নিজের লেখা বই বিক্রির অর্জিত আয় আর বেতনের ১০ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার কাজে ব্যয় করছেন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারহাট পল্লীর কবি মাধব রায়। শুধু শিক্ষা নয়, হতদরিদ্র গ্রামবাসী ও তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা দিতে বাড়িতে খুলেছেন গণকল্যাণ সেবা কেন্দ্র। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার হতদরিদ্র মানুষজন এখান থেকে বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা ওষুধ পেয়ে থাকেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি, নিজ বাড়িতে খুলেছেন গণ-গ্রন্থাগার। নিজ অর্থে কেনা বিভিন্ন ধরনের সহস্রাধিক পুস্তক সংরক্ষণ করেছেন গ্রন্থাগারটিতে। গ্রামের শিক্ষিত মানুষজন অবসর সময় এখানে এসে বই পড়েন এবং জ্ঞানের চর্চা করেন।
কবি মাধব রায় গ্রামটির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। সবকিছুই করছেন তিনি মানবিক মূল্যবোধ থেকে। ব্যবসায়িক বা অন্য কোন স্বার্থ এর পেছনে কাজ করেনি। তিনি পেশায় একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক। বর্তমানে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত আছেন।
২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে অনাথ এক শিশুর পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখে কবি মাধব রায় জনকল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ হন। ওই মাসেই তিনি তার নিজ ইউনিয়ন চন্দ্রপুরে ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হতদরিদ্র ও অনাথ পরিবার থেকে আসা ৫০ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করেন। এসব শিক্ষার্থীকে তিনি প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষা উপকরণ আর বছরের প্রথম মাসে নতুন পোশাক দিয়ে আসছেন। আর এদের চিকিত্সা সেবাও দিচ্ছেন নিয়মিত। হতদরিদ্র আর অনাথ পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা মাধব রায়ের এমন সহযোগিতায় পড়াশুনায় বেশ মনোযোগী, ফলাফলও করছে ভালো।
চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী বিউটি রাণী জানায়, তার বাবা একজন রিকশাচালক। তাই তিনি পড়াশুনার খরচ দিতে পারেন না। কবি মাধব রায় তাকে সব খরচ দিয়ে পড়াশুনা করাচ্ছেন। একই অভিমত ব্যক্ত করেন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মোরশেদা আখতার।
গ্রামের ছেলে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুজন রায় জানালেন, গ্রামের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত মানুষজন এখন আর অবসর সময় অলস বসে কাটায় না। তারা ভিড় করেন কবি মাধব রায়ের গণ-গ্রন্থাগারে। এখানে বই পড়া আর জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় উপকৃত হচ্ছে গ্রামটি।
গ্রামের হতদরিদ্র সুশীল চন্দ্র জানালেন, তার মতো অসংখ্য হতদরিদ্র মানুষ ও তাদের ছেলেমেয়েরা অসুখ হলে ছুটে আসেন কবি মাধব রায়ের জনকল্যাণ সেবা কেন্দ্রে। এখানে বিনামূল্যে চিকিত্সাসহ ওষুধ পাওয়া যায়। এ সেবা গ্রামের স্বাস্থ্য চিত্র পাল্টে দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
গ্রামের স্বর্গীয় দ্বীনো-নাথ রায় ও জ্ঞানোদা রাণীর ছেলে কবি মাধব রায় (৫৯)। ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখছেন। তার লেখা ৮টি উপন্যাস ও কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। বাজারে এসব বিক্রিও হচ্ছে বেশ। এখান থেকে যে আয় হচ্ছে তা ব্যয় হচ্ছে জনকল্যাণে।
তিনি জানান, মানবিক মূল্যবোধ থেকেই তিনি এসব করছেন। হতদরিদ্র ও অনাথ পরিবারের শিশুরা একটু ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
