একটা পা। তাতে নূপুর বাঁধা। সকালের পর আর কোনো নতুন লাশের খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাত্ই খবরটা এল। একটা পা দেখা গেছে, তাতে নূপুর বাঁধা। নূপুরটা বাতাসে হালকা দুলছে। কিন্তু কোনো নিক্কন শোনা যাচ্ছে না ওই দুলুনি থেকে। পরদিন পায়ের তলার ছবিটা খুব সুন্দর ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। নূপুরও আছে সেই ছবিতে। সেই নূপুর কার, কার সে পা। দিলু খুনকার তুমি বরং মনে কর নূপুর বাজছে তোমার ঘরে। তুমি ঘরে ফিরে যাও। নূপুর বাজলে তো কেবল তুমিই শুনবে। যাও দিলু খুনকার, ঘরে ফিরে যাও। দিলু খুনকারের কাছে প্রশ্ন ছিল—আচ্ছা ওই যে নূপুর পরা পা দেখতে পাচ্ছি, ওটা যে রেনুকা বেগমের কীভাবে নিশ্চিত হলেন? দিলু খুনকার সাংবাদিকের প্রশ্নে কী জবাব দিয়েছিল তা জানা নেই আমাদের কারও। দিলু খুনকার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে টিভি পর্দায় চোখ রাখা দর্শকদের বলে দিয়েছে, যদি ওই নূপুর পরা মেয়েটি আমার স্ত্রী রেনুকা বেগম না হয়, তবে তা আপনার স্ত্রী অথবা বোন অথবা মা অথবা অন্য কোনো পরম আত্মীয়র। আর কেন এই নূপুর পরা পা এভাবে নিশ্চুপ পরে থাকবে, কেন নূপুরের ছন্দ স্তব্ধ, কেন সূর্য ডোবার আগেই সাঁঝ নেমে আসে, কেন?’ এমন অনেক কথাই সেদিন শুধু চুপ করে থেকে টিভির দর্শকদের বলে দিয়েছে দিলু খুনকার। কিছু কথা বলার জন্য মুখ খুলতে হয় না, চোখের জল অথবা ক্ষোভের আগুনে পোড়া চোখ বলে দেয় সব। অথবা ধরা যাক, টিভি সাংবাদিকের কাছে দিলু খুনকার একটা গল্প বলতে চেয়েছিল কিন্তু আবেগ ধরে রাখতে পারেনি বলে কিছুই বলা হয়নি। প্রিয় পাঠক, চলুন আজ দিলু খুনকারের সেই না বলা গল্পটা শুনি।
মেয়েটার চলনের মধ্যে একটা দুলুনি লেগেই থাকে। এ ঘর থেকে ও ঘর অথবা ঘরের মধ্যেই সে হাঁটে—যেন নেচে নেচে। এ নিয়ে অবশ্য কম গালমন্দ তাকে সহ্য করতে হয়নি। কিন্তু কিছুতেই তার এই নৃত্যছন্দচলন বন্ধ করতে পারেনি।
স্কুলে যাবার পথে যারা মেয়েটিকে দেখেছে তারা তো অবাক। এই টুকুন পুঁচকে মেয়ে এভাবে নেচে নেচে যাচ্ছে সারাপথ। চুলটাকে বিনুনি করে দিয়েছে মা। মা জানে বেনি দুলিয়ে যখন ও স্কুলে যাবে তখন সবাই দেখবে মেয়েকে। মা-র অবশ্য ওর এই চলনটা কোনো কালেও খারাপ লাগেনি। ফুর্তি আছে এই চলনে। মেয়েটি বাড়ির সব কাজও করে খুব সুন্দর করে দ্রততার সঙ্গে—ওই যে নেচে নেচে। ফলে বাবা ছাড়া আর কেউ তাকে বকুনি দেয়নি। আর একজন বকে দিয়েছিল—খবিরুদ্দি চাচা। তিনি মসজিদের ইমাম। মেয়েটি তখন ক্লাস এইট কি নাইনে পড়ে। স্কুল থেকে ফেরার সময় খবিরুদ্দি চাচা মেয়েটির পথ আগলে দাঁড়ায়।
