর বিষয়েও প্রকৃত অর্থেই তার হাসি পাচ্ছিল। কারণ তার মনে হচ্ছিল, যথেষ্ট পরিপক্ক আর গভীরতার অধিকারী হবার পরেও ওই মেয়েও মনে হয় জানে না, এ প্রেম প্রত্যখান করা যায় না। কারণ এটি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের জন্য নিবেদন করা হয়নি। এটা এমন এক অবস্থা, যেখানে সব পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং এখানে কোনো কিছু ফিরিয়ে দেবার, ফিরিয়ে নেবার এবং কোনোভাবে ফেরার কোনো পথ নেই। এটা বোঝার কোনো ক্ষমতাই নেই যে, এটা কতটা প্রগাঢ় এক অনুভূতি অথবা অনুভবের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যকিছু। যা সে নিজেও এই প্রথম উপলব্ধি করছে। তার আরও মনে হয়, ওই মেয়ে যদিও গভীরতম উপলব্ধিকে ধারণ ও সনাক্তকরণে সক্ষম তবু এটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা ওই মেয়েরও নেই।
সে অস্বীকার করতে পারে না, তার মধ্যে জেগে উঠেছে অদ্ভুত এক প্রেম। যা তার কাছে অলৌকিক, অবিশ্বাস্য,অতিন্দ্রীয়। ব্যাপারটাকে এমনভাবে ব্যাখা করা যায় যে, মেয়েটা এক অত্যাশ্চর্য তান্ত্রিক, যার তন্ত্র-মন্ত্রে সে আর কিছুই মেলাতে পারছে না। সাধারণ যুক্তিবুদ্ধির ঊর্ধ্বে সে একটা ঘোরে। কিন্তু না, এটা কোনো ঘোরও না, এটা সত্য। এটা সুতীব্র তীক্ষ বোধ। মেয়েটার সাথে দেখাটা আকস্মিক হলেও অসম্ভব ছিল না। সে এই শহরে আরও বহুবার এসেছে। এখানে তার বন্ধু আছে, যারা তার পানের সঙ্গী। এখানে তারা দুদেশের সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনায় বহু উত্তেজিত সন্ধ্যা কাটিয়েছে। পান করতে করতে রাত গভীর করে দিয়েছে। এখানে সে তার শহরের মতোই কবি ও বুদ্ধিজীবী দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকেছে, যা তার কাছে বিরক্তির এবং একঘেয়েমির, যদিও এটাই তার পরিচিত পরিবেশ। আশ্চর্য এই মেয়েটা এ শহরেই ছিল এবং তার চেনাজানা মহল এবং চারপাশেই ছিল। তারপরও সে মেয়েটিকে দেখতে পায়নি। এখন সে মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছে, যাকে সে এতদিন খুঁজে ফিরেছে। একটা আবিষ্কার, তার জীবনের চরমতম আবিষ্কার।
সে এখন তার নিজের শহরে দাঁড়িয়ে গতকালের সন্ধ্যার কথা ভাবছে। সেটা ছিল তাদের বিদায়ী সন্ধ্যা। আকাশটা তার কাছে অতিরিক্ত লাল মনে হচ্ছিল এবং তার আলতার কথা মনে পড়ছিল। যেন কেউ আকাশটায় আলতা ঢেলে দিয়েছে। যদিও কবি হিসেবে আলতাকে তার খুব বাজে উপমা বলে মনে হয়েছে। গতকাল তার মনে হয়েছিল, একটা পুরো দিন সে মেয়েটার সাথে কাটিয়ে দেবে এবং লাল আকাশকে সাথে নিয়ে সন্ধ্যায় যখন তারা ক্যাফেতে প্রবেশ করেছিল তখন তার মনে হলো, সে এই ক্যাফেতেই থেকে যাবে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। মেয়েটা ব্যস্ত সময় কাটায়। সে অফিস এবং সংসারের প্রতি নিবেদিত এবং তার ঘরে ফেরা জরুরি ছিল। তারা কথা সংক্ষিপ্ত করছিল এবং ইতোপূর্বে যা সে আরও দু-একবার বলেছে, তা-ই আবার উচ্চারণ করেছিল— ‘ভালোবাসি’। তার মনে হচ্ছিল, শব্দটা সে শুধু উচ্চারণ করেনি, এটা তার আত্মার আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এসেছে।
