শেয়ারবাজারের বেরিশরভাগ বিনিয়োগকারীই লভ্যাংশে কর ছাড় পাচ্ছেন না। বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে এ বছর সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশে কর ছাড়ের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আইনের অস্পষ্টতা ও নানা জটিলতার কারণে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
স্টক এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি কোম্পানির লভ্যাংশ প্রাপ্তিতে কর ছাড়, নাকি বিনিয়োগকারীর (বিভিন্ন কোম্পানি থেকে) প্রাপ্ত মোট লভ্যাংশের উপর কর ছাড় দেয়া হবে এ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো লভ্যাংশ দেয়ার সময় (মোট লভ্যাংশে কর ছাড় ভিত্তিতে) গণহারে কর কেটে রাখছে। এতে কর ছাড় পেতে আয়কর বিবরণী দাখিলের সময় বিনিয়োগকারীদের কর সমন্বয় করে নিতে হচ্ছে। কিন্তু কর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা জটিলতা। ফলে শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীই এ সুবিধা পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, আয়কর বিবরণী দাখিলের সময় কোম্পানির দেয়া লভ্যাংশ সংক্রান্ত ওয়ারেন্টি পেপার (লভ্যাংশ ও কর্তনকৃত কর সংক্রান্ত চিঠি) জমা দেয়া হলে কর্তনকৃত কর সমন্বয় করা হয়। কিন্তু যাদের টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) নেই কিংবা টিআইএন থাকলেও করের আওতামুক্ত তাদের পক্ষে লভ্যাংশের উপর কেটে নেয়া কর সমন্বয় করার সুযোগ নেই। ফলে তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এদিকে সামপ্রতিক সময়ে কোম্পানিগুলো তাদের দেয়া নগদ লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি যোগ করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ওয়ারেন্টি পেপার দেয়া হচ্ছে না। ফলে কর্তনকৃত কর সমন্বয় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্বপন কুমার বালা বলেন, যেসব বিনিয়োগকারীর টিআইএন নেই তারা লভ্যাংশে কর ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না। টিআইএন থাকলেও করযোগ্য আয়সীমার বাইরে থাকলে তারাও কর ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না। তাছাড়া ওয়ারেন্টি পেপার না দেয়ায় অনেকেই কর সমন্বয়েও সমস্যায় পড়ছেন।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, যাদের আয় বেশি তারা লভ্যাংশে কর ছাড়ের সুযোগ (সমন্বয়ের মাধ্যমে) অন্তত পাচ্ছেন। কিন্তু যাদের আয় কম তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে কর দিতে হচ্ছে। ফলে এক্ষেত্রে কম আয়সম্পন্ন মানুষের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে। এদিকে কর ছাড় সংক্রান্ত ঘোষণা থাকলেও তা না পাওয়ায় এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য নেয়া প্রণোদনার অংশ হিসেবে সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশে কর ছাড়ের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা না পাওয়ায় এ প্রণোদনা কাজে আসছে না। বিনিয়োগকারীরা আরও বলছেন, কর্তনকৃত কর সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক বিনিয়োগকারী ভালোভাবে জানেনও না। ফলে ঘোষণায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত কর ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।
স্টক এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তারা বলছেন, কর ছাড়ের সীমা কমিয়ে হলেও প্রতি কোম্পানির লভ্যাংশ প্রাপ্তিতে কর ছাড় দেয়া হলে বিনিয়োগকারীরা এ সুবিধা পাবেন। কারণ উেস কর না কাটা হলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি সুবিধা পাবেন। অন্যথায় যে উদ্দেশ্যে কর ছাড় দেয়া হয়েছিল বাস্তবে তা পূরণ হবে না। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ সাজিদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, লভ্যাংশে কর ছাড়ের বিষয়ে আইনের অস্পষ্টতা থাকায় কোম্পানিগুলো কর কেটে রাখছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা সরকারের ঘোষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতি কোম্পানির দেয়া লভ্যাংশে (১০ হাজার টাকা পর্যন্ত) কর ছাড়, নাকি ব্যক্তির মোট লভ্যাংশ প্রাপ্তিতে কর ছাড় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এতে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য উেস কর কেটে রাখছে।
স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশের উপর সরকার কর ছাড় সুবিধা দিয়েছে। আগে এ সুবিধা ছিল ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশের উপর। কিন্তু কোম্পানিভিত্তিতে কর ছাড়ের সুবিধা না দেয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাচ্ছেন না। এমনই একজন বিনিয়োগকারী আজিজুর রহমান মিয়া। তার বিও (বেনেফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্টে বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির ৬০টি শেয়ার ছিল। ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে তিনি ৯০ টাকা লভ্যাংশ পেয়েছেন। তার এ লভ্যাংশের উপর ১০ শতাংশ হারে ৯ টাকা কর কেটে নেয়া হয়েছে। একই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে থাকা সাউথইস্ট ব্যাংক ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড কোম্পানির লভ্যাংশেও ১০ শতাংশ হারে কর কেটে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও লভ্যাংশের পরিমাণ ১০০ টাকার কম। এভাবে শুধু আজিজুর রহমান মিয়াই নন, লাখ লাখ বিনিয়োগকারীই কর ছাড় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উেস কর হিসেবে কর কেটে নেয়ায় বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাচ্ছেন না।
এসব প্রসঙ্গে এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশে উেস কর কেটে নেয়া হচ্ছে। এতে তারা রিটার্ন দাখিল করে কর সমন্বয় করতে পারবেন। কারো যদি আয়সীমা করযোগ্য আয়সীমার নিচে হয়, তবে যথাযথ কাগজপত্র (ডিভিডেন্ট ওয়ারেন্ট পেপার) জমা দিয়ে রিফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। রিফান্ডের বিষয়টি জটিল কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিফান্ড পেতে ওয়ারেন্ট পেপার সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু অনেকেই এ পেপার সময়মতো পান না। ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু জটিলতা রয়েছে। তবে এনবিআরের পক্ষ থেকে কোনো জটিলতা নেই। কাগজপত্র জমা দেয়া হলে রিফান্ড করা হয়। সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ছাড় দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা রিটার্ন দাখিলে উত্সাহ পাবেন।