এই যে কইন্যা, বয়স তো কম হয় নাই। এহন নাচুন বন্ধ কর। মাথায় ঘোমটা দিয়া ধীরে সুস্থে স্কুলে যাইবা।
চাচার কথাগুলো সেদিন মেয়েটির মর্মে প্রবেশ করেছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। কারণ, মেয়েটির সেই নাচুনে চলনে কোনো ছন্দপতন হয়নি, উল্টো নতুন ছন্দই যেন যোগ হয়েছিল। তবে কথাগুলো বলে খবিরুদ্দি চাচা যে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছিলেন তা আর কেউ না দেখুক মসজিদের দোতলা গম্বুজটা দেখেছে। মেয়েটি তার সামনে থেকে যাওয়ার পর খবিরুদ্দি চাচা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিল—আহারে এমন একটা মাইয়া যদি আমার থাকত, কী সুন্দর মাইয়া। তয় ওর হাঁটনটা বদলাইতে হইব। তিন ছেলের বাবা খবিরুদ্দি চাচা এই আক্ষেপ করতেই পারে।
মেয়েটির ভাইবোন ছয়জন। সে মেজো। মেয়েটির মতো তার আরও এক বোন নৃত্যছন্দচলন পটিয়সী। যেহেতু বোনটি ছোট তাই তার এই চলন খুব বেশি মানুষের চোখে পড়েনি এখনো। সবাই শুধু মেয়েটির চলনই দেখেছে। মা-র খুব সখ ছিল, মেয়েটিকে এক জোড়া নূপুর গড়ে দেবেন। সোনা না হোক রুপা হলেও চলে। নূপুরের সঙ্গে থাকবে কয়েকটা ছোট ছোট ঝুনঝুনি। ও যখন হাঁটবে তখন তা বাজবে—আহ কী মজা হবে! বাড়িময় একটি নাচুনে পাখি যেন ছুটে বেড়াবে। মা অবশ্য কথাগুলো বাবার কাছে প্রকাশ করতে পারেননি, সেই সাহসই মা-র হয়নি। মেয়েটির বাবা সুলেমান খা পাড়ার মাথায় ছোট একটা মুদি দোকান করে সংসার চালাচ্ছে। সংসারটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ছয়-ছয়টি সন্তানের ভরণ-পোষণ তো আর সহজ কথা নয়। এর মধ্যে আবার স্কুলে যায় তিন জন। সরকারি স্কুল বলে বেতন-ভাতা নাই, বইয়ের খরচও নাই। কিন্তু খাতা আর কলম? চুলে বেনি করার ফিতা? মেয়েটির মুখে মাখার স্নো-ক্রিম? এসব আসে কীভাবে।
বাবার আয়ে চলে না বলে মেয়েটির ভাই, যে কি না মেয়েটির চেয়ে দুই বছরের বড়—সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে পরের জমিতে কামলার কাজ শুরু করেছে। আসলে যে পরিবারের কথা ভেবেই সে স্কুল ছেড়েছে, তা নয়। তাকে স্কুল থেকে বিদায় করে দিয়েছে। ছাত্র হিসেবে সে ছিল শেষ বেঞ্চের। তার ওপর ছেলেটির ছিল একটি হাস্যকর অসুখ। ঘুমের অসুখ। হাঁটতে হাঁটতেও যেন ঘুমিয়ে পড়ত সে। তার নাক ডাকার আওয়াজে ক্লাসের পড়ায় ব্যাঘাত হওয়ায় তাকে স্কুলে যেতে মানা করে দিয়েছেন হেডমাস্টার।