মেয়েটা তখন তার নিজস্ব ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ছিল, সেটা একপ্রকার অভিবাদনের মতো মনে হলেও সে জানত, সেখানে কোনো অভিবাদন ছিল না, সে মেয়েটার মধ্যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আচরণ লক্ষ করেনি। তার প্রেমিকা পুরোপুরি অকৃত্রিম। তাকে একটা গোলাপের সাথে হয়তো তুলনা করা যায়, কিন্তু তার মনে হয়, গোলাপ ফোটার মধ্যেও কেমন একটা নাগরিক কৃত্রিমতা রয়েছে। তারপর সে ভাবে, উপমা হতে পারে বহ্মপুত্রের পাড়ে বসে কয়েকদিন আগে তার দেখা সেই পূর্ণচাঁদ। অথবা গোলাপ কিংবা চাঁদ এমন কিছুই নয়, সে অন্য কিছু। আরও আরও সুন্দর কিছু, যা তার জানা নেই। এটা শুধু বোঝা যেতে পারে, অনুভব করা যেতে পারে, কিন্তু এ সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হতে পারে না। এর প্রকাশের কোনো ভাষা নেই।
সে আবার ভাবতে চায়, কাল ঠিক এসময় সে কী করছিল, ক্যাফেতে তারা শুধু চা নিতে চেয়েছিল। তবে সেটা ছিল তার জন্য ওই শহরে শেষদিন আর মেয়েটা আপ্যায়ন পছন্দ করে। তারা চায়ের সাথে একটা কিছু খেয়েছিল। সে ওই খাবারটা পছন্দ করেছিল, কিন্তু এখন এ মুহূর্তে খাবারটার নাম তার মনে পড়ে না। সে ভালো করে খেয়াল করে দেখে, এ মুহূর্তে অনেককিছুই সে মনে করতে পারছে না। অদ্ভুত এক স্মৃৃতিভ্রম ঘটেছে তার। সে কি অপ্রকৃতিস্থ? তার সন্দেহ জাগে। তবে একটা কঠিন কিছু ঘটে গেছে, যা তার অনেককিছুই মুছে দিয়েছে। শুধু উজ্জ্বল হয়ে আছে মেয়েটা। আর সবকিছু কেমন ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আছে। তার কাছে আরও আশ্চর্যের বিষয়, সে এখন তার কলেজে দাঁড়িয়ে। না, দাঁড়িয়ে নয়; সে এখন মেয়েটার পাশে। তারপর সে আবার ভাবে, না সে তার কলেজের কাছেই দাঁড়িয়ে। তবে সে একটা কিছু ফেলে এসেছে এবং এখন সে তার দেহের খোল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার দেহের এ খোল, এই অন্ধকার, তার পাশে বয়ে চলা খালের মতো নদী—এসব তার কাছে আবার জাতিস্মরের চোখে দেখা পূর্বের কোনো দৃশ্যর মতো মনে হয়। সে আবার অপরিমেয় ব্যথা অনুভব করে এবং বুঝতে পারে, চোখের সামনের এ শহর বাস্তব, আর নির্মম সত্য—সে একটা কিছু রেখে এসেছে। সে চাইলেই এখন আর সেটা পাবে না। এরকম তীব্র এক ব্যথার অনুভূতিতে সে বুঝতে পারে, শুধু ওই মেয়েটা নয়, সে আরও কিছু রেখে এসেছে, যা তার কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। কালো জলের দিকে তাকিয়ে সে তার প্রেমিকার কথা ভাবে। ক্যাফে থেকে বের হয়ে তারা কী বলেছিল? সে বেশ মনে করতে পারে, তারা আবেগপূর্ণ কোনো বিদায়ের শব্দ উচ্চারণ করেনি। বিশেষ করে তার প্রেমিকা। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রিকশায় উঠেছিল। এবং সম্ভবত কোনো হাতও নাড়েনি।
তারপর সহজ ভঙ্গিতে বলেছিল—ভালো থাকবেন।
মুহূর্তের জন্যও তার চোখ ওই রিকশাকে অনুসরণ করেনি। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল এবং সোজা হাঁটতে শুরু করেছিল। এখন সে আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং গতকালের মতোই হাঁটতে থাকে। সন্ধ্যাটা ঠিক গতকালের সন্ধ্যাকে ফিরিয়ে আনে। তার মনে হয়, সে কোনো এক কঠিন আবেগ চাপা দিয়ে হাঁটছে। কিন্তু সে শূন্য নয়, পরিপূর্ণ। কারণ এমন এক প্রেম তার মধ্যে, যা হারিয়ে যায় না এবং যা হারিয়ে ফেলবার নয়। সে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজটার কাছে আসে। এটা তার স্মৃতির ব্রিজ। এখানে সে তার কিশোর-জীবনের প্রথম প্রেমিকার সাথে মিলিত হতো। এখানে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলত। সে খুব চেষ্টা করে কিশোরকালের ছবিটা চোখের সামনে আনতে। তার কাছে সে ছবিটা খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে আসে না। গতকালের সন্ধ্যা তাকে অনেক বেশি গ্রাস করে নিয়েছে। না, সে তার প্রথম প্রেমিকাকেও এত ভালোবাসত না। সে আবার ভাবে, এটা প্রেম, প্রেম আর প্রেম। এ এক অপার্থিব আনন্দ। তার প্রেমিকার কাছাকাছি থাকা এক স্বর্গীয় অনুভব। পৃথিবীর কোনো আনন্দের সাথেই এটার তুলনা করা যায় না। সে ব্রিজটার ওপরে দাঁড়ায় এবং নিশ্বাস টেনে নেয়। তারপর সে নিবিষ্টভাবে মেয়েটার কথা ভাবে এবং ফিসফিস করে আবার উচ্চারণ করে—ভালোবাসি, ভালোবাসি।
মেয়েটার কাছে প্রেম বিষয়টা বড় ছিল না, সে বলেছিল—প্রেম খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু সে জানে, ওটা প্রেম এবং প্রেম। তার কাছে প্রেমও নয়, ওটা তার অস্তিত্ব। এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই তার আবার শহরটার কথা মনে হয়। একটু আগে একটা ছেঁড়া তেনার মতো সে এ শহরকে পরিত্যাগ করেছে। কারণ, সে ভাবতে চায় না—এটা তার শহর। বিদায় নেবার দুদিন আগে ক্যাফেতে সে মেয়েটাকে বলেছিল—
আপনি কি কখনো আমার শহরে গিয়েছেন?
না আমার কোথাও যাওয়া হয়নি। আমি আমার দেশটাকেই ভালোভাবে দেখতে পারিনি।
আমার শহরটা আনন্দে পরিপূর্ণ। ওটা একটা অন্য রকম জায়গা, আপনাকে আকর্ষণ না করে পারবে না।
প্রত্যেকেই তার নিজের শহর সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোষণ করে, সেটা যদি খুব নিকৃষ্টতর একটা জায়গাও হয়।
সে একটু লজ্জা পায়—তা ঠিক তবে আমার শহরটা ইতিহাস আর ঐতিহ্যে পূর্ণ।
মেয়েটা একটু হাসে—এ শহরও সেই একই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা আর নিদর্শন বহন করে।
একবার আসুন ওখানে।
অবশ্যই। আপনার শহর আমাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করে। আর আমি খুব কমই দেখতে পেরেছি।
আমার জ্ঞানও খুব সীমিত। আপনি আমাকে একটা কুয়োর ব্যাঙ ভাবতে পারেন।
এটা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না, তার প্রেমিকার জ্ঞান কম। মগজবিহীন নারী তার কাছে মৃত ঘাসের মতো বিবর্ণ, যদি সে ট্রয় রমণী হেলেন অথবা সৌন্দর্যের দেবী আফ্রেদিতির মতোও সৌন্দর্য ধারণ করে। সে তার প্রেমিকার মুখমণ্ডলের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখে। তার প্রেমিকার দুচোখের দ্যুতি, চেহরার অসামান্য উজ্জ্বলতা যা একই সাথে পবিত্র ও স্থির, তাকে দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারণ করায়—এত মেধার বিচ্ছুরণ এত অসামান্য অবয়ব আমি আর কখনো দেখিনি।
মেয়েটা একটু লজ্জা পায়। লজ্জা তাকে আরও সুন্দর করে কি না, তা সে বোঝে না তবে তার মনে হয়, এটাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর, এর চাইতে বেশি কোনো সৌন্দর্যের অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই।
তারপর সে আবার বলে—আমি খুব শ্রীঘ্রই আবার আসব।
এখানে আপনার প্রচুর বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। আপনি নিশ্চয়ই খুব উপভোগ করেন। সে কোনো প্রকার ভণিতা বা গোপনীয়তা না রেখেই বলে—আমি এখানে কেন আসি, কারা আমার বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী সেটা কোনো গুরুত্ব রাখে না। আমি শুধু আপনার কাছে আসব। আপনার কাছেই আমি ফিরে আসব।
মেয়েটা আবার চুপ করে থাকে। এ ধরনের কথার উত্তর সহজে দেওয়া যায় না, সে জানে। তবু সে কোনো একটা উত্তর আশা করে—আপনার কি কিছুই বলার নেই?
