বিদায় মাহে রমজান

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫১
আজ ২৮ রমজান। সর্বত্র পবিত্র রমজানুল মোবারকের বিদায়ী আবহ ও চারিদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের সাজ সাজ খুশির রব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রোজাকে বিদায় জানাতে ঈমানদার রোজাদারগণের মন এক অব্যক্ত বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। কেননা রমজানে গোনাহ মাফের যে অবাধ সুযোগ ও আল্লাহর অবারিত করুণাধারা বহমান ছিলো তার জন্য আবার একটি বছর আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ঈদের দিনে নির্মল আনন্দ করতে কোনো নিষেধ নেই। বিখ্যাত তাবেঈন আল্লামা মুজাহিদ (রহ.) বলেন, রমজানের শেষ দশকের রাতের মত ঈদুল ফিতরের রাতও মাহাত্ম্যপূর্ণ। এ কারণেই মনে হয় প্রসিদ্ধ তাবেঈন (কারো মতে সাহাবী) আবদুর রহমান ইবনে আসওয়াদ বলেন, ঈদুল ফিতরের রাতে অন্যদের মত দুনিয়াবী রং-ঢংয়ে রোজা পালনকারীদের মত্ত থাকা কোনমতেই চলবে না। বরং পারতপক্ষে ঐ রাত নফল ইবাদতে কাটানো উচিত। আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, একথা বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (স.) সর্বপ্রথম যে ঈদের সালাত পড়েন তা হলো দ্বিতীয় হিজরীতে। তারপর থেকে তিনি দুনিয়া ত্যাগ করা পর্যন্ত আজীবন দু’ঈদের সালাত পড়েন (তালখীসুল হাবীর ১৪২ পৃঃ)। তাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতে এ সালাত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। কিন্তু বিভিন্ন হাদীসের বাহ্যিক ভাব বলে যে, এ সালাত ওয়াজিব বা অপরিহার্য। কারণ, নবী (স.) এবং তারপরে খোলাফায়ে রাশেদীন এ সালাত পড়ার জন্য নারীদেরকেও বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর এ নির্দেশও প্রমাণ করে যে, সালাতটি ওয়াজিব (সুবুলুস সালাম, ১ম খণ্ড ১৭৩ পৃঃ)। রসূলুল্লাহ (স.) দু’ঈদের দিনে গোসল করতেন (ইবনে মাজা ৯৪পৃঃ)। তারপর তিনি সবচেয়ে সুন্দর কাপড় পরতেন। কখনো তিনি সবুজ রংয়ের চাদর পরতেন (নাসাঈ ১ম খণ্ড-১৭৮ পৃঃ)। আবার কখনো লাল ফুলের বুটি দেয়া চাদর পরতেন (যাদুল মা’আদ ১ম খণ্ড-১২১পৃঃ)। জাবির (রা.) বলেন, দু’ঈদে ও জুমআতে নবী (স.) তাঁর লাল বুটি দেয়া বিশেষ চাদরটি পরতেন (ইবনে খুযায়মা, নায়লুল আওতার ৩য় খণ্ড-১৬৬ পৃঃ)। প্রত্যেক ঈদে তিনি এক বিশেষ ইয়েমেনী চাদর পরতেন (কিতাবুল উম্ম ২০৬ পৃঃ)। তারপর তিনি সর্বোত্তম খুশবু লাগাতেন (হাকিম, ফতহুল আল্লামা ১ম খণ্ড -২২১ পৃঃ)। তিনি বেজোড় খেজুর খেয়ে ঈদুল ফিতরের জন্য সকালে ঘর থেকে বের হতেন (বুখারী ১৩০ পৃঃ)। এবং ঈদুল আজহার দিনে সালাত না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না (তিরমিযী ১ম খণ্ড-৭১ পৃঃ, ইবনে মাজাহ, মেশকাত ১২৬ পৃঃ)। হজরত আলী (রা.) বলেন, সুন্নত হল ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া (তিরমিযী ১ম খণ্ড-৬৯ পৃঃ, বুলুগুল মারাম ৩৫ পৃঃ)। তাই তিনি হেঁটে ঈদগাতে যেতেন এবং হেঁটেই বাড়ি ফিরতেন (ইবনে মাজাহ ৯৩)। তিনি এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং অপর রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন (ইবনে খুযায়মা ২য় খণ্ড, ৩৪৩ পৃঃ) এবং ঘর থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত তিনি তাকবীর দিতে দিতে যেতেন (হাকিম, তালখীসুল হাবীর, ১৪২ পৃঃ)। হাসান ইবনে আহমাদ আলবান্না কিতাবুল আযাহীতে বর্ণনা করেছেন, নবী (স.) আমাদেরকে নিয়ে ঈদুল ফিতরের সালাত পড়েন তখন সূর্য দু’বল্লম ওপরে ছিল এবং সূর্য এক বল্লম ওপরে থাকাকালীন ঈদুল আজহা পড়ান (তালখীসুল হাবীর ১৪৪ পৃঃ)। সে যুগে ঘড়ি আবিষ্কৃত না হওয়ায় সাহাবিগণ একটা অনুমান করে এক ও দুই বল্লমের কথা বলে সময়টা বোঝাতে চেয়েছেন। অন্য এক সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে বুশর (রা.) একদা ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা পড়তে বের হন। অতঃপর ইমাম সাহেব দেরি করায় তিনি বিরক্ত প্রকাশ করেন এবং বলেন, এ সময়েই আমরা (রসূলুল্লাহর যুগে) সালাত পড়ে বাড়ি ফিরে যেতাম। এটা হল ইশরাকের সময়। মুসনাদে আহমাদ, আবু দাঊদ ১ম খণ্ড-১৬১ পৃঃ, ইবনে মাজাহ ৯৪ পৃঃ, হাকিম ১ম খণ্ড-২৯৫ পৃঃ, ও বায়হাকী, মিরআত ২য় খণ্ড -৩৪৫ পৃঃ আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, নবী (স.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে যেতেন (বুখারী, ১৩১ পৃঃ, মুসলিম ১ম খণ্ড-২৯০ পৃঃ, মিশকাত ১২৫পৃঃ)। আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, একবার বৃষ্টি হওয়ায় নবী (স.) সবাইকে নিয়ে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েন (আবু দাঊদ ১ম খণ্ড-১৬৪ পৃঃ, ইবনে মাজাহ ৯৪পৃঃ, মেশকাত ১২৫পৃঃ)। উক্ত দু’টি হাদীস প্রমাণ করে যে, কোন এক মাঠেই ঈদের সালাত পড়া উত্তম ও সুন্নাত। তবে বৃষ্টি হলে এবং মাঠে সালাত পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে ঈদের সালাত পড়া যাবে। হানাফী, মালিকী ও হাম্বলীদের অভিমত তাই। মদীনার পূর্বদিকে মসজিদে নববী থেকে রসূলুল্লাহ (স.) এর ঈদগাহ ছিল এক হাজার হাত দূরে। ওমর ইবনে শিবহে আখবারে মদীনাতে এ বর্ণনা দিয়েছেন (ফতহুল আল্লামা ১ম খণ্ড ২১৭পৃঃ)। একবার ব্যতীত আজীবন রসূলুল্লাহ (স.) ঐ ঈদগাহে ঈদের সালাত পড়েছেন। সুতরাং ঈদের আনন্দে আমরা যেন ইবাদত বন্দেগী না ভুলে যাই বরং রমজানের এই বাকি সময়টুকু অধিক ইবাদত বন্দেগী ও তওবাহ এস্তেগফারের মাধ্যমে অতিবাহিত করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক দান করুন, আমীন। e-mail : [email protected]