মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য চার পাঁচশত বছর ধরে বহু স্বশিক্ষিত লোককবি বারমাসী কাব্য বন্দনা করেছেন। এসব বারমাসীতে আবহমান বাংলার গ্রাম-সমাজের সাধারণ মানুষের পারিবারিক সামাজিক জীবনের ছবি পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভেদে লোককবিরা বিভিন্ন ধরনের বারমাসী বন্দনা করেছেন। এ সকল বারমাসীর মধ্যে ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে অনেকগুলো বারমাসী রচিত হয়েছে। বারমাসীর অধিকাংশ গীতিকাতেই বন-বনানী, গ্রাম-নগর, নদনদী, লোকজন, জীবনের ব্যবহারিক বিভিন্ন দ্রব্যাদি বাংলা বার মাসের বর্ণনা রয়েছে। এক কথায় বলা যায়, বারমাসীগুলো হাজার বছরের লোক-বাংলার স্থানীয় জনপদেরই ভূমিজাত ফসল।
এসব লোককবি গায়েনদের মধ্যে অন্যতম শ্রীধর বানিয়ার রোমান্টিক ভাবপ্রবণতা থেকেই জন্ম হয়েছিল শান্তি কন্যার বারমাসী। কালের পটভূমিতে বিচার করলে মধ্য যুগের কাব্য আলোচনায় এই বারমাসীটি এখনও একটা ঐতিহাসিক স্থান অধিকার করে রয়েছে বারো-তেরশ বছর বয়সী বাংলা সাহিত্যে। শান্তি কন্যার বারমাসী বন্দনাকারী লোককবি শ্রীধর বানিয়া, পিতা ধর্ম্মধর বানিয়া, জন্ম বৃহত্তর সিলেট হলেও তাঁর জন্মস্থান, জীবনকাল সম্বন্ধে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। এ ব্যাপারে বারমাসীর সংগ্রাহক মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন শ্রীধর বানিয়ার বাড়ি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে দাবি করলেও ডঃ দীনেশ চন্দ সেন মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের কাছে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছেন “শ্রীধর বানিয়ার বাড়ি বৃহত্তম সিলেট উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে আপনার কাছে কী ধরনের প্রমাণ আছে জানাবেন।”
মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন কোনো প্রমাণ হাজির করেছেন কি না, তা জানা না গেলেও হাল আমলের অনেক লোক-গবেষক বারমাসীটি সিলেটি হিসেবে তথ্য প্রমাণাদি দিয়ে তুলে ধরেছেন। বারমাসীটি সংগ্রহ ও সম্পাদনার সময় সিলেটের বাহিরের দু-একটি শব্দ ঢুকে গেছে বলে মনে হয়। এর কারণ সংগ্রাহকের অসর্তকতা হতে পারে। তার পরও বারমাসীটির বড় অংশ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হওয়ার কারণে এর বন্দনাকারী লোককবিকে বৃহত্তর সিলেটের নাগরিক বলেই ধরে নেওয়া যায়। লোককবি শ্রীধর বানিয়া সম্পর্কেও এর বেশি কিছু জানা যায় না।
বাংলার লোকসমাজে এই কালজয়ী গাথা-কাব্যটি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন কাব্যবিনোদ পুরাতত্ত্ববিদ মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের সৈয়দ নিয়ামত আলীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন প্রথম বারমাসীটিকে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন। এর চারটি সংস্করণের মলাটে ১৩৩৭ বাংলা লেখা থাকলেও ভূমিকার শেষাংশে তৃতীয় সংস্কারণে ১৩৩৪ বাংলা উল্লেখ রয়েছে। প্রকাশক মোছাম্মত সিতারা খাতুন। ক্রাউন সাইজে পৃঃ- ১২, উত্সর্গ সৈয়দ নিয়ামত আলী, এই বারমাসীটি ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশ করেছেন। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের সংগৃহীত বারমাসীগুলোর মধ্যে শান্তি কন্যার বারমাসী প্রথম মুদ্রিত হয়। এই বারমাসীটি মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সংগ্রহের কয়েক বছর পর একই উপজেলার দরগাহপুর গ্রামের লোকগায়েন আব্দুল গনির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণ। তাঁর সংগ্রহের সাল ১৩৪০ বাংলা। দু’জনের সংগ্রহের ব্যবধান এক যুগের বেশি।
এ প্রসঙ্গে হারুন আকবরের বর্ণনায় দেখা যায় পনেরো বছরের ব্যবধানে দুই গায়েনের গাওয়া একই বারমাসীটির মধ্যে পাঠান্তর লক্ষ্য করা যায়। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের সংগৃহীত শান্তির বারমাসীতে আষাঢ় মাসের ভনিতার ভাষাঃ
আইলাত আষাঢ় রে মাস বরিষার পানি,
আমার মনে কয়দো শান্তি খেলিতাম বাইছালী। ওরে কি\তুমিত তোমার নায়ে আমি আমার বাড়ী, কে খেলত বাইছালী, আমার সাধু নহে বাড়ী। ওরে কি\
চৌধুরী গোলাম আকবর সংগৃহীত একই নামের বারমাসীতে আষাঢ় মাসের বর্ণনা নিম্নরূপঃ
মানিক-আইলত আষাঢ় মাসরে বরিষার পান্তি।
বাইছালি খেলইতাম কন্যা চায় আমার পরাণী।
শান্তি-তুমি তোমার না যে আমি আমার চালি।
আমার সাধু বাড়ীতে থাকলে খেলাইতাম বাইছালি\
এই বারমাসীর সংগ্রাহক দু’জনই গুরুশিষ্য পরম্পরায় তাদের সংগ্রহে ও বর্ণনায়, সংলাপে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বারমাসীটি এক ও অভিন্ন।
পদ্যছন্দে পল্লিসুরে লোক-মানুষের মুখের ভাষায় রচিত বারমাসীর মূল কাহিনীর চরণগুলোতে এভাবে সংলাপ বিনিময় হয়। নবযৌবনা শান্তির রূপে আর দেহলাবণ্যে মুগ্ধ সওদাগর তাঁর মনের সুগোপন আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্ত করে প্রথমে মানিক সওদাগর বলেছেন,কালা কালা কালা দো শান্তি কালা মাথার কেশ।তোরই লাগি ছাড়ি আইলাম বাপ ভাইয়ের দেশ। ওরে কি এইতো পৌষরে মাস দ্বিতীয়ার উঠে চান্দ, কেমনে রাখিমু আমি নাগরের পরান। ওরে কি\
প্রত্যুত্তরে শান্তি বলছে যেমনে পার রাখবে পরান আমার কিংবা তারপর নারীর আশা সাধু কর কি আশায়। ওরে কি\ শান্তি কন্যার বারমাসীর দ্বিতীয় সংগ্রাহক চৌধুরী গোলাম আকবর এই কাহিনী সম্পর্কে লিখেছেন-
বারমাসীও গীতিকাহিনীর অনুরূপ। তবে মাঝে মাঝে ‘গ্যাপ’ রাখিয়া প্রতি বাংলা মাসের পয়ল দিকে নায়ক-নায়িকার মধ্যে অপরিচিতভাবে আলাপাদি হইত।
প্রাচীনকালে আমাদের দেশে তুলাদান ৩ প্রথায় বিবাহ হইত। বিবাহের পর কন্যা পিতৃগৃহেই থাকিত। তবে বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে ‘বর’ ছদ্মবেশে আসিয়া কন্যার সতীত্ব পরীক্ষা করিয়া স্ত্রীকে বরণ করিত। সকল বারমাসীই একই ধাচের। সেকালের লোক যে সংযমী জিতেন্দ্রীয় ছিলেন বারমাসীগুলিতে তাহার বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়।
৪