সামান্য নীরবতার পর সে মুখ খোলে। তার কণ্ঠ অনুচ্চ শোনায় কিন্তু উচ্চারণ দৃঢ়—আমি আপনার এ আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ বিশ্বাস করি। আপনার এ গভীর অনুভবে শ্রদ্ধা রাখি। এর বেশি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি না।
এটা কোনো একটা গভীর উপলব্ধিকে অস্বীকার করা। সে জানে এটাই তার প্রাপ্য। তাকে এর বেশি অনুরাগ ঢালা হবে না। এ কষ্ট প্রবল এবং অমোচনীয় হলেও সে তাতে সংহতি প্রকাশ করে—ব্যস ওটুকুই, আপনি আমাকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারলেই হলো।
তারপর সে একটু ব্যাকুল হয়ে বলে—এটা অবর্ণনীয় কষ্টের যে, আমি চাইলেই আপনার কাছে ছুটে আসতে পারব না। এটা আমাকে খুবই বিমর্ষ করছে যে, চাইলেই আমি আর আপনাকে দেখতে পারব না, আমাকে পাসপোর্ট-ভিসা করতে হবে। আমরা দুটো ভিন্ন শহরে থাকি, দুটো ভিন্ন দেশ।
চামচে খাবার নাড়তে নাড়তে তার প্রেমিকা বলে—সাতচল্লিশের আগে এই দেশটা এক ছিল।
সাতচল্লিশে তার বা এই মেয়ের জন্ম হয়নি। সে ওই বাস্তবতায় কখনো বাস করেনি। সীমান্ত পেরোনোর বাস্তবতাই তার জানা। তবু তার মনে হয়, সে সাতচল্লিশ-পূর্ববর্তী কোনো একটা সময়ে বসে আছে এবং তার এখানে আসার জন্য কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন হবে না। সে আর তার প্রেমিকা কোনো সীমান্ত দ্বারা পৃথক নয়।
সে চামচ নাড়ানো ওই হাতের দিকে তাকায়। সে চামচের শব্দের সাথে চুড়ির শব্দ আশা করে, কিন্তু না, ওই হাত জীবনানন্দের কবিতার মতো-নগ্ন নির্জন হাত। তার কাছে আবার মনে হয়, নগ্ন কিন্তু নির্জন নয়, সৃষ্টির স্ফুরণ।
সে জানে না, কেন সে-মুহূর্তে সে একটু উত্তেজনা বোধ করে এবং অস্থির ভঙ্গিতে বলে—আপনার ঈশ্বরের কসম—আমি ফিরে আসবই।
ক্যাফে থেকে বের হয়ে তারা রাস্তায় দাঁড়ায়। তখন পূর্ণ সন্ধ্যা। আজানের ধ্বনি আসছিল। মেয়েটা মাথার ওপর কাপড় টেনে দিয়েছিল। সেটা কোন সময়ের আজান এবং এভাবে মাথায় কাপড় টেনে দেওয়া তাদের ধর্মীয় কোনো রীতি কি না, তা সে জানে না। কিন্তু সন্ধ্যার আলোয় ওই মুখকে তার কাছে অপার্থিব মনে হয়। এটা একটা আশ্চর্য শিহরণ। এটা তার মধ্যে কামের উপস্থিতি আনে কিন্তু ওই কামনার মধ্যে একটা মহত্ত্ব বা বিরাট কিছু সে অনুভব করে, ওয়ার্সওয়ার্থ প্রকৃতির মধ্যে যে সাবলাইমের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিলেন, এটা যেন সে-রকম একটা কিছু, কিন্তু ওই মুখ প্রকৃতির অংশ নয়; ওটা জাগতিক অনুভবের ঊর্ধ্বে। খুব অষ্পষ্ট ছবির মতো তার মনে হয়, এটা বধূ বেশ। এই বধূ বেশ তার জন্য। তারা কখনোই উভয়ের ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলেনি। সে জানে, তার প্রেমিকা বিশ্বাসীদের অর্ন্তভুক্ত এবং সে কোনো বিশ্বাসের কাছে পদানত নয়। তারা পাশাপাশি খুব মৃদূ পদক্ষেপে হাঁটে। তারপর বিদায় নেবার জন্য দাঁড়ায়। বিদায়ের আগে তারা সামান্য কিছুক্ষণ নীরবতাকে অনুভব করে, তারপর সে বলে—আপনার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা—ভালো থাকবেন।
