ঈদের ছুটির মধ্যে শনিবার আকিকার অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া নামক স্থানে কোচের সাথে লোকাল বাসের সংঘর্ষে অনুষ্ঠানযাত্রী ১০ জন নিহত হয়েছেন। লোকাল বাসের চালক ছাড়া নিহতদের সবাই আত্মীয়। এছাড়া গতকাল রবিবার বগুড়া শহরতলীর বনানীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন, দিনাজপুরের বীরগঞ্জে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন এবং বৃহস্পতি থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত কুমিল্লায় কয়েকটি দুর্ঘটনায় ৬ জন মিলিয়ে আরো মোট ১৬ জন নিহত হয়েছেন। চার জেলায় এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৬২ জন। বগুড়া ও গাইবান্ধার দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, আকিকার অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে রংপুর-বগুড়া মহাসড়কের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া নামক এলাকায় শনিবার বিকাল সাড়ে চারটায় কোচ ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাস ড্রাইভারসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। বাকি ৯ জনের মধ্যে ২ জন শিশু ও ৭ জন নারী এবং এরা সবাই আত্মীয়। আহত হয়েছেন ২০ জন। নিহতরা হলেন বাসযাত্রী মৃত আফতাবউদ্দিনের স্ত্রী মারিয়া বেগম (৬৫) ও তার মেয়ে মালতী বেগম (৫০)। আফতাবের ছোটভাই আবুল কাশেমের স্ত্রী শামছুন্নাহার বেগম (৬০), তার দুই মেয়ে শাহানা আকতারী কমলা (৩৫) ও সালমা আকতার পাপিয়া (৩২), অপর ছোটভাই কাওসারুল ইসলামের স্ত্রী শাহানা পারভীন (৫৩), আর এক ছোটভাই আব্দুল মতিন মিয়ার স্ত্রী সোনালী বেগম (৪৫) ও তার ছেলে সাব্বির মিয়া (১২) ও নাতী রিশা (৭)। এরা সবাই গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাই ইউনিয়নের খুকশিয়া কালুগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। নিহত বাসের চালক একই উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের ফুটুলি চন্দ্র রায়ের ছেলে দিলীপ কুমার রায় (২৬)।
গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফুজ্জামান জানান, লোকাল একটি বাস ভাড়া করে মারিয়া বেগম তার ছোটমেয়ে লিপি বেগমের ছেলে আকিকার নিমন্ত্রণে অংশ নেয়ার জন্য আত্মীয়-স্বজনসহ একই উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়ের চকমাকড়া গ্রামে জামাই বাড়ির পথে রওনা হন। পথে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রংপুরগামী ‘হানিফ এন্টারপ্রাইজের’ একটি কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। লোকাল বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলে নিহত হয় ৩ জন ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যায় ৬ জন। রাতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বাসের চালক মারা যায়। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি ফারুক হোসেন জানান, পুলিশ সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উদ্ধার তত্পরতায় আহতদের গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, রংপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছে এবং বাস দুটি থানায় নিয়ে গেছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ায় কোচ-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে ৫ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১ জন শিশু, ১ জন মহিলা ও ৩ জন পুরুষ। গতকাল রবিবার বিকেল ৩টায় বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, রংপুর থেকে ঢাকাগামী “এস আর প্লাস” নামের একটি এসি কোচ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে ঢাকা থেকে গাইবান্ধাগামী আরোহী বোঝাই একটি মিনি ট্রাক এর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে কোচ এবং ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ৩ জন নিহত হয়। পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে । সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় এক শিশুসহ ২ জন মারা যায়। নিহতরা সকলেই ট্রাকের যাত্রী। তারা অল্প ভাড়ায় ঢাকা থেকে গাইবান্ধায় ট্রাকযোগে বাড়ি ফিরছিল। ট্রাকে কমপক্ষে ২০-২৫ জন ছিল। আহত ৫০ জনের মধ্যে ১৯ জন কোচযাত্রীসহ মোট ২৯ জনকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং ২১ জন কোচযাত্রী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এরমধ্যে ৬ জনের অবস্থা আশংকাজনক বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।
পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের জানান, কোচচালক মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় গাড়ি চালানোর ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আহত যাত্রীরা পুলিশের কাছে এই অভিযোগ করেছেন বলে তিনি জানান। কোচের যাত্রী আব্দুল্লা বলেন, ঢাকা থেকে কোচটি ছাড়ার পর হতেই চালক অনবরত মোবাইলে কথা বলে আসছিলেন। তিনিও দুর্ঘটনার জন্য কোচ চালককেই দায়ী করেন। শাজাহানপুর থানার ওসি মাহমুদুল আলম জানান, ট্রাক ও কোচ আটক। নিহতদের লাশ মর্গে রাখা হয়েছে এবং নাম পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
দিনাজপুর অফিস ও বীরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের বীরগঞ্জে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মা-মেয়েসহ ৫ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে অপর ৫০ জন। গতকাল রবিবার দুপুর আড়াইটার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার পথে ‘শাহাজালাল এক্সপ্রেস’ নামে একটি যাত্রীবাহী বাস বীরগঞ্জের বাদিয়াপাড়া নামক স্থানে পৌঁছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীতগামী ‘তাহমিনা এন্টারপ্রাইজ’ নামে অপর একটি যাত্রীবাহী বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে শাহাজালাল এক্সপ্রেস বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মা লাইলী বেগম (৪০), তার মেয়ে ফারজানা আক্তার (৭) এবং অপর এক অজ্ঞাতপরিচয় মহিলা (৩৫) নিহত হয়। আহত হয় দু’ বাসের ৫০ জন যাত্রী। হাসপাতালে মারা যায় চালক হাফিজুল ইসলাম (৪৫) ও যাত্রী সোনিয়া। নিহত লাইলী বেগম কাহারোল উপজেলার দ্বীপনগর গ্রামের মো. হানিফ-এর স্ত্রী। আহতদের দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার বিভিন্নস্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত পৃথক ঘটনায় চান্দিনা, দাউদকান্দি, বুড়িচং ও চৌদ্দগ্রাম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন আব্দুল মান্নান (৩৫), কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে, সিলেটের মৌলভী বাজার উপজেলার পটারমহল গ্রামের তমরু মিয়ার ছেলে গাড়িচালক সোহেল আহমেদ (৩০) ও যাত্রী চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার হাড়িচাইল গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে নূরে আলম (১০), নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার শ্যালসারদি গ্রামের আলী বাহারের স্ত্রী পারুল বেগম (৪৮) ও রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নাসরিন (২৫), বাসের হেলপার স্বপন (৩২) নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার মৃত রাশেদ মিয়ার ছেলে।
রবিবার বেলা সোয়া ১১টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি মেঘনা-গোমতী সেতুর টোলপ্লাজা সংলগ্ন এলাকায় সিএনজি অটোরিক্সা ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছে।
রবিবার সকালে একটি সিএনজি অটোরিক্সাকে পিছন দিক থেকে একটি বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই সিএনজির দুই যাত্রী পারুল বেগম ও নাসরিন নিহত হয়। আহত হয় সিএনজি অটোরিক্সার আরও ২ যাত্রী। উত্তেজিত জনতা বাস চালককে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।
একইদিন সকাল সাড়ে ৮টায় মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার এলাকায় ভটভটিযোগে মাদক পাচার করার সময় বাস চাপায় মান্নান নামে মদ ব্যবসায়ী নিহত হয়। মান্নান ভটভটিযোগে মদ পাচার করার সময় মহাসড়কে অবস্থানরত পুলিশ ওই ভটভটির গতিরোধ করে। মান্নান পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে পালানোর সময় দ্রুতগতি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে নিহত হয়।
পুলিশ বহনকারী ভটভটি থেকে ২২৫ বোতল বিয়ার এবং ১৭৬ বোতল এলকোহলযুক্ত ক্যান উদ্ধার করেন।
শুক্রবার সকালে একই মহাসড়কের নিমসার এলাকায় মাইক্রোবাস উল্টে শিশুসহ ২ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছে। গাড়ি চালক সোহেল আহমেদ (৩০) ও যাত্রী শিশু নূরে আলম (১০)।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি উপজেলার রায়পুর এলাকায় কুমিল্লাগামী যাত্রীবাহী বাসের সাথে বিপরীত দিক থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাসের হেলপার স্বপন নিহত হয়। এ ঘটনায় উভয় বাসের আরও ২৮ যাত্রী আহত হয়। আহতদের গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
