অসীম আর মুনীর এক সাথে বাস ধরেছে। তাদের পার্ট-টাইম কাজের জায়গাতে যাবে এই পথে। ওরা উঠেছে মিরপুর থেকে, যাবে শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের কাছে। ওরা স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বন্ধু। এখন কাজও করছে এক সাথে।
বাস ছাড়ার একটু পরই ওদেরই বয়সি একটি ছেলে উঠল। প্যান্ট আর পাঞ্জাবি পরনে। এই অফিসের সময়টাতে বাসে বেজায় ভিড়। শুরুতে অসীম আর মুনীর দুজনেই দাঁড়ানোর ভালো জায়গা পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে আরও দু-তিনজন মাঝখানে ঢুকে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। নতুন পাঞ্জাবিওয়ালা দাঁড়াল মুনীরের পেছনে, একেবারে ঘেঁষে।
মিরপুরের এই রাস্তাটা বেশ লম্বা। কয়েকটা বাসস্ট্যান্ড পার হলো। মিরপুর ছাড়ালো অবশেষে। বাসে দাঁড়ানো অবস্থায় অসীম বাইরের দিকে মুখ করে থাকে না। অনেকেই জানালার দিকে মুখ করে গোলগোল চোখে বাইরের দৃশ্যাবলি দেখতে থাকে। কিন্তু বাইরে এত দেখার কী আছে। সেই তো উদ্ভট ধরনের পোস্টার, ফুটপাতে ফেরিওয়ালার ভ্যান আর আকাশ আড়াল করে যতসব বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন। দু-একজন আবার স্টপেজে থামা অবস্থায় পোস্টারের লেখাগুলো সশব্দে পড়তে থাকে। এটা চরম বিরক্তিকর লাগে, মনে হয় এরা সদ্য ‘আমার বই’-এর বানান শিক্ষা সমাপন করেছে আর তারই সার্থক প্রয়োগ করছে।
অসীম অবশ্য বাইরের দিকে তাকায় না অন্য একটি কারণে। তার ক্লাসের বন্ধু-বান্ধবীরা দেখবে যে, সে এমন একটা লক্কড়-ঝক্কর বাসে চড়েছে—এটা সে ভাবতেই পারে না। বাসগুলোর বডিতে একটি সুন্দর রং করলে কী হয়। আর ফাটা কাচে অমন খবরের কাগজ সেঁটে এই ব্যান্ডেজ বাঁধা রোগীর চেহারা না করলেই কি হতো না!
কাজেই অসীম অনবরতই সামনের লোকেদের শার্টের পেছনে ময়লা দাগ, ঘর্মাক্ত টাক ইত্যাদি দৃশ্যপট দেখতে থাকে। অনেকে আবার তার মধ্যেই সার্কাসের কায়দায় যে হাতে বাসের ছাদের রড ধরা থাকে, সেই হাতের কনুই দিয়ে মোবাইল সেটটি কানের কাছে চেপে কথা বলতে থাকে, কারণ ডান হাতে থাকে ব্যাগ। বাসযাত্রীরা হাতগুলো বিচক্ষণভাবে ব্যবহার করে। অন্যমনস্কভাবে এসব দেখতে দেখতে হঠাত্ মনে হলো মুনীরের পেছনের ছেলেটির ডান হাত একটু নড়ছে এমনভাবে যা কিনা বাসযাত্রীদের স্বাভাবিক হস্তসঞ্চালন প্রথার বাইরে। হাতটা সামনের দিকে কী করছে সেটা বোঝা যায় না, কিন্তু একটু ভাঁজ হয়ে একটা ত্রিভুজ আকৃতি ধারণ করেছে।
অসীমের খেয়াল হলো যে, ওর হাতে কোনো হাতব্যাগ ছিল না। কাজেই হাতব্যাগ নাড়াচাড়ার ব্যাপার নেই। এরই মধ্যে ঝোলানো পাঞ্জাবিটা একটু বেশি টানাটানি হচ্ছে।
অসীমের মনের কোনায় একটি আশঙ্কা ধা করে ঢুকে পড়েছে। আশঙ্কাটি মুনীরের মানিব্যাগের অবস্থান পরিবর্তন বিষয়ক। মুনীরের পেছনে লেপ্টে দাঁড়ানো ছেলেটি এই পরিবর্তনের নায়ক নয় তো?
