পেশা যখন মানুষের সাথে যোগাযোগ

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৮
নিজের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অন্য প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব একটি প্রতিষ্ঠানের যে বিভাগের উপর ন্যস্ত থাকে, তারই নাম জনসংযোগ বিভাগ বা পাবলিক রিলেশন। এই বিভাগের এবং বিভাগে কর্মকরতদের মূল দায়িত্বই হচ্ছে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করা। এই সংশ্লিষ্ট পেশা সম্পর্কে এই লেখায় জানাচ্ছেন সানজিদা সুলতানা তুমি কী দারুণ কথা বলতে পারো! শুধুমাত্র কথা বলেই কঠিন থেকে কঠিনতম পরিস্থিতিকে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নেওয়া তোমার কাছে কোনো ব্যাপারই না। স্কুল-কলেজের স্যার থেকে থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির ঝগড়ুটে আন্টিও কি তোমার কথার জাদুতে বশ? তা হলে বলে রাখি, তোমার এই কথা বলার ক্ষমতা দিয়েই পাবলিক রিলেশন (পিআর) বা জনসংযোগের জগতে তুমি নিজের জন্য তৈরি করে ফেলতে পারো এক দারুণ ক্যারিয়ার। জনসংযোগ পেশা কী পেশার নাম দেখেই ধারণা করা যায় জনসংযোগ পেশাটা আসলে কী। জনসংযোগ বা পাবলিক রিলেশন একটি প্রতিষ্ঠানের এমন একটি বিভাগ, যে বিভাগটি ওই প্রতিষ্ঠানকে পরিচিত করে তুলে বাইরের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির কাছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক, নিজের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং খবর অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রচার—এর সবই জনসংযোগ বিভাগের কাজ। এই বিভাগে যারা কর্মরত থাকবেন, তাদের কাজও তেমনি নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের কাছে নিজের প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে তুলে ধরা। আর এর জন্য মূল যে বিষয়টি প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে যোগাযোগ এবং নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলাই একজন জনসংযোগ কর্মকর্তার মূল দায়িত্ব। কেমন হবেন জনসংযোগ কর্মকর্তা পাবলিক রিলেশন অফিসার (পিআরও) বা জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রথমে একজন সাংবাদিক, লেখক, ফিচার লেখক এবং পরবর্তী সময়ে সে একজন তথ্যব্যাংক, যে ব্যাংক থেকে মিডিয়া, প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত ব্যবসা ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সংবাদ ডিজাইন এবং মিডিয়ার মাস্টার প্ল্যান ইত্যাদি সংগ্রহ করবে। একজন পিআরও প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ভিআইপি; সিআইপি কিংবা মিডিয়ার সম্পাদক, বাণিজ্যিক ম্যানেজার, সংবাদকর্মীদের সাথে কাজে ব্যস্ত থাকবে। ফলে প্রথমেই তাকে নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হতে হবে। এই দক্ষতা যেমন থাকতে হবে লেখায়, তেমনি বলা ও শোনার ক্ষেত্রেও সেটা আবশ্যকীয়। দ্বিতীয়ত, এই পেশায় যারা কাজ করবে, তাদের অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের আস্থা বাড়াতে এই সেকশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই সেকশনকে ঊর্ধ্বতনদের সাথে আলোচনা ও যোগাযোগের প্রেক্ষিতে মার্কেটিংয়ের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি তথা অফারের ক্ষেত্রে সজাগ থাকতে হবে। যখন যে অফার প্রতিষ্ঠান করবে তা সততার সাথে রক্ষা করার প্রতি আপোষহীন থাকতে হবে। বিষয়টি প্রতিষ্ঠান প্রধান বা গ্রুপের পরিচালনা পরিষদের খুব সতর্কতার সাথে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বাজেটের প্রচার যাতে একইসাথে জনহিতকর হয় সেই বিষয়ে ডিজাইন পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে। তৃতীয়ত, এই পেশার একজন প্রফেশনালকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথেই কাজ করতে হয়। কাজেই কোন পর্যায়ের মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে এবং তাদের কী করে নিজের মন্তব্য এবং লক্ষ্যের প্রতি আস্থায় আনতে হবে, সে বিষয়ে যথার্থ কৌশলও জানতে হবে। জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সরকারি বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই জনসংযোগ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগ যতবেশি শক্তিশালী সে প্রতিষ্ঠান সর্বমহলে ততোবেশি পরিচিত ও সুপ্রসিদ্ধ। একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, ক্রেতা-বিক্রেতা, গ্রাহক কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ও যোগাযোগ বৃদ্ধির কাজটি যথাযথভাবে পালন করতে হয় প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তাকে। শুধু তাই নয় নিজ প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলাটাও জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া সকল প্রকার ইভেন্ট আয়োজন ও সফলভাবে পরিচালনা করা জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানের এমডি/চেয়ারম্যানের সাথে অন্য প্রতিষ্ঠানের