চলতি মওসুমে কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট জাগ দেয়ার পানি নিয়ে রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন কৃষক। ভাল ফলন পেতে হলে পাটের চারার জীবনকাল ধরা হয় ১শ’ থেকে ১২০ দিন। এই সময়ের মধ্যে পাট কাটলে সর্বোচ্চ ভাল ফলন পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এখন পুরোপুরি পাট কাটার সময় হলেও পাট জাগ দেয়ার পানির অভাবে কৃষক পাট কাটতে পারছে না। আবার অনেকে পাট কেটে জমিতে কিংবা নিচু জায়গায় স্তূপ করে রেখেছেন। এতে পাটের গুণগতমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, জুলাই মাসের মতো চলতি আগষ্ট মাসেও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। গত জুলাই মাসে সারাদেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি মাসেও কম বৃষ্টিপাত হবে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ঢাকায় ২৮০ থেকে ৩১০ মিমি, চট্টগ্রামে ৫২০ থেকে ৫৬০ মিমি, সিলেটে ৪২০ থেকে ৪৬০ মিমি, রাজশাহীতে ২৪০ থেকে ২৭৫ মিমি, রংপুরে ৩৩০ থেকে ৩৭০ মিমি, খুলনায় ২৪০ থেকে ৩০০ মিমি এবং রবিশালে ৪১০ থেকে ৪৩৫ মিমি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম।
ফলে পাট জাগ দেয়া নিয়ে চিন্তিত কৃষক। সমপ্রতি ফরিদপুর, কুড়িগ্রাম ও বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে পাট চাষিদের এই দুর্ভোগের কথা জানা যায়। বাংলাদেশের সোনালী আঁঁশখ্যাত পাট উত্পাদনের অন্যতম জেলা ফরিদপুর। বরাবরই ফরিদপুরে উত্পাদিত পাটের চাহিদা উপমহাদেশের সর্বত্র। এ বছর চারা থাকাকালীন অতিবৃষ্টি, পরবর্তীতে প্রচন্ড খড়া, ইত্যাদি কারণে এই অঞ্চলে পাটের ফলন ভাল হবে না বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরসঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে পাট জাগ দেয়ার পানির অভাব। জেলার সালথা উপজেলা রঘুয়ার কান্দি গ্রামের পাট চাষি কাজল মিয়া বলেন, পাট নিয়ে গত দু’-বছর ধরে বিপাকে রয়েছি আমরা। প্রথমে টানা বৃষ্টি কারণে পাটের ক্ষেতে পানি জমে পাটের গোড়া পচে যাওয়ার সমস্যা আবার এখন পাট কেটে জাগ দেয়ার সমস্যা। পাট জাগ দিতে হয় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কুমার নদীতে নইলে নিজ বাড়ির পুকুরে। অথচ আগে পাট জাগ দেয়ার সময়কালে এলাকার খাল- বিল, নদী-নালা, মাঠ বর্ষার পানিতে থৈ থৈ করতো।
সালথা উপজেলার ভাওয়াল গ্রামের পাট চাষি বেলায়েত খান বলেন, পাট পচাতে পানির এত অভাব থাকতো না যদি পদ্মার সাথে সংযুক্ত জেলার সবকয়টি স্লুইস গেট খুলে দেয়া হত।
পাট জাগের এ সমস্যা প্রসঙ্গে ফরিদপুর কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ চন্ডীদাস কুন্ডু ইত্তেফাককে বলেন, পানির অভাবে পাট জাগের এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে কৃষকরা রিবন রেটিং পদ্ধতিতে আঁঁশ ছাড়াতে পারে। কিন্তু রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট আগে কাটতে হয় তারপর গোড়া থেঁতলাতে হয়। এই বিষয়টাকে কৃষকরা ঝামেলা মনে করে। যার কারণে এই অঞ্চলের কৃষকরা শত ভাগ জাগের উপর নির্ভরশীল।
কুড়িগ্রামে এবার পাটের বাম্পার ফলন হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে পাট পচাতে (জাগ) না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে চাষিরা। পাট কেটে পানির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে কৃষকদের। অনেকে পাট কেটে জমিতে কিংবা নিচু জায়গায় স্তূপ করে রেখেছেন। এতে পাটের গুণগতমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া জানান, এবার ছ্যাঙ্গা পোকার আক্রমণ, ভাল মানের বীজ সংকট, অনাবৃষ্টি ও পাট পচানোর জায়গা সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে পাট চাষিদের। বগুড়ার শেরপুর, ধুনট, মথুরাপুর, সারিয়াকান্দিসহ বগুড়া জেলার অন্যান্য উপজেলা ও সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা মোকামসহ বড় বড় মোকামে পাট কেনা-বেচা অল্প পরিমাণে শুরু হয়েছে। পাটের পুরোপুরি বিকিকিনি শুরু হবে আরো দুই সপ্তাহ পড়ে। শেরপুর উপজেলার গুয়াগাছি গ্রামের কৃষক মগরেব জানান, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পাট পচানো নিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জয়লাজুয়ান গ্রামের কৃষক মোকছেদ আলী জানান, অনেকে পুকুর-ডোবা লিজ নিয়ে পাট জাগ দিয়েছে। অনেককে ট্রাক-ট্রলিযোগে নদী অথবা সরকারি বিল-জলাশয়ে পাট জাগ দিতে হয়েছে। ধুনট উপজেলার বিশ্বহরিগাছা গ্রামের কৃষক আমির হোসেন তালুকদার জানান, সঙ্গত কারণে পাটের উত্পাদন খরচ বেড়ে গেছে। তিনি জানান, বাজারে যে দাম আছে তাতে খরচ হিসাব করলে এবার পাটের উত্পাদন খরচ উঠবে না। পাট চাষিদের লোকসান গুনতে হবে।
