সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইসির জোর প্রস্তুতি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৯
আগামী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটারের সিডি প্রস্তুত, নির্বাচনী মালামাল ক্রয়, বাজেট প্রণয়ন, ভোট কেন্দ্র ও কক্ষ নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী অন্তর্বর্তী বা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে বেশকিছু আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অন্যান্য নির্বাচনের মতো এবারও সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা নিযুক্ত হচ্ছেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। নবম সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবার ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের সংখ্যাও বাড়ছে। ইসির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দলীয় সরকারের পাশাপাশি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও রয়েছে কমিশনের। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘নানা বাস্তবতার কারণে আমাদের দু’ ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন সর্বদা প্রস্তুত। সব দলের অংশগ্রহণে সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায় কমিশন।’ নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে যা যা করণীয় তা করা হচ্ছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তরা আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকেও তাদের নাম বাদ দেয়া হচ্ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী এনে প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। একই দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলে দল কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি বাদে অন্যদের মনোনয়নপত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের বিধান রাখা হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সংশোধনেরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এবারই প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনকালীন তারা প্রটোকল না পেলেও প্রটেকশন দেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। ভারতীয় নির্বাচনী আচরণ বিধির আলোকে বিধিমালা করা হচ্ছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটির দলীয় প্রধানসহ কমপক্ষে ২০ জন তাদের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়াও মহাজোট ও ১৮ দলীয় জোটভুক্ত শরিক দলের প্রার্থীরা প্রথমবারের মতো নির্বাচনী প্রচারণায় জোট প্রধানের ছবি ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছেন। টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমসহ ডিজিটাল প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। পাশাপাশি বিলবোর্ড, ব্যানার ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। নির্বাচনে নির্দিষ্ট মাপের সাদা-কালো ব্যানার ব্যবহারের বিধান রাখা হচ্ছে। ‘না’ ভোটের বিধান তুলে দেয়া হচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৯ জেলার ৫৩টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এনেছে কমিশন। বাকি আসনগুলোতে ২০০৮ সালের সীমানা বহাল রাখা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রেস থেকে ভোটার তালিকাও মুদ্রণ করা হচ্ছে। ওয়ার্ড ভিত্তিক ভোটার তালিকার সিডিও প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য এবার প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ২৬ জন। বর্তমানে ভোটার ৯ কোটি ২১ লাখ ৯৮ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ কোটি ৬২ লাখ ১ হাজার ৮৭১ জন ও মহিলা ভোটার ৪ কোটি ৫৯ লাখ ২৭ হাজার ৯৮১ জন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ছিল ৩৫ হাজার ২৬৩টি ও ভোটকক্ষ ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৭টি। আগামী সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্র ৪৪ হাজার ২১টি ও ভোটকক্ষ ২ লাখ ২১ হাজার ৩৮৪টি। নির্বাচন আয়োজনের অংশ হিসাবে এবারের নির্বাচনে স্বচ্ছ ব্যালট বক্স, অমোচনীয় কালি ও ব্যালট বক্স লক সরবরাহ করবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনডিপি। নির্বাচন কমিশন থেকে দুই নির্বাচনের জন্য ৪০ হাজার স্বচ্ছ ব্যালট বক্স, ৬ লাখ ৪৮ হাজার অমোচনীয় কালি (কলম আকারে) ও ২৪ লাখ ব্যালট বক্স লক সরবরাহের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আগামী ৮ অক্টেবার এসব পণ্য নির্বাচন কমিশনকে সরবরাহ করা হবে বলে নির্বাচন কমিশনকে ই-মেইল বার্তায় জানানো হয়। এছাড়া ৬ লাখ ৪৮ হাজার স্ট্যাম্প প্যাড, ৯০ হাজার ব্রাশ সিল, ৬ লাখ ৪৮ হাজার অফিসিয়াল সিল (ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার ব্যবহারের জন্য), ১১ লাখ ২৩ হাজার মার্কিং সিল (ভোট দেয়ার সিল) ও ১৭ হাজার ৩০০ কেজি সিলগালা (লাল রংয়ের) কেনার জন্য গত জুন মাসে পৃথক ৫টি টেন্ডার আহ্বান করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলি ইত্তেফাককে জানান, নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে খসড়া ভোটকক্ষ ও বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী অক্টোবরের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।