গল্প

আদিম আগুন

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ১৭:৫৩
গত দু-দিন ধরে পরীবাগ ওভারব্রিজের নিচের ফুটপাতে এক দম্পতিকে দেখছি আমরা। দম্পতি, নাকি অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকা? আমরা নিশ্চিত নই। ছেলেটির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ, মেয়েটির আঠার-উনিশ। কেউ যদি বলেন? না, ছেলেটির বয়স তিরিশ আর মেয়েটির পঁচিশ ছাড়িয়ে গেছে, তবুও বিতর্কের কিছু নেই। খেতে না পাওয়া দিন, নির্ঘুম রাত, শহরের ধুলোবালি আর কালো ধোঁয়া তাদের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া আমাদের মতো তারা তো আর রুই-ইলিশ, গরু-খাসি, কোরমা-পোলাও খেতে পায় না। চোপাভাঙা মুখ দেখে বয়স বোঝা তো মুশকিল হবেই। কেউ কেউ ভাবেন, তারা বুঝি নেশাখোর, নেশার ঘোরেই বুঝি তাদের রাত কাটে। তারা হয়তো নেশা কী বোঝে না। কখনো চোলাই, গাঁজা বা ফেনসিডিল দেখেনি, হেরোইন বা ইয়াবার নামও কোনোদিন শোনেনি; তবু কেউ কেউ তাদের নেশাখোর বলেই সন্দেহ করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, না, মোটেই তারা নেশাখোর নয়। ব্রিজের ওইদিকে কড়ইগাছটার নিচে রোজ যে দুই গাঁজাখোরকে দেখা যায়, তাদের চেয়ে এরা একেবারেই আলাদা। কই, গত দু-দিনে এদেরকে একবারও তো ওদের মতো নেশাগ্রস্ত দেখা যায়নি। বোঝা যায় এই শহরে তারা নতুন। সপ্তাখানেক, বড়জোর পনের দিন আগে এসেছে। হতে পারে তারও বেশি। আমরা নিশ্চিত নই। আমরা তাদের নাম-সাকিন জানি না। শরীরের গড়ন-গঠন আর জামা-কাপড় দেখে আন্দাজ করা যায়, ছেলেটির বাবা অজগাঁয়ের লাঙলঠেলা চাষা। ফজল মিয়া, জালাল মিয়া, আকবরালি, করমালি বা এই ধরনের কোনো একটা নাম তার। যারা লাঙল ঠেলে ফসল ফলিয়ে আমাদের তিনবেলা খাবারের জোগান দেয়, তাদের নাম তো আর ফজল আহেমদ চৌধুরী কি করম আলী মজুমদার হয় না! আর মেয়েটির বাবাও হয়তো চাষাভুষা, ক্ষেতমুজুর। হতে পারে নদীপারের দূরের কোনো এক গাঁয়ের নিকারি। মেয়েটির রোদপোড়া মুখে তারই ইশারা। ধরে নেয়া যাক সম্পর্কে তারা স্বামী-স্ত্রী। বিয়ে হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। গতকাল ওই ফুটপাত দিয়ে যেতে যেতে কেউ কেউ দেখেছেন, তাদের হাত মেহেদিরাঙা। এছাড়া তাদের কথাবার্তা শুনে আন্দাজ করা যায়, তারা একে অন্যের জীবনসঙ্গী। না, এ কথা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। কারণ, আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের কোনো জীবনসঙ্গী নেই, আছে যৌনসঙ্গী। যদিও একদিন জীবনসঙ্গী হিসেবেই এত এত লাখ টাকা দেনমোহরের বিনিময়ে যৌনসঙ্গীটিকে ঘরে এনেছিলেন। ছেলেটি হয়তো এখন মেয়েটিকে জীবনসঙ্গীই ভাবছে, ভালোবাসছে, আদর করছে, নিজে না খেয়ে খাওয়াচ্ছে। কিন্তু একটা সময় আসতে পারে, যখন সে এই শহরে মোটামুটি একটা জায়গা করে নিতে পারবে, যখন সে ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া হবে, অথবা ফ্ল্যাটের মালিক হবে, তখন হয়তো মেয়েটিকে স্রেফ যৌনসঙ্গী ছাড়া আর কিছু ভাববে না। তাদের গায়ের পোশাক পুরোনো হলেও এখনো বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আগামী দু দিন পরিষ্কার থাকবে। এই শহরে এক পোশাক দু-দিনের বেশি পরিষ্কার