মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকদের হঠাতে সেনাবাহিনী গতকাল অভিযান চালালে রাজধানী কায়রো রক্তাক্ত হয়। সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ও বুলডোজার ব্যবহার করে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু লোক হতাহত হয়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে কায়রোয় মুরসির সমর্থকদের দুটি ক্যাম্পে অভিযান শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী। কয়েক ঘন্টার অভিযানে দুটি ক্যাম্প খালি করে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুরসি সমর্থকরা রাস্তায় নেমে আসে। কায়রোয় রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনী ও মুরসি বিরোধীদের সঙ্গে মুরসি সমর্থকদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘটনার নিন্দা জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার সারাদেশে এক মাসের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করে। খবর বিবিবি, সিএনএন, রয়টার্সের।
মুরসি সমর্থকদের হঠাতে সেনাবাহিনীর চালানো অভিযানে কতজন হতাহত হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। মিসরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল নীল জানিয়েছে, অভিযান চালানোর সময় ১৫০ জন নিহত ও প্রায় দেড় হাজার লোক আহত হয়েছে; কিন্তু মুরসির নেতৃত্বাধীন দল মুসলিম ব্রাদারহুড জানিয়েছে, এই অভিযানে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের ওয়েবসাইট ইখওয়ান অনলাইন দাবি করেছে, সেনা অভিযানে দুই হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে।
সেনা বাহিনী পূর্ব কায়রোর রাবা আল-আদাউইয়া মসজিদের বাইরে যেখানে ব্রাদারহুড সমর্থকরা অবস্থান নিয়েছিল সেখানে অভিযান চালানোর সময় সেই জায়গাটি কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকাটি ঘিরে রাখে। আশপাশের সড়কগুলোতে মুরসি-সমর্থকদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে ঢিল ছুঁড়ে। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে টিয়ার গ্যাসের পাশাপাশি তাজা বুলেট ব্যবহার করছে। সামরিক বাহিনী ঐ এলাকার হাসপাতালগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এছাড়া রাজধানী কায়রোর আল-নাহ্?দা স্কয়ার থেকে ব্রাদারহুড সমর্থকদের সরিয়ে দেয়া হয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাবিল ফাহমি বলেন, অবস্থান কর্মসূচি ‘অনির্দিষ্টকাল ধরে’ চলতে পারে না।
মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে গত ৩ জুলাই সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হন মুরসি। এরপর মুরসিসহ তার দল মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেক সিনিয়র নেতাকে আটক করা হয়। মুরসিকে অজ্ঞাত স্থানে রেখে তার বিরুদ্ধে দুইবার আটকাদেশ দেয়া হয়। মুরসিকে ক্ষমতচ্যুত করার পর থেকেই তার সমর্থকরা আল-নাহদা স্কতয়ার ও রাবা আল-আদাউইয়া মসজিদের বাইরে তাঁবু টাঙিয়ে টানা বিক্ষোভ চালায়। তাদেরকে সরে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর দেয়া ৪৮ ঘণ্টা সময় পার হওয়ার পরই নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে রক্তাক্ত হয় কায়রো।
গতকাল অভিযান শুরু হওয়ার পর মুসলিম ব্রাদারহুড তার সমর্থকদের আবার রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছে এবং পুলিশ এ ধরনের একটি গ্রুপকে হঠিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কায়রোর পশ্চিমে রাবা আল-আদাউইয়া মসজিদের বাইরে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এখানে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
কায়রোয় নিরাপত্ত বাহিনীর অভিযানের সময় ব্রিটেনের টিভি চ্যানেল স্কাই নিউজের ক্যামেরাম্যান মাইক ডিন নিহত হন।
বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে বাইরে:মুসলিম ব্রাদারহুডের বিক্ষোভ কায়রো ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সুয়েজ প্রদেশে অন্তত পাঁচ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। এখানে মুরসি সমর্থকরা সরকারি ভবন ভাংচুর করে। মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় মুরসি সমর্থকরা সড়ক অবরোধ করে। আলেকজান্দ্রিয়া, বেহিরিয়া, মধ্যঞ্চলীয় আসিউত ও মিনিয়া শহর থেকেও নিরাপত্তা বাহিনীর এবং ব্রাদারহুড সমর্থকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আসওয়ানে শহরে শত শত বিক্ষোভকারী স্থানীয় গভর্নরের অফিসের সামনে জড়ো হয়। মধ্যাঞ্চলে তিনটি গির্জায় মুরসি সমর্থকার হামলা চালায় বলে খবর পাওয়া যায়।
অভিযানের নিন্দা:কায়রোর ঘটনায় কয়েকটি দেশ ও সংস্থা নিন্দা জানিয়েছে। মুরসি সমর্থকদরে ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউস নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি গণতন্ত্রের প্রতি অন্তর্বর্তী সরাকরের অঙ্গীকারের বরখেলাপ। তুরস্ক কায়রোর অভিযানকে হত্যাযজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আর ইরান সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মিসরে গৃহযুদ্ধ শুরুর আশংকা দেখা দিয়েছে। কাতার মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থকদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার নিন্দা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিসর কর্তৃপক্ষের প্রতি সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ শক্তি প্রয়োগের নিন্দা করেছেন।
মিসরে বাংলাদেশীরা নিরাপদে
আছে :পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বাসস জানান, মিসরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসি সমর্থকদের ওপর সামরিক বাহিনী রক্তক্ষয়ী অভিযান সত্ত্বেও সেদেশে বাংলাদেশীরা নিরাপদে রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহি:সমপ্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, আমাদের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ হাজার বাংলাদেশী বর্তমানে মিসরে রয়েছে এবং কায়রোয় আমাদের দূতাবাস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানতে পেরেছি, সেখানে সকল বাংলাদেশী নিরাপদ রয়েছে।
তিনি বলেন, কায়রোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের দুটি ক্যাম্পে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালানোর কারণে দূতাবাস কর্মকর্তারা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তিনি বলেন, দূতাবাস এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশীর হতাহতের খবর পায়নি।