সাথে সাথেই অসীম ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে থাকে। পাশে দাঁড়ানো সবাই বিরক্তিতে কপাল কুঁচকাল। তাদের একজন ধমকের স্বরে বলল, ‘শাহবাগ তো আমরাও নামব, আরও তো দুই স্টপ পরে।’
কিন্তু অসীমের এসব শুনলে চলবে না। ওই ছেলেটি যদি মুনীরের মানিব্যাগ গায়েব করে থাকে, তাহলে হয়তো পরের স্টপেই নেমে পড়বে। তার আগেই ধরতে হবে। অসীম ওই ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
‘মানিব্যাগটা কোথায়?’
ছেলেটি মুনীরের পেছনটা হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,
‘আমার বন্ধুতো, ছোটবেলার বন্ধু, তাই একটু...
এই আরকি... এই মজা...।’
ওর তোতলানো শুনেই অসীমের সন্দেহ আরও প্রবল হলো, যদিও বন্ধু হলে ওরকম মজা করতেই পারে।
অসীম ওর হাতটা চেপে ধরল। বলল, ‘ঠিক আছে, মুনীর কী বলে, শুনি।’
তবে একটু চাপা গলায় বলল অসীম। যাতে অন্যরা তত বুঝতে না পারে। যদি ও সত্যিই মুনীরের বন্ধু হয়, তাহলে সহযাত্রীরা ওর পক্ষই নেবে, আর অসীম কিছু ধোলাই বা অন্তত গালাগালি খেয়ে খাবি খাবে।
মুনীরের নাম শুনে সে ফিরে তাকাল। ওই ছেলে মুনীরের দিকে তাকিয়ে আছে। মুনীর অসীমকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, সমস্যাটা কী? ওরে চেপে ধরেছিস কেন?’
অসীম দ্রুত ফিসফিস করল, ‘তোর পকেটে হাত দিয়ে দ্যাখ’।
হাত দিয়েই বুঝতে পারল, ব্যাগের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। সে তাকাল পেছনের ছেলেটির চোখে। এবং বাক্য বিনিময় হলো চোখে চোখে। অসীম হাতের চাপ বজায় রাখতে ব্যস্ত ছিল।
ততক্ষণে শাহবাগ এসে গিয়েছে। ছেলেটি ফ্যাকাশে হেসে দ্রুত এবং কম্পমান হাতে মানিব্যাগটি দিল মুনীরকে। মুনীর আস্তে বলল, ‘ধন্যবাদ, আমার আরও সাবধানে চলতে হবে। তোমারও।’
অসীম আর মুনীর নামল। পেছনে সেই ছেলেটিও নামল। অসীম মুনীরকে বলল, ‘কি রে, তুই ওকে চিনিস, কিন্তু ওতো তোর সাথে কোনো কথা বলল না?
মুনীর বলল, ‘বলেছে। তোকে বিকেলে পুরোটা বলব’।
ততক্ষণে ওই ছেলেটি আবার এসে হাজির। এসেই সে মুনীরের পায়ের কাছে বসে জুতার ওপর দিয়েই পায়ে এক হাত রাখল। তারপর বলল, ‘স্যার, আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। যদি ধরিয়ে দিতেন, বাসসুদ্ধ লোক আমাকে পিটিয়ে হয়তো মেরেই ফেলত।’
মুনীর তাকে টেনে তুলে বলল, ‘এই ওঠো। বাসের লোক এখনো আশপাশে রয়েছে। ওরা এখনো সন্দেহ করতে পারে।’
ছেলেটি ভয় পেয়েই উঠে দাঁড়াল। আবার বলল, ‘ভাই, আপনার অনেক দয়া। আপনার পায়ে ধরি, আমাকে মাপ করবেন।’
মুনীর এবারে একটু রাগ দেখিয়ে বলল, ‘আরে, তুমি বললে যে তুমি আমার বন্ধু।
তাহলে আপনি বলছ কেন? আমাকে তুমি বলবে। আর নাম বলো তোমার।’
সে হেসে বলল, ‘কলিম, আর তুমি?’
মুনীর নিজের ও অসীমের নাম জানাল। তারপর অসীমকে বলল, ‘চলো, একটু চা খাই তিনজনে।’
বাসস্টপের উল্টাদিকের ঝুপড়ি দোকানে তিনজন বসল। চা-সিঙ্গাড়ার অর্ডার গেল।
সিঙ্গাড়া হাতের নাগালের মধ্যে আসামাত্র যে ছেলে বিশাল দু-তিন কামড় বসায়, সে কিনা সিঙ্গাড়া হাতে নিয়ে মুখের বেশ কয়েক ইঞ্চি দূরে রেখেই কৌতূহল উপচে দিল। জিজ্ঞেস করল অসীম, ‘এই মুনীর, তুই ওকে তো মোটেই চিনিস না। তাহলে পকেটমার বলে চেঁচিয়ে-টেচিয়ে ওকে জনতার আদালতে সোপর্দ করলি না কেন?’