রাখা যায় না। দুজনের গায়ের রং কালো, চুল এলোমেলো, ধুলোবালিতে জটলাগা। জট অবশ্য লাগারই কথা। রাস্তায় কত ধুলাবালি উড়ছে, উড়ন্ত ধুলাবালি তাদের মাথায় কি পড়ছে না? ধুলাবালির তো ঘরবাড়ি নেই। বাতাস যেখানে তাড়িয়ে নেয় সেখানেই তাদের ঠাঁই। এই দম্পতিও ধুলাবালির মতো যাযাবর, তাদেরও ঘরবাড়ি নেই। সকালে অফিসে যাবার সময় দুজনকে ঠিক এই জায়গায় দেখি, আবার দেখি ফেরার সময়। সারাদিন আর দেখা যায় না। চটের বস্তায় বাঁধা পোটলা-পুটলিগুলো অবহেলায় পড়ে থাকে ব্রিজের খামের আড়ালে। ওই পথে যেতে-আসতে আমরা মেয়েটির দিকে বারবার তাকাই। যারা হেঁটে বা গাড়িতে চড়ে যাতায়াত করেন, কেউই মেয়েটির দিকে তাকানোর লোভ সামলাতে পারেন না। তার চেহারায় ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বা পনড্স্ ফ্রেশ ওয়াশের মসৃণতা না থাকলেও আছে এক গেঁয়ো সৌন্দর্য। মুখের গড়ন কারও কাছে বিশ্রী ঠেকলেও তার বুক, পিঠ, পাছা বা ঊরুর দিকে তাকালে তার মুখের কথা ভুলে যান। আমরা মেয়েটির দিকে প্রথমবার তাকাই কোনোদিকে না তাকিয়েই। দ্বিতীয়বার তাকানোর আগে তেরচা চোখে আশপাশ ভালো করে দেখে নিই, পাছে কেউ আমাদের কামার্ত চোখের চাউনি দেখে ফেলছে কি না! দেখে ফেললে আমাদের নাগরিক ভদ্রতা যে নষ্ট হয়! যখন নিশ্চিত হই, না, কেউ আমাদের দেখছে না, তখন আমাদের চোখ আবার মেয়েটির স্তন, ঊরু বা পাছার দিকে চলে যায়। আমরা তখন হাঁটার গতি কমিয়ে দিই। যারা বাসে চড়ে যান, বাস মেয়েটিকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেলেও জানালা গলিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকেন। যারা ব্যাক্তিগত গাড়িতে চড়ে জায়গাটা অতিক্রম করেন, তখন গাড়ির গতি কমিয়ে দেন। গাড়িটা ড্রাইভার চালালে তাকে বলেন?‘একটু আস্তে চালাও তো অমুক মিয়া।’ কিন্তু অমুক মিয়া আস্তে চালায় না; পাছে রূপসী বাংলার মোড় বা বাংলামোটরের সিগন্যাল পড়ে যায়! গতি বরং সে খানিকটা বাড়িয়েই দেয়। তখন চাপাগলায় ড্রাইভারকে দু-একটা গলিও দেন। অমুক মিয়া ড্রাইভার হয়তো শোনে না, শুনলেও কিছু বোঝে না, বুঝলেও চুপ করে থাকে। কারণ, এই শহরে অমুক মিয়ারা এসব গালি শুনতে শুনতে অভ্যস্ত। গালিকে তারা আর খারাপ কিছু মনে করে না। রূপসী বাংলার মোড়ে বা বাংলামোটরের সিগন্যাল পড়ে গেলে মাঝে মধ্যে রাস্তাটা যানবাহনশূন্য হয়ে পড়ে। কখনো আবার সিগন্যাল ছাড়াই রাস্তা ফাঁকা। তখন আমরা দূর থেকে খেয়াল করি, ছেলেটির কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করছে মেয়েটি। ছেলেটির চোখে তখন আদিম আগুন জ্বলে ওঠে, অগ্নিময় মুখ বাড়িয়ে দেয় মেয়েটির মুখের দিকে। হঠাত্ বাস কি প্রাইভেটকারের যান্ত্রিক শব্দে দুজনের কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে ছেদ পড়ে। আগের মতো আবার তারা আলাদা হয়ে বসে। গাড়িগুলো চলে গেলে তারা আবার পরস্পরের কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করে, চুম্বকের মতো একজন আরেকজনকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আবারও গাড়ির শব্দ, আবারও আমাদের শত শত চোখ তাদের উপর থির হয়। ফলে আবার তারা তড়িঘড়ি আলাদা হয়ে বসে। এভাবে একবার, দু-বার, তিনবার...। নাহ, কিছুতেই