হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের ৫টি নির্বাচনী এলাকাতেই নির্বাচনী হাওয়া ব্যাপক জোরে বইছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিকদের মধ্যে সংশয় বা দোলাচল দেখা গেলেও জেলার সম্ভাব্য প্রার্থীরা বসে নেই। রমজান মাসে ইফতার মাহফিলসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধান দুই জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ডিজিটাল ব্যানার, বিলবোর্ড ও পোস্টার শোভা পাচ্ছে গোটা সুনামগঞ্জ জুড়ে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও সজীব ওয়াজেদ জয় ও লন্ডনে দেয়া তারেক রহমানের বক্তব্য নিয়ে চায়ের দোকানে ঝড় তুলছেন। নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় কর্মসূচিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রধান দুই দলই। ১৮ দল ঈদের পর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা তৃণমূল কর্মীদের সংগঠিত করছে। ১৮ দলকে ঠেকাতে একেবারে বসে নেই ১৪ দলও।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ইত্তেফাককে বলেন, মানুষ এখন নির্বাচনমুখী। নির্বাচন ছাড়া শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ নেই।
গত চারদিন সুরঞ্জিত তার নির্বাচনী এলাকা (সুনামগঞ্জ-২) দিরাই-শাল্লায় বেশ কয়েকটি ইফতার মাহফিলসহ দলীয় কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন। তার উপস্থিতি চাঙ্গা করে সেখানকার আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গত রবিবার সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ইনামুল কবীর ইমন আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলেও যোগ দেন। ইফতার মাহফিলে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের দাওয়াত করা হয়। ইফতার মাহফিলটি বহুবিভক্ত জেলা আওয়ামী লীগকে একত্রিত করার প্রয়াস ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, জেলার ৫টি আসনই মহাজোটের থাকবে যদি সবাইকে এক কাতারে আনা যায়। এজন্য জেলা সভাপতি আলহাজ্ব মতিউর রহমানকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ইফতার মাহফিল প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার ইমন ইত্তেফাককে বলেন, এই শহরের মানুষ একে অপরের আত্মীয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও গর্ব করার মত। সম্প্রীতির এ শহরে সবাই মিলে ইফতার করা আনন্দ ও পুণ্যের বিষয়।
১৪ দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, হেফাজত ইস্যুটি নিয়ে অপপ্রচারের জবাব দিতে পারলে আগামী সংসদ নির্বাচনে সবকটি আসন ধরে রাখতে পারবেন তারা। জেলার ধর্মীয় নেতারা অনেক সচেতন। তারা প্রকৃত অবস্থা বুঝেন।
২০০৮ সালে এ জেলার ৫টি আসনে মহাজোট জয় পেয়েছিল। এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সবকয়টি আসন উদ্ধারে মরিয়া। তারা বলছেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল ভাটি এলাকায়ও প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি ১৪ দলও যে অনুভব করছে না তাও নয়। সব কিছু মাথায় নিয়ে তারা এগুচ্ছেন। সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ট্রাস্টের সেক্রেটারি মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান বলেন, ১৪ দলকে প্রার্থী নির্বাচনে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট হায়দর চৌধুরী লিটন ইত্তেফাককে বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে এবং অপপ্রচারের জবাব দিতে ব্যাপকভাবে মাঠে নামতে তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ হচ্ছে।
স্থ্থানীয় বিএনপি গত চার বছর সরকার বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি দলীয় কোন্দল, দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকলেও এখন এগুলো একটু কমেছে। বিএনপির একাংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক আছপিয়া। অপর অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন চৌধুরী ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরিন। নাসির চৌধুরী হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতলে চিকিত্সাধীন। দেওয়ান জাকেরিন দেশের বাইরে। উপর থেকে দেখলে এই মুহূর্তে বিএনপিতে কোন কোন্দল নেই।
জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক আছপিয়া ইত্তেফাককে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে দেশ এক্যবদ্ধ। বেগম জিয়ার নির্দেশনায় মাঠেই আছি। ঈদের পর আন্দোলন আরো বেগবান হবে।
জেলা কৃষক দলের সভাপতি আ ত ম মিছবাহ বলেন, সিটি নির্বাচনে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে, এই সরকারকে তারা চায় না। ঈদের পর তত্ত্বাবধায়কসহ গণদাবি আদায়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হবে কৃষক, মজুর ও সাধারণ মানুষ নিয়ে।
সুনামগঞ্জ-১:(ধর্মপাশার ১০টি, তাহিরপুরের ৭টি ও জামালগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন) ২০০৮ সালের নির্বাচনে ১৮ দলের প্রার্থী বিএনপি নেতা ডা. রফিক চৌধুরী ও নজির হোসেনকে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এবারো এই তিন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী। এক্ষেত্রে বিএনপির ডা. রফিক একটু বেশি এগিয়ে আছেন। এর আগে ২০০১ সালে সুরঞ্জিত সেনকে হারিয়ে বিএনপির টিকিটে নজির হোসেন জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু গত নির্বাচনে ডা.রফিক বিএনপির মনোয়ন পেয়েছিলেন। নজির হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হন। ফল যায় আওয়ামী লীগের ঘরে।