মেয়েটির এই ঘুমকাতুরে ভাইটি যে পরের জমিতে কাজ করে খুব বেশি আয় করতে পারছে তা-ও নয়। কাজে যাওয়ার পর নিড়াতে নিড়াতেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকবার। চাষির গালমন্দ শুনতে শুনতে ছেলেটি আর এখন ওই কাজে যেতেও চায় না। আবার বাড়িতে বসে থাকলেও খাবার জুটবে না, তাই সে খুঁজছিল এমন একটা কাজ যেখানে ঘুম থাকবে না চোখে। কাজটা হবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে গল্পে গল্পে। কী কাজ হতে পারে, মেয়েটির ঘুমকাতুরে ভাই এই ভাবনা ভাবতে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
মেয়েটিরও যে এভাবে রোজ বেনি দুলিয়ে স্কুলে যেতে ভালো লাগে তা-ও নয়। সে জানে, বাবার দোকানের আয় যথেষ্ট নয়, ভাইটা কাজে গেলে ঘুমিয়ে পড়ে। আটজন মানুষের ভরণ-পোষণ খুব কঠিন। মেয়েটিও ভাইটির মতো ভাবনায় পড়ে যায়। তবে তার ঘুম পায় না। পড়ে পড়ে আর কতদূর যেতে পারব—এই প্রশ্নটিই তার মাথায় ঘুরতে থাকে। রুপকথার গল্পের মতো যদি মেয়েটি হঠাত্ করেই একটা যাদুর বাক্স পেত, যেটাতে ‘যাহা চাইবে তাহাই পাইবে’ এমন কথা লেখা থাকত! কী মজাটাই না হতো। তাহলে এই গল্পের শেষে গল্পকার লিখতেন—‘অবশেষে মেয়েটি স্বামী-সন্তান লইয়া সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’
মেয়েটির ঘুমকাতুরে ভাইটি কোনো কিছু না ভেবেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল শহরে। গ্রাম্য জীবনের সব নাড়িনক্ষত্র তার জানা। এখানে ঘুমকে ফাঁকি দিয়ে তার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। গ্রামের বাড়ি-নদী-নালা-পুকুর-বিল-স্কুল-মাঠ সবখানেই যেন ঘুমের ভূতেরা হা করে বসে আছে। আর এই ভূতরা কেবল মেয়েটির এই ভাইকেই চেনে। ফলে শহরে যাওয়ার বিকল্প ভাইটি খুঁজে পায় না। বাড়ি থেকে সে পালিয়ে গেলেও নৃত্যছন্দচলন পটিয়সী বোনকে সে ঠিকই বলে যায়। শোন, শহরে যাইতাছি, দেহি কুনু কাজকাম পাই কি না, না পাইলে আর বাড়িতে ফিইরা আমু না। মেয়েটিও যেন চাইছিল এমন কিছুই। আসলে পরিবারের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কাউকে না কাউকে তো রিস্ক নিতেই হবে। এইট কি না নাইনে পড়া মেয়েটি হয়তো এসব ভেবেই ভাইকে পালিয়ে যেতে উসকানি দিয়েছিল।
মাস পাঁচেক কোনো খবরই ছিল না ভাইটির। প্রথম দিকে বাড়ির সবাই দল বেঁধে কান্নাকাটি করেছে। মা রোজ মসজিদে-মাজারে গিয়ে মানত করেছে। বাবা ছেলেকে গালমন্দ করে গোপনে কেঁদেছে। শুধু মেয়েটি ছিল নীরব। সে তো জানত ভাইটি কোথায় গেছে।
পাড়ার এক ওঝা এসে সেদিন মা-র কাছে বলে গেছে, ছেলেটিকে পরিতে নিয়ে গেছে। ছেলেটি না কি সেদিন সন্ধ্যায় শ্যাওড়াতলায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর ওই গাছে বিশ্রাম নিতে আসা পরি তাকে পছন্দ করে তুলে নিয়েছে। এখন কী হবে, এখন কী হবে করে আবার খানিকটা কেঁদে নিলেন মা। ওঝা তো এই সুযোগই খুঁজছিল। ‘আপনের ছাওয়ালরে যে পরিতে ধরছে তারে খুশি কইরা দিলেই ছা্ওয়াল ফেরত দিবে। দুই কেজি আতপচাইল আর একটা লাল মোরগ সঙ্গে আগরবাত্তি দিলেই পরি খুশি হইব মনে হয়’। বাহ। কী দারুণ ভেলকিবাজি—ওঝার বায়না মিটল। তার জন্য অবশ্য একবেলা না খেয়ে থাকতে হলো সবাইকে। কিন্তু ছেলেটির আর সন্ধান মিলল না পাঁচ মাসেও।
কেউ কেউ পরামর্শ দিল—থানায় ডায়রি কর...। ডায়রি হলো। দরগায় ভোগ দাও... ভোগ হলো। গাছে গাছে তাবিজ বান্ধো... তাবিজ বাঁধা হলো।
পাঁচ মাসে কী হয়নি এই বাড়িতে। শুধু মেয়েটি জানত, তার ভাই একদিন ফিরবেই। ফিরলোও তাই। সকালে মা তখন উঠান ঝাঁট দিচ্ছিলেন আর ও আমার মানিকরে আয়রে ফিইরা আমার বুকে আয়রে... এই ক্রন্দন গীত গাইছিলেন। আর মেয়েটি কুয়োতলায় বসে বাসি হাড়িপাতিল ঘষছিল আর গুনগুন করছিল। হঠাত্ মেয়েটির হাত থেকে পিতলের একটা গ্লাস পড়ে যায় ইটের ওপর—ঝনাত্। আইজ্জে ভাইয়্যে মনে অয় আইব...। মা-র কানে কথাগুলো যায়। আর তাতে মা-র গীতটি আরও চড়াসুরে বেজে ওঠে। ঠিক তখন—মা আমি আইছি।
ঈদের দিনেও সুলেমান খার বাড়িতে এমন আনন্দ হয় না। তিন বোনের জন্য চুড়ি, দুই ভাইয়ের জন্য চাবি দেওয়া গাড়ি, মা-র জন্য শাড়ি আর বাবার জন্য তজবিহ। এই আনন্দ অবশ্য বেশি সময় থাকে না। যখন ছেলেটি তার বাবার কাছে মেজো বোনটিকে শহরে নিয়ে যাবার প্রস্তাব তোলে তখনই সব আনন্দ চুপসে যায়। বাবা রেগে আগুন। ছেলের দেয়া হাজারখানেক টাকাও পারলে তিনি ছুঁড়ে ফেলে দেন।
অন্য ভাইবোনেরা দোটানায় পড়ে যায়। যাকে নিয়ে আনন্দ মাটি হলো, সেই নাচুনি মেয়েটির মনোভাব অবশ্য এতক্ষণেও প্রকাশ পায়নি। শহর ফেরত ভাইটি প্রশ্ন করে—তুই ক, যা কইবার মুখে কইবি, ইশারামুশারায় কইবি না। হয় যাইবি নয় যাইবি না। আমার এত আলাপের সময় নাই। রাইতে আবার গিয়া অপিস কইরতে অইব—ঠিক আছে সবাই মিইলা ভাইবা দেহো’। ছেলেটি দুপুরের দিকে আবার শহরের পথে পা বাড়ায়।
একমাস পর ভাইটির সঙ্গে মেয়েটি যাচ্ছে শহরে। গার্মেন্টসে কাজ করবে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত। পাড়ায় অবশ্য এ নিয়ে অনেক কথা রটে যায়। সেই খবিরুদ্দি চাচাই সবার আগে বলে—মাইয়া মানুষে ইভাবে না পাঠাইলেই পারতা সুলেমান খা। কেউ কেউ বলে—মেয়েটা নষ্ট হয়ে যাবে, পুরুষ মানুষের লগে কাম করতে হইলে কি আর... আরও কত কী।
