অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলেও হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের চিহ্নসমূহ এখন শুধু তাদের একার নয়; পর্যটকদেরও দেখার বিষয়। এই বিষয়টি নিজের চোখে দেখার জন্য ইয়ুন নান প্রদেশের রাজধানী শহর খুন মিং থেকে উত্তর-পূর্ব কোনাকুনি ৬০০ কিলোমিটার দূরের শহর শিশুয়াং পাননাতে আমরা এসে পড়ি।
‘শিশুয়াং পাননা’ চৈনিক শব্দ। এর মানে ‘বারো হাজার ধান ক্ষেত’। একসময় হয়তো এমনটিই ছিল এই অঞ্চলের অবস্থা। এখন অবশ্য সময় পাল্টেছে। দক্ষিণ সীমান্তে মিয়ানমার আর লাওসের সীমানার কাছাকাছি এই অঞ্চলটি বিখ্যাত অন্য কারণে। চীনের ৫৬টি নৃ-গোষ্ঠীর ১২টিরই বাস এখানে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আদিবাসীরা এই অঞ্চলে বসবাস করছেন তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে। এদের মধ্যে দাই-ই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
শিশুয়াং পাননার রাজধানী জিংহো, একটা ছোট্ট শহরতলি। প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ লোকের বাস। কম ঘনত্বের শহর বলেই হয়তো অনেক কম যানবাহনের চলাচল। পরিচ্ছন্ন এই শহরটাকে প্রথম দেখাতেই কেমন যেন খুব আপন বলে মনে হয়।
খুব ভোরেই রাস্তার পাশের খাবার হোটেলগুলোতে চীনাদের ভিড়।
ফুটপাতের ওপর বেঞ্চি বা টুল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সকালের নাশতা খাবার জন্য এরকম আয়োজনই পছন্দ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ফুটপাত-হোটেলের খদ্দেরদের দেখে মনে হলো, তারা কেউই নিজের ঘরে সকালের নাশতা বানান না। পরিবারের লোকজন সবাই মিলে এক সাথে নাশতা খেয়ে যে যার কাজে বেরিয়ে যান।
নাশতার মেনু হিসেবে এই নুডুলস স্যুপটাই তাদের বেশি প্রিয়। নুডুলস-এর সাথে মাংসও মেশানো থাকে। এর সাথে যে পানীয় অংশটুকু থাকে তা দিয়েই মিটে যায় পানির তৃষ্ণা। সকালের ঘরোয়া নাশতা হিসেবে এই নাশতাটাই তাদের প্রিয়।
দাই নৃ-গোষ্টির জনগণ অধ্যুষিত এই এলাকাকে একসময় বলা হতো বন্যপশুর রাজত্ব। হাতি ছিল এই অঞ্চলের প্রধান পশু। শিকার, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মালামাল পরিবহনে এই হাতির ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি। দাই জনগোষ্ঠী যেহেতু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই পশুটি তাদের কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়ও। সে কারণেই হয়তো রাস্তাঘাটে, বড় সড়কের মোড়ে, বিভিন্ন আকারের হাতি-মূর্তি এই শহরে দেখা যায়।
এই সব হাতি এই এলাকার মানুষের জীবন চারণের সাথে মিলেমিশে একাকার। কখনো এইসব হাতি এসেছে জীবনের সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে। জীবনে-মরণে-হাতি শিশুয়াং পাননাবাসীর একটা বড় অংশ দখল করে আছে। তারই বহিপ্রকাশ দেখা গেল তাদের এই সব উপস্থাপনার মাধ্যমে।
শহরের পাশেই জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় আর লেক মিলিয়ে সুন্দর একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলেছে চীনা সরকার।
দাই গ্রাম
আমাদের ট্যুরিস্ট গাড়িটি আঁকাবাঁকা পাহাড়ি খাড়া রাস্তা মাড়িয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে। দুদিকে সবুজ অরণ্য আর মাঝে পিচঢালা মসৃণ পথ। বাহ!
আমরা যে এলাকায় পৌঁছালাম এটা পাহাড়ের ওপরই একটা মসৃণ সমতল জায়গা। জমজমাট একটা বাজারের মতো। খানাপিনা হৈ-হুল্লোড় গান-বাজনা নিয়ে এলাহি কাণ্ড।
কোথাও ভাজা হচ্ছে মাছের কাবাব, আবার কোথাও বা পোড়ানো হচ্ছে মাংসের কাবাব। ভাজা পোড়া মাছ-মাংস চীনাদের খুব প্রিয়। পর্যটকদেরও। এখানকার রাঁধুনিদের কোনো ফুরসত্ নেই। সবাই বড় ব্যস্ত।
যেহেতু সাধারণ পানি চীনাদের খুব পছন্দের খাবার নয়, সে কারণে মূল খাবারের সাথে ফলের রসের এমন পানীয়র অনেক চাহিদা এখানে।
আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম, এটা একটা প্রায় স্থায়ী প্রদর্শনী মঞ্চ। একপাশে মঞ্চ, অপরপাশে বিশাল ছাউনির নিচে অনেকগুলো টেবিল-চেয়ার বিছানো। হাজারখানেক লোকের সংকুলান অনায়াসে হয়েছে এখানে।
বিশাল উন্মুক্ত খাবার জায়গা। ওপরে শুধু ছাউনি। চারদিকে কোনো বেড়া নেই। খাবার জায়গা ঘিরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের স্যুভিনিয়র শপ। এর এক দিকে সামান্য একটু ফাঁকা জায়গা তার ওপাশেই মঞ্চ। মঞ্চের লাল পর্দা এখনো ওঠেনি। মঞ্চের পর্দা উঠলেই শুরু হবে চীনা আদিবাসী সমপ্রদায়ের নৃত্যনাট্য।
আগত ভোজনরসিক পর্যটকেরা সবাই চীনা আদিবাসীদের কালচারাল শো-র দর্শক। এখানে খেতে খেতে উপভোগ করা যাবে তাদের অনুষ্ঠান। বাহ! আয়োজনটা চমত্কার।
১৯৫০ সালে সফল চীন বিপ্লবের পর থেকে চীনা সরকার তাদের সংখ্যালঘু আদিবাসী সমপ্রদায়ের উন্নতির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক নয়; সাংস্কৃতিক দিক থেকেও যাতে সংখ্যালঘু আদিবাসীরা বৈষম্যের শিকার না হয় বা তাদের সংস্কৃতি বিলীন না হয়ে যায়, তারই একটি বাস্তব প্রকল্প এটি। এতে যে শুধু তাদের সংস্কৃতিই বিকশিত হচ্ছে তা নয়, এ থেকে তারা অর্থনৈতিকভাবেও অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তার প্রমাণ এখানে অভ্যাগত পর্যটক। ঘরে বাইরে সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন।
ইয়ুন নান প্রদেশের আদিবাসীদের বাজানো যন্ত্র-সংগীতের তালে তালে একদল নট-নটি মঞ্চে প্রবেশ করে। তাদের ভাষার এক বর্ণও বুঝি না। কিন্তু কিছু শারীরিক ভাষা আছে সর্বজনীন। নাচের এই মুদ্রাটিও তেমন। এই নর্তকী তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহারে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের কাছে ময়ূরী বলেই মূর্ত হয়ে যান।
হ্যাঁ এটিই ময়ূর নৃত্য। এই নাচটি দাই সমপ্রদায়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাচ। জনপ্রিয় হওয়ার অনেক কারণ। মূল যে নাচিয়ে থাকে তার পোশাকটি হয় আকর্ষণীয়। পেখম মেলা ময়ূরের আদলে যেহেতু পোশাকটি তৈরি করা হয় সে কারণে সাবলীলভাবেই নাচিয়ে তার গতিবিধি পরিবর্তন করতে পারেন। পেখম মেলা ময়ূরের পোশাকের মধ্যে যে মানবী থাকে, তাকেও অনেক জীবন্ত মনে হয়। তাই বনের ময়ূর কখন যে মঞ্চে এসে মানবীর রূপ ধরেছে হঠাত্ করে তাকে আর আলাদা করা যায় না।
দাই সমপ্রদায়ের কাছে ময়ূর অনেক পূজনীয়। এই সমপ্রদায়ের লোকজন মনে করে, ময়ূর হলো সুন্দর ভবিষ্যত্, সুখ, সৌন্দর্য আর দয়ার প্রতীক। সে কারণেই তারা কোন অনুষ্ঠানে শুরুতে এই ময়ূর নাচটিই পরিবেশন করে।
একে একে একদলের পর আরেকদল শিল্পী আসেন। প্রতিটি গানের সাথে, নাচের সাথে, তাদের কোনো না কোনো উপকথার কাহিনি লুকানো।
এক রাজকুমারী বনের মাঝে এসে আসন বিছিয়ে বসেছেন। এক বাদক তার বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রাজকুমারীর মন জয় করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রাজকন্যা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তাই সে তার আসন সরিয়ে নিয়ে তার অপছন্দের বার্তাটি জানিয়ে দেয়। এভাবে অনেক বাদ্যযন্ত্রী আসে। কেউ আসে ব্যঞ্জ নিয়ে তো কেউ আসে একতারা নিয়ে, আবার কেউ আসে বিন নিয়ে, কেউবা বেহালা। সবাই যখন বিফল তখন রাজকুমারী নিজেই তার কোমর থেকে একটা কচি পাতা বের করে বাজাতে শুরু করে। পাতার বাঁশির সুরে সবাই বিমোহিত। এবার আগত বাদ্যযন্ত্রীরা সবাই এক-একটি গাছের পাতা ছিঁড়ে সেটি বাজাতে শুরু করে। অবশেষে একজন একটি আস্ত কলাপাতাই বাজাতে শুরু করে দেয় তবুও কেউই রাজকুমারীর মন জয় করতে পারে না।