বলা হয়ে থাকে আসনটি আওয়ামী লীগের জন্য উর্বর। এবারো তাই এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ডজন খানেক নেতা মনোনয়ন চাইছেন। এদের বেশিরভাগই তরুণ ও ত্যাগী। প্রবীণদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুল হক, ধর্মপাশা উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়াল, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট হায়দর চৌধুরী লিটন, জামালগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার, আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান সেলিম, অ্যাডভোকেট রঞ্জিত সরকার, শামীম আহমদ, এমদাদ হেসেন প্রমুখ। আবার এ আসনে উপরের সীদ্ধান্তে প্রার্থী নির্বাচনে নাটকীয় কোন পরিবর্তন আসতে পারে এমনও আভাস রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশায় রয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যন আনিসুল হক, অ্যাডভোকেট ফারুক আহমদ, সাংবাদিক ওমর ফারুক আল হাদী, মোত্তালেব খান প্রমুখ।
সুনামগঞ্জ -২: ( দিরাইর ১টি পৌরসভা, ৯ ইউনিয়ন ও শাল্লার ৪ টি ইউনিয়ন) দপ্তর বিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে ১৭ হাজার ৪০৪ ভোটে হারিয়েছিলেন। এখানকার বাসিন্দারা আবারও দুই প্রার্থীর প্রতিযোগিতা দেখতে প্রস্তুত।
হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর মাঝখানে অন্য কারো নাম তেমন শোনা যাচ্ছে না এলাকায়। বলা হয়ে থাকে এলাকার সংখ্যালঘুদের ভোটই সুরঞ্জিতের সম্বল। এ কথা সম্পূর্ণ সত্য নয় বলে জানান তার সমর্থকরা। তারা বলেন, সুরঞ্জিতকে জাতীয় নেতা হিসাবেই সকলেই জানে। তার কাছে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। এবারের নির্বাচনে নানা করণে সুরঞ্জিত সেন ‘চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন’ হবেন বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। সাধারণ মানুষ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে রায় দেবে তা মেনে নিব।
সুনামগঞ্জ-৩:(জগন্নথপুর ১টি পৌরসভা, ৮টি ইউনিয়ন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন)। বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের এম.এ মান্নান। সাবেক আমলা। এলাকায় তার বদনাম নেই। তিনি গত নির্বাচনে ৪ দলীয় জোট প্রার্থী জামায়াত নেতা শাহিনূর পাশা চৌধুরীকে পরাজিত করেন। এবারও এই দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন-দলীয় মনোনয়ন পেলে। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আবদুস সামাদ আজাদের পুত্র আজিজুস সামাদ ডন। জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমনের নামও এলাকায় শোনা যাচ্ছে। তার পিতা আব্দুর রইছও আওয়ামী লীগ থেকেই এই আসনে জয় লাভ করেছিলেন। ক্লিন ইমেজ পিতার ক্লিন সন্তান ইমনকে নিয়ে এলাকার মানুষও স্বপ্ন দেখছে। তবে ইমন বলেছেন এসব বিষয়ে নেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসাবে কর্নেল (অব.) সৈয়দ আলী আহমদ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ, মালেক খানের নাম আলোচনায় আসছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারেন মাহবুবুর রহমান মকু। এই এলাকায় বেশ কয়েক জন প্রবাসীও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
সুনামগঞ্জ-৪: ( সুনামগঞ্জ পৌরসভা, সদরের ১৭ ইউনিয়ন, বিশ্বম্ভরপুরের ৫টি ও দোয়ারা বাজারের ১টি ইউনিয়ন) জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মতিউর রহমান বর্তমান সংসদ সদস্য । ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী জাপার মমতাজ ইকবাল, বিএনপির সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়াকে হারিয়ে জয় লাভ করেন। কিছুদিন পর মমতাজ ইকবাল মারা গেলে উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করেন মতিউর রহমান। এবারও তিনি প্রার্থী হবেন। মতিউর রহমান চাঁদাবাজি,সন্ত্রাসসহ নানা অপকর্ম বন্ধ করতে সকলকে নিয়েই মাঠে কাজ করছেন। তিনি নিজ উদ্যোগে উত্তর সুরমায় ‘মতিউর রহমান কলেজ’ স্থাপন, খরচার হাওরে রাবার ড্যাম, আউশা ও বালিকান্দিতে দুটি স্লুইস গেইট নির্মাণ ও বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যুতায়নসহ অনেক উন্নয়ন কাজ করেছেন। যা আলোচনায় রয়েছে। জেলার প্রাণের দাবি সুনামগঞ্জ সুরমা ব্রিজের অসমাপ্ত কাজও বহুগুণ এগিয়ে এনেছেন। মতিউর রহমান বলেন, ব্রিজের বাকি কাজ এই সময়ের মধ্যেই শেষ হবে।
এবার এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আফতাবউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক নূরুল হুদা মুকুট, রেডক্রিসেন্ট সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান পীর ও ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমন।১৮ দল থেকে বিএনপির সাবেক হুইপ ফজলুল হক আসপিয়া এবারও প্রার্থী হবেন। দলের হাইকমান্ডের কাছে তিনি বেশ পরিচিত। দলের আস্থাভাজন নেতা তিনি।
সদর উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনও প্রার্থী হতে পারেন বিএনপি থেকে। তারও রয়েছে পারিবারিক সুনাম। সাবেক দুই সংসদ সদস্য দেওয়ান জয়নাল আবেদীন ও অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ-৫ : বর্তমান এমপি মুহিবুর রহমান মানিক। আগামী নির্বাচনেও তিনি ১৪ দলের প্রার্থী হতে পারেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারেন বিএনপির সাবেক এমপি কলিমউদ্দিন মিলন। এবার অবশ্য এই আসনে প্রধান দুটি দলের দুই তরুণ স্ব-স্ব দলের মনোনয়ন পাবার আশায় কাজ করছেন মাঠে। ছাতক পৌর মেয়র কালাম চোধুরী আওয়ামী লীগের ও ছাতক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী।
এছাড়াও ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মুনসিফ আলী বেশ কয়েক বছর আগ থেকে মাঠে সমাজ সেবামূলক কাজ করছেন। তিনি বিএনপির মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। জাপা নেতা আ,ন,ম,ওহিদ(কনা মিয়া) ও প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকের নাম শুনা যায়।