শান্তি কন্যার বাবা তাঁর মেয়েকে শিশুকালে তুলাদান প্রথায় বিয়ে দিয়েছিলেন ভিনদেশি এক সওদাগরের কাছে। বিয়ের পর সওদাগর নিজের সওদাগরির সপ্তডিংগা নিয়ে বিদেশ চলে যায়। দীর্ঘ সময় ব্যবসা-বাণিজ্য সেরে দেশে ফেরত এসে স্ত্রীকে ঘরে আনার বিষয়টি অনুভব করলো। শৈশবকালে যাকে বিয়ে করেছিল এখন সে যৌবন-ভারাক্রান্ত রমণী, কাজেই এ সময় অন্য কোনো পরপুরুষের সাথে প্রেম-বাসনা, মিলনাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে এ সকল বিষয় জেনে বুঝে তাকে ঘরে তুলতে মানিক সওদাগর ছদ্মবেশে নৌকাযোগে রওয়ানা দিলেন শান্তি কন্যার বাবার দেশে। সেখানে গিয়ে শান্তির বাড়ির ঘাটে নৌকা ভিড়াল। নৌকায় থেকে স্ত্রীর চরিত্রের পরীক্ষা শুরু করে দিল। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জাজ্বল্যমান প্রতিনিধি মানিক সওদাগর। নদীর ঘাটে শান্তির সাথে সওদাগরের সাক্ষাত্ ঘটল, কিন্তু শান্তি জানে না এই ভিনদেশি সওদাগর তাঁর স্বামী। সওদাগর শান্তিকে ঠিকই চিনতে পারলেও অপরিচিত অন্য নারীর মতো তাঁর সাথে আলাপচারিতা প্রেম নিবেদন করে বারমাসীর সুরে। বাংলা সনের বৈশাখ মাসের দিকে নায়ক-নায়িকার মধ্যে সংলাপ আদান-প্রদান শুরু হলো। এভাবে এক এক করে বারো মাস চলার পর শান্তির পিতা নদীর ঘাটে নেমে সওদাগরের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলেন এই সওদাগরই শান্তির বর। তার কাছেই অপ্রাপ্ত বয়সে শান্তিকে তুলাদান প্রথায় বিয়ে দিয়েছিলেন। শান্তির পিতা মানিক সওদাগরকে মেয়ের স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। এখানে বারমাসীর শেষাংশের কয়েকটি স্তবক উল্লেখ করা হলো-
এত হাতে লোটা পানছা আর হাতে তেল,সিনানের দোহারে বুড়া জামাই চিনতে গেল। ওরে কি\ কোন পথে আইচরে বাবা কোন পথে ঘর, কিবা নাম তোর মাতা পিতার নাম কিবা তোর। ওরে কি\ উজান পাকে আইছি আমি বা ভাটিয়ল পাকে ঘর, খাও আমার ময়নামতী বাপ দগুদর। ওরে কি\ ভইন আমার কমলা রানী ভাই মনোহর,এখানে আসিছি আমি মানিক সওদাগর। ওরে কি\চিনিলাম চিনিলাম গো শান্তি স্বামী আইছে তোর,মায়ার কেশ দুভাগ করি নমস্কার কর। ওরে কি\বার মাসের তের পদ লওরে গনিয়া।
এই গীতা রচিয়া দিল শ্রীধর বানিয়া। ওরে কি\
৫
শান্তির বারমাসীতে ভাষা, ভাব, সুর পরস্পর নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা। বারমাসীর ভাষা প্রাঞ্জল, চিত্রকল্পে ঋতুমাত্রিক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র নিবিড়ভাবে যেমন পাওয়া যায় তেমনি নায়কের পেশা, বংশ, নিকট-আত্মীয়ের, পরিচিতি ফুটে উঠেছে। শান্তি কন্যার বারমাসীটি হাতে পেয়ে তাঁর নিজের অনুভূতির প্রকাশ করে ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেছেন-
পালা যত প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক তত্ত্ব-বহুল হইবে ততই ভাল।নিরীক্ষার গায়কেরা যেভাবে গান করিবেন, পালা গুলি ঠিক সেইভাবে লিখিয়া লওয়া উচিত। শুদ্ধ করিতে চেষ্টা করিলে গ্রাম কবিতার সরল সৌন্দর্য হানি হয়।
ঐতিহাসিক বা সামাজিক চিত্র কবিত্বপূর্ণ গ্রামভাষীয় পালা পাইলে আমরাও এ জন্য যথোচিত পারিশ্রমিক দিতে পারি। শান্তির বারমাসী আমরা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ছাপাইয়াছি। ইহা ভিন্ন রূপে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রচলিত আছে। আমরা ফরিদপুর জেলা হইতে এই পালার কতকগুলি গান
সংগ্রহ করিয়াছি আপনি “শ্রীধর বানিয়ার” বাড়ী
শ্রীহট্ট বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। প্রমাণ কি?
