দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর পরিচালিত ফেরি সার্ভিসের এখন করুণদশা। বছরের পর বছর বিকল হয়ে পড়ে আছে অনেক ফেরি। নানা রকম জোড়াতালি দিয়ে যেগুলো সচল রাখা হয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও খুব জরাজীর্ণ। এ অবস্থায় নদ-নদীবহুল এলাকাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক নেটওয়ার্ক এক ধরনের ঝুঁকির কবলে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে পুরনো ফেরিগুলোর যথোপযুক্ত পুনর্বাসন এবং আরও কিছু নতুন ফেরি সংগ্রহ করা না হলে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ যে কোনো সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন আঞ্চলিক মহাসড়কসমূহের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে ৫১টি নদীর ওপর সংক্ষিপ্ত ফেরি সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্থানে ফেরিতে উঠানামার জন্য রয়েছে ১৬৩টি পন্টুন। উল্লেখিত ঘাটগুলোতে যানবাহন পারাপারের জন্য বর্তমানে চালু রয়েছে মোট ১৩১টি ফেরি। এছাড়া অনেকগুলো ফেরি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে।
সওজ মালিকানাধীন অধিকাংশ ফেরি ২২০ অশ্বশক্তির। এছাড়া সর্বনিম্ন ১২০ অশ্বশক্তি থেকে শুরু করে ৩২৫ অশ্বশক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন ফেরিও রয়েছে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ফেরি সংগ্রহ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি করে থাকে সওজ অধিদপ্তরের যান্ত্রিক বিভাগ। আর নির্ধারিত ঘাটসমূহে ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করে থাকে একই অধিদপ্তরের সিভিল বিভাগ। এ কারণে পুরো কাজটির ক্ষেত্রে এক ধরনের সমন্বয়হীনতাও বিরাজ করছে। আর এই সমন্বয়হীনতার কারণে সওজ অধিদপ্তরের ফেরি নেটওয়ার্কে বিদেশি সহায়তা দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সওজ অধিদপ্তর এসব ফেরির মালিক হলেও সংশ্লিষ্ট ঘাটসমূহে ফেরি পরিচালনা করে ঘাটের ইজারাদার। মূলত রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যক্তিরাই পেয়ে থাকেন এই দায়িত্ব। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ফেরি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ডিজেল) দিয়ে থাকেন ইজারাদার। এছাড়া প্রতি ৩০০ কার্যঘন্টা পর পর ফেরির ইঞ্জিন সার্ভিসিং করার নিয়ম রয়েছে। এই ক্ষেত্রে সার্ভিসিংয়ের কারিগরি দায়িত্ব পালন করে সওজ অধিদপ্তরের যান্ত্রিক বিভাগ এবং সার্ভিসিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় লুবওয়েল ও অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করার কথা ইজারাদারের।
কিন্তু বাস্তবে এই কাজটি কখনোই ঠিকমতো হয় না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। প্রথমত: ইজারাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতি ৩০০ কার্যঘন্টার পর পর ইঞ্জিন সার্ভিসিংয়ের কথা থাকলেও অনেক সময় সেটা এক হাজার ঘন্টায়ও করা হয় না। এছাড়া নিম্নমানের লুবওয়েল ও সার্ভিসিং সামগ্রী ব্যবহারের কারণে ফেরির ইঞ্জিন দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।
এসব কারণে সওজ মালিকানাধীন অধিকাংশ ফেরি খুবই ধীর গতিতে চলাচল করে। যেহেতু ইজারাদারদের অধিকাংশই রাজনৈতিক মদদপুষ্ট, সে কারণে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরাও এ ব্যাপারে জোরগলায় কথা বলেন না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজশেই ফেরির রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ফাঁকিবাজি করে সেই টাকা ভাগাভাগি হয় বলে অভিযোগ আছে।
সওজ অধিদপ্তরের যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, সওজ মালিকানাধীন ফেরিগুলোর অধিকাংশই দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। তবে এগুলোর ইঞ্জিন ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত। যেহেতু দেশের অধিকাংশ ফেরি পরিচালনা করা হয় লবণাক্ত পানিতে, সে কারণে এগুলোর বডি দ্রুত বিনষ্ট হয়। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি তিন বছর পর পর প্রতিটি ফেরি ও পন্টুন ডকিং-এ নিয়ে পুনর্বাসন করার কথা। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ১০ বছরেও একবার কাজটি করা যাচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে আর্থিক বরাদ্দের অপ্রতুলতাই মূল সমস্যা। তিনি বলেন, এছাড়া ফেরির ইঞ্জিনের স্বাভাবিক আয়ু ৮ থেকে ১০ বছর। অথচ সওজ অধিদপ্তরের অধিকাংশ ইঞ্জিন গড়ে ২০ বছর পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ ২০০৬ সালে চার সেট ইঞ্জিন আমদানি করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালের দিকেও কিছু ইঞ্জিন আমদানি করা হয়। এ পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে কিছু নতুন ইঞ্জিন আমদানি করা না হলে যে কোনো সড়ক নেটওয়ার্কে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
অপর একজন কর্মকর্তা জানান, ফেরি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও পুনর্বাসন খাতে প্রতিবছর যেখানে ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন, সেখানে বরাদ্দ দেয়া হয় ১৬/১৭ কোটি টাকা। এছাড়া ফেরির বডি ও হাল পুনর্বাসনের কাজে অন্তত ১৫ কোটি টাকার প্রয়োজন থাকলেও এই খাতে বছরে বরাদ্দ দেয়া হয় মাত্র এক কোটি থেকে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা। একইভাবে ফেরির খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি বন্ধ রয়েছে বহু বছর ধরে। স্থানীয়ভাবে তৈরি দুর্বল যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণেও সওজ অধিদপ্তরের ফেরিগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সওজ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দের অপ্রতুলতা একটি সামগ্রিক বিষয়। সওজ মালিকানাধীন ফেরি রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও বরাদ্দের অপ্রতুলতা রয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।’