এরপরে বাঁশ নৃত্য। এটি আমাদের দেশের আদিবাসীদের বাঁশ নৃত্যের একটু সাজানো গোছানো ভার্সনই মনে হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বম আদিবাসী গোষ্ঠী এ ধরনের বাঁশের খেলা খেলে থাকে। চীনাদের এই গোষ্ঠীর সাথে আকৃতি ও প্রকৃতিতে তাদের যথেষ্ট মিল।
এবার শুরু হয় মৃদঙ্গ নৃত্য। মৃদঙ্গ নৃত্য দাই সমপ্রদায়ের একটি বিশেষ নৃত্য। এই নৃত্যটি আসলে পুরুষ প্রধান নাচ। একদল পুরুষ হাতির পায়ের আদলের মৃদঙ্গ নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে মৃদঙ্গ বাজাতে থাকবে তার তালে তালে একদল তরুণী ছাতা ঘোরাতে ঘোরাতে এসে নৃত্য শুরু করবে।
এই মৃদঙ্গও দাই সমপ্রদায়ের কাছে প্রতীকী অর্থে ব্যবহূত। জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি পরিবেশে হাতির সাথে বসবাস তাদের জন্মজন্মান্তরের। কখনো শত্রুতা কখনো বা মিত্রতা। হাতি তাড়ানোর একটি কৌশল—মৃদঙ্গ বাজানো। সেই কৌশলের জায়গা থেকেই এসেছে এই বাদ্যযন্ত্রটি।
আদিবাসী সমপ্রদায়ের এইসব পরিবেশনা দেখে বিমোহিত দর্শকেরা।
বেলা সাড়ে বারোটায় মধ্যাহ্নভোজের বিরতি।
বিরতির পর আবার শুরু হয় অনুষ্ঠান। এই পর্যটন জনপদটি সাজানো হচ্ছে চীনের দাই সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নিয়ে। আর একাজটি করার জন্য তারা শরণাপন্ন হয়েছেন তাদের প্রাগৈতিহাসিক যুগের পুরাণ এবং উপকথাগুলোর। চীনা পুরাণের ড্রাগন নামক এই ঐশ্বরিক জন্তুটিকেও ব্যবহার করা হয়েছে যত্নের সাথে।
এই চত্বর থেকে বেরোবার রাস্তায় কতগুলো অদ্ভুত প্রকৃতির ভাষ্কর্য। কোথাও ডিম থেকে বেরিয়ে এসেছে শিশু, কোথাও চার মাথার এক প্রাণী। প্রাণীটির চারদিকে বাঘ, সিংহ, গরু আর হাতির মাথা। আর তার পাশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে স্বর্গীয় এক ঝরনাধারা। এ যেন কাল থেকে কালান্তরে যাবার চেষ্টা। এই দাই গ্রামে বেড়াতে এসে দাই সম্প্রদায়ের কিছু স্মৃতি নিয়ে যাবেন—এমন চিন্তা যদি কেউ করে থাকেন, তার জন্য আছে এই সুভ্যেনির শপ।
দাই রাজের বাড়ি
এ এলাকার শহরাঞ্চলটি খুব ছিমছাম, সাদামাটা। দাই সম্প্রদায়ের মানুষজনের ঘরবাড়ি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে নাগরিক ছোঁয়া বেশি। খবর পেলাম, অনেক পুরোনো দাই রাজতন্ত্রের একটা রাজবাড়ি আছে ল্যাংচান নদীর ওপারে। আমরা ছুটে চলি সে রাজবাড়ি আর রাজ জাদুঘর দেখতে।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই ল্যাংচান নদীর পারে। সুন্দর ছিমছাম রোপওয়ে স্টেশন। এর ভাড়া জনপ্রতি ৫ ইউয়ান। বাংলাদেশি টাকায় ৫০ টাকা টিকেট কেটে আমরা চেপে বসি ক্যাবল কারে। নিচে বয়ে চলে ল্যাংচান নদী। এই নদীর একটি আর্ন্তজাতীক নাম আছে। মেকং নদী। ভিয়েতনামেও এই নদীর একটা অংশের দেখা পেয়েছিলাম এর আগে।
মেকং চীনের কিংহাই প্রদেশের ট্যাংগুলাশান পাহাড়ে উত্পন্ন হয়ে চীনসহ আরও পাঁচটি দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভিয়েতনামের মেকং ডেলটাতে গিয়ে মিশেছে। সে কারণে এই ল্যাংচান আন্তর্জাতিক নদী। প্রায় ৪৮৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী প্রায় ২০০০ হাজার বছর ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসায়িক করিডোর হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে।
ল্যাংচান নদীর ওপারে অল্প দূরত্বে হাঁটাপথেই দাই সম্প্রদায়ের জাদুঘর। কিন্তু এই হাঁটাপথটাকে আর হাঁটাপথ রাখেনি চীনা পর্যটন কর্তৃপক্ষ। এটিকে একটি বাগান বানিয়ে রেখেছেন তাঁরা। দাই বাগান।
এলাকাটা পাহাড়ি। পাহাড়ি চড়াই পথ বেয়ে ওপরে উঠতে হবে দাই সম্পদায়ের জাদুঘরটি দেখার জন্য।
এই দাই রাজবাড়ি দেখানোর জন্য আমাদের গাইড হয়েছেন এক দাই তরুণী। মেয়েটির পোশাক, মাথার ফুল, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ সবকিছুরই বৈশিষ্ট্য আছে। কোনো দাই তরুণী যদি তার মাথার খোঁপার ডান দিকে ফুলগুঁজে রাখে তাহলে বুঝতে হবে, সে তার কোনো প্রিয় মানুষকে দেখানোর জন্য এ ফুলটি গুঁজে রেখেছে আর সে যদি খোঁপার বাম দিকে ফুলটি গুঁজে রাখে তাহলে বুঝতে হবে সে কুকুরকে দেখানোর জন্য খোঁপায় ফুল গুঁজেছে।
কোনো দাই তরুণীর কোমরে যদি চাবির গোছা থাকে তাহলে বুঝতে হবে সে বিবাহিত। সংসারের কর্ত্রী যেহেতু রমণীরাই, সুতরাং চাবির গোছা থাকবে ঘরের কর্ত্রীরই কোমরে, এটাই স্বাভাবিক।
দাই সম্প্রদায় তাদের ছেলে-মেয়েদের খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের রীতিনীতিতে অভ্যস্ত করে তোলে।
তিন-চার বছর বয়স থেকেই তারা শিখে যায় কীভাবে তারা বড়দের সন্মান করবে।
তারা মাথা ঝুঁকে দুই হাত করজোড় করে বুকের কাছে নিয়ে যায়। এটা হচ্ছে প্রতীকী অর্থে তারা তাদের হূদয়কে দুই হাতের মধ্যে নিয়ে তাদের অতিথি বা বড়দের সন্মান জানাচ্ছে।
দাই সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিয়ে করতে হলে ছেলেদের অনেক কষ্ট করতে হয়।
দাই সম্প্রদায়ের কোনো যুবতী যখন বিয়ের উপযুক্ত হয় তখন সে একটি নির্জন স্থানে গিয়ে পাতার বাঁশি বাজায়। সে বাঁশি শুনে ছেলেরা এসে তার পাশে বসে। যদি ছেলেটিকে তার পছন্দ না হয় তখন সে বাঁশি বাজানো বন্ধ করে দেয়। আর যদি তার পছন্দ হয় তখন সে বাঁশি বাজাতেই থাকে। তখন ছেলেটি তার অভিভাবকদের মাধ্যমে মেয়েটির পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। মেয়েটির পরিবার যদি রাজি হয় তখন ছেলেটিকে পাঠানো হয় মেয়ের পরিবারে দুই বছরের জন্য, দুই বছর তাকে কাজের ছেলের ভূমিকায় থাকতে হবে হবু শ্বশুর বাড়িতে। পশুপাখি লালন-পালন, ক্ষেতে খামারে সাহায্য করা, এসব কাজ তার। ছেলেটি যদি এই দুই বছর অপেক্ষা করতে না পারে অথবা কাজ করতে না চায় তখন সে একটি সুপারি গাছের মাথায় উঠে ক্ষমা ভিক্ষা করবে। তখন হয়তো মেয়েটি তাকে ক্ষমা করে দেবে। আর ছেলেটি যদি সুপারি গাছের মাথায় না উঠতে পারে তখন ছেলেটিকে এই বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।
আমরা পৌঁছে যাই দাই সম্প্রদায়ের জাদুঘরের সামনে। একসময় এই জাদুঘরটি দাই সম্প্রদায়ের রাজবাড়ি ছিল।
যদিও পুরো এলাকাটাই পাহাড়ি তারপরেও একটি উঁচু টিলার ওপরে জাদুঘরটির অবস্থান। রাজা-বাদশাহরা সব সময়ই উঁচু টিলা বা পাহাড়ের ওপরই তাদের প্রাসাদ বা দুর্গ বানাতেন। এখানেও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কয়েকটি সিঁড়ি মাড়িয়েই তবে মূল জাদুঘরটিতে ঢুকতে হবে।
জাদুঘরটিতে ওঠার সিঁড়ির রেলিংটা পাহারা দিয়ে আছে বেশ বড়সড় দুটি ড্রাগন। ড্রাগন হলো রাজার প্রতীক। ড্রাগন তাদের শৌর্য্য বীর্জ এবং সৌভাগ্যের প্রতীকও। জাদুঘরটির ওপরে একটি সাইনবোর্ড ‘মিংলি মিউজিয়াম’। মিং অর্থ বড় লি অর্থ জায়গা। যেহেতু এটি রাজপ্রাসাদ ছিল সেহেতু নিঃসন্দেহে এটি বড় জায়গা। সে কারণেই এর নামকরণটি এরকম।
