রমজান মাসে দুধের চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় পাবনা অঞ্চলের একশ্রেণীর অসাধু দুধ ব্যবসায়ী প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার লিটার ভেজাল দুধ তৈরি করে স্থানীয় হাট-বাজার ও বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিন প্রায় পনের শত লিটার ভেজাল ঘি বাজারজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, ৪০ টাকা প্রতি লিটার দুধ রমজান মাসে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এই সুযোগে পাবনা অঞ্চলের প্রায় ৪০টি ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভেজাল দুধ তৈরি হচ্ছে। ছানার পানি, ক্ষতিকর স্কিম মিল্ক পাউডার, ফরমালিন, বাটার অয়েল, সোডা, দুধের ননিসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে এই ভেজাল দুধ তৈরি করা হচ্ছে।
পাবনা প্রাণী সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাবনা জেলায় ছোট-বড় প্রায় ১৫শত দুগ্ধ খামার রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রতিদিন বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষ, মিষ্টি দোকানির পক্ষ থেকে হাট-বাজারে দুধ ক্রয় করা হয়ে থাকে। এক সূত্র জানায়, রমজান মাসে দুধের চাহিদা বেড়ে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি পড়ে ৪০ হাজার লিটার। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল দুধ তৈরি করে দুধের এই ঘাটতি পূরণ করছে ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর উপজেলার বেশ কিছু ঘোষ ও ব্যবসায়ী প্রতিদিন প্রায় ৫০ মণ ছানা তৈরি করে। ওই পরিমাণ ছানা তৈরিতে প্রায় তিন শ’ মণ দুধের প্রয়োজন হয়। ছানা তৈরির পর ছানার পানি ফেলে না দিয়ে তা মজুদ করে রাখা হয়। পরে ওই ছানার পানি দিয়ে তৈরি করা হয় ভেজাল দুধ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও ঘোষ প্রতি মণ ছানার পানিতে ২ কেজি ননী, সামান্য পরিমাণ লবণ, খাবার সোডা, ১ কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করছে যা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া আসল না নকল বোঝার উপায় থাকে না। ব্যবসায়ীরা দুধে ফরমালিন ব্যবহার করছে।
ছানার পানি ছাড়াও অন্য এক পদ্ধতিতে অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ভেজাল দুধ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক মণ ফুটন্ত পানিতে ১ কেজি দুধের ননী, আধা কেজি স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার অয়েল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, এক ফোঁটা ফরমালিনসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়। ক্ষতিকর স্কিমড মিল্ক পাউডার ভারত থেকে সীমান্ত পথে দেশে প্রবেশ করছে। সূত্র জানায়, দুধে ফরমালিনসহ স্কিমড মিল্ক পাউডার ব্যবহারে দুধের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং দুধ তাজা থাকে। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে ল্যাকটোমিটার দিয়ে এই সূক্ষ্মপ্রতারণা ধরা সম্ভব হয় না।
এছাড়া পাবনা অঞ্চলের অসাধু ব্যবসায়ীরা ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার লিটার ভেজাল ঘি তৈরি করছে। ভেজাল ঘি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সয়াবিন, পামঅয়েল, পশুর চর্বি, ভেজিটেবল ফ্যাট, আলুর পেস্ট, রাসায়নিক দ্রব্য ও কালার ফ্লেভার। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই ভেজাল ঘি ও দুধ খেয়ে মানুষ ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্টরা ভেজাল দুধ তৈরি, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা অস্বীকার করেছে।
বেড়ার আকিজ ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের স্থানীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, তারা সরাসরি গো-খামারীদের কাছ থেকে কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারী দ্বারা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়ে ভেজালমুক্ত দুধ সংগ্রহ করেন। প্রাণ ডেয়ারির আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক শরিফ উদ্দিন তরফদার, ব্র্যাক ডেয়ারি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস দুগ্ধ ক্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মোঃ বাসার আলীসহ স্থানীয় ক্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকরা নিজেদের দুধ সংগ্রহ পদ্ধতি শতভাগ ভেজালমুক্ত বলে দাবি করেছেন।
পাবনা জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জানান, ভেজাল দুধ, ঘি তৈরি ও বিক্রয় সম্পর্কে তিনি শুনেছেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছেন। মেডিসিন বিশেজ্ঞ ডাঃ শামীম হোসাইন জানান, দীর্ঘ দিন ধরে বিষাক্ত দুধ পান করলে মানব দেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে হেপাটোটক্সিকিটি বা লিভার রোগ, কিডনির রোগ, স্কিমড মিল্ক পাউডার খাওয়ার ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যথা, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