মুনীর বলতে শুরু করল, ‘সংক্ষেপে বলি, ওর চোখ দেখে মনে হলো যে, ও এই পেশাতে নতুন, হঠাত্ নেমেছে। দক্ষ হলে তার পকেটে থাকত না আমার মানিব্যাগ, দলের লোকের হাতে চলে যেত, মাঝখানে আমি অপদস্থ হতাম। তাই ভাবলাম, দিই একে বাঁচিয়ে, মানিব্যাগ তো ফেরত পেয়েছি।’
অসীম রাগ করল, ‘অত দয়ালু হয়ে উঠলি আজ।’
মুনীর কলিমকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, তুমি কি একেবারেই কোনো ট্রেনিং নাওনি? আর দলে কি কেউ নেই?’
এবারে কলিমের মুখ করুণ, প্রায় চোখে পানি, বলল, ‘স্যার, বিশ্বাস করুন আমি...’
মুনীর দিল এক ধমক—‘আবার স্যার, স্যার বলবি তো ভাগ।’
কলিম হাসল, বলল, ‘তাইলে মুনীর ভাই বলি।’
মুনীরও হাসল, বলল, ‘আচ্ছা, আবেদন মঞ্জুর।’
কলিম এবার একটু উদাস ভঙ্গিতে বলল, ‘মুনীর ভাই, বিশ্বাস করেন আমি খারাপ ছেলে না, খারাপ হইতে চাই নাই।’
মুনীর তাকে থামাল, ‘এই, তুমিতো টিপিক্যাল চোর, পকেটমারের মতো ডায়ালগ দিচ্ছ। সত্যি বলো তো, আমি তোমার কত নম্বর কেস?’
কলিম হেসে ফেলল, ‘যদি বিশ্বাস করেন তাইলে বলি, এই প্রথম।’
‘ট্রেনিং ছাড়াই নেমেছ? তাহলে তো তুমি বুদ্ধু।’ মুনীর বলল।
‘ট্রেনিং নেওয়ার মতো লাইন পাইনি। আমি কোনো কাজেই কোনো লাইন পেলাম না।’
‘এর আগে আর কী কাজ করেছ? চুরি? চাঁদাবাজি?’
কলিম ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আমি বোকার মতো দুটা পেশাতে গিয়েছি। দু-জায়গাতেই ফেল, একটার গল্প বেশ মজার, শুনবেন?’
মুনীর ঘড়ি দেখল, অসীমকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই শোন, বসকে একটা ফোন দিয়ে আজ একটু জিরাই। আর এই বেকুবের গল্পটা শুনি। কী বলিস?’
অসীমও রাজি। কলিম বেশ কিছুক্ষণ একটানা বলল, ‘আমার বাবা মারা গেল এক বছর আগে। চিকিত্সার জন্য শেষ টুকরা জমি বিক্রি করেছিলাম। মার হাতে সেই টাকার কিছুটা ছিল। এই এক বছর চলেছে। শেষ দিকে দিন যেন আর চলে না। মা আমাকে সাত-শ টাকা হাতে দিয়ে বলল, ঢাকা শহরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা কর। বাস-রিকশাভাড়া খরচের পর পাঁচশ টাকা হাতে। গ্রামের চেনা এক ভাইয়ের মেসে ওর সিটের পাশে ফ্লোরে ঘুমাই।’
‘এই, এসব ফ্যাদাপ্যাচাল বাদ দে। পেশার কথা বল।’
কলিম আবার বলতে শুরু করল, ‘ঠিক করলাম রাস্তার পাশে চা-বিস্কুট বিক্রি করব। হিসাবে আমি ভালো। ক্লাস নাইনের অঙ্ক পরীক্ষাতে আশির উপরে মার্কস ছিল। দেখলাম, দিনে ৭০-৮০ টাকা লাভ। একটা বড় ফ্লাস্ক কিনলাম। কিছু বিস্কুট, বনরুটি। এসব নিয়ে মিরপুরে দুইটা ছোট রাস্তার কোনায় বসলাম। গার্মেন্টস-এর মেয়েরা লাইন ধরে যাওয়ার সময় অনেকে বিস্কুট নিল। দুই দিন ভালোই গেল, আমি তো খুশি।’
‘কী? তারপরে কি কোনো মেয়ে তোকে দেখে হাসল, আর বিপদ হলো?’ অনেকটা ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলল অসীম।