জাদুঘরটিতে ঢুকতেই এক দিকের দেয়ালে বড় একটি দেয়ালচিত্র। দেয়ালচিত্রটিতে দাই রাজার শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
দাই সম্প্রদায়ের কোনো ফ্যামিলি টাইটেল নেই। সে কারণে দাই রাজাদের কোনো টাইটেলও পাওয়া যায় না। দেয়ালচিত্রের ছবিতে যে রাজার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সে রাজার নাম চৌ থিয়া লিন মানে বড় জায়গার রাজা।
দাই রাজাদের শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। প্রথমে একজন কবিরাজ পাহাড়ে গিয়ে বিভিন্ন রকম ঔষধ সংগ্রহ করেন। তারপর বিভিন্ন নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে এই পানিকে সংগৃহীত ঔষধগুলো দিয়ে জীবাণুমুক্ত করেন। রাজা এই পানি দিয়ে গোসল করেন। কিন্তু গোসলের আগে রাজা গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বৃদ্ধের কাছ থেকে গৌতম বুদ্ধের কিছু বাণী শোনেন। গোসল শেষে সত্তুরোর্ধ্ব বয়স্ক একজন প্রজা সকল প্রজার পক্ষ থেকে রাজাকে শুভেচ্ছাপত্র পাঠ করে শোনান। এরপরে রাজা বেইজিং থেকে আসা মহাচীনের রাজার একজন প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের পাঠানো রাষ্ট্রদূতদের প্রতিনিধিদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এ সময় এ সকল রাষ্ট্রদূতেরা তাঁকে শপথ গ্রহণের অনুমতি দেন। শপথ গ্রহণের অনুমতি পাওয়ার পরে দাই সম্প্রদায়ের একজন বৌদ্ধধর্মীয় নাগরিক রাজাকে শপথ বাক্য পাঠ করান।
সব শেষে কেন্দ্র থেকে আসা কেন্দ্র সরকারের একজন মন্ত্রী রাজার হাতে একটি সিল তুলে দেন। তিনি যে এ এলাকার শাসক—এই সিলটি তারই প্রতীক।
রাজার শপথ গ্রহণ চিত্রের পাশেই একটি সাদা কাপড়। কাপড়ের ওপরে একটি ফিনিক্স আঁকা। ফিনিক্স হলো রানির প্রতীক। সাদা কাপড়ের ওপরে ফিনিক্স অঙ্কিত এই প্রতীকটিই হলো দাই সম্প্রদায়ের পতাকা। রাজা যেখানে যান সেখানে সবার আগে একজন পতাকাবাহী থাকেন, যার হাতে থাকে এই পতাকাটি।
এর পাশের শোকেসটিতে রাজাদের পোশাক-আশাক সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
দাই সম্প্রদায়ের এই জাদুঘরের পাশেই আছে আরেকটি উপস্থাপনা। আমরা হাঁটতে থাকি এই উপস্থাপনা দেখতে। পর্যটকেরা যাতে দাই সম্প্রদায়ের জীবন-যাপন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেতে পারেন, সে কারণে সনাতন পদ্ধতিতে বানানো দাই সম্প্রদায়ের একটি বাড়িকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে।
দাই সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়িগুলো হয় এরকম মাচার ওপরে। মাচার নিচের দিকটা ফাঁকা রাখা হয়। নিচের এই ফাঁকা জায়গাটা গৃহপালিত পশুপাখিদের জন্য। দাই সম্প্রদায় বিশ্বাস করে, এইসব পশুপাখি তাদের অনেক উপকার করে। এইসব পশুপাখি তাদের জীবনধারনকে অনেক সহজ করেছে।
বাড়ির ওপরের ধাপে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি। এই সিঁড়িটি একটি পাটাতনের ওপরে। এই পাটতনটি কচ্ছপের প্রতীক। দাই সম্প্রদায় মনে করে কচ্ছপ ভারবাহী প্রাণী। সে কারণেই তারা এই পরিবারের ভারটি এই কচ্ছপের ওপরে দিয়েছে। এবং এই কচ্ছপ তাদের পরিবারের সকল ভার বহনের জন্য উপযুক্ত।
আর এই সিঁড়িটাকে তারা মনে করে ড্রাগন। ড্রাগন হলো শৌর্য-বীর্জ আর সৌভাগ্যের প্রতীক। এই সিঁড়ি দিয়ে যখন তারা ওঠে তখন তারা মনে করে, তারা সৌভাগ্যের শিখরে উঠছে।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই প্রথমে একটি মোটা কাঠের খাম্বা। এই খাম্বাটিতে ঘোড়া বেঁধে রাখা হয়। আর নিচের দিকের মাচার খাম্বাগুলো কুকুর এবং শুকর জাতীয় পশু বাঁধার জন্য।
আর ওপরের দিকে আরেকটি মোটা কাঠের খাম্বা। এটি এই পরিবারের জামাইয়ের জন্য। দাই সম্প্রদায়ের ছেলেরা বিয়ের পরে কনের বাড়িতেই থাকে। সে কারণে কোনো কারণে যদি ছেলের মন খারাপ হয় অথবা তার বাবা-মাকে দেখতে মন চায় তখন সে মন খারাপ করে এই কাঠের খাম্বার কাছে বসে থাকে। তখন তার শাশুড়ি বুঝতে পারে ছেলেটি হয়তো বাবা-মাকে দেখার জন্য মায়ের বাড়িতে যেতে চায়। তখন তিনি কিছুদিনের জন্য তার জামাতাকে ছেড়ে দেন মায়ের বাড়িতে নাইওর যাওয়ার জন্য।
পাহাড়ের ঢালুতে যখন একটি দাই গ্রাম গড়ে ওঠে, তখন সব সময় গ্রামটি গড়ে ওঠে একটি পাহাড়ি ঝরনার পাশে। পানির উত্সকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি গ্রাম। কারণ পাহাড়ে জীবন ধারনের জন্য সবকিছুই সহজপ্রাপ্য, শুধু পানি ছাড়া। পাহাড়ে পানির একমাত্র উত্স পাহাড়ি ঝরনা। এখানেও একটি কৃত্রিম ঝরনা বানিয়ে রাখা হয়েছে আগত পর্যটকদের জন্য।
ঝরনার এই পানি পাহাড়ের উপরে উঠিয়ে নেবার জন্য তাদের একটা নিজস্ব পদ্ধতি ছিলো। হাইড্রোলিকস-এর এই পদ্ধতিটি এখনকার দাইবাসীর কাছে শুধুই ইতিহাস, আর অনুসন্ধানী পর্যটকের কৌতূহল নিবৃতির উপকরণ হয়ে এখন এই জাদুঘরে।
এই দাই রাজবাড়ির পাশেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে এই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক অনেক সাংস্কৃতিক আয়োজন। আমরা তা দেখার জন্য ধীরে ধীরে উঁচু সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকি।
দাইদের বর্ষবরণ
দাই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক বাড়িঘর দেখা শেষ করে একটু এগোলেই একটি বেশ বড়সড় খোলা চত্বর। এখানেও আছে বেশকিছু আয়োজন। এখানেই পর্যটকদের দেখানো হয় দাই সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
পাহাড়ের চূড়ায় কয়েকটি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলেই বেশ বড়সড় এই খোলা চত্বর। এই চত্বরে দাঁড়ালেই একটি মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ে। এটি একটি প্রাচীন মন্দির। ম্যাংগা বৌদ্ধমন্দির।
চন্দ্রবত্সরের প্রথমদিনটিতে দাইদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি হয়ে থাকে। ইংরেজি ১২ থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে পড়ে দিনটি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৪ এপ্রিল হয় বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠানটি।
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের দিনের শুরুতেই নতুন পোশাক পরে আদিবাসী নারী-পুরুষেরা মন্দিরে আসেন প্রার্থনা করতে। হাতে মঙ্গলদীপ জ্বেলে এভাবেই তারা মন্দিরটি প্রদক্ষিণ করেন। তারপর মঙ্গলদীপটি মাটিতে পুঁতে সেখানে পানি দেন। এরপর শুরু হয় মঙ্গলবারতা আওড়ানোর পালা।
ম্যাংগাও মন্দিরের বিশেষত্ব হলো অন্ধকার। এখানে একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে গৌতম বুদ্ধের একটি ছোট্ট মূর্তি রাখা আছে, দিনের বেলার উজ্জ্বল আলোতেও মূর্তিটির অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। সে কারণেই এই মন্দিরে এতবেশি আলোকের অবতারণা। মূর্তি প্রকোষ্ঠের দুদিকে ছোট দুটি হাতির মূর্তি বসিয়ে রাখা হয়েছে প্রহরায়।
বর্ষবরণের দিনটি ছাড়াও মার্চ মাসের ৬ষ্ঠ দিন আর জুলাই মাসের ৭ম দিনটিতে এই এলাকার দাই এবং আইনি সম্প্রদায়ের নারীপুরুষ একত্রিত হন এই মন্দির প্রাঙ্গণে। পুরুষেরা একটি শুকরের মাথা এনে সেটি উত্সর্গ করেন এখানে। কয়েকটি মোরগ মুক্ত করে দেন এই প্রাঙ্গণে এবং যে যার সামর্থ্য মতো টাকা-পয়সা রেখে যান এই মন্দিরে।
এ কারণেই আমরা দেখি যে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের অভিনয় দেখতে যেসব পর্যটক এসেছেন তারাও কিছু কিছু অর্থ রেখে যাচ্ছেন লাল কাপড়ে মোড়া কষ্টি পাথরের তৈরি ছোট্ট বুদ্ধমূর্তির সামনে।
মন্দিরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা ফিরে আসি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে।
বর্ষবরণের দিনে মন্দির থেকে ফিরে এসে পুরো দাই সম্প্রদায় মেতে ওঠে বিভিন্ন রকম গান-বাজনায়। এখানে এই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের একদিকে একটি মঞ্চ।
এই অঞ্চলেই হয়ে থাকে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। মূল অনুষ্ঠান দেখার জন্য বছরের এই নির্দিষ্ট দিনে সকল পর্যটকের অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। সে কারণে, বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই স্থানীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ এমন আয়োজন রেখে দিয়েছেন।
আমরাও যোগ দিই মেকি এই বর্ষবরণ উত্সবের আয়োজনে।
বর্ষবরণের দিনে দাই গ্রামে যুবক-যুবতীরা মেতে ওঠেন বিভিন্ন ধরনের আতসবাজিতে। কিন্তু এই আতসবাজিটি একেবারেই তাদের ঐতিহ্যিক। পর্যটকেরা চাইলে এরকম একটি আতসবাজি নিজের হাতে আকাশে উড়িয়ে দিতে পারেন।
খোলা এ প্রাঙ্গণটিতে বেশ কয়েকটি বড় বড় পানির পাত্র। আর পানির বড় পাত্রটির মধ্যে ছোট ছোট স্টিলের পাত্র পানির মধ্যে ভাসছে। এসবই জলকেলি উত্সবের আয়োজন। দাইদের বর্ষবরণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি এই জলকেলি। এই জলকেলি উত্সবকে নিয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উপকথা প্রচলিত আছে।
কোন একসময়ে এই দাই রাজ্যে এক অশুভ রাজার আগমন ঘটে। সে পুরো রাজ্য থেকে বেছে বেছে সাত জন সুন্দরী দাই রমণীকে বিয়ে করে। এরপর সে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই এই অশুভ রাজাকে বধ করা যাচ্ছে না। কারণ এ অশুভ রাজা অমর। কোনোভাবেই এ রাজার মৃত্যু হবে না। কোনো এক রাতে এই সাত রানি রাজাকে সুরা সাকি আর নাচে গানে এতই মশগুল করে ফেলেন যে রাজার মন খুলে যায়। রাজা প্রকাশ করেন তার গুপ্ত কথা। রাজার গলায় এক চুল পরিমাণ একটি গোলাকার জায়গা আছে, যেখানে চুল দিয়ে পেঁচিয়ে টান দিলেই তার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাবে।
এই সাত রানি সুযোগ খুঁজতে থাকে। কোনো এক রজনীতে সে সুযোগ এসেও যায়। রাজা যখন সুরার নেশায় বুদ, রানিরা একটি চুল খুব সাবধানে রাজার গলায় পেঁচিয়ে একটা টান দেয়। সাথে সাথে রাজার গলা দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়। রাজার বিচ্ছিন্ন মস্তক একটি গোলাকার অগ্নিপিণ্ডে রূপ নিয়ে চরকার মতো ঘুরতে থাকে। আশপাশে সবকিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে থাকে। সাত রানি নিজেদের উত্সর্গ করেন এই অগ্নিপিণ্ডকে নিয়ন্ত্রণের জন্য। তারা পালাক্রমে ঘূর্ণায়মান অগ্নিপিণ্ডটিকে তাদের বুকে চেপে ধরে রাখেন। যখন রানিরা পালাক্রমে এই ঘূর্ণায়মান অগ্নিপিণ্ডকে ঝাপটে ধরে তখন দাই জনগণ চারদিক থেকে রানিদের দিকে পানি ছুড়তে থাকেন। একসময় ঘুরন্ত অগ্নিপিণ্ড ভষ্মে পরিণত হয়। সেই সাথে সাত রানিও পুড়ে ছাইয়ে পরিণত হন। সেই সাত রানির আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য দাই সম্প্রদায় এমন জলকেলিতে মেতে ওঠেন।
এই জল উত্সব শুধু দাই সম্প্রদায়েরই প্রধান উত্সব নয়; আরও কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়েরও প্রধান উত্সব এই জল উত্সব। থাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং বাংলাদেশের মারমা উপজাতীর বর্ষবরণে প্রধান আয়োজন থাকে এই জল উত্সব। বাংলাদেশে এই জল উত্সবের আয়োজনটাও এখন সাজানো খেলার মতো হয়ে গেছে, চীনাদের কাছে এখনো এটা আনন্দের খেলা। দাইদের এই জল উত্সবের আয়োজনে দেখি, এলাকার সমস্ত নারী-পুরুষ যুবক-যুবতী সবাই একস্থানে মিলিত হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুবক-যুবতীরা তাদের জীবনসঙ্গীকে এখান থেকেই নির্বাচন করে থাকে।
জল উত্সবে যারা যোগ দেবে, সবার হাতেই থাকে পানির পাত্র। পাত্রের মধ্যে পানিতে চোবানো ফুল আর পাতা থাকে। একদল দাঁড়িয়ে থাকে অন্যদল তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। হেঁটে যাওয়ার সময় উভয় উভয়কে ফুল দিয়ে পানির ছিটা দিয়ে দেন শরীরে। এটা যেন বা অনেকটা জড়তা কাটানোর মহড়া।
ফুলের পানি ছিটিয়ে জড়তা কাটানোর পালা শেষ এবার সবাই মিলে বৃত্তাকারে নাচতে থাকে দল বেঁধে। এ নাচেরও কিছু নির্দিষ্ট তাল লয় আছে। নাচ চলতে চলতেই এক সময় শুরু হয়ে যায় জল ছোড়াছুড়ি।
বর্ষবরণ উত্সবে যে জলকেলি হয় সেখানে সাধারণত ছেলেদের একটা দল থাকে আর মেয়েদের একটা দল থাকে। এখন এ প্রাঙ্গণে যে জলকেলি শুরু হয়েছে তার হিসাবটা অন্যরকম। এখানে স্থানীয় আয়োজকরা এক দলে, আর পর্যটকেরা অন্য দলে।
চলতে থাকে জল ছোড়াছুড়ি। একদল ছুটে গিয়ে অন্যদলের কোর্টে গিয়ে পানি ছুড়ে আবার ফিরে আসছে।
কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখা গেল, দুদলই খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা একটি বড় পানির পাত্রকে ঘিরে পাগলের মতো একে অপরকে পানির ছিটা দিচ্ছে। একসময় হাঁফিয়ে ওঠে দুদলই। তারা রণে ভঙ্গ দেয়।
আমরাও পাহাড়ি পথের সিঁড়ি মাড়িয়ে নিচের দিকে নামতে থাকি।
মানদাও কুমারপাড়া
ভোরের আলোতে এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি গ্রামটি। লিনচাং নদীর ওপারে যে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে, আদিতে হয়তো ওই সব পাহাড়ের যেকোনো একটিতে বাস ছিল এই মানুষগুলোর। পশু শিকার আর কৃষিকাজই ছিল তাদের জীবিকা। জঙ্গলের গাছ-গাছড়া আর অলৌকিক কোনো শক্তির প্রতি বিশ্বাসই ছিল তাদের চিকিত্সা। কিন্তু কালের আবর্তে আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে তারা নেমে এসেছে এরকম একটি এলাকায়।
সরু রাস্তা। রাস্তার দু-পাশে ছড়ানো ছিটানো ঘরবাড়ি। কিন্তু এলাকাটা পরিষ্কার। রাস্তায় লোকজনের চলাচল খুব একটা চোখে পড়ে না। যে মানুষগুলো এখানে বাস করছে তারা যখন পাহাড় থেকে নেমে এসেছে তখন হয়তো পাহাড়েই ফেলে রেখে এসেছে তাদের ঐতিহ্যিক পোশাকও। এমনও হতে পারে যে, তাদের ঐতিহ্যিক পোশাকটি বানাবার উপাদান এই আধাখেচড়া শহর এলাকায় পাওয়া যায় না। অথবা তাদের পোশাক শহুরে এই পোশাকের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে শহুরে পোশাক জায়গা করে নিলেও প্রৌঢ়দের মধ্যে এখনো তাদের ঐতিহ্যিক পোশাক তার জায়গা ধরে রেখেছে ঠিকই।
তাদের জীবন যাপনেও এসেছে অনেকটা মফস্বল শহরের ছাপ। বাড়ির সাথেই তারা খুলে বসেছে মুদি দোকান। আর এসব দোকানের র্যাক দখল করেছে কোক স্প্রাইটের মতো পণ্য।
