অফিস ছড়িয়ে আছে পাঁচ স্থানে দলিল দস্তাবেজ গ্যারেজে

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫৮
প্রধান প্রকৌশলী অফিস করছেন তেজগাঁওয়ে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী-কর্মকর্তারা একেকজন অফিস করছেন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে। কেউ বেইলী রোডে কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য নির্মিত ভবনে, কেউ মিরপুরের পাইকপাড়ায় সড়ক গবেষণাগারে, কেউ মহাখালীর সেতু ভবনে, কেউবা এলেনবাড়িতে। আর বহুবছরের নানা রকম মূল্যবান নথিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ বস্তাবন্দি অবস্থায় রয়েছে গাড়ির গ্যারেজে কিংবা নিরাপত্তা রক্ষীদের মেসে। সেগুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কিংবা খেয়ে সাবাড় করছে উই পোকায়। এই হলো সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের চিত্র। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বছর খানেক ধরেই রাজধানীর রমনা এলাকায় অবস্থিত সড়ক ভবন থেকে দফায় দফায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়। সর্বশেষ জুন মাসের শেষার্ধে আদালতের বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে সরিয়ে নেয়া হয় সড়ক ভবন কমপ্লেক্সের এ ব্লক ও বি ব্লকের সব দফতর। কিন্তু এতগুলো দফতর একত্রে কোনো একটি স্থানে পুনঃস্থাপনের মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সওজ অধিদপ্তরের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষিপ্তভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়া ছাড়াও সামগ্রিকভাবে সড়ক বিভাগের কর্মকাণ্ডে মারাত্মক সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়েছে। রমনা এলাকায় সড়ক ভবন কমপ্লেক্সের তিনটি পৃথক ভবনে (এ ব্লক, বি ব্লক ও সি ব্লক) ১ লাখ ২২ হাজার বর্গফুট জায়গার (স্পেস) সংস্থান ছিল। এতে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার ৯৫টি আলাদা দফতর পরিচালিত হতো। প্রধান প্রকৌশলীর দফতর ছাড়াও পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ উইং, ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস উইং, সেতু ব্যবস্থাপনা উইং, টেকনিক্যাল সার্ভিসেস উইং ও যান্ত্রিক উইংয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীরা বসতেন এই কমপ্লেক্সে। সড়ক এবং সেতু উন্নয়নসহ নানা কাজে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের কাজে সমন্বয় অপরিহার্য। দিনে একাধিক দফায় বৈঠক করতে হয় তাদের। বর্তমানে একটি বৈঠকের জন্য কোনো এক জায়গায় একত্রিত হতে গিয়েই সারাদিন কেটে যায় তাদের। এছাড়া সওজ অধিদপ্তরের ১৫০টি প্রকল্প চলমান রয়েছে, যেগুলোর প্রকল্প পরিচালকদের কার্যালয়ও ছিল মূলত সড়ক ভবন কমপ্লেক্সে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্প, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু প্রকল্প এবং ইস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের (ইবিবিআইপি) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহের প্রকল্প পরিচালকদের কার্যালয় ছিল এখানে। এসব প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সমন্বয়ের প্রয়োজন। কিন্তু সড়ক ভবন ছেড়ে আসার কারণে এসব প্রকল্পের পরিচালকরা বর্তমানে বিক্ষিপ্তভাবে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অফিস করছেন। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে পৃথক ৫টি স্থানে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের দফতরগুলো অস্থায়ী ভিত্তিতে পুনঃস্থাপনের জন্য সবমিলিয়ে জায়গা (স্পেস) পাওয়া গেছে মাত্র ২৯ হাজার বর্গফুট। এত অল্প জায়গায় এত অফিস পরিচালনা রীতিমতো অসম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও একটি কক্ষে ২/৩ জন করে বসছেন। এছাড়া কোন্ ফাইল কোথায় রয়েছে, সেটাও রীতিমতো গবেষণার ব্যাপার। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, সওজ অধিদপ্তরের মোট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ফাইল বা পিডিএস (পার্সোনাল ডাটাশিট) প্রধান কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকে। এছাড়া সকল দরপত্র দলিলের মূলকপি, বিল-ভাউচার, বিল পরিশোধের সার্টিফিকেট, অডিটার নথিপত্র, সেতুসমূহের ডিজাইনের মূল কপি ইত্যাদিও প্রধান কার্যালয়ে সংরক্ষিত ছিল। সড়ক অধিদপ্তরের সঙ্গে কমবেশি ৫ হাজার মামলা চালু রয়েছে। এসব মামলার কাগজপত্রও আছে। এসব মামলায় সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপুল অংকের নগদ টাকার প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। কোনো একটি নথি হারানোর কারণে বড় ধরনের সম্পদ বা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এসব নথিপত্রের বেশির ভাগই এখন তেজগাঁওয়ের সওজ ওয়ার্কশপ কমপ্লেক্সের ৬টি গ্যারেজের মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। কবে নাগাদ এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে- জানতে চাইলে অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তেজগাঁও ওয়ার্কশপ কমপ্লেক্সে সড়ক বিভাগের ১৭ একর জায়গা রয়েছে। এখানেই নতুন করে সড়ক ভবন কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনোমিক কো-অপারেশন (সাসেক) প্রকল্পের আওতায় ১২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মিত হবে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করতে বছর খানেক লাগতে পারে। কাজ শুরুর পর এটি শেষ করতে সময় লাগবে ন্যূনতম তিন বছর। ততদিন এমন সমন্বয়হীনভাবেই চলবে অধিদপ্তরের কার্যক্রম। সওজ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইফতেখার কবির বলেন, আমরা আক্ষরিক অর্থেই মহাবিপদে আছি। এতবড় একটি সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা রীতিমতো দুরূহ হয়ে পড়েছে। এত বিশাল সংস্থার প্রধান কার্যালয় দ্রুত ও নিরাপদে স্থানান্তর এবং অন্যত্র পুনঃস্থাপন মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু যেহেতু আদালতের আদেশ, সুতরাং এই ক্ষেত্রে আমাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। আপাতত কোনোমতে কাজ চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে।