চট্টগ্রাম নৌ-বন্দরের বহির্নোঙ্গর এলাকায় বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর উদ্ধার তত্পরতায় কোনো গতি নেই। বহু ‘স্যালভেজ টিম’ (উদ্ধারকারী সংস্থা) ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের কাজ পেয়েও কাজে নামেনি কিংবা কাজ শুরু করলেও শেষ না করেই চলে গেছে। এদিকে ডুবে যাওয়া জাহাজের ভাঙা লোহা-লক্কড়ের খোঁচায় বিভিন্ন সময় পণ্যবাহী জাহাজের তলদেশ ছিদ্র হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া পলি জমে সাগর মোহনায় নাব্যতা কমছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে ডুবে যাওয়া অন্তত ১৩টি জাহাজের ব্যাপারে দৈনিক সতর্ক বার্তা জারি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী দেশি-বিদেশি জাহাজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ‘নোটিস টু মেরিনার্স’ শিরোনামে এই সতর্ক বার্তা জারি রয়েছে। সেখানে চিহ্নিত বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে জাহাজ চালানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ পর্যন্ত ডুবে যাওয়া ১৩টি জাহাজের মধ্যে মাত্র কয়েকটি জাহাজ উদ্ধার করা হলেও বাকিগুলোর ক্ষেত্রে কাজে ধীরগতির কারণে উদ্ধার অভিযান সফল হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ব্যর্থ স্যালভেজ টিমগুলো বন্দর চ্যানেল ও সমুদ্রে প্রতিকূল পরিবেশের দোহাই দিয়ে কাজ পরিত্যাগ করেছে। কোনো কোনো স্যালভেজ টিম শীতকালে শান্ত আবহাওয়ায় উদ্ধার কাজে ফিরে আসার কথা বলে পাততাড়ি গুটিয়ে একবারেই চলে গেছে। আবার কয়েকটি জাহাজ উদ্ধারে এখন পর্যন্ত কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি।
বেসরকারি ‘বে অব রয়েল শিপিং’-এর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোস্তফা ইত্তেফাককে জানান, যখন কোনো জাহাজ ডুবে যায় সে জাহাজটি সমুদ্র তলদেশের ভেতরের স্রোতের কারণে সেই জায়গায় থাকতে পারে না। ডুবে যাওয়া জাহাজ দ্রুত উদ্ধার করাই জরুরি। কারণ ঐসব জাহাজের ধাক্কায় ভাল জাহাজের তলদেশ অনেক সময় ফুটো হয়ে যায়। কখনো নোঙর করে থাকা জাহাজের শিকল ডুবে যাওয়া জাহাজের ভাঙা অংশের সাথে পেঁচিয়ে যেতে পারে। জোয়ার-ভাটার প্রচণ্ড স্রোতের সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা বেশি থাকে। তাছাড়া ডুবে যাওয়া জাহাজের কারণেই চ্যানেল কিংবা বহির্নোঙ্গরে ব্যাপক ‘সিলটেশন’ (পলি জমে) হয়ে নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ঘন ঘন ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে আর্থিক ব্যয় বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনায় ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের নামে কিছু অপেশাদার লোক জাহাজের লোহা-লক্কড় এলোপাতাড়িভাবে কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে কিছু ডুবে যাওয়া জাহাজ বিপজ্জনকভাবে থেকেও থাকতে পারে। সেসব জাহাজের ভাঙা অংশের খোঁচায় হয়তো কোনো কোনো জাহাজের তলা ফুটো হয়ে যেতে পারে।