কোক স্প্রাইটের মতো পন্যগুলো তাদের দোকানের র্যাক দখল করলেও তাদের প্রাত্যাহিক জীবনাচার কিন্তু এখনো দখল করতে পারেনি পাশ্চাত্য কালচার। এক বাড়ির জানালা দিয়ে দেখে ফেলি সে দৃশ্য।
স্বামী-স্ত্রী সামনা সামনি বসে সকালের খাবার খাচ্ছেন। খাবারগুলো সবই তাদের ঐতিহ্যিক। খাচ্ছেনও চপস্টিক দিয়ে। কিন্তু পরিবেশনের পাত্রে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। সেখানে মাটির পাত্রের পরিবর্তে চিনামাটির পাত্র জায়গাটা দখল করেছে।
যেখানেই দাই সম্প্রদায়ের বসতি গড়ে ওঠে সেখাইে প্রথমে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। সেই মন্দিরকে ঘিরেই আস্তে আস্তে বসতিটা বিস্তার লাভ করে। এখানেও এই মানদাও গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটি বৌদ্ধমন্দির আছে। এই মন্দিরে এসে গ্রামের সবাই মিলিত হন। দাই সম্প্রদায় বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী। অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দির থেকে দাইদের মন্দির একটু আলাদা। অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দিরে যেখানে গৌতম বুদ্ধের বিভিন্ন মূর্তি এবং দেয়ালচিত্র থাকে সেখানে দাই সম্প্রদায়ের মন্দিরগুলোতে থাকে তাদের জীবনাচারের চিত্র।
মানদাও গ্রামের অধিবাসীদের জীবন যাপনের মধ্যে তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। মোড়ে মোড়ে অথবা রাস্তার পাশের খাবারের দোকানে আড্ডা দিয়েই তারা তাদের অলস সময়টুকু কাটায়।
দাই গ্রামের মানুষগুলো কেমন করে তাদের জীবনটাকে যাপন করছে সেটা দেখার জন্য একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ি।
দোতলা এই বাড়িটিতে ঢুকেই মনে হলো, একান্ত গৃহস্থ বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।
এই পরিবারের আয়ের প্রধান উত্স কৃষি। কিন্তু তাদের পরিবারের অন্দরমহলে ঢুকেই আমাদের দেশের একটি কৃষকপরিবারের সাথে মেলাতে মন চায় না।
দাই সম্প্রদায়ের আদি ঘরবাড়ি যে ধরনের হতো, এর স্থাপত্যিক গড়নটা অনেকটা সেরকমই। আদিতে দাই সম্প্রদায় তাদের বাড়ি বানাত কাঠের খাম্বা বা বাঁশের মাচার ওপরে। বাড়ির নিচে খোলা বড়সড় একটি পরিসর থাকত। পাহাড়ি ঢল সহজে নেমে যাবে—এমন কারণে এরকম ফাঁকা জায়গা তারা ঘরের নিচে রেখে দিত। আর বর্ষার মৌসুম ছাড়া এই জায়গাটুকু ব্যবহার হতো গৃহপালিত পশুপাখির জন্য। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, এইসব গৃহপালিত পশুপাখি তাদের জীবনধারনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু এ গ্রামটি সেরকম পাহাড়ি কোনো এলাকা নয়। তারপরও এখানে তারা নিচের তলাতে একটি বড়সড় খোলা পরিসর রেখে দিয়েছে। এই খোলা পরিসরে অবশ্য তারা গৃহপালিত পশুপাখি রাখে না। কিন্তু তাদের ছোটখাটো ঘরকন্যার কাজটা তারা এই খোলা জায়গাতেই বসে সেরে ফেলেন। ফসলের মৌসুমে তাদের উত্পাদিত ফসলও এই জায়গাতেই রাখেন। আর যখন কিছুই থাকে না তখন অলস সময় কাটানোর জন্য কয়েকজন মিলে তাস খেলতেও বসে যান এ জায়গাটাতে।
খোলা এই জায়গাটার পাশ দিয়েই উঠে গেছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। ঠিক তাদের ঐতিহ্যিক বাড়িগুলোতে যেমনটা থাকে সেরকমই। ওপরে উঠেই আবার একটি খোলা পরিসর। এখানে এখন তারা ডাইনিং টেবিল পেতেছে। কিন্তু তাদের ঐতিহ্যিক বাড়িগুলোতে তারা এই জায়গাতেই তাদের ঘরকন্যার ছোটখাটো কাজ সারতেন আর এর সাথে লাগানো বারান্দাতে ফসল শুকাতেন এবং ফসল রাখতেন।
এখন এগুলো হয়েছে ডাইনিং আর লিভিং স্পেস। তাদের ঐতিহ্যিক বাঁশ-বেতের আসবাবের পরিবর্তে দখল করছে প্লাইউড আর প্লাস্টিকের আসবাব।
জীবনকে আরামদায়ক করতে ব্যবহার বেড়েছে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর। যার কারণে প্রতিটি বাড়িতেই ফ্রিজ, ওভেন, এসির মতো ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য এখন দাই সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীদের কাছে ডাল-ভাতের মতো।
মানদাও গ্রামে দাই সম্প্রদায়দের শোবার ঘরে বিভিন্ন নামীদামি আসবাব আর ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ঢুকলেও তাদের শোবার ব্যবস্থাটা আগের মতোই আছে।
দাই সম্প্রদায়ের শোবার ঘরটি হয় একটি বড় হলঘরের মতো। কোন ঘরে কে বা কারা শোবেন, তাও নির্ধারণ করা থাকে দাই সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়িতে। পরিবারের ছেলেদের গণবিছানা করা হয় ঘরের দক্ষিণ দিকে, আর মেয়েদের বিছানা করা হয় ঘরের উত্তর দিকে। বাড়িতে যদি কোনো মেহমান আসে তবে তাদের বিছানা করা হয় ঘরের পূর্ব দিকে। কিন্তু মেহমান যদি বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ হন তবে তার বিছানা করা হয় ঘরের পশ্চিম অংশে।
মানদাই গ্রামের দাই সম্প্রদায় তাদের বর্তমান যাপিত জীবনে বাড়ির যে দিকটিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এনেছে সেটি হচ্ছে তাদের রান্নার জায়গা। যেহেতু তারা এখন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে গ্যাস, সে কারণে তারা তাদের রান্নাঘরটি ঢেলে সাজিয়েছে একদম পশ্চিমা ধাঁচে। ঐতিহ্যিক তিনঠ্যাং ওয়ালা চুলার পরিবর্তে এসেছে গ্যাস বার্নার।
আতিথেয়তায় দাই সম্প্রদায়ের সুনাম সেই প্রাচীনকাল থেকেই। সেই পরম্পরা তারা ধরে রেখেছে তাদের এই পরিবর্তনের ক্রান্তিকালেও। মানজেলা অর্থাত্ বাংলাদেশ থেকে একজন অতিথি এসেছে শুনে তাদের সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে অতিথি সেবার আয়োজন করেছে। সমস্ত কাজ ফেলে পরিবারের সব সদস্য এক হয়েছে মানজেলা থেকে আগত অতিথির সাথে দুপুরের খাবার খেতে।
আমরা বসে যাই এই পরিবারটির সাথে দুপুরের খাবার খেতে। আদিকাল থেকেই ভাত দাই সম্প্রদায়ের প্রধান খাবার। ভাতের সাথে কিছু সেদ্ধ লতাপাতা। আর কিছু ফলমূল। বরবটি, ঢেঁড়স-এর মতো সবজিগুলো তারা শুধু গরমপানিতে একটু সেদ্ধ করেই খেয়ে ফেলে। যদিও তারা এখন তাদের এই সবজিগুলোতে সসেজ-এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেছে। কিন্তু আদিতে যখন তাদের পাহাড়ে বাস ছিল তখন শুধু সবজিটা সেদ্ধ হলেই তাদের চলত। শিকার করা পশুপাখিগুলো পুড়িয়ে বা সেদ্ধ করে খেয়ে ফেলত। এখন তাদের খাবারের মেনুতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পদটি হচ্ছে এক বিশেষ প্রজাতির হাঁসের মাংস। মানজেলা বা বাংলাদেশি অতিথির জন্য তারা আয়োজন করেছে এই বিশেষ রান্নাটি।
দাই সম্প্রদায়ে বয়সে বড় যেকারও অবস্থান সবার ওপরে। কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে থাকলে ছোটরা তার সামনে বসেন না। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তিটি আগে বসবেন তার পরে ছোটরা বসবে। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তি যে দিকে বসে থাকেন ছোটরা তার দিকে পা রাখেন না । তার থেকে অন্যদিকে পা-টা গুটিয়ে রাখেন। খাবারের বেলায়ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তি আগে বসবেন তারপরে অন্যরা খাবার শুরু করবে। তাদের সেই রীতি এখনো চলে আসছে।
