আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করেছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে দল দুটি। এলক্ষ্যে দুই শীর্ষ নেত্রী চলতি ও আগামী মাসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফরে যাচ্ছেন। উভয় শিবিরেরই মূল লক্ষ্য-নিজেদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়। এর বাইরে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি আন্দোলনের চূড়ান্ত ছক করছে, আর বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলা ও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারে কাজ করছে আওয়ামী লীগ। দু’দলেরই টার্গেট-জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।
জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ সভায় যোগ দিতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশন শুরু হয়ে চলবে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত। জানা গেছে, জাতিসংঘের সভায় যোগ দেয়ার উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পথে ব্রিটেনে যাত্রাবিরতি করতে পারেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সাধারণ সভায় যোগ দেয়া প্রধান উদ্দেশ্য হলেও সরকারের মেয়াদ পূরণের মাত্র এক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর এই যুক্তরাষ্ট্র সফর ও যুক্তরাজ্যে সম্ভাব্য যাত্রাবিরতি রাজনৈতিক বিবেচনায়ও অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জাতিসংঘের নির্ধারিত অধিবেশনের বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময়ও হবে। সেসব মতবিনিময়ে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গ উঠে আসা স্বাভাবিক।
প্রধানমন্ত্রী যখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হবেন, সেসময়ে কিংবা এর দু’চারদিন আগে-পরে বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার যুক্তরাজ্য সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। জানা গেছে, ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে তিনি যুক্তরাজ্য যাচ্ছেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আতিথেয়তায় অবস্থান করবেন। যদিও এখনও তার সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়নি, তারপরেও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া সফরের প্রথমদিনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে তার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দফতরে বৈঠক করবেন। এছাড়াও ব্রিটেনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলয়াম হেগের সঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, সম্ভাব্য এই যুক্তরাজ্য সফরে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা তুলে ধরা ছাড়াও বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে কিভাবে নতুন ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা করবে-সেই রূপকল্পও উপস্থাপন করবেন তিনি। সূত্র মতে, খালেদা জিয়ার এই সফরে লন্ডনে অবস্থানরত পুত্র তারেক রহমানের নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গও উঠে আসতে পারে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে বিএনপি প্রধানের এই যুক্তরাজ্য সফরকেও অত্যন্ত গুরুত্ববহ মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি হাউস অব লর্ডসে্র একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দলও নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন।
দুই শীর্ষ নেত্রীর সম্ভাব্য এই যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্য সফরের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও কূটনৈতিক মহলে নানাভাবে তত্পরতা চালাচ্ছে বড় দুটি রাজনৈতিক দল। নির্বাচনকে সামনে রেখেই কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে দল দুটি। এবারের রমজানের শেষদিকে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদিআরবের রাষ্ট্রদূতের বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও জামাতা ছিলেন। সেখানে তারা ইফতার ও নৈশভোজ করেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিনের মধ্যে সৌদিআরব সফরে যেতে পারেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সমীকরণে প্রধানমন্ত্রীর সৌদিআরবের রাষ্ট্রদূতের বাসায় যাওয়া এবং দেশটিতে সম্ভাব্য সফর করার বিশেষ তাত্পর্য রয়েছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক রসায়ন এবং আগামী নির্বাচনে বহির্বিশ্বের ভূমিকার পয়েন্টগুলো পর্যালোচনা করলে বিষয়টি শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, এর বাড়তি কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা গত ১৮ আগস্ট বৈঠক করেছেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। বেশ কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান শেষে ঢাকায় ফিরে মজীনার এই বৈঠকটিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীনর সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যখন সরকার ও বিরোধী দল বিপরীত মেরুতে, তখন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক পরবর্তী সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সংঘাত-সহিংসতায় বিশ্বাস করে না। আমরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সংকটের নিরসন দেখতে চাই। শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনে দুই নেত্রীর সংলাপ অনুষ্ঠানেও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে রাজি বলে জানিয়েছেন মজীনা।