শহর। কত ব্যস্ততা। সবাই ছুটছে। দম ফেলারও যেন সুযোগ নেই কারও। মেয়েটির এই শহরে এসে নাচের গতি আরও বেড়ে যায়। ভাইটি তাকে যে কারখানায় কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সেখানে বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। মেয়েটি এতে বেশ আশ্বস্ত হয়। একমাসেই সে কাজের অনেক কিছুই শিখে নেয়। মেশিনেই সব সেলাই হয়। কাটেও মেশিনে। গ্রামের মুক্কু দর্জি যদি এই মেশিন পেত তাহলে এক বছরের কাজ সে একদিনেই করে ফেলতে পারত—ভাবে মেয়েটা। তার কাজ খুব সহজ—শার্টের বোতামগুলো ঠিকমতো লাগানো হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে ইস্ত্রি মেশিনের দিকে কাপড়গুলো ঠেলে দেওয়া। ইস্ত্রি করবে অন্যজন। প্রত্যেকেরই কাজ ভাগ করা। কাজটা মেয়েটির খুব পছন্দ হয়েছে। আরও পছন্দ হয়েছে তার বেতন। সাড়ে তিন হাজার টাকা। এক বছর গেলে না কি আরও বাড়বে শুনেই তার হাসি পায়। যদিও সে শহরে আগে আসা মেয়েদের কাছে শুনেছে, এই মজুরি খুব কম। তাদের নাকি মজুরি হওয়ার কথা আরও দুইগুণ। এ নিয়ে যখন আন্দোলন হবে, তখন তাকেও যেতে হবে মিছিলে। সে কখনো মিছিলে যায়নি। সবাই দল বেঁধে শ্লোগান দেবে—মানি না মানব না, বেতন ভাতা বাড়াতে হবে বাড়িয়ে দাও বাড়িয়ে দাও; এসব বলতে হবে শুনে সে ভাবে, ভালোই তো মিছিলও তো খারাপ না।
মেয়েটির বাড়িতে এখন আর অনটন খুব বেশি নেই। বাবার দোকানে এখন মোবাইলে টাকা ভরার ব্যবসাও যোগ হয়েছে। ছোট তিনটা ভাইবোন স্কুলে যায় নতুন জামা পড়ে। মা-র চোখের ছানির অপারেশনও হবে সামনের মাসে। একবার বাড়িতে গেলে মা বলে—‘তুই এক জোড়া নূপুর বানায়া নিতে পারিস না মা, তোর পায়ে নূপুর খুব ভালো মানাইব...’ মেয়েটি হাসে। মা আবার বলে—‘ইবার তোর বিয়া দিমু, কী কস তুই, পাত্র তোর অপছন্দ হইব না। খুনকার বাড়ির ছুডো ছাওয়াল কী যেন নাম... দিলু খুনকারের লগে পস্তাব আইছে’। মেয়েটি আবারও হাসে। মেয়েটির হাসিও খুব সুন্দর। মা অবাক হয়—‘কিরে পাগলি হয়া গেইছস নাহি’।
যা খুশি কর। সংক্ষিপ্ত এই উত্তরে মেয়েটির মা খুব আশাবাদী হয়। দিলু খুনকার নিজেও তো শহরে থাকে, গার্মেন্টেসেই কাজ করে। মেয়েটি তার ভাইয়ের মাধ্যমে দিলু খুনকারের বৃত্তান্ত জেনে নেয়। দিলু মেয়েটির ঘুমকাতুরে ভাইয়ের বন্ধু। মেয়েটি হাসে আর ভাবে, নূপুর যদি পরতেই হয় তাহলে বিয়ের আগে না, বরের হাতেই নূপুর পরবো।
