বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভোটের রাজনীতি

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ২০:৩৯
বিগত বিএনপি জোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগের দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাংচুর, অফিস-আদালত থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামানো, নানাভাবে তাঁকে অবমাননা করার বেপরোয়া উন্মাদনা আমরা দেখেছিলাম। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত বৃত্তান্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে ৬০টি দেশের সংবিধান ঘেঁটে জাতির পিতার অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতি প্রদর্শন ও সংরক্ষণ আইন বাতিল করা হয়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা যাবে না এমন কথাও তোলা হয়েছিল। সরকার থেকে বলা হয়েছিল—শেখ মুজিব ও জিয়ার ছবি সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে পাশাপাশি লাগানো হবে। শেখ মুজিবকে জাতীয় নেতা হিসেবে সম্মান দেখানো হবে। সরকারের গুটিকয়েক লোক হাততালি দিয়ে উঠেছিলেন। সরকারের সংকীর্ণ মনে তাঁরা উদারতা খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তত্কালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তাঁর লেখা ক’টি বই বাজারে ছাড়লেন এবং তাতে তিনি শেখ মুজিবকে বাংলাদেশের স্থপতি ও জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক করার প্রস্তাব দিলেন। তাঁর ধারণা, এতে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দূরত্ব কমবে। তত্কালীন জোট সরকার একটা মহত্ (!) সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানকে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত শোনার পর আবারও হাততালির ঝড় উঠেছিল। মারহাবা মারহাবা রব উঠেছিল। ক্ষমতার পালাবদলে এই যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসম্মানজনক টানাহেঁচরা তা কি চলতেই থাকবে! তাও সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ! বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির জনক ও বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি আছেন, থাকবেন যতদিন বাঙালি জাতি আছে, বাংলাদেশ আছে । রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যান্য শক্তি বঙ্গবন্ধুকে যথাযথ সম্মান করে। তাঁর উচ্চতা কেউ ছোঁয়ারও প্রশ্ন তোলে না। পাকিস্তানপন্থিরাই বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন গর্বিত সেক্টর কমান্ডার, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে পাকহানাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া অকুতোভয় সৈনিকদের কমান্ডার শুধুমাত্র ক্ষমতার মোহে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারীদের পুনর্বাসন করলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা, স্বাধীনতার সূর্য-সন্তান জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যবস্থা না করে ক্ষমতায় নিজেকে আসীন করলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল মন্ত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদে কি দেশ চালানো যেতো না! যার পথ ধরে আজকের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে করেছে প্রিয় সঙ্গী। অথচ বিএনপিতে রয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা। যে আদর্শ, যে বিশ্বাস, যে মূলমন্ত্র নিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁরা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে করে মূলত নিজেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন। অন্য রাজনৈতিক দলে যে মুক্তিযোদ্ধারা আছেন তাঁরা কেন ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করেন! তাহলে তো নিজের বিরুদ্ধে চলে যাওয়া হয়। তাই বলে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও মূলনীতি ধারণ করে রাজনীতি করার জন্য আওয়ামী লীগ করতে হবে এমন কথা নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু সব দলের সম্পত্তি। দল ও ব্যক্তির ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের সম্পত্তি নন এবং অবশ্যই না। বঙ্গবন্ধুকে মূলধন করে তাঁর আদর্শ চেতনা থেকে চ্যুত হয়ে শুধু ভোটের রাজনীতি করে আসা আওয়ামী লীগের জনসমর্থনের নব্বই থেকে পঁচানব্বই শতাংশ কিন্তু আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর কারণে, আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়ন করবে এই আশায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ একি করছে! ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর আকাশসম সম্মানকে ব্যবহার করে ভোটের রাজনীতিতে অবতীর্ণ হচ্ছে। তাদের কারণে ক্ষমতার পালাবদলে বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করা হয়, তাঁকে নিয়ে টানাহেঁচরা চলে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুকে ভোটের রাজনীতি থেকে বের করে আনতে হবে। আওয়ামী লীগ বাদে অন্যান্য দলের উচিত এ ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এই মনোভাব পোষণ করতে হবে যে বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগের নন। তাঁকে ভোটের মূলধন বানিয়ে আর কাউকে ফায়দা লুটতে দেওয়া হবে না—এ জোরালো দাবি সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা উচিত এবং অবশ্যই অবশ্যই করতে হবে। নির্বাচনী পোস্টারে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই। তিনি কোনো দলের নন। তিনি জাতির পিতা। দলমত নির্বিশেষে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ দলীয় স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটুক, বঙ্গবন্ধুকে অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্বাসীদের অশ্রদ্ধা করতে বাধ্য করুক, তা আমরা চাই না। প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করা হোক। যাতে আওয়ামী লীগসহ কোনো রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করতে না পারে। ক্ষমতার পালাবদলে যারাই ক্ষমতায় আসুক দেশ যেমন সবার ঊর্ধ্বে তেমনি বঙ্গবন্ধুও সবার ঊর্ধ্বে থাকবেন। ঢাকা