ঈদের দিন গণভবনে সর্বসাধারণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধীদলের অপপ্রচারে জনগণ আর বিভ্রান্ত হবে না। তিনি বলেন, সমপ্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধীদল জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল।
গত শুক্রবার গণভবনে দলীয় নেতা, পেশাজীবী, বিচারক, কূটনীতিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা হোসেন, দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও মন্ত্রী পরিষদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর শুভেচ্ছা ও পরবর্তী নির্বাচনেও জনগণের ভোট কামনা করে বলেন, আমরা গত নির্বাচনে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তার সিংহভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু কিছু এলাকায় আমরা প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি কাজ করেছি। বর্তমান সরকার বাকি কাজগুলোও সম্পন্ন করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দলের অপপ্রচারে ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হয়। জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আপনারা যেন এমন ভুল না করেন। ভবিষ্যতে জনগণ আর বিভ্রান্ত হবে না এমন আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণ তাদেরই ভোট দেবে, যারা সত্ এবং এলাকার উন্নয়নে নিবেদিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ সিটিতে পরাজয় দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি অত্যন্ত যোগ্য প্রার্থী দিয়েছিলাম, যাদের বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো না। এমনকি তাদের ব্যাপক উন্নয়নেরও রেকর্ড ছিলো। তা সত্ত্বেও তারা ভোট পাননি।
শুক্রবার সকাল নয়টার আগেই গণভবনের গেট সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এসময় নারী-পুরুষ-শিশুরা দলে দলে বিনা বাধায় গণভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে গণভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তারা দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের জন্য। এ সময় গণভবনের বিস্তীর্ণ লন সুসজ্জিত ছিলো।
প্রথমে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রী পরিষদ সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। যার মধ্যে ভিক্ষুক ও দুস্থ পুরুষ-মহিলাও ছিলেন।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খোন্দকার, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সাহারা খাতুন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বেসামরিক পরিবহন মন্ত্রী ফারুক খান, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম, মেহের আফরোজ চুমকি প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
কিছুসংখ্যক দর্শনার্থী ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তাদের সমস্যার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার সমাধান কামনা করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকবৃন্দ, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং কূটনীতিকদের সঙ্গে গণভবনের লনে পৃথক পৃথকভাবে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন, তিন বাহিনীর প্রধান, মার্কিন রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূতগণ, ইউরোপ ও সার্ক অঞ্চলভুক্ত দেশের কূটনীতিকরা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপস্থিত দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষদের মিষ্টি, কেক ও সেমাই দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী দরিদ্রদের খাবার, পোশাক ও নগদ টাকা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নিশ্চিত করতে চাই কোন অসাংবিধানিক সরকার, কোন অগণতান্ত্রিক সরকার দেশে আসতে পারবে না এবং কোন সেনা স্বৈরাচার ক্ষমতায় এসে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করতে পারবে না। জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স এবং আমরা বিশ্বাস করি দেশ সংবিধান অনুসারেই চলবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নাগরিক জীবনকে দুঃসহ করে তুলতে বিএনপি এখন জামায়াত ও হেফাজতকে সাথে নিয়ে একটার পর একটা অঘটন ঘটিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, মানুষ যদি দিনে কাজ করতে না পারে, যদি আয়-রোজগার করতে না পারে, তবে তাদের জীবন কিভাবে চলবে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ তত্ত্বাবধায়কের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মানুষ তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি। শুধু রাজনীতিবিদরাই নয়, ব্যবসায়ী-শিক্ষক-শিক্ষার্থী-সাংবাদিক এবং সবপর্যায়ের মানুষই তাদের স্টিম রোলারের সম্মুখীন হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন ইচ্ছাই ছিলো না দেশে নির্বাচন দেয়ার। জনগণের সাহসী ভূমিকার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের কুপ্রবৃত্তি থেকে সরে এসে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, বিশেষ পার্লামেন্টারি কমিটির সুপারিশে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। কমিটি বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় করার জন্য সংবিধান সংশোধন করেছে।
রমজান মাসে আর্থ-সামাজিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, রমজান মাস অত্যন্ত সুখ ও শান্তির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ছিল নিয়ন্ত্রণে। এমনকি মধ্য রমজান থেকে কিছু জিনিসের দাম কমেছে। তিনি বলেন, অতীতের শাসনামলে রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুত্ ও পানির সমস্যা, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিসহ অন্যান্য নাগরিক সমস্যা থাকলেও এই রমজান মাসে সবকিছু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট ছিল। ফলে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং বিদ্যুত্ ও গ্যাস সংকট দূর হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার দরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে গ্রামাঞ্চলে রমজান মাসে ভিজিএফ ও ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে চাল বরাদ্দ করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার মানুষকে সাধ্যমতো স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তি প্রদানে সচেষ্ট। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় যায় তখনই মানুষ সুন্দরভাবে ঈদসহ বিভিন্ন উত্সব সুষ্ঠুভাবে পালন করে থাকে। তিনি বলেন, মধ্যরাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা বিএনপির শাসনামলে কল্পনাতীত ছিল।
দেশের অর্থনীতির উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ৯৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছি। কোন সরকারই এমন রেকর্ড করতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের দুঃখজনক অধ্যায়ের ঘটনার পুনরুল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ঈদ সবার জন্য খুশি বয়ে এনেছে, কিন্তু আমার জন্য তা বেদনা ও খুশি দুটোই। কারণ, খুশির ঈদ এসেছে, কিন্তু এ মাসেই আমি আমার বাবা-মা, ভাইদের ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের হারিয়েছি।
তিনি বলেন, আমি এই শোকাহত অবস্থায় রাজনীতি করি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার এবং জনগণকে ক্ষুধা দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
