দেশের অন্যতম নৈসর্গিক পর্যটন কেন্দ্র মাধবকুন্ড উষ্ণ জলপ্রপাত। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার কাঠালতলী বাজার থেকে ৪ কি.মি. ভেতরে গেলে শোনা যাবে নৃত্যরত মিষ্টি মেয়ে মাধব কন্যার নিক্কণের শব্দ। সেই সঙ্গে চারিদিক থেকে ভেসে আসবে চা পাতার বাহারি গন্ধ। দূর থেকে তখন পাথারিয়া পাহাড়কে মনে হবে কুয়াশা আচ্ছাদিত হিমালয় পর্বতের একটি শৃঙ্গ। প্রায় ২০০ ফুট পাথারিয়া পাহাড়ের উপর থেকে আছড়ে পড়া জল রাশির দৃশ্য দেখা না গেলেও কান পাতলে শোনা যাবে ঝর্ণা ধারার শব্দ। সেই সঙ্গে মনে হবে শব্দের যত কাছে যাওয়া যাচ্ছে প্রকৃতির মায়াবি দৃশ্য ততই দূরে চলে যাচ্ছে। গাড়ি ও যানবাহন নিয়ে মাধবকুন্ডের মূল অংশে পৌঁছানো যায় না। পাহাড়ের চূড়া থেকে আছড়ে পড়া জল রাশি ছোট-বড় পাথরের বুক চিরে দিঘলকেশি মেয়ের বিনুুনির মত টিলার গা ঘেঁষে ছুটে চলছে মাধব ছড়া দিয়ে। এই মাধব ছড়ার পাশ দিয়ে পায়ে চলে পৌঁছানো যায় মাধবকুন্ডে। কিংবদন্তিঃ অতীতকালে এখানে আস্তনা গেড়েছিলেন এক সন্ন্যাসী মাধব চন্দ্র , মতভেদে মাধবেশ্বর। যার নামানুসারে এই এলাকার নাম হয়েছে মাধবকুন্ড। যা আজ প্রাগৈতিহাসিক। কালচক্রে হারিয়ে গেছে সেই ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের কেউ সঠিকভাবে সেই ইতিহাস বলতে না পারলেও কুন্ডের কাছেই মাধবেশ্বরের মন্দির কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাধবকুন্ড এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে সমধিক পরিচিত। পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে এই জলপ্রপাতকে ঘিরেই গড়ে তোলা হয়েছে ইকোপার্ক। মনোরম দৃশ্যে শোভিত এই মাধবকুন্ড সনাতন ধর্মাবলম্বিদের কাছে পবিত্র স্থান হিসাবে মাধবেশ্বর মন্দিরে প্রতি বছর চৈত্র মাসে বারুণী স্নান ও বারুনি মেলা বসে। প্রকৃতি প্রেমী মানুষের কাছে মাধবকুন্ড একটি পিকনিক স্পট হিসাবে বিশেষভাবে আর্কষণীয় ও পরিচিত। এই কুন্ডের পাশেই রয়েছে পরিকুন্ড। কুন্ডের জলরাশির অবিরাম ধারায় সৃষ্ট হিম শীতল শব্দ ভিন্ন এক মাত্রা এনে দেয়। যে পথ দিয়ে পানি উপচে পড়ছে সেই পথটি কঠিন শিলায় পরিণত হয়েছে। কুন্ডের ডান দিকে পাহাড়ের বুকে রয়েছে এক বিরাট আলো-ছায়া মিশ্রিত এক গুহা। স্থানীয় ভাষায় অনেকেই গুহাকে কাব বলেন, যা প্রকৃতি সৃষ্ট। বিভিন্ন উত্সবে বা শীতকালে ঝাঁকে ঝাঁকে পর্যটকদের সমাগম ঘটে মাধব কুন্ডে। কিন্তু খানাখন্দকে ভরপুর, অপ্রশস্ত রাস্তা, গাড়ি পার্কিং-এর স্থানাভাবসহ নানা অব্যবস্থাপনায় বেড়াতে আসা পর্যটকদেরকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে পর্যটন পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। তারপরও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে এই পর্যন্ত কুন্ডের চূড়া থেকে পড়ে এবং কুন্ডে সাঁতার কাটতে নেমে প্রায় ৩০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে এই স্থানটিকে তত্কালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী পর্যটক কেন্দ্রে রূপান্তর করেন। পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করার পর এই স্থানে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর বন বিভাগের পরিচালনায় ইর্কোপার্কের গেইট থেকে ১৫-২০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। এই পর্যটন কেন্দ্রটির অবকাঠামোসহ রাস্তার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রটিতে পর্যটক হারানোর আশংকা রয়েছে।