এমডি/চেয়ারম্যানের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা ও বাস্তবায়ন করা, বিদেশি ভিজিটরদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট তত্ত্বাবধান করার কাজ জনসংযোগ কর্মকর্তারা করে থাকেন। কর্পোরেট চুক্তি অনুষ্ঠানে জনসংযোগ কর্মকর্তা সার্বিক সহযোগিতা করা জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানের সকল ক্ষেত্রে জনসংযোগ কর্মকর্তার বিচরণ থাকে। অর্থাত্ মার্কেটিংয়ের মুখ্য ভূমিকা জনসংযোগ কর্মকর্তারা পালন করে থাকেন। সর্বোপরি গণমাধ্যমের কর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ড সর্বোচ্চ জনসম্মুখে তুলে ধরা জনসংযোগ কর্মকর্তার মূখ্য দায়িত্ব। শিক্ষাগত যোগ্যতা যে কোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেই যোগ দেওয়া যেতে পারে এই পেশায়। এই পেশায় আসার জন্য আসলে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে পড়ালেখার বাধ্যবাধকতা নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বেশকিছু বাড়তি যোগ্যতাও প্রয়োজন হয় এই পেশায়। যেমন, এই পেশায় আসতে হলে হতে হবে সদালাপী, বিনয়ী, ব্যক্তিত্ববান ও কৌশলী। কাজটা যেহেতু যোগাযোগ রক্ষা করে চলা, তাই সমাজের উচ্চস্তর থেকে সাধারণ লোকজনের সাথে মেশার সক্ষমতা থাকতে হবে। আর সেই অভ্যাস না থাকলেও অন্তত মানসিকতাটা থাকতে হবে। তাছাড়া সুন্দর বাচনভঙ্গি, গুছিয়ে কথা বলা ও উপস্থাপন ক্ষমতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্তরিকতা, কাজে একাগ্রতা, দৃঢ় মনোবল, উদ্যম প্রভৃতি গুণও থাকতে হবে। আর ইংরেজিতে ভালো দখল এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজে দক্ষতা এখন সব চাকরির ক্ষেত্রেই সমান দরকারি। এগুলো জনসংযোগ পেশার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। সময়ের সাথে সাথে এই পেশার চাহিদা বেড়ে চলার কারণে এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই এই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের কোর্স করিয়ে থাকে। এই পেশায় সাফল্য লাভে দৃঢপ্রতিজ্ঞ হলে এই কোর্সগুলো করে নিতে পারেন পেশায় প্রবেশের আগেই। আর বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে কম্পিউটার এবং ইংরেজির উপরেও প্রফেশনাল কোর্সগুলো করে নিতে পারেন। চাকরি ও কাজের সুযোগ পাবলিক রিলেশন নিয়ে পড়াশোনা করলে চাকরির সুযোগের অভাব হয় না। এন্টারটেইনমেন্ট সেক্টর থেকে মাল্টিন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি—সব জায়গাতেই পাবলিক রিলেশন প্রফেশনালদের চাহিদা প্রচুর। সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই জনসংযোগ বিভাগ বর্তমানে অনিবার্য। দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে জনসংযোগ কর্মকর্তাদের কাজের চাহিদা। প্রায় সব ক’টি প্রতিষ্ঠানেই জনসংযোগ বিভাগ চালু আছে। তাছাড়া বেসরকারি সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, কনসালটেন্সি ফার্ম, আইটি কোম্পানি, হোটেল ও ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, বিভিন্ন সেবা সংস্থা, হাসপাতালসহ সকল প্রকার শিল্প প্রতিষ্ঠানেই জনসংযোগ বিভাগ চালু রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে জনসংযোগের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন পিআর নিয়েও আলাদা এজেন্সি এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আর নিজেকে যথেষ্ট দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী ভাবলে নিজেও এই ধরনের পিআর পতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। হতে চাইলে জনসংযোগ কর্মকর্তা জনসংযোগের জগতে তোমার ভবিষ্যত কতটা উজ্জ্বল, তা তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়েও বেশি নির্ভর করে কিছু বিশেষ স্কিল বা দক্ষতা তোমার মধ্যে রয়েছে কিনা তার উপর। এই দক্ষতাগুলো কী করে সনাক্ত করা যাবে, তার জন্য নানা ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। নিচের ছোট্ট কিছু প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে অবশ্য এ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। নিচের প্রশ্নগুলো ভালো করে খেয়াল করো। বিভিন্ন ধারা এবং ধরনের লোকজন তোমার পছন্দ? বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে মিশতে তোমার কোনের অসুবিধা হয় না? বিভিন্ন এবং বিচিত্র সব বিষয়ের নানা তথ্য থাকে তোমার কাছে? বন্ধু-বান্ধবদের কিছু জানার প্রয়োজন হলে বন্ধুরা কি প্রথমে এবং প্রায়ই তোমার কাছেই ধর্ণা দেয়? ঘরের যতসব ছোট-বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন, তার সব দায়িত্ব কি তোমার উপরেই থাকে? স্কুল বা কলেজে ক্লাসের বা ক্লাসের বাইরের প্রোগ্রামগুলোর দায়িত্বও কি তোমাকেই পালন করতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তরে যদি তোমার কাছ থেকে বেশিরভাগই হ্যাঁ আসে, তাহলে এই পেশায় আসাটা তোমার কাছে খুব একটা কঠিন হবে না। বরং এই পেশাতে প্রবেশ করলে তোমার সাফল্য পেতে অন্যদের তুলনায় কিছুটা হলেও কষ্ট কম করতে হবে।