এবারের রমজানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসায় আয়োজিত একাধিক ইফতার পার্টিতে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। সূত্র মতে, এসব ইফতার পার্টিতেও আলাপ-আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থা ও আগামী নির্বাচন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিযুক্ত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রদূত কিংবা হাইকমিশনারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়েও অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনাও চলছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে পর্দার অন্তরালেও কূটনৈতিক তত্পরতা চালাচ্ছে প্রধান দুটি দল।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, এখানকার স্থিতিশীল কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার হাত বদলের ওপর ভারত ও চীনসহ যেসব দেশের অর্থনৈতিক গতিসহ পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু নির্ভর করে, সেসব দেশের কূটনীতিকদের তত্পরতা দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্য কয়েকজন কূটনীতিকের সঙ্গে বড় দুটি দলের কথাবার্তা দৃশ্যমান হলেও ঐসব দেশসমূহের কূটনীতিকদের তত্পরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না।
এদিকে, কূটনৈতিক তত্পরতার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতিও নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলের সামনের আন্দোলন মোকাবেলা ও ফের সরকার গঠনের লক্ষ্যে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে দলটি। এসব বিষয়ে আলোচনার জন্য আজ শনিবার আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বসছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। আগামীকাল রবিবার অনুষ্ঠিত হবে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক। সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে আওয়ামী লীগের এই দুটি বৈঠককেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচারে নতুন করে চমক আনতে যাচ্ছে দলটি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ফের ক্ষমতায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে এবং বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামের ‘অপপ্রচারের’ জবাব দিতে দলের তরুণ সংসদ সদস্য, চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনেতা এবং স্থানীয় নেতাদের সমন্বয়ে ১৮টি টিম কাজ করবে। আওয়ামী লীগের প্রচার উপকমিটি সূত্রে জানা গেছে, টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচার, রোড শো, পথসভা, কর্মী সমাবেশ, পোস্টার ও পুস্তিকা প্রকাশ, ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড এবং প্রজেক্টরের সহায়তায় সরকারের উন্নয়ন ও আগামীতে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে। সরকারের উন্নয়ন চিত্র ও বিরোধী দলের ধর্মীয় ‘অপপ্রচার’-এর জবাব দিতে টেলিভিশনে বিশেষ ‘প্রামাণ্যচিত্র’ সমপ্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সরকারের উন্নয়নচিত্র ও আওয়ামী লীগকে ফের ক্ষমতায় আনতে তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানানো হবে। এসব প্রচারণা সুসংহত করতে আওয়ামী লীগের প্রচার উপকমিটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন-বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে ২৫ জন সদস্য কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদারের পাশাপাশি নির্বাচন ও আন্দোলন প্রস্তুতি নিচ্ছে একসঙ্গে। নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব নিয়ে বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। একইসঙ্গে নির্বাচন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সাংগঠনিক তত্পরতা শুরু করা ছাড়াও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। আন্দোলন ও নির্বাচন প্রস্তুতিসহ সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আজ শনিবার বৈঠকে বসছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। পরদিন, অর্থাত্ রবিবার অনুষ্ঠিত হবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক। কার্যত: আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বের রূপরেখা প্রণয়ন নিয়েই এই দুটি বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যখন তার মেয়াদের শেষ সিঁড়িতে পা দিয়েছে এবং নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোট যখন এখনও অমীমাংসিত অবস্থানে তখন বিএনপি ও ১৮ দলের এই দুটি বৈঠকের ওপরও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির অনেক কিছু নির্ভর করছে।
বিএনপিসহ ১৮ দল সূত্রে জানা গেছে, সরকারের মেয়াদে শেষ মাস-অর্থাত্ অক্টোবরের আগে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাচ্ছে না বিরোধী জোট। নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে অক্টোবর মাস জুড়ে হরতাল, অবরোধসহ নানা কর্মসূচি দেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিশেষ করে সরকারের শেষদিকে টানা হরতাল ছাড়াও সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধের মত শক্ত কর্মসূচি দেয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। এর আগে চলতি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে কিছু বিচ্ছিন্ন হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি রাখা হতে পারে। এছাড়া নির্বাচন ও আন্দোলনের চূড়ান্ত ধাপকে সামনে রেখে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বড় সমাবেশের আয়োজন করে সেখানে খালেদা জিয়ার বক্তব্য রাখার কথাও রয়েছে।
