‘আসব যাব চিরদিনের সেই আমি..’

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৯
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইবো না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে গো’ আজ বাইশ শ্রাবণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭২তম মহাপ্রয়াণ দিবস। সশরীরে না থাকলেও তিনি গানে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, ছবিতে প্রবলভাবে রয়েছেন আমাদের মাঝে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সবক’টি শাখাকে স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর লেখা গান বাঙালির হূদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় আজো। আনন্দে, বেদনায় এমনকি দ্রোহে এখনও রবীন্দ্রনাথ বাঙালির প্রেরণার উত্স। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মানস লোক বিনির্মাণে চেতনার উন্মেষের প্রধান অবলম্বন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে। বাঙালির রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশ ও ভারত-দু’দেশের মানুষের প্রাণের কবি। ২০১১ সাল ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। এই সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীকে স্মরণে রাখতে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে বছরব্যাপী তাঁর জন্মদিন পালনে নানা ধরনের আয়োজন করেছিল। দু’দেশের মানুষের সম্পর্কে সেতুবন্ধ রচনায় রবীন্দ্রনাথ দেখা দিয়েছেন নতুনতর মহিমায়। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চেতনা ছিল — শুধু নিজের শান্তি বা নিজের আত্মার মুক্তির জন্য ধর্ম নয়। মানুষের কল্যাণের জন্য যে সাধনা তাই ছিল তাঁর ধর্ম। তাঁর দর্শন ছিল মানুষের মুক্তির দর্শন। মানবতাবাদী এই কবি বিশ্বাস করতেন বিশ্বমানবতায়। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই দর্শনের অন্বেষণ করেছেন। তাঁর কবিতা, গান, সাহিত্যের অন্যান্য শাখার লেখনী মানুষকে আজো সেই অন্বেষণের পথে, তাঁর উপলব্ধির পথে আকর্ষণ করে। রবীন্দ্রনাথের জন্ম কলকাতার এক পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারে ১৮৬১। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। ১৮৮৭ সালে ষোল বছর বয়সে ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে প্রথম বাঙালি এবং প্রথম এশীয় হিসাবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ’ রূপে। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ভারতের জাতীয় সঙ্গীতও তাঁর লেখা। বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণে তিনি প্রচলিত ভারতীয় রূপকল্পের কঠোরতাকে বর্জন করে সহজ, সরল বর্ণনায় লেখা শুরু করেন। নানান রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে তিনি রচনা করেন উপন্যাস, ছোটগল্প, সঙ্গীত, নৃত্যনাট্য ও প্রবন্ধ। তাঁর হাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোটগল্পের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর লেখা ঘরে বাইরে, গোরা প্রভৃতি উপন্যাস; রক্তকরবী, অচলায়তন, বিসর্জন প্রভৃতি নাটক সময়ের গণ্ডী পেরিয়ে আজো পথ নির্দেশক। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর ভাবনাও তাঁকে অত্যন্ত উঁচু স্থানে নিয়ে গিয়েছে। তাঁর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সারাদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে । বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলের আয়োজনে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকছে নাটক, টকশো, কবিতা আবৃত্তি, সঙ্গীতানুষ্ঠান, প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ইত্যাদি। তবে পবিত্র রমজান মাসের কারণে অনুষ্ঠানমালাগুলো কিছুটা অনাড়ম্বর হবে। অবশ্য ঈদের পর নানা আয়োজনে এই দিনটি পালন করবে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।