হয়ে ওঠে না। চারবারের সময় বিরক্ত হয়ে তারা আমাদের উদ্দেশে ‘দুশ্শালা’ বা এই ধরনের দু-একটা গালি ছুঁড়ে দেয়। গালি হয়তো আমাদের উদ্দেশে নয়, তাদের নিয়তির উদ্দেশেই। আমরা দূরে বলে পষ্ট শুনতে পাই না। তাদের চেহারা দেখে আন্দাজ করতে পারি, বেজায় বিরক্ত তারা। ওভারব্রিজটার ওপর সারাদিন চার পুলিশকে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের চোখও খুঁজে বেড়ায় মেয়েটিকে। কিন্তু সন্ধ্যার আগে তাকে দেখা যায় না। সন্ধ্যায় ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটি ফিরে এলে পুলিশদের চোখ আর সরে না, অপলক চোখ থির হয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। তখন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকাটাই যেন তাদের ডিউটি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দেয়। আমাদের কেউ কেউ ভাবেন, আচ্ছা সবাই কেন মেয়েটির দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে? কেউ কেন ছেলেটির দিকে একবারের বেশি তাকায় না? আমাদের মধ্যে যারা কবি তারা বলেন? ‘নারীরা পুষ্প। পুষ্পের পানে চাহিয়া থাকা দোষের কিছু নহে। তাহাতে আত্মার বিষাদ দূর হয়, প্রখর হইয়া ওঠে দৃষ্টিশক্তি।’ কেউ কেউ কবিদের এমন মন্তব্যে নাখোশ হন। হলেও কিছু করার থাকে না। কারণ, তারা এই শহরের বহুল প্রচলিত প্রবাদটি জানেন?‘কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি।’ অকবিগণ বিষয়টা নিয়ে ভাবতে থাকেন। বেশি ভাবতে হয় না, সহজেই উত্তর পেয়ে যান। উত্তর পেয়ে নিজেদের ভেতর সম্ভ্রমের একটা দেয়াল খাড়া করেন; তবে খানিকের জন্য। পাকা ডালিমের মতো মেয়েটির স্ফীত বুকের দিকে তাকালে দেয়ালটিকে বেশিক্ষণ খাড়া করে রাখা যায় না, ঝড়ে পাওয়া গাছের মতো মুহূর্তে ধসে পড়ে। ধরে নেয়া যায়, তাদের বিয়ে হয়েছে অল্প ক-দিন আগে। হতে পারে দু-দিন, বড়জোর তিন দিন, কিংবা এক সপ্তাও হতে পারে। আমরা অনুমান করতে পারি, তারা এই শহরের ডাস্টবিনগুলোতে ঘুরে ঘুরে কাগজের ঠোঙা, আরসি-কোলা, মিনারেল ওয়াটার, রয়্যাল টাইগারের বোতল খোঁজে। সেসব বিক্রি করে রাতের খাবার জোগায়। আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত যে তারা ভিক্ষা করে না। কারণ, তাদের যে হালসুরত তাতে কেউ ভিক্ষা দেবে না তাদের। আমাদের কেউ কেউ মনে করেন, মেয়েটি সারারাত রমনাপার্কে, চন্দ্রিমা উদ্যানে, ফকিরের পুল বা কারওয়ান বাজারের আবাসিক হোটেলে কাটায়। কিন্তু তার গতর দেখে তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ রমনাপার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান বা আবাসিক হোটেলগুলোতে আমরা যেসব মেয়েকে দেখি, তারা এই মেয়েটির মতো অতটা সুশ্রী নয়। রাত গভীর হলে আমরা দেখি, তীব্র গরমের মধ্যে একটা কালি-ময়লা চাদর গায়ে জড়িয়ে তারা শুয়ে থাকে। চাদরটা খাটো। মাথা ঢাকলে পা উদোম, পা ঢাকলে মাথা। মশা-মাছিরা তাদের চারপাশে বেহালা বাজায়। তবু তারা বেঘোরে ঘুমায়, যান্ত্রিক কোনো শব্দও তাদের ঘুম নষ্ট করতে পারে না। কিন্তু গত দু-রাত দুজনকে ঘুমাতে দেখিনি আমরা, সারারাত এপাশ-ওপাশ করেছে কেবল। তারা হয়তো শরীরের আগুনটা নিভাতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা সেই সুযোগ দিইনি তাদের। শরীরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি নিয়ে তারা শুয়ে ছিল। আমরা দূর থেকে খেয়াল করেছি, মাঝরাতে ছেলেটি শোয়া থেকে উঠে মেয়েটির কানে কী যেন বলছে। কী বলছে, আমরা ঠিক বুঝতে পারি না। ধরে নেয়া যেতে পারে, ছেলেটি বলছে—এই শহর কি ঘুমাবে না? মেয়েটি ঘুমজড়ানো গলায় জবাব দেয়, কী জানি! তাহলে এভাবেই কাটবে আমাদের রাত? মেয়েটি শোয়া থেকে উঠে দু-পা ছড়িয়ে কফ-থুতু আর পানের পিকে ভরা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে। চোখ দুটি লাজরাঙা। একবার চারপাশে তাকায়। ভুরু কুঁচকিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ছেলেটির ঊরুতে মাথা রাখে। ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকায়। হঠাত্ গাড়ির হর্নের শব্দে ছেলেটি সরে বসে। চাপা গলায় বলে, দেখছ না মানুষে গিজগিজ করছে! শেষরাতেও রাস্তাটা যানবাহনশূন্য হয় না। রাস্তাটাকে খানিকের জন্যও বিশ্রাম নিতে দিই না আমরা। হয়তো রাস্তাটাও বিশ্রাম চায় না। এক মাঝরাতে আমরা দেখি, ছেলেটি ও মেয়েটি গভীর ঘুমে অচেতন। তারা আজ কিছুটা আগেভাগেই শুয়ে পড়েছে। দুজনের মাঝখানে ছোট একটা টুটাফাটা মলিন কাপড়ের বোঁচকা। রাস্তার হাজার হাজার গাড়ির শব্দ, ফুটপাতের শত শত জুতার শব্দেও তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না। গত দু-রাত জেগে থাকায় আজ বুঝি তারা দারুণ ক্লান্ত। আমরা খেয়াল করি, ঘুমের ঘোরে তারা একজন আরেকজনের কাঁধে, পিঠে, কখনো বুকে হাত রাখে। তবে তা খানিকের জন্য। একজন টের পেলে দ্রুত হাত সরিয়ে নেয় অথবা সরিয়ে দেয়। তারপর এক শেষরাতে আমরা দেখি, তারা শোয়া থেকে উঠে বসেছে। ছেলেটি বোঁচকা থেকে ফ্রেশ মিনারেল ওয়াটারের এক লিটারের একটা পুরোনো বোতল বের করল। ছিপি খুলে দুজনে কুলি করল। ভোরের নাশতা কলা-পাউরুটি তারা শেষরাতেই খেয়ে নিল। ভোর হওয়ার আগেই বুঝি কোথাও রওনা হবে তারা? খেয়েদেয়ে তারা চুপচাপ বসে থাকে, মাঝেমধ্যে আড়চোখে আমাদের দিকে তাকায়। তাদের চোখে কীসের যেন প্রতীক্ষা। কীসের প্রতীক্ষায় আছে তারা? নাহ, আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। খানিক পর দেখি, ছেলেটি জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে। দুজনের চোখেমুখে সেই আদিম আগুন। হঠাত্ একটা গাড়ি এসে পড়ায় তারা আবার আলাদা হয়ে বসল। গাড়ি চলে যায়, তারা জড়াজড়ি করে। গাড়ি আসে, তারা দূরে সরে বসে। এভাবে চলতে থাকে... চলতে থাকে...। শেষমেষ জড়াজড়ি বাদ দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে তারা। মেয়েটি মলিন ওড়নায় মুখ মোছে। মুখ নাকি চোখ, দূর থেকে ভালোভাবে ঠাওর করতে পারি না আমরা। ছেলেটির চোখে আগুন ঠিকরে পড়ছে। সে অবিরাম গজগজ করে। ছেলেটির দিকে তাকায় মেয়েটি। হয়তো কিছু একটা জিজ্ঞেস করে। ধরা যাক সে বলছে—চলো আমরা নির্জন কোথাও যাই। কোথায়? কাছেই তো রমনাপার্ক। এত রাতে ঢুকতে দিবে না। দিলেও পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে। কেন? রাতের রমনাপার্ক বড় ভয়ানক। মেয়েটি আর কিছু বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপলক ছুটন্ত যানবাহনের