পাহাড়ে লাশের মিছিল দেখতে চাই না

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৯
এবার আবারও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তাতে মা-মেয়েসহ দুজনের করুণ মৃত্যুও হয়েছে। গত কয়েক বছরে পাহাড় ধসের ঘটনায় কমপক্ষে দুই শ’ পঞ্চাশ জনের মতো লোক মারা গেছে। বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলেই শুধু প্রশাসনিকভাবে নড়াচড়া শুরু হয়। এত লাশের পরও নেওয়া হয়নি কার্যত কোনো ব্যবস্থা। এর দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? ভাগ্যবঞ্চিতদের রক্ষায় কেন সরকার এগিয়ে আসছে না? কেন তাদের মুত্যৃকূপ থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না? এ প্রশ্ন কার কাছে করবো? প্রাকৃতিক পরিবেশ যখন বিনষ্ট করা হয় তখন প্রকৃতি তার মারাত্মক প্রতিশোধ গ্রহণ করে। সে দৃশ্য আমরা দেখলাম। পাহাড় ধস এবং প্রবল বর্ষণে পার্বত্যাঞ্চলে যে মৃত্যুর মিছিল আমরা দেখলাম তার পেছনে প্রশাসনিক গাফেলতির কারণই উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়। সেখানে সতর্ক বার্তা হিসেবে মাইকিং করলেও ভুক্তভোগীদের বিকল্প কোনো থাকার জায়গার ব্যবস্থা না থাকার কারণেই মূলত এ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে তারা। পাহাড় হলো পৃথিবীর খিলানস্বরূপ। মাটির জমাট বাঁধা পাহাড় যখন কাটার মহোত্সব চলে তখন প্রবল বর্ষণ হলে মাটির ওপরের আবরণ না থাকায় যে পানি প্রবল বেগে নিচে ধাবিত হয় তার সঙ্গে মাটি নিয়ে এসে পাহাড়ের পাদদেশে আছড়ে পড়ে। আর তখনই ঘটে মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনা। ২০০৭ সালে যখন পাহাড় ধসে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয় তখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সে আলোকে প্রশাসনিক আর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ধসের মূল কারণ হলো—পাহাড় থেকে মাটি কাটা পাহাড়সমূহ ৩০ ডিগ্রির বেশি ঢালু হলে সে পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হয়। সেখানে রয়েছে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঢালু। ২০০৭ সালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর পাহাড়ের পাদদেশে গাইডওয়ালসহ শক্ত প্রটেকশন করার কথা থাকলেও নেওয়া হয়নি কার্যত কোনো ব্যবস্থা। আর সে কারণেই প্রবল বৃষ্টিপাত এবং ভূমিকম্পের দরুন এরকম মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলো। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় ভবিষ্যতে যাতে এরকম ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু তদন্ত কমিটির পরামর্শের আলোকে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে তা কীভাবে রোধ করা যাবে। প্রশাসনে যাঁরা আছেন তাঁরা যেন সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করে পাহাড়ের মৃত্যুর মিছিল রোধ করতে বড় ধরনের ভূমিকা নেন। কী ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিল তা ভাবা যায় না। রাষ্ট্রের কাছে হতভাগ্যরা কোনো সহযোগিতা পাননি। আমরা কোথায় বাস করছি? যাঁরা সেখানে বসবাস করছেন তাঁরা হয়তো নিরুপায় হয়েই জীবন বাজি রেখে বসবাস করছেন। কিন্তু প্রশাসন ব্যবস্থা কেন তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেনি? কেন পাহাড়ের পাদদেশে শক্ত প্রাচীর নির্মাণ করে দেয়নি? সবচেয়ে যে বিষয়টি ভয়াবহ তা হলো পাহাড়ের মাটি কেটে পাহাড়টাকে বিপজ্জনক করে ফেলা। কারা পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে পাহাড়কে মৃত্যুকূপে পরিণত করছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। একই ঘটনা বার বার ঘটবে আর পাহাড়ে মানুষের লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এটা হতে পারে না। পাহাড় ধস, প্রবল বর্ষণ, জলাবদ্ধতা এবং ভূমিকম্পের কারণে পার্বত্যাঞ্চলে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে দেশের মানুষ আতঙ্কিত। সাধারণ বর্ষণেই যদি এতোগুলো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে তাহলে ভয়াবহ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বড় কোনো ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটলে দেশের মধ্যে কী ধরনের অবস্থা হবে তা ভাবলেই গা শিউড়ে ওঠে। আগের ঘটনা থেকে পাহাড়ের মানুষগুলো শিক্ষা নেয়নি বলেই তাদের এ করুণ পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে। এ ঘটনায় একটি কথা স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো আবার ভূমিধস ফিরে আসবে। পাহাড়ে এখন যারা বসবাস করছে তারা অতিসত্বর অন্যত্র আশ্রয় নিতে হবে। পাহাড়ের আক্রোশ থেকে তাদের রেহাই নেই। পাহাড়ের যত্রতত্র থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। খাড়া পাহাড় থেকে যখন তীব্র বর্ষণের ধারা প্রবাহিত হয় তখন গতি থাকে বেশি। আর মাটি কেটে ওপরের শক্ত আবরণ তুলে নেওয়ায় প্রবাহিত পানির তোড়ে মাটি নরম হয়ে পাদদেশে পড়ে বিপর্যয় ডেকে আনে। এ ঘটনায় হয়তো তদন্ত কমিটি গঠন হবে আর আগের মতোই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও প্রশাসনিক জটিলতার লাল ফিতায় বন্দি হয়ে কোনো সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে সরকার বিরত থাকবে। আবার একটি ঘটনা ঘটবে আবার তোড়জোড় শুরু হবে। এ নিয়তির জালেই যেন পাহাড়ের মানুষের ভাগ্যলিপি বন্দি। তাই সরকারের কাছে আমরা প্রত্যাশা করবো— কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে মৃত্যুকূপ থেকে পাহাড়ের মানুষগুলোকে রক্ষা করা হবে। পাহাড়ে এখন যারা বিপদজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে তাদেরকে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা পাহাড়ে আর লাশের মিছিল দেখতে চাই না। নারায়ণগঞ্জ