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন নাজমুল আলম এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে বর্তমান মুহূর্তে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই। কারণ কোনো কোনো জাহাজকে ডুবে যাওয়া স্থান থেকে টেনে উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে উদ্ধারের জন্য সরিয়ে রাখা হয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরের মাঝখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চাউল নিয়ে ডুবে যাওয়া ভিয়েতনামী জাহাজ এমভি হোয়াং রো ডোম-এর উদ্ধার কাজ এখনো শেষ হয়নি। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পরপরই প্রান্তিক মেরিনার্স নামের একটি উদ্ধারকারী সংস্থাকে উদ্ধারের দায়িত্ব দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটি কবে কাজ শেষ করতে পারবে নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বন্দরের লাইটারিং ও মুরিং বিভাগের কর্মকর্তা ইফতেখার উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, ডুবে যাওয়া জাহাজ এস.এস থেটিককে উদ্ধারের জন্য স্থানীয় একটি স্যালভেজ সংস্থাকে গত তিন চার মাস আগে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তাদের আগামী এক বছরের মধ্যে উদ্ধার কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। পতেঙ্গার পশ্চিমে বহির্নোঙ্গর আলফা ও বিটা পয়েন্টের মাঝখানে ডুবে যাওয়া লাইটারেজ জাহাজ এস এস বিশ্বকুসুম উদ্ধারে যে সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। একাত্তর সালে ডুবে যাওয়া জাহাজ এস এস কাওয়ানার উদ্ধার কাজ চলছে নিরাপদ এলাকায়। জাহাজটির আর সামান্য অংশ কেটে সরিয়ে ফেলার কাজ বাকি রয়েছে। প্রায় আট দশ বছর আগে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ডুবে যাওয়া জাহাজ এমভি লিটা এবং এমভি টিনা উদ্ধারে পতেঙ্গার উপকূলীয় চরের কাছে কাজ চলছে। তার মধ্যে ডুবে যাওয়া এমভি কাদের জাহাজের উদ্ধার কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রতি বন্দর চ্যানেলের বাইরে কাফকো জেটির সামনে ডুবে যাওয়া লাইটারেজ জাহাজ এমভি হেং জেং-এর উদ্ধার কাজ ঈদের পর শুরু হবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডুবে যাওয়া বিআইডব্লিউটিসির বার্জটি এখন চ্যানেলের তলদেশে পলির নীচে চাপা পড়ে গেছে বলে জানা গেছে। এটি উদ্ধারে এ যাবত্ কোনো স্যালভেজ টিমই রাজি হয়নি। তিন চার বছর আগে কুতুবদিয়ার কাছে ডুবে যাওয়া আবুল খায়ের গ্রুপ অব কোম্পানির জাহাজ এমভি টিটু-৯ কোম্পানির নিজস্ব উদ্ধারকারী দলই উদ্ধার করছে। এমভি বেঙ্গল ব্রিজ জাহাজটি উদ্ধার হয়েছে, তবে এমভি ইউনাইটেড স্টার নামের ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে নিয়োজিত স্যালভেজ টিম কাজ না করে চলে গেছে। ডুবে যাওয়া লাইটারেজ জাহাজ এমভি ফিরোজা-ফারজানাকে উদ্ধারে নিয়োজিত সংস্থা উদ্ধার কাজ চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া পতেঙ্গা উপকূলের কাছে ডুবে যাওয়া জাহাজ এমভি ফরচুনকে উদ্ধারের জন্য স্থানীয় একটি স্যালভেজ সংস্থাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে বন্দর কর্মকর্তারা জানান।
প্রসঙ্গত সরকারের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তক্রমে চট্টগ্রাম বন্দরে ডুবে যাওয়ার পর এখনো উদ্ধার না হওয়া যেকোনো জাহাজ যেকোনো স্যালভেজ টিমের পক্ষে স্বউদ্যোগে উদ্ধারে কোনো ধরনের বাধা নেই। এজন্য বন্দরকে অর্থও দিতে হবে না। ‘যেখানে পাও তুলে নিয়ে যাও’ ভিত্তিতে তারা কাজ করবে। তবে যেসব জাহাজ উদ্ধারে কেউ আসে না বন্দর কর্তৃপক্ষ সেক্ষেত্রে দরপত্রের মাধ্যমে স্যালভেজ টিম নিয়োগ করে থাকে।
