ফ্যাক্টরি চালুর দাবিতে দাদা ম্যাচের শ্রমিকরা এবার ঈদের নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজপথে। ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিলে সাড়ে ১৭ কোটি টাকা বোনাস দেয়া হলেও মজুরি কমিশনের তৃতীয় কিস্তির টাকা পরিশোধের মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে গেছে। নিউজপ্রিন্টসহ বন্ধ মিল-কলকারখানা চালু নিয়েও চলছে দোদুল্যমনতা। টেক্সটাইল পল্লী চালুর উদ্যোগও অনিশ্চয়তার জালে বন্দী। এ রকম এক অবস্থার মধ্য দিয়ে এবার শিল্পনগরী খুলনার শ্রমজীবী মানুষ ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে অনেকটা উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে খুলনার শিল্প এলাকায়।
খুলনার ঐতিহ্যবাহী দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি বর্তমান সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে গেছে। এ মিলের মালিকানা এখন সরকারের হাতে। আড়াই বছর আগে নগরীর খালিশপুরের জনসভায় বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিসিআইসির আওতায় দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি আজও চালু হয়নি। ইতিমধ্যে দাদা ম্যাচের অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বেতন-বোনাস না পেয়ে ৪০ জন সিকিউরিটি গার্ডের মধ্যে ৩০ জনেরও বেশি গার্ড ফ্যাক্টরি ছেড়ে চলে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সরকারের নিকট বারবার স্মারকলিপি প্রদান, আন্দোলন-সংগ্রাম, শিল্পমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্সহ নানা কর্মসূচি পালন করেও শ্রমিকরা এখনো সরকারের মন গলাতে পারেনি। সর্বশেষ গত শুক্রবার মিলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ঈদের আগে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি চালু করার আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোন সাড়া মেলেনি। যে কারণে আগামী ঈদ-উল-ফিতরের দিন এক সময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠান দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা মিলের সামনের রাজপথে ঈদের নামাজ আদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির এ অবস্থা হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা এবার ঈদ বোনাস পেয়েছে। সোমবার খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৯টি পাটকলে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা বোনাস প্রদান করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তারপরও রাষ্ট্রায়ত্ত এসব জুটমিলগুলোর শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সূত্রমতে মজুরি কমিশনের তৃতীয় কিস্তির টাকা গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে পরিশোধের কথা থাকলেও গত সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজেএমসির চেয়ারম্যান শ্রমিক নেতাদের কাছে এ মাসের শেষদিন পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। সোমবার দুপুরে ঢাকাস্থ বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের ১৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, বিজেএমসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদ মজুরি কমিশনের বকেয়ার তৃতীয় কিস্তির টাকার জন্য চলতি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সময় চান। তিনি বলেন, ৭ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে মিলগুলো বন্ধ থাকবে। বন্ধের পর মিলগুলো খুললেই ব্যাংকের সিসি ঋণের টাকা ছাড় হওয়ার পর শ্রমিকদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করা হবে। সে পর্যন্ত শ্রমিকদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান বিজেএমসি চেয়ারম্যান। কয়েকজন শ্রমিক নেতা জানান, বিজেএমসির চেয়ারম্যানের অনুরোধ তারা শ্রমিকদের জাননোসহ এ মাসের শেষদিন পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ জানাবেন।
এশিয়ার বিখ্যাত কাগজকল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল চালু করা নিয়েও চলছে নানা দোদুল্যমানতা। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া খুলনা টেক্সটাইল মিলের জায়গায় টেক্সটাইল পল্লী স্থাপনও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় খুলনার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অনেকটা হতাশা কাজ করছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিল ও বন্ধ মিল-কলকারখানাগুলো ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন জুটমিলগুলোতেও চলছে অস্থিরতা।
ব্যক্তি মালিকানাধীন জুটমিল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-বোনাসের দাবিতে এ্যাজাক্স, সোনালী, শিরোমনি জুট স্পিনার্স ও আফিল জুট মিল গেটে গত রবিবার শ্রমিকদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি কমিশনের আলোকে বর্ধিত বেতন ও বোনাস ঈদের আগে প্রদানের জন্য মিল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, তা না হলে রাজপথে ঈদের নামাজ আদায়সহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে খুলনা অচল করে দেয়া হবে। এছাড়া শিরোমনি শিল্পাঞ্চলের বন্ধ হয়ে যাওয়া মহসেন জুট মিল চালুর কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এতে মিলের প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে। মিল চালু এবং বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা মিলগেটে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরাও রাজপথে ঈদের নামাজ আদায় করবে বলে জানা গেছে।