মেয়েটির ভাই একদিন দিলু খুনকারকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে তাদের মেসে। স্কুল ঘরের মতো লম্বা টিনের ঘরের এক দিকে থাকে মেয়েরা অন্য দিকে থাকে ছেলেরা। মেয়েটি আর ছেলেটি ভাইবোন বলে পাশাপাশি রুমে থাকে। মেয়েটির দুই নতুন শহুরে বান্ধবীও থাকে তার সঙ্গে। বান্ধবীরা দিলু খুনকারকে দেখে পছন্দ করে ফেলে—রেনুকারে, দিলু ভাই তো ভালোই। ঢকডইল আছে, তোর লগে ভালোই মানাইব। রেনুকা মানে নৃত্যছন্দচলন পটিয়সী মেয়েটি মাথা নিচু করে হাসে। তারও অপছন্দ হয়নি দিলু খুনকারকে। দিলু খুনকার তার দোস্ত মানে রেনুকা খাতুনের ভাইকে জানিয়ে দেয়, তার আপত্তি নেই বিয়েতে।
এরপর নূপুর পরিয়ে দেয় দিলু খুনকার। মানে বিবাহপর্ব শেষ। দিলু খুনকার নিজহাতে যখন নূপুর পরায় তখন একবার তার মনে হয়েছিল, রেনুকা বেগমের পা দুইখান যেন নূপুরের অভাবে এতদিন ঠিক উদাম পড়ে ছিল। রেনুকা আর নূপুর এক সময় দিলু খুনকারের খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। রেনুকা যখন হাঁটে, সেই নৃত্যছন্দচলন গতিতে তখন দিলু খুনকার আহাউহু করে ওঠে। মেয়েটাকে সে আর অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে মিলাতে পারে না, তার সব কিছুই আলাদা মনে হয়। দিলু খুনকার আবারও যেন প্রেমে পড়ে রেনুকা বেগমের। ‘রেনু+দিলু’ শব্দ দুটো যে কখন তাদের ঘরের দরজায় লেখা হয় যায় তা আর ভেবে পায় না ওরা। অথবা শব্দ দুটো কে লিখেছে তা-ও যেন ওরা মনে করার অবসর পায় না ভালোবাসার দমকে।
‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ নামের একটি নাটক আছে সংস্কৃত ভাষায়। কালিদাসের লেখা এই নাটকে দরিদ্র কন্যা শকুন্তলার বিয়ে হয় রাজার সঙ্গে। কিন্তু রাজা তার রাজ্যে ফিরে গিয়ে ভুলে যায় শকুন্তলাকে। শকুন্তলা রাজার কাছে গেলে তাকে অস্বীকার করা হয়। শেষমেষ শকুন্তলাকে দেয়া রাজার আংটিই তাকে রাজরানীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।’ রেনু-দিলুর গল্পে কেন শকুন্তলার অভিজ্ঞান—আংটির প্রসঙ্গ এল, তা নিয়ে পাঠকের খটকা দূর করা দরকার। কারণ, কোনো এক দুপুরে যখন দিলু খুনকার শুনতে পায়, রেনুকা বেগম মানে তার নৃত্যছন্দচলন পটিয়সী স্ত্রীটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তার মনে পড়ে সেই নূপুরের কথা। রেনুকা বেগম কি তবে নূপুরের ছন্দ তুলে নাচতে নাচতে অচিন দেশে চলে গেছে? দুঃসংবাদটি শোনার পর সে বলেছিল, ‘তার আসা যাওয়ায় যে বাজনা বাজে, সে যেহানেই যাউক তারে খুুঁইজা পাওয়া কঠিন হইব না’ সংবাদ দাতাকে সে যেন তাচ্ছিল্য ভরেই কথাগুলো বলে বেশ করে হেসে নিয়েছিল। সত্যিই তো যার পায়ে এমন বাজনাওয়ালা নূপুর, সে আবার হারিয়ে যায় কীভাবে।
