চিফ প্রসিকিউটর টিপুর ছেলে আশিষের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৬
যুদ্ধাপরাধ আদালতের চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর একমাত্র ছেলে আহমেদ আরিফ ইফতেখার আশিষের মৃত্যু নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। রহস্য ঘণীভূত হচ্ছে। এই মৃত্যুর নেপথ্যে স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ীর চিকিত্সা অবহেলা নাকি পরকীয়া প্রেমের কারণে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড— এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ১৫ জুন রাতে আশিষের জ্বর এলে ১৬ জুন তার শাশুড়ী ঢাকা থেকে টেলিফোনে স্ত্রী ইলোরাকে খবর দেন। রাত সাড়ে ১০টায় স্ত্রী তানজিমা মনিম ইলোরা চৌধুরী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী আসেন। স্ত্রী ইলোরা স্কুল শিক্ষকতার সুবাদে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মায়ের বাড়িতেই থাকতেন। রাজশাহীতে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ী বদলি করিয়ে নিতে চাইলেও রাজি হননি। অন্যদিকে পারিবারিক সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে শফিকুল নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক পুরুষের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ইলোরার চাঁপাইনবাবগঞ্জেই থাকার ইচ্ছে প্রবল ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে শফিকুলের সঙ্গে যখন তখন ইলোরা মটর সাইকেল বা রিকশায় ঘুরে বেড়াতেন। এ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে মাঝখানে দীর্ঘ দুই বছর দাম্পত্য জীবন শীতল হয়ে পড়েছিল; কিন্তু আশিষের ছিল স্ত্রী ইলোরার জন্য অন্ধ প্রেম। টিন এজ বয়সে দুই জনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ইলোরার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা দেয়। দুই বছরের সংসার জীবনের ইতি ঘটিয়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া ইলোরার সঙ্গে আশিষের ফের যোগাযোগ হয় খালাত বোন নেলির বিয়েতে। শুরু হয় নতুন করে পুরনো প্রেম। পরিবারের আপত্তি থাকলেও আশিষের জেদের কারণে আশিষের বাবা-মা ইলোরার বাপ-চাচা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে সম্মতি দেন। বাড়ির একমাত্র ছেলের বিয়ে হয় মহা ধুমধামে। সেটি ৩০ আগস্ট ২০০৩ সালের ঘটনা। ২০১০ সাল থেকেই তিনি স্থায়ীভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাস করতে থাকেন। জানা যায়, রাজশাহী নগরীর উপ-শহরের তিনতলা বাড়িটিতে আশিষ একাই থাকতেন। মা-বাবা ঢাকার বেইলী রোডের মিনিস্টার এপার্টমেন্টে বাস করেন। ১৬ জুন রাত সাড়ে ১০টায় ইলোরা রাজশাহীতে অসুস্থ আশিষের কাছে এলে ঢাকা থেকে তার শাশুড়ী ফোন করে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান। ইলোরা বলেছিলেন সে ঘুমিয়ে আছে। ভালো আছে। ২৪ জুন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ইলোরা তার শাশুড়ী ও ননদদের কখনোই টেলিফোন দেয়নি। বার বার বলেছে ঘুমিয়ে আছে, ভালো আছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও তার পিতা-মাতাকে স্ত্রী ইলোরা বা শ্বশুর-শাশুড়ী— কেউ জানাননি। ১৬ জুন রাতে তার সেজ বোন ঢাকা থেকে ফোন করলে আশিষের শরীরটা খারাপ বলে জানান। বোন বলেছিলেন, রাজশাহীতে ডাক্তার দেখিয়ে ঢাকা চলে আয়। ইলোরাকেও ঢাকা নিয়ে যেতে বলেছিলেন। জবাবে ইলোরা বলেছিলেন, ১০ বছরে ১০ বার তোমার ভাইয়ের ভাইরাল ফিভার হয়। এটা নতুন কিছু নয়। ১৭ জুন সকালে আশিষের বোন ফোন করলে ইলোরা জানান, আশিষ ভালো আছে। ইলোরা বলেছিলেন, সেদিন তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে চলে যাব। বোন বলেছিলেন, রাজশাহীতে মেডিসিনের একজন অধ্যাপক দেখাও। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ জুন রাত সাড়ে ৮টায় ইলোরা আশিষকে ডাক্তার আনোয়ারের চেম্বারে নিয়ে যান। অন্যদিকে ঢাকা থেকে শাশুড়ী-ননদদের তিনি বলেন, আশিষ ভালো আছে, আশিষ ঘুমাচ্ছে, সে কথা বলতে চাইছে না। ২০ জুন ফের ডাক্তার আনোয়ারের কাছে চিকিত্সা করানো হয়; কিন্তু গায়ে প্রচণ্ড জ্বর, ব্যথা ও কাশি না কমার কারণে তার অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে ২১ জুন সকালে মেডিসিন ও হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ওমর ফারুকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডা. ওমর ফারুক প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশনসহ প্যাথলজি ও ডিজিটাল এক্স-রে টেস্ট দেন। প্রয়োজনে তাকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। ডা. ওমর ফারুক বলেছেন, ২২ জুন সকালে তিনি আশিষের শ্বশুর মনিম উদ্দৌলাকে ফোন করলে জানান, ডিজিটাল এক্স-রে করানো হয়নি। এতে ডা. হতাশ হন। তার মতে মৃত্যুবরণ করার মতো অসুখ আশিষের ছিল না। ২১ জুন রাত থেকেই মনিম উদ্দৌলার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে বেড়ে ওঠা নার্স দিয়ে ইনজেকশন পুশ করালে তার পাতলা পায়খানা ও সঙ্গে রক্ত যায়। এটিও ডা. ওমর ফারুককে জানানো হয়নি। অন্যদিকে ২২ জুন রাতে ডাক্তার ওমর ফারুক ইস্তাম্বুল চলে যান এবং ফিরে এসে শুনেন আশিষ মারা গেছে। ২২ জুন আশিষের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তার শ্বাসকষ্ট, শারীরিক দুর্বলতা এমনকি কথা বলার শক্তিও হারাতে থাকেন। ২৪ জুন সকাল ১১টায় ইলোরার পিতা মনিম উদ্দৌলা চৌধুরী ফোন করে আশিষের পিতা গোলাম আরিফ টিপুকে প্রথম জানান। তিনি আশিষের পিতাকে আপনার ছেলের অবস্থা ভালো নয়, আপনি যা করার করেন বলে ফোন রেখে দেন। আশিষের পিতা উদ্ভ্রান্তের মতো বের হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রাণ গোপাল দত্তসহ মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. এম আবদুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসপাতালে চিকিত্সার আয়োজন করেন। অন্যদিকে ইলোরার বাবা-মা তাদের কন্যার সঙ্গে বাড়ির দফাদার দিয়ে মাইক্রোবাসে করে আশিষকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পাঠিয়ে দেন। রাজশাহী মেডিক্যালে আনার পর প্রিন্সিপাল ও পরিচালক গোলাম আরিফ টিপুর টেলিফোন পেয়ে অক্সিজেন সাপোর্ট এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষকে তিনি বলেছিলেন, তার অবস্থা স্থিতিশীল হলেই তাকে ঢাকা পাঠিয়ে দিতে। রাজশাহী মেডিক্যালেও তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়। রুগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে আরএমও অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন বেলা ৩টায়। নাটোর এসে বেলা ৪টার দিকে অসুস্থ আশিষ টয়লেটে পড়ে গেলে তাকে নাটোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে। এ সময় ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢাকা থেকে ভোররাতে যখন উপ-শহরের বাড়িতে সন্তানহারা পিতা-মাতাসহ বোনেরা এবং আত্মীয়-স্বজনরা পৌঁছেন তখন নিচ তলায় কাফন পরিহিত আশিষের মাথার পেছনে রক্তাক্ত দাগ, নাকে রক্তে ভেজা তুলা দেখতে পান। আশিষের পরনের কাপড়-চোপড় কোথায় জানতে চাইলে ইলোরা তার শাশুড়ীকে জানান, এসব তার মায়ের কাছে দিয়ে দিয়েছেন। ইলোরা ও তার মা-বাবা ছিলেন স্বাভাবিক। বাড়িতে যখন শোকের মাতম চলছিল তখন আশিষের লেখা ডায়রি, তার মোবাইলের মেমোরি কার্ডসহ বেশ কিছু কাগজ-পত্র গায়েব হয়ে যায়। আশিষের বড় বোন ইলোরার মা-বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন আশিষের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও একদিনের জন্য হলেও তার বাবা-মা বা বোনদের জানানো হয়নি? কেন তার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি? তারা সদুত্তর দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে আশিষের শ্বশুর মনিম উদ্দৌলা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, জামাই আশিষের চিকিত্সায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এর বাইরে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।