সে ধ্যানমগ্ন ও জীবন্ত স্মৃতির স্পর্শ নিয়ে ব্রিজ পার হয়ে সামনের রাস্তায় ওঠে। একটা টানা রিকশা তার সামনে দাঁড়ালে সে আবার বাস্তবে এসে হোঁটচ খায়। এ বাহন সে কখনোই পছন্দ করতে পারেনি। একজন মানুষের বোঝা হওয়া তার অপছন্দের। কিন্তু এখন সে নিজেকে কিছুর মধ্যে ছেড়ে দিতে চাইছে। সে রিকশায় ওঠে কিন্তু কোনো গন্তব্য নির্দেশ করতে পারে না। কারণ কোনো কিছুর সাথেই এখনো সে নিজেকে সংযুক্ত করতে পারেনি। তার কাছে এটা কোনো এক অপরিচিত শহর। তার আবার গত রাতের কথা মনে পড়ে। হ্যাঁ এসময়টাতেই সে তার পনেরো দিনের সাময়িক আবাস রেস্টহাউজে ফিরে এসেছিল এবং ফিরে আসার জন্য প্রস্তুতি পূর্ণ করেছিল। তারপর সে মুঠোফোনে তার প্রেমিকার সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছিল, সে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে গেছে। খুব সংক্ষিপ্ত সে কথোপকথনের পর সে বলেছিল—বাস ঠিক দশটায়।
উত্তরে সে বলেছিল—সাবধানে যাবেন।
তার ভ্রমণটা খারাপ ছিল না। পূর্ণিমা ছিল না, কিন্তু শরতের পরিষ্কার আকাশে একটা পরিচ্ছন্ন চাঁদ উঠেছিল। সে জানলা দিয়ে খণ্ড খণ্ড জ্যোত্স্না দেখছিল। সেগুলো কখনো ম্লান এবং কখনো তীব্র আলোর বলয় তৈরি করেছিল। বাইরের ঘোলা জ্যোত্স্নায় রাস্তার দুপাশের গাছগুলোকে খুব দ্রুত অতিক্রম করছিল। ফেরিতে এসে সে তাকিয়ে ছিল পানির দিকে। পানিতে বিম্বিত চাঁদ কাঁপতে কাঁপতে বিভিন্ন আকৃতি নিচ্ছে। কখনো টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে আবার মিলিত হচ্ছে। তার ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের সেই চাঁদের কথা মনে পড়ছিল, যেটা তার প্রেমিকার মুখের মতো পূর্ণ, পবিত্র। বাসটা দ্রুত চলছিল এবং সে বুঝতে পারছিল না আসলে কী ঘটছে। সবকিছু তার কাছে কী একটা রেস টেনে যাচ্ছিল এবং সে শুধু একটা পুতুলের মতো নিজেকে যুক্ত রেখেছিল। রাত্রি বারোটায় সে তার প্রেমিকাকে টেক্সড করেছিল—বাইরে তুমুল জ্যোত্স্না। আমি জেগে আছি। রাত জেগে আছে। একজনকে ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না।
সে ভাবেনি, এখনো তার প্রেমিকা জেগে আছে। কিন্তু তার মোবাইলে ভেসে উঠতে দেখে—জ্যোত্স্না, রাত আর নিঃশব্দ অনুভবের সাথে কবিতা দীর্ঘজীবী হোক। শুভরাত্রি।
এখন এই গন্তব্যহীন এ রিকশা-যাত্রায় সে শহরের কোলাহল শোনে। ঘড়ি দেখে, রাত নয়টা বিশ। তার প্রেমিকার শহরে এখন নয়টা পঞ্চাশ। তার মানে গতকাল এসময় সে প্রেমিকার শহরেই ছিল। মাত্র একটা রাতের ব্যবধান। গতকাল প্রায় ষোল ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে সে এখন এই নগরের কোলাহল আর পরিচিত দৃশ্যের ভেতর দিয়ে নিজের অপরিচিত সত্তাকে অবলোকন করছে। সে ভাবছে, শহরটা তার নিজের নয়। এবং নিজের শহর বিষয়টা আপেক্ষিক। সে আবার স্মরণ করে, নয় ঘণ্টার ভ্রমণের পর তার মাথার ওপরে নতুন সকাল যখন সূর্যের তেজ বাড়াচ্ছিল তখন সে অতিক্রম করেছিল সীমান্ত। সীমান্ত অতিক্রমের আগে চেকপোস্টে শেষবারের মতো সেই কণ্ঠ শোনার জন্য সে কানের কাছে মোবাইল চেপে ধরেছিল এবং আর্তনাদের সাথে বলেছিল—
আমি এটা ভাবতেই পারছি না, যে শহরে তুমি নেই সে শহরে আমি আছি, আর যে শহরে তুমি আছ সে শহরে আমি নেই। আমি সে শহরেই থাকি যেখানে তুমি থাকো।
ইথারে টুকরো টুকরো হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল তার কণ্ঠস্বর। মুঠোর মধ্যে ধরা ফোনটা নেটওর্য়াকের দাগহীন। তখন সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
