‘আজ আমাদের ছুটি...’

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:১৫
মাঠে ব্যাট-বলের শব্দ নেই, বিসিবি অফিসে নেই কর্মব্যস্ত লোকেদের ছোটাছুটি। এমনকি নিচতলার দোকানপাটগুলোতেও তালা ঝুলে গেছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ঢেকে যাওয়া এই সময়ের মিরপুর স্টেডিয়াম দেখতে দেখতে একটা শব্দই মনে হল—ছুটি! হ্যাঁ, গতকাল অনুশীলন হয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলেরও ছুটি হয়ে গেল। ‘জাতীয় দল’ বলতে গত ক দিন ধরেই মিরপুরের অনুশীলনে খেলোয়াড় আছেন মাত্র ছয় জন! বাকিরা ‘এ’ দলের সঙ্গে এখন ইংল্যান্ড সফরে আছেন। এই ছয় ক্রিকেটারই যা একটু সরগরম করে রেখেছিলেন মিরপুর এলাকাটা। আজ থেকে আসছে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত এই মুশফিক, মাশরাফি, মাহমুদউল্লাহ, রাজ্জাক, নাসির, শাহরিয়াররাও আর আসবেন না মিরপুর; কাটাবেন ঈদের ছুটি। ছুটির আগের দিনের অনুশীলনটা যেমন হয়ে থাকে, তেমনই স্রেফ মজা আর খুনসুটিতে ভরা এক পর্ব হল। হালকা জিম করার পর মাঠে সবাই এসেছিলেন বাড়তি একটু কিছু করবেন বলে। তা আর হল না। কী এক আজব খেলা আবিষ্কার করলেন অ্যাকাডেমির ফিটনেস কোচ স্টুয়ার্ট কার্পিনেন—টেনিস বল দিয়ে গোল করতে হবে! সে খেলাতেও গোল করে কী আনন্দ নাসির হোসেনদের। তবে আনন্দটা বেড়ে গেল বছর আড়াই বয়সের এক শিশু খুদে এক ব্যাট নিয়ে মাঠে ঢোকায়। বিসিবির এক কর্মচারীর এই মায়াবী ছেলেটিকে দেখে মুশফিক আর নাসিরের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, কে আগে কোলে নেবেন! নাসির ছেলেটিকে কোলে নিয়ে দিলেন দৌড়! দিনশেষে গ্যালারিতে বসে চকচকে চোখ নিয়ে নাসির হোসেন বলছিলেন, ‘বাচ্চাদের আমার খুব ভালো লাগে। এই বয়সী বাচ্চা দেখলেই আমি কোলে নেই। কী মায়া ভরা চোখ-মুখ!’ শিশুদের এই মায়বী চেহারার টানে গত পরশু নাসির তার অধিনায়কের সঙ্গে গিয়েছিলেন কমলাপুর স্টেশনে। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ঈদ উপহার দিতে গিয়েছিলেন শিশুদের। সেই প্রসঙ্গ উঠতে অবশ্য নাসিরের মুখটা কালো হয়ে গেল। আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ভাই, আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমি জানি, দেশে কতো মানুষ কতো কষ্টে আছে। কিন্তু চোখের সামনে পথশিশুদের এই কষ্ট দেখাটা আসলেই বেদনার ব্যাপার। আমার শুধু বারবার মনে হয়েছে, এই মায়ভরা, হাসিমাখা বাচ্চাগুলোর ভাগ্যে এতো কষ্ট কেন? সে তুলনায় আমরা আসলে কতো ভালো আছি।’ এই বোধ থেকেই বারবার মানুষের মাঝে ছুটে যেতে চান নাসির হোসেনরা। বারবার নিজেদের তারকাস্বত্বাকে তুলে রেখে মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে চান। যদিও তা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। পেশার খাতিরে, সময়ের প্রয়োজনে নাসিরদের বেশিরভাগ সময়টাই কাটাতে হয় অদৃশ্য এক দেয়ালের ওপারে। সেখানে বসে ক্রিকেট আর ক্রিকেটই শুধু তার জীবন। সেই ক্রিকেট নিয়ে ভাবনাটা কাল আলাপচারিতায়ও করতে হল নাসিরকে। এই তরুণ বয়সেই নাসির এখন জাতীয় দলের সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হয়ে উঠেছেন; বিদেশের মিডিয়া এরই মধ্যে নাম দিয়ে ফেলেছে—মিস্টার ডিপেন্ডেবল। নাসির অবশ্য এসব নিয়ে ভাবতে চান না। আগে বহুবার বলা কথাটা আরেকবার বললেন, ‘আমি এসব খেতাব বা লক্ষ্য নিয়ে ভাবি না। আমি আসলে মাঠে নামি খেলাটা উপভোগ করতে। চাপের সময়, রান তাড়া করার সময় আমি খেলাটা আরও উপভোগ করি। সবচেয়ে উপভোগ করি জয়ের মুহূর্তটা।’ নাসিরের বিশ্বাস, এই জয়ের মুহূর্ত এখন বাংলাদেশের নিয়মিতই আসবে। সে জন্য সদ্য শেষ হওয়া ফিটনেস ও স্কিল ডেভলপমেন্ট ক্যাম্প বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস তার। কোরি রিচার্ডসের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন এই ক্যাম্পটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটা ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে, ‘আজকের দিনে সামান্য একটু বেশি ফিটনেস বদলে দিতে পারে একজন খেলোয়াড়কে। একটু বেশি দৌড়াতে পারা, একটু ইনজুরি থেকে বেশি দূরে থাকা পুরো দলের জন্যই অনেক বড় পাওয়া। দেখবেন, বাংলাদেশের এর পরের খেলাধুলায় এর প্রভাব দেখতে পাবেন।’ তাই হোক, নাসির হোসেন।