‘আরে, না ভাই। কী যে বলেন, সেদিন দুপুরের দিকে বসে আছি আমি। দুই-তিনজন শক্ত ছেলে, আমার চেয়ে বয়সে বড়, কাছেধারে আড্ডা দিচ্ছিল। একজন এসে আমার জায়গার পাশে ফুটপাতের ধারে উবু হয়ে তার প্রাকৃতিক ডাক সারল। একটু পরে আর একজন আসল। কেন যে তারা আমার কাছের জায়গাটাকে বাথরুম ভাবল সেটা বুঝলাম না। আমি খুব ভদ্রভাবে কাঁচুমাচু মুখে বললাম, ভাই, এখানে গন্ধ হলে লোকে আমার চা খাবে না।’
‘তারপরে ওই মাস্তান তোকে দিল চৌদ্দগুষ্ঠির নামে গালি, তাই না?’ অসীম বলল।
‘গালি দিলে কম বিপদ ছিল, অন্য জায়গাতে গিয়ে দোকান বসাতাম। করল কী, সোজা এক কিক ঝাড়ল আমার ফ্লাস্কটা লক্ষ করে। সেটা দশ হাত দূরে পড়ে টুকরা টুকরা। মাটিতে গড়াগড়ি। আমার ক্ষিধার সময় বিস্কুটগুলো খেতেও পারলাম না। বনরুটিগুলো পলিথিনে ছিল, সেগুলো দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারলাম, আর চা-ব্যবসাকে গুড বাই।’
‘তুই তো বোকা, ওদের সাথে কথা বলতে গিয়েছিলি।’ অসীম বলল।
‘কেমনে বুঝব? সুন্দর টি-শার্ট, জিনস পরা। চেহারাও সুন্দর ছিল ভদ্রলোকের মতো।’
মুনীর মুখ গুঁজে বসে গল্প শুনছিল। আর একটা দুঃখের গল্প আর শোনার উত্সাহ ছিল না। তাই বলল, ‘আর কাহিনি দরকার নাই। অসীম চল যাই।’ শুধু কলিমের ফোন নম্বরটা নিল, নিজেরটাও দিল। বলল, ‘কোনো ব্যবস্থা করতে পারলে ফোন করব আমি। আর পকেট মার করতে যেও না, জান শেষ হবে।’
কলিম বলল, ‘এটা কি বলতে হয়? কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত আমার।’
বলার পর সত্যি সত্যি উঠে কান ধরে দাঁড়াল। অসীম-মুনীর দুজনে ওকে টেনে বসাল। বিদায় নিল ওরা।
মুনীর ভেবেছিল, গল্পটাকে সে সুখী-সুখীভাবে শেষ করবে। কলিমের জন্য কোনো ছোট ছেলে পড়াবার টিউশানি জোগাড় করে দেবে, লজিংসহ। তারপর কলিম নিজে এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তারপর কতটা, ইত্যাদি।
মুনীরের সবচেয়ে ছোটভাই ক্লাস টুতে পড়ে। ভারি দুষ্ট। পড়তে বসতে চায় না। তাই ওর জন্য একজন টিউটর খুঁজছে মা।
মুনীর রাতে মাকে ধরল। কলিমের কেসটা খুলে বলল, ওর মা তো অবাক, বললেন,
‘আরে পকেটমারকে এনে ঘরে ঢুকাবি? আর ওতো গ্রাম থেকে এসেছে, শহরের আদব-কায়দা জানবে না। এসব বাদ দে। অন্য টিউটর খোঁজ কর।’
মুনীর মাকে বোঝানোর চেষ্টা করল নানাভাবে। কিন্তু তিনি এটাকে অসম্ভবের পর্যায়েই রাখলেন। বরং মুনীরকে উপদেশ দিলেন এসব পকেটমারদের সাথে না মিশতে।
মুনীর আর কলিমকে ফোন করেনি। সেও তো একজন ফেল করা মানুষ। কলিমের কোনো ব্যবস্থা করা, এটাকে সম্ভবের পর্যায়ে আনতে পারেনি। পার্থক্য হচ্ছে কলিমের সব কাজে ফেল করাটা সবাই জানবে, মুনীরের ফেল হওয়াটা সারাজীবন মুনীর একাই জানবে, মনে রাখবে। গল্পটা দুই বন্ধুর জীবনেই দুঃখের গল্প হয়েই লেখা থাকল।
