পাহাড়ে অশান্তির মূলে ভূমির অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৯
অনিশ্চিত ভবিষ্যেক কেন্দ্র করে পাহাড় অশান্ত হয়ে উঠেছে। আর এই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে ভূমির অধিকারকে নিয়ে। সাথে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক নির্বাচনী ডামাডোল। কয়েকটি পক্ষ পার্বত্য এলাকায় যার যার অবস্থান থেকে তার অধিকার রক্ষায় আন্দোলনে নেমেছে। আর তাতে তৈরি হচ্ছে সংঘাত। গত কয়েক মাস প্রায় একটানা পাহাড়ে সংঘাত লেগেই আছে। গত এক বছরে অন্তত ৩২জন এই সংঘাতে মারা গেছেন। বর্তমানে পার্বত্য এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করতে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। এক পক্ষের এই সরকারের কাছেই প্রত্যাশা যে তাদের দাবি অন্য কোন সরকার হয়তো বাস্তবায়ন করবে না। ফলে এখনই আন্দোলন করে দাবি আদায় কর। আর অন্য পক্ষ মনে করছে এই সরকার এমন কিছু করবে যাতে তাদের স্বার্থ বলতে কিছুই থাকবে। সবমিলিয়ে অস্তিত্ব রক্ষা, ভূমি, সংস্কৃতি সর্বোপরি আন্তঃপরিচয় নির্ধারণের জন্য এক এক পক্ষ এক এক অবস্থান থেকে আন্দোলন শুরু করেছে। এক দিকে ভূমি কমিশন আইন আর অন্য দিকে সরকারের শেষ সময়। এই দুই মিলিয়ে আন্দোলন চাঙ্গা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার ও পাহাড়ীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনের নেতৃতকে কেন্দ্র করে দ্বিধাবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তাদের প্রতিপক্ষ ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)র মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ক্রমশ বাড়ছে। সমপ্রতি জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধি প্রিয় লারমা (সন্তু লারমা), পার্বত্য চট্টগ্রাম সংসদীয় ককাসের আহবায়ক সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বিভিন্ন আলোচনা সভায় বার বার বলছেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পাহাড় আবার অশান্ত হয়ে উঠবে। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে চুক্তির আগে যে পরিস্থিতি ছিল আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে। পার্বত্য এলাকায় পাহাড়িদের মধ্যে যেমন কয়েকটি পক্ষ আছে তেমনই আছে বাঙ্গালিদের মধ্যেও। শুধু বাঙ্গালি-পাহাড়ি দ্বন্দ্ব নয়। ভূমির অধিকার আদায়ে শংকিত যেমন বাঙ্গালি তেমনই পাহাড়িরাও। কোন কোন বাঙ্গালি মনে করছেন, ভূমি কমিশন আইন সংশোধন হলে পাহাড় থেকে তাদেরকে চলে যেতে হবে। এখানের জমি সব পাহাড়িদের দিয়ে দিতে হবে। কেউ মনে কবছেন, ‘আদিবাসি’ শব্দটি সাংবিধানিকভাবে মেনে নিলে এই অঞ্চল শুধু পাহাড়িদেরই হয়ে যাবে। ফলে কোনভাবেই ভূমি কমিশনের সংশোধন হতে দেয়া যাবে না। এবং ‘আদিবাসি’ শব্দটিও সাংবিধানিক অধিকারে আনা যাবে না। অন্যপক্ষ মনে করছেন, ভূমি কমিশন আইন যথাযথভাবে সংশোধন হচ্ছে না। এরফলে যেসব পাহাড়ি আগে ভূমির অধিকার হারিয়েছে তারা আবার অধিকার ফিরে পাবে না। তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে জনসংহতি সমিতির সুপারিশ অনুযায়ী আইন সংশোধন দরকার। আর ‘আদিবাসি’ শব্দটির সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যা যা বিষয় থাকা লাগে তার সব কিছুই আছে। তবে কেন ‘ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী’ শব্দ ব্যবহার হবে? ‘আদিবাসি’ শব্দটি সাংবিধানিকভাবে ব্যবহার না করলে নিজেদের পরিচয় ঠিকভাবে হবে না। মূলত এইসব অবস্থান থেকেই পাহাড়ে আবার অশান্তি দেখা দিয়েছে। আবার একটি পক্ষ সাধারণ বাঙ্গালি ও পাহাড়িদের মধ্যে সরকারের নেয়া কার্যক্রমকে মিথ্যা ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশ অশান্ত করে তুলছে। যারাই সেখানে অবস্থান করছে তাদের স্বার্থ বিরোধী কথা প্রচার করা হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে দ্রুত বিরোধ ছড়িয়ে পরছে। সরকারি দলের নেতারা বলছেন, পাহাড়ের সংগঠনগুলো সংশোধিত ভূমি আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিভ্রান্ত ও উত্তেজিত করে তুলছে। ফলে স্থানীয় আন্দোলনের যে কোন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালি ও পাহাড়িরা খুব সহজেই পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝিতে জড়িয়ে পড়ছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় জনসংহতি সমিতি ও তাদের প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফ এবং সন্তু লারমা বিরোধী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এখন রক্তক্ষয়ী আন্ত-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ গ্রুপের সশস্ত্র তত্পরতা, দফায় দফায় বন্দুকযুদ্ধ, চোরাগোপ্তা হামলা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ফের অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের আইনের সংশোধনীকে কেন্দ্র করে তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি-বাঙ্গালির মাঝে যখন ক্ষোভ দানা বাঁধছে ঠিক তখন চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ গ্রুপের কর্মীদের সশস্ত্র তত্পরতা, গ্রামাঞ্চলে পক্ষ-বিপক্ষের নেতাকর্মীর উপর সশস্ত্র হামলা, পাল্টাপাল্টি খুনের ঘটনা ও অপহরণ ইত্যাদি সহিংস ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ উদ্বেগ উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পাহাড়ে হঠাত্ সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসে নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। সামাজিক অস্থিরতাও যেন বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক মাস পাবর্ত্য এলাকায় অশান্তি বিরাজ করছে। মানববন্ধন, হরতাল, অবরোধ চলছেই। গত