এত গ্যাস গেল কোথায়?

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৭
গত চার বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন বেড়েছে। কিন্তু সংকট কাটেনি। সমস্যা যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৩) ৬৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে যোগ হয়েছে। একই সময়ে কারিগরি কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উত্পাদন কমেছে ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে চার বছরে জাতীয় গ্রীডে নিট যোগ হয়েছে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তবু সংকট কাটেনি। স্বাভাবিক কারণেই গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, এত গ্যাস গেল কোথায়? নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। পুরোনো ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনও বেড়েছে। কিন্তু গ্যাস নিয়ে হাহাকার কাটেনি। বিশেষ করে শিল্পে। শিল্প কারখানাগুলোতে বছরজুড়ে গ্যাস সংকট ছিলই। রেশনিং করে গ্যাস দেয়া হয়েছে। এখনও সিএনজিতে রেশনিং করে গ্যাস দেয়া হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে বছরজুড়ে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট উত্পাদনক্ষমতার বিদ্যুত্ কেন্দ্র বন্ধ ছিল। শীতের সময় প্রতি বছর আবাসিকসহ সব গ্রাহকের গ্যাসের সংকট হয়েছে। অথচ এত বেশি গ্যাসের সরবরাহ আগে কখনো ছিল না।২০১১-১২ অর্থ বছরে বার্ষিক গড়ে ৯৬২ বিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৭১৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। ঐ বছর গ্যাস ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৪৯ বিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহের দিক থেকে এই পরিমাণ গ্যাস অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু তবু অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে সে বাড়তি উত্পাদনের সুফল যথাযথ ভোক্তারা পায়নি। এখন থেকে দশ বছর আগে ২০০৪ সালে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ছিল এক হাজার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু উত্তোলন হয়েছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সে সময় প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল গ্যাসের ঘাটতি। ২০০৭ সালে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছিল এক হাজার ৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর উত্তোলন করা হয়েছে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এরপর গত সাড়ে চার বছরে গ্যাসের উত্তোলন এবং সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে নিট ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উত্তোলন করা হচ্ছে দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা আর দুর্নীতির কারণে গ্যাসের সংকট কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গেল কয়েক বছর এই সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাসের উত্তোলন বাড়লেও ভোগান্তি কমেনি একটুও। গত দশ বছরে গ্যাসের উত্তোলন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু ভোগান্তি যা ছিল তাই আছে। বিশেষ করে শিল্পে। শিল্প কারখানার ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। ব্যবস্থাপনার অভাবে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ দেয়ার কথা বলা হলেও তা ঠিকমত দেয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা আর নীতির অভাবে এই পরিস্থিতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আর অগ্রাধিকার ঠিক করে গ্যাস সরবরাহ করলে পরিস্থিতি এমন হত না। তা না করে বরং দুর্নীতি আর অবৈধ ব্যবস্থাকে আরো উস্কে দেয়া হয়েছে। তাই গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়লেও তার সুফল পাওয়া যায়নি। গত কয়েক বছর প্রায় পুরো সময়টা জুড়ে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নতুন সংযোগ না দিলেও চাহিদা বেড়েছে। যার পুরোটাই হয়েছে অবৈধভাবে। আর অবৈধভাবে এই চাহিদা বাড়ার ফলে গ্যাসের ব্যবহারে অগ্রাধিকার ঠিক করা যায়নি। অন্যদিকে গ্যাস আছে কি নেই তা বিচার না করেই এবং যথাযথ স্থান ঠিক না করে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেখা গেছে সমন্বয়হীনতার অভাব। সমন্বিতভাবে এই কাজ করতে পারলে সমস্যা অনেক কম হত। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে যার জন্য পেট্রোবাংলার কাছ থেকে গ্যাসের প্রাপ্তির কোন অনুমতি নেয়া হয়নি। গত কয়েক বছরে ৩০২টি বড় প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২২১টি শিল্প কারাখানা রয়েছে। সিএনজি স্টেশন আছে দুইটি। আর ক্যাপটিভ বিদ্যুত্ কেন্দ্র আছে ৫৯টি। এছাড়া আবাসিক বাড়িতে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে এক লাখ ৬৪ হাজার ৮০৩টিতে।