শ্রীধর সম্বন্ধে আপনি আর কোন সংবাদ দিতে পারবেন কি না?
গ্রাম্য কবিতা মুসলমানেরাই রক্ষা করিয়া আসিতেছেন, হিন্দুরা গত ৩/৪ শত বছর যাবত শাস্ত্রের অনুবাদ করিয়া সংস্কৃতের আনুগত্য করিতেছেন। তাহারা পল্লীর এই শ্রেষ্ঠ কবিত্ব সম্পদের প্রতি পরম উপেক্ষা দেখাইয়া আত্মবঞ্চনা করিতেছেন মাত্র।
৬
লোকবাংলার লোককবি-গায়েনরা কেবল নারী-পুরুষের প্রেমের দুরন্ত প্রকাশ ঘটনাননি, তারা সামন্ত যুগের নায়কদের পরিবর্তে ধনপতি সওদাগরদের টেনে এনে নায়ক বানিয়েছেন। এর কারণ হয়তো সমাজ-বিবর্তনের ঐতিহাসিক নিয়মকে তারা বুঝাতে পেরেছিলেন তাদের নিজস্ব বোধশক্তিতে। এই ধনপতি ব্যবসায়ী সওদাগররা সামন্ত যুগ থেকে আমাদের সমাজ অর্থনীতিকে বণিক পুঁজির দিকে টেনে আনতে প্রেরণা যুগিয়েছেন। আমাদের বিশাল লোকসাহিত্যে এ ধরনের অনেক গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে। লোকসাহিত্য বীক্ষণের ভেতর দিয়ে এ সকল তথ্য অনুসন্ধানযোগ্য। শান্তিকন্যা মানিক সওদাগরও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে বলেই মনে হয়।
তথ্য নির্দেশ ঃ
১। হারুন আকবর, লোক সাহিত্যের কিছু কথা, জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ, সিলেটের স্মারক, গ্রন্থ, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ৬৩, ৬৪।
২। শান্তিকন্যার বারমাসী; পৃ- ১
৩। তুলাদান পদ্ধতির বিয়ে-মেয়ের ওজনের সমান অর্থাদি বা স্বর্ণরৌপ্যাদি নিয়ে বিয়ে দেওয়াকে তুলাদান পদ্ধতির বিয়ে বলে থাকে।
৪। চৌধুরী গোলাম আকবর, রচনা ও সংগ্রহসম্ভার, জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ ২০০৭; পৃ- ২৫
৫। শান্তিকন্যার বারমাসী, পৃ- ১০
৬। ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের এই চিঠি ছাপা হয়েছিল শান্তিকন্যার বারমাসীর শেষ মলাটের ভিতরের অংশে।
৭। মাহফুজুর রহমান লেখক, লোক গবেষক।
কুলাউড়া, মৌলভীবাজার