দাই এই পরিবারটির সাথে আমাদের দুপুরের খাবারটা বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। খানায় পিনায় আর গালগল্পে অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। যখন নিচে নামি তখন একটি জিনিস আবিষ্কার হয়ে যায়। এই পরিবারের এক সদ্যস্যের তৈরি মাটির পাত্রের সুনাম দেশে-বিদেশে সর্বত্র। আমাদের আগ্রহ জন্মে তার মাটির পাত্র তৈরির কৌশলটি দেখার জন্য। তিনি বসে পড়েন মাটির পাত্র তৈরি করতে।
প্রায় পাঁচ প্রজন্ম ধরে এই পরিবারটি মাটির পাত্র তৈরি করে আসছে। যিনি মাটির পাত্র তৈরি করছেন তিনি তার দাদার কাছ থেকে এই মাটির পাত্র তৈরির কাজ শিখেছেন। দাদা মাটির পাত্র তৈরি করতেন আর উনি লুকিয়ে লুকিয়ে পাত্র তৈরির কাজ দেখতেন। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতেন কারণ তখন তাদের বিশ্বাস ছিল কেউ যদি এই পাত্র বানানো দেখে ফেলে, তাহলে তার পাত্র ভালো হবে না। সে কারণে পাত্র তৈরির কাজটা করা হতো গোপনে।
চীনের কেন্দ্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি উনাকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি করেছে। আবার জাপানে একটি আর্ন্তজাতিক ঐতিহ্যিক প্রোটারি শিল্পের প্রদর্শনীতে উনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন তার তৈরি মাটির পাত্র নিয়ে।
এখনো এই পরিবার এই কুমারের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসারের আয় রোজগার এবং স্বামী সন্তানের ভরণপোষণের জন্য সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথা তারই।
দাই এই পরিবারটির সাথে সুন্দর একটি দিন কাটিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি। হাঁটতে থাকি মানদাও গ্রামের রাস্তা দিয়ে।
আদিবাসী সন্ধ্যা
শিশুয়াং পাননার রাজধানী শহর জিংহোং-এ সন্ধ্যা নামে। সড়কদ্বীপের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। সড়কদ্বীপের এই আলোগুলোকেও ছাপিয়ে কিছু বিশেষ ভবনের আলোকসজ্জা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
পর্যটকদের অনেক প্রিয় বলেই এ শহরে এমন উত্সবের আমেজ সারাবছর জুড়েই থাকে।
রাতের শিশুয়াং পাননা দেখার জন্য চেপে বসেছি একটি মেটরবাইকের পেছনে। হঠাত্ চোখ যায় একটা বড় দালানের দিকে। দাই মন্দির স্থাপত্যরীতিকে অনুসরণ করে বানানো একটা বড় দালানের সাজসজ্জা আমাদের আকৃষ্ট করে।
এই ভবনের সামনে এসে দেখি এলাহি কাণ্ড। অনেক নারী-পুরুষ একসাথে নাচানাচি করছে। যে যেমন পারছে। আলো ঝলমলে শহরের মাঝখানে এরকম গণ-আয়োজন এর আগে দেখা হয়নি। ভবনের ভেতর থেকে মিউজিক বাজানো হচ্ছে আর সে মিউজিকের তালে তালে নেচে চলেছে শতশত নারী-পুরুষ। এদের খুব কমসংখ্যকই স্থানীয় অধিবাসী। বাদবাকি সবাই চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক।
চীনারা এমনিতেই প্রচণ্ড স্বাস্থ্যসচেতন। স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ধ্যা হলেই এই ভবনের সামনে চলে আসেন তাদের প্রাত্যহিক শরীরচর্চাটা সেরে নিতে। সন্ধ্যাবেলা রাতের খাবার সেরে শরীরচর্চার অংশ হিসেবে চীনারা বাজনার তালে তালে নাচের এমন আয়োজন করেই থাকে। কিন্তু এখানে এ আয়োজনটা অনেক বেশি প্রাণ পেয়েছে তার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির কারণে।
যে ভবনের সামনে এই আয়োজন, এটি শিশুয়াং পান্নার সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যিক অ্যাকাডেমি। এই অ্যাকাডেমি শিশুয়াং পাননাতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত শিশুয়াং পাননার আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক একটি সাংস্কৃতিক শো’এর আয়োজন করে। সে শো শুরু হতে এখন অনেক দেরি। সে-সময় পর্যন্ত উপস্থিত দর্শকরা শুধু শুধু বসে থাকবেন কেন? এ সময়টুকুতে পর্যটকেরা আনন্দ আয়োজন শুরু করে দেন নিজেদের মধ্যে।
পর্যটকদের খুব একটা বেশি সময় অপেক্ষায় রাখে না শিশুয়াং পাননার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অ্যাকাডেমি। শুরু হয়ে যায় শিশুয়াং পাননার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দাইদের বাঁশ নৃত্য।
বাঁশ নৃত্যে অ্যাকাডেমির দাই সম্প্রদায়ের কর্মীদের সাথে পর্যটকেরাও সমান তালে তাল মিলিয়ে নেচে চলে। প্রায় দুই ফুট উচ্চতার একটি বাঁশ থাকে সবার হাতে। একই তালে বাঁশটি মাটির সাথে দুবার ঠুকতে হবে সেই সাথে দু-কদম হেঁটে যেতে হবে। তারপরে একটু থেমে তালে তালে দু-বার মাজাটা নাড়াতে হয়। আর এই তালটা ঠিক রাখার জন্য মুখে কিছু বুলিও আওড়াতে হয় তাদের।
দাই সম্প্রদায়ের এই নৃত্যটি এসেছে তাদের জীবন যাপনের একটি অংশ থেকে। আদিকালে দাইদের বাস ছিল পাহাড়ে। জুম চাষই ছিল তাদের একমাত্র পেশা। খুব ভোরে তাদের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠতে হতো জুমের জমিতে যাওয়ার জন্য, সে জন্য তারা একখণ্ড বাঁশ হাতে রাখত শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য। বাঁশটি মাটিতে ঠুকে যখন পাহাড়ে উঠত তখন ইচ্ছা করেই তারা বাঁশটি একটু জোরে মাটিতে ঠুকে দিত এবং মুখ দিয়ে এক ধরনের শব্দ করত। অনেকে দলবেঁধে পাহাড়ে উঠত বলে শব্দটা একটু বেশিই হতো। ফলে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা হিংস্র জন্তু-জানোয়ারেরা তাদের ভয়ে দূরে সরে যেত। পরবর্তীতে তারা খেয়াল করল, এভাবে দলবেঁধে পাহাড়ে ওঠার একটা শৈল্পিক রূপ আছে। সে শৈল্পিক রূপকে তারা নাচের মাধ্যমে উপস্থাপন শুরু করল। সেই থেকে এই লাঠিনাচ আর তার সাথে এমন ধ্বনির উচ্চারণ।
নাচের শেষের দিকে তালটা একটু দ্রুতলয়ে হয়। মনে হয় তারা তাদের জুম চাষের জমির কাছাকাছি চলে এসেছে। আর সে কারণেই তারা এমন উত্ফুল্ল।
এই বাঁশ নৃত্য শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় আরেকটি বাঁশ নৃত্য। এই বাঁশ নৃত্যটির সাথে অবশ্য আমরা বেশ পরিচিত। আমাদের দেশের বান্দরবানের অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায় এই বাঁশ নৃত্যটি নেচে থাকে।
মাটিতে সমান্তরালভাবে দুটি বাঁশ পাতা। আর আড়াআড়িভাবে সমদূরত্বে দুটি বাঁশকে একটি ছন্দবদ্ধ রূপে খুলছেন এবং বন্ধ করছেন দুজন দাই যুবক। নাচিয়েদের, এই খোলা এবং বন্ধ করা ঠিক রেখে পেরিয়ে যেতে হবে একেকটি বাঁশের ফাঁদ। তালটা ঠিক রাখলে বাঁশ পেরোনো খুব একটা কঠিন নয়। কিন্তু একটু বেতাল হলেই এমন বাঁশের ঠোকর খেতে হয় পায়ে।
দাইদের এই নাচটাও এসেছে তাদের জীবনযাপন থেকে। জুমের ফসল উঠে যাবার পর তারা ফসল মাড়াইয়ের জন্য বাঁশ দিয়ে এমন করে পেটাত। এবং এই পিটাপিটির কাজটা তারা তালে তালে করতো। আর যে ফসল সংগ্রহ করত সেও তালে তালে তাল মিলিয়ে আবর্জনার ভেতর থেকে ফসলের অংশটুকু সংগ্রহ করে নিত। দাই সম্প্রদায়ের মেয়েরা এমনিতেই নাচুনে। সে কারণেই তারা তাদের এই কাজটাকে নাচের অংশ হিসেবে নিয়ে নিলো।
আলো ঝলমলে এই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বহুবর্ণিল পোশাকে সজ্জিত দাই যুবক-যুবতীদের এই আয়োজন দর্শকরা বেশ উপভোগ করেন। অনেকে আবার এই আনন্দঘন মুহূর্তটিকে তাদের ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য ব্যস্তও হয়ে পড়েন।