দিকে তাকিয়ে থাকে। খানিক পর ছেলেটির চোখে চোখ রেখে বলে, চলো আমরা গাবতলি ব্রিজের ওদিকে নদীর তীরে চলে যাই। লাভ নাই। নদীর তীর রমনাপার্কের চেয়েও ভয়ানক। এই শহরটাই তো দেখছি ভয়ানক। হ্যাঁ, তা-ই বলতে পারো। মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, তাহলে চলো আমরা গ্রামে চলে যাই। গ্রামে গিয়ে খাব কী? হোঁচট খায় মেয়েটি। দ্বিতীয় আর কোনো প্রশ্ন না করে ইটের শক্ত বিছানায় শুয়ে পড়ে। পাশে একটা লোক দাঁড়িয়ে ছরছর শব্দে পেশাব করে। ছটকা এসে পড়ে মেয়েটির গায়ে। ছেলেটি রাগতস্বরে বলে—এই মিয়া, চোখে মানুষ দেখেন না? লোকটি হেলতে দুলতে কড়ইগাছটার দিকে চলে যায়। গাছের তলায় গিয়ে একটা পুরোনো লুঙ্গি গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা দুজনকে দেখি কিছুটা পরিচ্ছন্ন অবস্থায়। তারা হয়তো গোসল করেছে আজ। কোথায় গোসল করল কে জানে! হয়তো গোসল করেনি। কারণ আমরা জানি, এই শহরে তারা গোসল করার অধিকার রাখে না। বড়জোর হাতমুখ ধুয়েছে। ছেলেটি বারবার মেয়েটির দিকে তাকায়। চোখে চোখ রেখে হাসে। বলে, তোমাকে আজ সিগন্যাল বাতির মতো লাগছে। সিগন্যাল বাতির মতো! হি হি হি...। বেশিক্ষণ এরকম লাগলে ভয় আছে। কেন? দেখ না লোকজন তোমার দিকে কেমন চোখে তাকায়! মেয়েটির চোখেমুখে অজানা ভয়ের ছাপ ফুটে ওঠে। চুপচাপ বসে থাকে। একমনে কী যেন ভাবে। তারপর সেই রাতের মতো তাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটি। কিন্তু রাস্তার ওপারে আমাদের একজন তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন বলে তাড়াতাড়ি ওরা সরে বসে। তারপর তারা আলাপ শুরু করে। কথার ফাঁকে তদের হাত একেকবার এদিক-ওদিক নড়েচড়ে। তারা বুঝি আমাদের উপর ক্ষেপে আছে। ধীরে ধীরে দুজনের চোখেমুখে আনন্দের ছাপ ফুটে উঠতে থাকে। আমরা যে যার স্থান থেকে তাদের দিকে তাকাই, তাকিয়ে থাকি। খেয়াল করি, আমরা যে তাদের দিকে তাকিয়ে আছি সেই পরোয়া নেই তাদের। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। চোখে চোখ, ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখি। কড়ইগাছটার তলায় লুঙ্গি গায়ে শুয়ে থাকা উদ্বাস্তু লোকটা তীব্র গরমে গা থেকে লুঙ্গিটা সরিয়ে ফেলে। দম্পতি শক্ত ইটের বিছানায় গড়াগড়ি খায়। আমাদের একজন বললেন—ছি! কী অসভ্যতা! দিনে দিনে সমাজটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! তারপর ছেলেটা কৃষক বাপের মতো লাঙলের ফলা ভেজা জমিনে বিদ্ধ করে। হু হু শব্দে চলে হালচাষ। আমরা যারা দাঁড়িয়ে, তারা সামনে বা পেছনে হাঁটা ধরি। যারা গাড়িতে বসে অন্যদিন মেয়েটির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন, তারা আজ একবার মাত্র তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলেন। ব্রিজের ওপর দাঁড়ানো পুলিশদের চোখও এখন অন্যদিকে। আমাদের এই পরিবর্তনে আমরা অবাক হই। চাষিপুত্র নিকারিকন্যার জলভরপুর বিলে আইড় কি রুই শিকারে মত্ত এখন। তাদের চোখে এখন এই আলোঝলমল শহর অন্ধকারে ঢাকা। আদিম আগুন বুকে নিয়ে, অগ্নিরথে সওয়ার হয়ে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সাঁতরে পার হচ্ছে প্রাচীনতর নদী। আমারা ভুলেও আর তাদের দিকে তাকাই না।