কিন্তু সংবাদটির গুরুত্ব বুঝতে খুব দেরি হয় না দিলু খুনকারের। যখন তার জানের দোস্ত ও পরবর্তীতে পরম আত্মীয় মানে রেনুকা বেগমের ভাই তার দিকে তাকিয়ে বলে—‘দিলু রে... তোর নূপুর আর বাজব না, ওরে দিলু নূপুর কেন দিলিরে...’ কোনো পুরুষ মানুষ এমন মেয়েলি ঢংয়ে কাঁদতে পারে তা বোধ হয় জানা ছিল না দিলু খুনকারের। দিলু কী করবে কী বলবে, বুঝে উঠতে পারে না।
এরপর আর না বোঝার থাকে না কিছুই। দিলু খুনকার আর রেনুকা বেগমের ভাই মিশে যায় এমন হাজার মানুষের সঙ্গে যাদের সবার কণ্ঠেই একই সুর, একই কান্না। এরপর দিলু খুনকার আর তার জানের দোস্ত মানে রেনুকা বেগমের ভাই কেবল দৌড়াতে থাকে। অধরচন্দ্র স্কুল থেকে এনাম হাসপাতাল আর এনাম হাসপাতাল থেকে অধরচন্দ্র স্কুল—মাঝে মাঝে দুই-একবার সেই বিল্ডিংয়ের কাছেও যেটি ভেঙে পড়ায় নূপুরসহ রেনুকা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার তিনদিন পর একটি পা দেখা গেল ধসে পড়া ভবনের দক্ষিণ দিকের ইট সুড়কির ফাঁক গলিয়ে। পা আর নূপুর বলে চলেছে—‘আরে আমি তো আছি এইখানে প্রাণের স্বামী দিলু খুনকার তুমি কই, আস দেখ আমারে, এই যে আমি তোমার নূপুর তুলে ধরলাম।’ পা-টা এমনভাবে বের হয়ে আছে যেন, প্রথম দেখায় মনে হবে এক্ষুনি নূপুরসহ পা নাচ শুরু করবে কেবলই বাদ্যের অপেক্ষা। পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায়ও ওই পায়ের ছবিটা ছাপা হয়েছিল। যে পায়ে জড়িয়ে আছে একটি নূপুর। অন্য পা-টি সম্ভবত ইট-পাথরে চাপা পড়ে আছে।
দিলু খুনকার এবং তার জানের দোস্ত যখন এনাম হাসপাতাল থেকে অধরচন্দ্রের দিকে ছুটছিল আরও নতুন লাশ যাচ্ছে শুনে, ঠিক সেসময় পত্রিকাটি চোখে পড়ে দিলু খুনকারের। নূপুর ও পায়ের সামান্য অংশ দেখেই আর পুরো শরীর চিনে নিতে সময় লাগে না দিলুর। তারা ছুটে যায় সত্যিকারের পা আর নূপুরের সন্ধানে। পত্রিকার ছবির জন্য মডেল যেন ওই পা আর নূপুর। আজও সেভাবেই আছে। বড়বড় কংক্রিটের চাঁই না সরাতে পারলে নূপুরসহ পা বের হবে না, দেহটা তো আরও গভীরে।
‘নূপুর বাজে না, বাজে না নূপুর। দিলু খুনকার কী করবা ইবার। ও দিলু খুনকার... দিলু খুনকার! কী করবা ইবার, কথা কও না মিয়া... ওই দিলু খুনকার! নূপুর পিন্দাবা বউরে... বউয়ের নাচন দ্যাখতে খুব জুইত লাগে না! নূপুর বাজে না রে, ও নূপুর বাজে না রে... দিলু ইবার কী করবা রে...।’ দিলু খুনকার দূর থেকে সেই নূপুর আর পায়ের কিছু অংশ দেখে। দেখতেই থাকে দিলু।