এখন যে আয়োজনটি শুরু হবে, এটি দাই মেয়েদের স্বয়ম্বরা অনুষ্ঠান। দাই মেয়েদের হাতে এরকম একটি মালা থাকবে। আর তাদের সামনে থাকবে তাদের পাণি প্রার্থী যুবকেরা। দাই মেয়েদের ছুড়ে দেওয়া এই মালাগুলো যে যুবকের হাতে গিয়ে পড়বে সেই যুবক হবে সেই দাই মেয়ের বর। সনাতনি পদ্ধতির এই বিবাহরীতি গত হয়ে গেছে কয়েক দশক আগে। এখন এর নাটকীয় প্রকাশটুকু ঐতিহ্যিক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে।
দাই যুবতীরাও দাঁড়িয়ে যায় আমাদের সামনে। তাদের হাতের মালাটি দুলাতে থাকে। একসময় ছুড়ে মারে মালাটি। কিছু বুঝে উঠার আগেই চীনা যুবকেরা মালাটি লুফে নেয়। যে যুবকগুলো দাই যুবতীদের মালার মালিক হয়েছে, তাদের এক সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে। এখন তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দাই যুবতীরা বাছবিচার করে দেখবে—এই পাণি প্রার্থীদের আদতেই বিবাহ করা যায় কি না। এই পরীক্ষায় প্রথমেই তাদের দাইদের একটি গান করতে হচ্ছে। এই পর্বটা অনেকেই পেরিয়ে যায়। কিন্তু এর পরের পর্ব অনেক জটিল। এক দাই যুবতী নেচে দেখাচ্ছে। ঠিক এমন করেই নাচতে হবে যুবকদের। যুবতীর দেখিয়ে দেওয়া মুদ্রায় নাচতে গিয়েই যুবকেরা গোল বাঁধিয়ে ফেলল আর তারা হয়ে উঠল উপস্থিত দর্শকদের হাসির খোরাক। এর পরে দাইদের বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণের পালা। শব্দের অর্থ বুঝতে না পারলেও স্থানীয় পর্যটকদের হাসাহাসিতে বুঝতে পারি যুবকেরা বেশ হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এখন মনে হচ্ছে এই যুবকদের সামনে বেশ কঠিন কোনো পরীক্ষা উপস্থিত হচ্ছে। সঞ্চালক বেশ ভালোভাবে তাদের কোনো একটা বিষয় বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সঞ্চালকের কথা কিছুই বুঝতে পারি না। অপেক্ষা করতে থাকি কী ঘটে।
একটু পরেই দেখি দুজন করে দাই যুবতী একজন করে বধূকে নিয়ে আসে খোলা প্রাঙ্গণে দর্শকদের সামনে। বধূদের মুখ লাল মখমলের কাপড়ে ঢাকা। এখন এই বরদের তাদের বধূকে খুঁজে নিতে হবে।
প্রথম যুবককে তার বধূটিকে বেছে নিতে বলা হলো। সে এক বধূকে দেখিয়ে বলে এটিই তার বৌ। কিন্তু বধূর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই চারদিকে হাসির রোল। ভালো করে দেখি। আরে! এতো ছেলেকে বৌ সাজানো হয়েছে। কী আর করা এই যুবকের ভাগ্যে ছেলে বউ-ই জুটে গেল।
তারপর পরের যুবকটির পালা। যুবকটি বুঝে উঠতে পারে। সে ঘোমটা খুলবে কি খুলবে না দ্বিধায় পড়ে যায়। একসময় যুবকটি ঘোমটা খোলে। এবার সত্যি সত্যিই তার ভাগ্যে জুটে যায় সুন্দরী এক দাই যুবতী।
এবার তাকে এই দাই যুবতীর পাণি গ্রহণ করতে হবে। এই পাণি গ্রহণের পদ্ধতিটিও বেশ চমত্কার। বর এবং বধূকে সামনা সামনি দাঁড় করানো হয়। বর এবং বধূ একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে ঐতিহ্যিক একটি ক্ষুদ্র পাত্র থেকে দাইদের ঐতিহ্যিক পানীয় পান করবে। এর পরে যুবকটিকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হাত থেকে একই পানীয় পান করতে হবে।
পাণি গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই দুজন সিপাহী এসে যুবকটিকে উঠিয়ে নিয়ে গেল আর বান্ধবীরা এসে যুবতীটিকে নিয়ে গেল। এখন তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হবে বাসর ঘরে।
আর এদিকে উপস্থিত দর্শকেরা মেতে ওঠে নাচ-গানে।
ম্যানজিং পাও-এর বিয়ে বাড়ি
শিশুয়াং পাননার সকালটা সাইকেল চালনার জন্য বেশ উপযোগী। চিরবসন্তের এই শহরটা সাইকেল আরোহীদের জন্য লোভনীয়। এই লোভ সংবরণ করতে পারি না। শিশুয়াং পাননার এই হাইওয়েগুলো সাইকেল আরোহীদের জন্য বেশ উপযোগী।
এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বেশ চমত্কার। দুদিকে চোখ জুড়ানো ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে হাইওয়ে। দূরে গাঢ় নীলচে পাহাড়ের সারি।
দু-পাশে সারি সারি নারিকেল গাছ। চার লেনের এই হাইওয়ের মাঝখানে ডিভাইডার। এখানকার লাইটপোস্টগুলোও বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত। চা উত্পাদনের জন্যও এ এলাকা বিখ্যাত। চীনের চায়ের একটা বড় অংশ উত্পাদিত হয় এখানে। সে জন্যই এই ল্যাম্পপোস্টগুলো সাজানো হয়েছে একটি কুঁড়ি দুটি পাতা দিয়ে।
চীনের এই এলাকায় দাই আদিবাসীদের বাস। দাই সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা কৃষি এবং প্রধান খাদ্য ভাত। সে কারণেই এই এলাকায় ধানের চাষ বেশি। এরকম মসৃণ হাইওয়ে আর এই মনোলোভা প্রকৃতির মাঝে এসে আমরাও যেন শিশু হয়ে যাই। সাইকেল নিয়ে এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ানোতেই যেন আমাদের আনন্দ।
আমরা এসে পড়ি একটি দাই গ্রামে। ম্যানঝিং পাও দাই অধ্যুষিত গ্রাম। ম্যান দাই শব্দ। দাই ভাষার এর অর্থ গ্রাম। আর ঝিং অর্থ বাঁশের খাঁচা, যে খাঁচাতে করে পাথর টানা হয়। কথিত আছে একবার গৌতম বুদ্ধ এখানে আসেন এবং তিনি এখানে কিছু পাথর পড়ে থাকতে দেখেন। তখন তিনি বলেন, পবিত্র এক নদী পবিত্র এ পাথর খণ্ডগুলোকে এখানে টেনে এনেছে। পবিত্র এ পাথর খণ্ডগুলোকে একটি পবিত্র স্থানে রাখতে হবে। তখন তিনি একটি ছোট্ট পাহাড়ের চূড়া নির্দেশ করেন। যখন গ্রামের লোকজন ভেবে পায় না কীভাবে তারা এই পাথরগুলো পাহাড়ের ওপরে তুলবে। তখন তারা একটি বাঁশের খাঁচা তৈরি করে এবং সেটিতে করে পাথর খণ্ডগুলো পাহাড়ের চূড়ায় তোলেন। সে থেকে এই গ্রামের নাম হয়ে যায় ম্যানঝিং।
হাইওয়ে থেকে ঢালু একটা রাস্তা নেমে গেছে ম্যানঝিং গ্রামের দিকে। ফাঁকা হাইওয়েতে লোকজন তেমন একটা নেই। তারপরেও নর-নারীরা ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছে হাইওয়ের পাশে। সেখানে তারা বিকোচ্ছে জাম্বুরা, ডাব, কমলা আর মাল্টা।
ঢালুপথটা ধরে সাইকেল চালিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই পবিত্র সেই গ্রামে। ছোট্ট ছিমছাম চাইনিজ দাই গ্রাম। এই ভরদুপুরে রাস্তাঘাটে খুব একটা লোকজন চোখে পড়ে না। মানদাও গ্রামের মতো এই ম্যানজিং গ্রামের শহুরে ছোঁয়া ততটা লাগেনি। এখানে নতুন যেসব বাড়িঘর নির্মিত হচ্ছে তার অবয়বে ঐতিহ্যিক ছাপটা ঠিকই ধরে রাখছে।
অলস এই দুপুরে গ্রামের নারী-পুরুষ বাড়ির সামনের মুদি দোকানের সামনে অলস আড্ডায় মশগুল থাকেন।
এই এলাকাটি যেহেতু পর্যটনপ্রিয় কোনো জনপদ নয়, সে কারণে ভিনদেশি পর্যটকদের খুব একটা আনোগোনা এখানে চোখে পড়ে না। গ্রামবাসীর কাছেও ভিনদেশি মানুষেরা খুব অপরিচিত। সে কারণেই হয়তো আমাদের মতো ভিনদেশি পর্যটক দেখে তারা নড়ে চড়ে বসে। একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন তাদের। পোশাকে আশাকে এখনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।
মুদি দোকানের এই আড্ডা থেকেই আমরা জেনে যাই, এই গ্রামের একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমরা হাঁটতে থাকি বিয়ে বাড়ির দিকে।
দাই সম্প্রদায়ের বিয়ে বাড়ি মানেই খানাপিনা আর হৈ-হুল্লোড়। দাই সম্প্রদায়রা তাদের বিয়েতে যে কত প্রকারের খাবারের আয়োজন করে, তাদের বিয়েতে উপস্থিত না থাকলে ধারণা পাওয়া যায় না।
