রিজার্ভে রেকর্ড ইতিবাচক নয়

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫২
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিকে মোটেও ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন না দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিনিয়োগ কমায় দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। এ কারণে সরকারের শেষ সময়ে এসে রিজার্ভ ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। এটা প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, রিজার্ভ বেড়ে যাবার নানা কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখ করলেও মূলত বিনিয়োগ কম হবার কারণেই বাড়ছে রিজার্ভ। বিনিয়োগ না বাড়ানো গেলে এই রিজার্ভ এক প্রকার অলস অর্থের মতোই পড়ে থাকবে। তাই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন তারা। এজন্য প্রয়োজনে প্রণোদনা নীতি ঘোষণার পরামর্শও দিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডক্টর আকবর আলী খান বলেছেন, রিজার্ভ স্বস্তিকর পর্যায়ে থাকুক এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু বাংলাদেশের রিজার্ভে রেকর্ডের অন্যতম কারণ হচ্ছে আমদানি কমে যাওয়া। এটি ইতিবাচক নয়। কারণ আমদানি কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, যদি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের কারণে রেমিট্যান্স বেড়ে যায় সেটিও তেমন স্বস্তিদায়ক হয় না। কারণ এর ফলে দেশে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান তা এখানে দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়। এতে করে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবার আশংকা থাকে। আকবর আলী খান রিজার্ভকে কাজে লাগানোর জন্য দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এই স্থিতি দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ভারত রিজার্ভের দিক দিয়ে প্রথম এবং পাকিস্তান তৃতীয়। ভারতের বিজার্ভ প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার। আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানের রিজার্ভ এক হাজার কোটি ডলারের কিছু বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকরী পদক্ষেপ, রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আয়, ইতিবাচক রফতানি বৃদ্ধি, খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধিতে চালের আমদানি হ্রাস এবং জ্বালানি তেল আমদানিতে আইডিবির ঋণ সহায়তায় আমদানি ব্যয়ের চাপ হ্রাস ইত্যাদি এই রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। জানা গেছে, এখন দেশের অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছেই পর্যাপ্ত ডলার রয়েছে। অতিরিক্ত ডলার থাকার কারণে কোন কোন ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে আইডিবির কাছ থেকে প্রথমে ১০০ কোটি ডলারের একটা ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলেও পরে তা ২৫০ কোটিতে উন্নীত হয়। এটিও রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ। এর সাথে আইএমএফ থেকে সরকার যে ঋণ নিয়েছে তার তিনটি কিস্তিও রিজার্ভের সাথে যুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান অর্থনীতি বিশ্লেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও বললেন, রিজার্ভ বেড়ে যাবার প্রধান কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়া। বিনিয়োগ কম হবার ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এসব আমদানি কমেছে। এর সাথে সাথে ভোগের চাহিদাও কমেছে। তিনি বলেন, রিজার্ভ যদি কোন কাজে না আসে তাহলে তা যত বড় অংকেরই হোক অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল দেয় না। এক্ষেত্রে তিনি রিজার্ভকে বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য সরকারকে কিছু প্রণোদনা নীতি ঘোষণার পরামর্শ দেন। তবে এ প্রণোদনা যাতে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে না দেয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভোগের পরিমাণ কমে আসার ফলে রিজার্ভ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কারণ ভোগ কমলে আমদানির পরিমাণ কমে আসে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভকে রেকর্ড হিসেবে না দেখিয়ে তা বিনিয়োগে কাজে লাগাতে পারলেই কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এদিকে ব্যাংকে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের ধারায় ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এতে ফল হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুত্, গ্যাসসহ নানা অবকাঠামোর অভাবে বিনিয়োগকারীরা ভরসা পাচ্ছেন না বিনিয়োগে। আবার সরকারের শেষ সময় হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে বিনিয়োগের সূচক নিচে নেমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল আমদানি কমেছে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপও কমেছে। তবে বিদেশ থেকে বেসরকারি খাত সরাসরি যে ঋণ নিচ্ছে তা দিয়ে তারা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করছে। এছাড়া খাদ্যপণ্য আমদানিও কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী জুলাই-মে সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় কমেছে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। কিন্তু রফতানি বেড়েছে (জুলাই-জুন) ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর চলতি বছরের জুলাই মাসে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ।