সঞ্চয়পত্র বিক্রি হতাশাজনক

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২১:০৭
সদ্য বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে বড় ধস নেমেছে। অর্থবছরের শুরুতে এ খাতের মাধ্যমে সরকার ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরবর্তীতে নিট বিক্রি কম হওয়ার প্রেক্ষিতে বছরের শেষ দিকে এসে সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেছে, এ খাতে নিট বিক্রি হয়েছে ৭৭৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১০ শতাংশ বিক্রি হয়েছে! আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বেশ দুরে রয়েছে এ খাতে বিনিয়োগ। সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই দীনতার মধ্যেও চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন চলমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করা সম্ভব হবে না। ব্যাংকের সাথে প্রতিযোগিতামূলক সুদ হার না থাকা, মুনাফায় উেস কর কর্তন, সঞ্চয়পত্রে নিরুত্সাহিত করে ব্যাংকগুলো নিজেদের সেবা গ্রাহকের কাছে তুলে ধরে তা বিক্রি বাড়ানোর প্রবণতা এবং অতি লাভের আশায় বিভিন্ন ফটকা ব্যবসায়ে সঞ্চয়কারীদের ঝুঁকে পড়াকে এ খাতের প্রকৃত বিনিয়োগ কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। সেই সাথে মূল্যস্ফীতির ধকল সামলাতে অনেকে সঞ্চয় ভাঙ্গিয়ে নেওয়াও এ খাতের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়াতে হলে এ খাতের উপর বিদ্যমান কর সম্পূর্ন উঠিয়ে দেয়া দরকার। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে কর কেটে রাখা হচ্ছে যাদের অনেকের করযোগ্য আয়ই নেই। ফলে তারা চাইলেও এই কর ফেরত নিতে পারছে না। এদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী।’ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে উত্সাহিত করা দরকার। অন্যথায় এসব সঞ্চয় ঝঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে চলে যাবে।’ গত ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে সরকার এ খাতের মুনাফায় ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করে। এর পর এটি কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। বর্তমানে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। যাদের কাছ থেকে মুনাফা দেয়ার সময়ই কর কেটে নেয়া হয়। এই টাকা পরবর্তীতে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সমন্বয় বা ফেরত নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ সুযোগ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিতে পারছেন না। কারণ তাদের অনেকেরই করযোগ্য আয় নেই। আবার অনেকের টিআইএন নেই। সঞ্চয়কারীদের উেস কর্তিত কর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এ জটিলতার কথা স্বীকার করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। এসব সমস্যার কারণে এ খাতের উেস কর প্রথা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছিল সঞ্চয় পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে। তবে এই সুযোগ সঞ্চয়কারীদের দিলে ব্যাংকের বিনিয়োগকারীরাও এমন সুযোগ চাইতে পারে - এমন অজুহাতে কর বাতিল করতে রাজি নয় এনবিআর। সঞ্চয় পরিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরে এ খাতের তিনটি মাধ্যমে (ব্যাংক, সঞ্চয় ব্যুরো ও ডাকঘর) মোট বিনিয়োগ হয়েছে ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। একই সময়ে সঞ্চয়কারীরা উত্তোলন করেছেন ২২ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। অর্থাত্ এ খাতে নীট বিনিয়োগ ৭৭৩ কোটি টাকা। মোট জমা থেকে মূল টাকা পরিশোধ বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট অর্থকে নীট বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। একই সময়ে সুদ পরিশোদ করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। বিক্রির পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন বিনিয়োগ প্রচুর হলেও একই সময়ে পুরনো বিনিয়োগকারীরা টাকা উত্তোলন করে নিয়ে গেছেন। এছাড়া সঞ্চয় ব্যুরো ও ডাকঘর খাতে নীট বিক্রি ইতিবাচক হলেও ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রির চেয়ে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি উত্তোলন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে উত্সাহবোধ করে না। এ ব্যাপারে সঞ্চয় পরিদপ্তর থেকে একাধিক বৈঠকে তাগাদা দিলেও ফল আসেনি। এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়াতে গত মার্চ মাস থেকে সুদের হার কিছুটা বাড়িয়েছে সরকার। পরিবার, পেনশনার, তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, ডাকঘর ও পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১ শতাংশ থেকে ক্ষেত্র বিশেষে তিন শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সুদহার ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ বিদ্যমান রয়েছে। অবশ্য এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন শর্তের জালে ফেলে গ্রাহকের হাতে মুনাফা দেয়ার সময় ক্ষেত্র বিশেষে এই হার এক থেকে দুই শতাংশ কমে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুদের হার বাড়ালেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান সুদের হারের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে বিক্রিও কাঙ্খিত মাত্রায় বাড়ানো যাচ্ছে না।