এক বছরে উভয় পক্ষের নিহত হয়েছেন অন্তত ৩২ জন নেতাকর্মী। এসময়ে পরস্পরের মধ্যে সশস্ত্র হামলা ও বন্দ্ধুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ২৮ বার, এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৫ জন ও অপহরণ হয়েছে ৯০ জন। সর্বশেষ বড় ধরনের অপহরণ ঘটনা ঘটে গত ৮ জুলাই। ঐদিন রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি এলাকা থেকে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবিতে টেলিটকের নিযুক্ত একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ৫ জন প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানকে অপহরণ করা হয়। সহিংস ঘটনার বেশিরভাগই সংঘটিত হয়েছে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়। এর মধ্যে গত এক বছরে বেশি নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছে এবং অপহরণ ঘটেছে রাঙ্গামাটির বরকল, শুভলং ও লংগদুতে। এ কয়টি এলাকায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৭ জন। বর্তমানে পাহাড়ি গ্রামগঞ্জে, যানবাহনে ও হাট-বাজারে একশ্রেণীর উপজাতীয় অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজের তত্পরতাও বেড়ে গেছে। পাহাড়ে এখন বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে যে দলগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের কাছে রয়েছে অত্যাধুনিক ভারি অস্ত্র। অর্থ আর অস্ত্রের যোগান পেয়ে সন্ত্রাসী এই দল খুব দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে তুলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভয়ংকর এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে খাগড়াছড়ির সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, বাবুছড়া, মেরুং, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, মহালছড়ি ও রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, কাউখালী, লংগদু, বরকল ও নানিয়ারচর উপজেলা। লক্ষ্যণীয় যে তিন পার্বত্য জেলায় গত কয়েক মাস সন্ত্রাসীদের তত্পরতা বেড়ে যাওয়ায় পার্বত্য এলাকার নিরাপত্তা প্রশ্নে প্রশাসনও চিন্তিত। প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষ যেন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা পার্বত্য এলাকার বাঙ্গালি পাহাড়ি সব ধরনের ব্যবসায়ীদের উপর চাঁদার হার বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগে জানা যায়, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের উপজাতীয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নির্যাতন করছে। এসব অস্ত্রধারীরা খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে গাড়ির চালক, হেল্পারকে হুমকি দেয়াসহ গাড়িতে থাকা মালের উপর থেকে নির্ধারিত চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেক গাড়ি চালক ও হেল্পার। জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেছেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ের আদিবাসিরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য নিজেরাই ব্যবস্থা নেবে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংঘাত বাড়ছে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় আদিবাসিদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে। বাড়ছে আদিবাসিদের ক্ষোভ। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র চলছে। সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না করে সরকার পরোক্ষভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উত্সাহিত করছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব তাদের উত্সাহিত করছে। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। লারমা বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ সরকার ৩ বছর ৮ মাস সময় পেয়েছিল। সেই সময়ে সরকারের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ দেখতে পাইনি। বর্তমান সরকার চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি । তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পাহাড়ের আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন বাড়ছে। পাহাড়ে অপহরণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আদিবাসীদের ক্ষোভ বাড়ছে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে পাহাড়ে নানাভাবে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। তিনি আরো বলেন, শান্তিচুক্তি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাবে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আদিবাসি বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার শান্তিচুক্তির আগের অবস্থায় চলে যেতে পারে। সেখানকার ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। এটাই ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করছে। ‘আদিবাসি’ শব্দটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগের ইশতেহারে একাধিকবার শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দটি নিয়ে যখন বিতর্ক শুরু হলো, তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুবিভাগ যুক্তি দেখিয়েছে, এই শব্দ ব্যবহার করা হলে বাংলাদেশকে অনেক আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। দেশে তা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করবে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শুনেছি, বাঙ্গালিরাই এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। কিন্তু ‘আদিবাসি’ ও ‘আদি বাসিন্দা’ এ দুটির অর্থ ভিন্ন। আদিবাসি শব্দের ভিন্ন মর্মার্থ রয়েছে।