এটি মেয়ের বাড়ি। সাতদিন ধরে এই বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলবে। আর এই সাতদিন বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনরা এই বাড়িতে থাকবেন খাবেন আর আনন্দ-ফূর্তি করবেন।
দাই আদিবাসীদের রীতি অনুযায়ী এই খাওয়ানোর মধ্যে মেয়ের পরিবারের মান-সন্মান জড়িত থাকে। খানাপিনায় যদি অতিথিরা সন্তুষ্ট না হন, তখন ধরে নেওয়া হয় যে পরিবারটি অনেক কৃপণ। মনে করা হয়, এখানে ছেলেটা অনেক কষ্টে থাকবে।
সে কারণে এই বিয়ে বাড়িতে টেবিলে টেবিলে বিভিন্ন পদের খাবারের ছড়াছড়ি—বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কাবাব, মাংসের কাবাব, বিভিন্ন ধরনের সবজি, ফল দিয়ে মিষ্টি আচার—এসব।
যে সাতদিন বিয়ের অনুষ্ঠান চলবে সে সাতদিন এ বাড়িতে খাবারের টেবিল কখনো ক্লোজ হবে না। টেবিলে টেবিলে এমন চপস্টিক আর স্যুপের চামচ দেওয়া থাকবে। যার যখন খেতে ইচ্ছে করবে সে তখন কোনো একটা টেবিলে বসে পড়লেই চলবে।
আর অন্যদিকে চলছে রান্না-বান্নার কাজ। পরিবারের বয়স্কদের চোখে ঘুম নেই। সমানে রান্না চড়িয়ে চলেছেন তারা।
আর অন্যদিকে চলছে ধোওয়া মোছার কাজ। আমরা যখন এসব ঘুরে ফিরে দেখছি তখন বরযাত্রী চলে এসেছে।
খুবই সাদামাটা বরযাত্রার আয়োজন। বরযাত্রীরা সব পায়ে হেঁটেই এসেছেন। বরযাত্রীর সংখ্যাও খুব একটা বেশি না। সাকুল্যে জনা পঞ্চাশেক। বরযাত্রীদের সবার হাতেই বিভিন্ন রকমের উপঢৌকন। এটাই দাই সম্প্রদায়ের বিয়ের রীতি। বর যখন বিয়ে করতে আসবে তখন বরের সাথে যারা আসবে তারা বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন নিয়ে আসবে। সেসব উপঢৌকন আর কিছুই না। বিভিন্ন ধরনের সবজি, মাছ, মাংস, পানীয় আর চাল। বাহ! হয়তো বা রীতিটা এ কারণে হয়েছে যে, যেহেতু তারা আগামী পাঁচদিন এ বাড়িতে থাকবে এবং খাবে সে কারণে শুধু শুধু কনের পরিবারের ওপরে একক চাপটা তারা দিতে চায় না। সৌহার্দের মানসিকতা স্বরূপ তারা এই উপঢৌকনগুলো নিয়ে আসে।
বরযাত্রীদের যখন খাতির করে বসানো হচ্ছে তখন দেখি কনে একটা মোটরসাইকেলে বাজার করে ফিরছে। এ সময় আমাদের জামাইবাবুকে দেখতে ইচ্ছে করে। পেয়েও যাই জামাইকে। খুব সাদামাটা পোশাকে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি আসলে তিনদিন আগে থেকেই এ বাড়িতে আছেন।
কনের মাকে দেখলাম, বরযাত্রীরা যেসব উপঢৌকন নিয়ে এসেছে সেগুলো সামলাতে ব্যস্ত।
বউকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে তিন দিন আগে মাত্র তার বিয়ে হয়েছে। একটি জিন্সপ্যান্ট হাঁটুর কাছে গুটিয়ে রাখা আর একটি টি শার্ট পরে আছে বৌ। আমাদের জানায়, গত দুদিন সে বিয়ের পোশাক পরেই ছিল। আজ যেহেতু বিয়ের তৃতীয় দিন সে কারণে সে বিয়ের পোশাকগুলো ধুয়ে দিয়েছে। পোশাকগুলো এখন রোদে শুকাচ্ছে।
বরপক্ষের লোকজন এসেছেন। এর মধ্যেই কনে পক্ষের লোকজন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বর পক্ষের লোকজনকে খাওয়ানোর আয়োজনে। স্বয়ং কনেই চেয়ার-টেবিল টানা-হেঁচড়া শুরু করে দিয়েছে।
কনে পক্ষের লোকজন টেবিলে টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত। খাবারের টেবিলগুলো প্রস্তুত। এখন বসার পালা। এখানেও আছে কিছু আনুষ্ঠানিকতা। বর পক্ষের লোকজন যখন খেতে বসবে তখন সবার আগে বসবে বর পক্ষের মধ্যে বয়জ্যেষ্ঠ যে ব্যাক্তি, তিনি। তার পরে অন্যান্যরা বসবে। বর পক্ষের যে আত্মীয়-স্বজন এসেছে তাদের মধ্যে যে সকল মহিলা অতিথি এসেছে তাদের সবাই দাই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যিক পোশাক পরেছেন। আর মেয়েদের এ পোশাক দেখে তাদের পরিবারকে আলাদা করা যায়। একই পরিবারের মেয়েরা সব একই রংয়ের পোশাক পরবে যাতে করে এত লোকজনের মধ্যে তাদের পরিবারের লোকজনকে আলাদা করা যায়। এবং সে হিসেবেই তারা সন্মান পাবে। খাবার শুরুতেই দাই সম্প্রদায় কোনো পানীয় দিয়ে খাওয়া শুরু করে। তারপরে তারা খাবে ভাত। এবং ভাতের সাথে অন্যান্য খাবার।
যে ছেলেটির বিয়ে হচ্ছে তার বয়স ২৪ আর মেয়েটির বয়স ২৩। বিয়ের ক্ষেত্রে দাই সম্প্রদায়ের ছেলে কী করে বা ছেলের পেশা কী—এটি বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য বিষয় মেয়ে কী করে। কারণ, মেয়েটিকেই এই পরিবার চালাতে হবে। যে মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে তাদের রাবার বাগান আছে। সে রাবার বাগানেই কাজ করে। ছেলেটিকেও হয়তো এ রাবার বাগানে কাজ করতে হবে।
দুদিন আগেই তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন চলছে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। এই আনুষ্ঠানিকতা চলবে সাতদিন ধরে।
বিয়ের পরেরদিন হয় তাদের সুতা পরানো অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে কনে পক্ষের বয়োজ্যেষ্ঠরা কনে এবং বরের হাতে সাদা সুতা বেঁধে দেন। এই সুতাকে তারা পবিত্র মনে করে। তারা মনে করে এই পবিত্র সুতা দিয়ে দুটি হূদয়কে একসাথে বেঁধে দিল। দুদিন ধরে চলে এই সুতা বাঁধা অনুষ্ঠান। এরপর বর পক্ষের লোকজন আসে কনে পক্ষের বাড়িতে। তারা এখানে থাকবে দুদিন। এ দুদিন তারা এখানে থাকবে খাবে আর আনন্দ-ফূর্তি করবে। বর পক্ষের লোকজন যখন কনে পক্ষের বাড়িতে আসে তখন আরও অনেক উপহারসামগ্রী নিয়ে আসে। এর মধ্যে অবশ্যই যে জিনিসগুলো তাদের আনতে হয় সেগুলোর সাথে আমরা বেশ পরিচিত। আমাদের দেশে বিয়ের পরে মেয়ের সাথে যে জিনিসগুলো দেওয়া হয় সে জিনিসগুলো। যেমন তোষক বিছানো কাঁথা, বালিশ, ঘরকন্নার জিনিসপত্র ইত্যাদি। সংসার পাততে যেসব জিনিসপত্র লাগে তা বর পক্ষের লোকজন দিয়ে দেয়।
দুদিন পরে বর পক্ষের লোকজন বর ও কনেকে নিয়ে চলে যাবে তাদের বাড়িতে। সেখানে দুদিন ধরে চলবে বরের বাড়িতে সুতা বাঁধা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান। তখন কনের পরিবারের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব দুদিন ধরে বরের বাড়িতে থাকবে খাবে আনন্দ ফূর্তি করবে। তারপর কনে বরকে নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে আসবে এবং এখানেই তারা সংসারধর্ম পালন করবে। কনের বাড়িতে দুই বছর সংসার করার পর বর চাইলে তার নিজের বাড়িতে যেতে পারবে।
বিয়েবাড়ির এইসব আচার-অনুষ্ঠান আমরা যখন ঘুরে ফিরে দেখছি তখন একটি জিনিস আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না। সবার শরীরেই বিভিন্ন ধরনের উল্কি আঁকা। তাদের শরীরের এই উল্কি তাদের ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। এদের অধিকাংশের শরীরেই উল্কি আকারে ড্রাগনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তারা মনে করে ড্রাগন হলো সৌভাগ্য আর শক্তির প্রতীক।
এসব নিয়েই বর কনে আর তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আমাদের আড্ডা জমে ওঠে। খানায় পিনায় আড্ডায় কথাবার্তায় আমাদের সময় গড়িয়ে যায় অনেক। ম্যানজিং পাও গ্রামের পাহাড়ের আড়ালে সূর্যটা মুখ লুকাতে চায়। আমাদের ফিরতে হবে শহরে। তাও আবার সাইকেল চালিয়ে। আলো থাকতে থাকতেই আমাদের ফিরতে হবে। কিন্তু এ পরিবারের আতিথেয়তা ছেড়ে আসতে মন চায় না। কিন্তু সূর্য দেবতা আমাদের সময়ও দেয় না বেশি। ম্যানজিং পাও গ্রাম পেছনে ফেলে আমরা ফিরতে থাকি শহরের দিকে।
