গৃহযুদ্ধের পথে মিসর

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৩, ২২:৪৭
মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির দল মুসলিম ব্রাদারহুড দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। আরব অঞ্চলসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুসলিম ব্রাদারহুড মিসরজুড়ে সপ্তাহব্যাপী যে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তা শেষ হলেই সংগঠিতভাবে এ গৃহযুদ্ধ চালানো হবে। দেশটির রাজধানী কায়রোসহ বিভিন্ন শহরে ব্রাদারহুড যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তাতেও গৃহযুদ্ধের আভাস পাচ্ছে সংবাদ মাধ্যমগুলো। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সরকারি ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলা করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে তারা। তবে সৌদি আরবসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ মিসরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন দেয়ায় মিসরের পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদেল আজিজ মুরসির সমর্থকদের উপর চালানো দমননীতিকে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পর সৌদি আরব দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এদিকে মিসরের পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপসহ নানা মহল থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকরা নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে আলোচনা চালিয়ে যাবার পক্ষে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে সম্মান জানানোর আহবান জানিয়েছে। সাথে সাথে সংস্থাটি এও বলছে, সমাবেশের মধ্য থেকেও বিক্ষোভকারীরা গুলি ছুঁড়েছে এমন প্রমাণ আছে। উল্লেখ্য, মিসরের পরাক্রমশালী লৌহমানব হোসনি মোবারক যুগের অবসানের পর সাধারণ নির্বাচনে মুরসির দল ব্রাদারহুড একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই সেনাবাহিনী পেছনে থেকে মুরসি সরকারকে হটিয়ে দেয়। এরপর মুরসিকে কোথায় রাখা হয়েছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ব্রাদারহুডের সমর্থকরা ক্রমাগত বিক্ষোভ করে আসছে। গত বুধবার এসব বিক্ষোভ সমাবেশে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনী গুলি চালালে অন্তত ছয়শজন নিহত ও কয়েক হাজার আহত হয়। মিসরের বিভিন্ন শহরে এখনো আইন-শৃংখলা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ চলছে। মাসব্যাপী জরুরি অবস্থা জারির পরও রাস্তায় সহিংস বিক্ষোভের কারণে অনেকেই মনে করছেন দেশটিতে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ মিসরের বিক্ষোভ-সমাবেশকে সন্ত্রাসবাদের কারবার বলে অভিহিত করলেও প্রকৃত পরিস্থিতি ভিন্ন। বিভিন্ন গণমাধ্যম বিক্ষোভকারীদের বরাত দিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, শুধু মুসলিম ব্রাদারহুড নয়, এসব বিক্ষোভে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনের অংশগ্রহণ আছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরা কায়রোর বিক্ষোভ থেকে তারা কয়েকজনের সাক্ষাত্কার নিয়েছে। দিনা বাদ্রি নামের একজন যুবতী বলেছেন, তারা যেহেতু আমার ভাইকে হত্যা করেছে, আমাকেও হত্যা করতে পারে। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা সবাইকে হত্যা করতে পারে। আহমেদ আওয়াদ নামের ৩৩ বছরের যুবক বলছেন, আমি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। গণতন্ত্র এবং বিচার ব্যবস্থা রক্ষায় আমি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে এসেছি। ২৮ বছরের যুবক মোহাম্মদ মহসীন বলেছেন, সেনাবাহিনী যা করছে তা ভুল। চারদিকে মৃত মানুষ। মিসর আগে এমন ছিল না। সাবেক একজন সেনা কর্মকর্তাও বলছেন, যারা এখন দেশ শাসন করছেন তাদের সাথে কথা বলা যায় না। এদিকে সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, মিসরের ক্ষমতা এখন কার হাতে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে পরিস্থিতি আন্দাজ করে অনেকে বলছেন, দেশটির নির্বাহী এবং আইন প্রণয়ন ক্ষতমা সেনাবাহিনী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভাগাভাগি করে চালাচ্ছে। তবে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মনে করছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের সমর্থকরা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে। তারা তাদের রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখছে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন, চলতি বছরের শেষদিকে মিসরের নতুন সংবিধান প্রণীত হলে তার অধীনে নির্বাচন হতে পারে। তবে কখন সে কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। সেনাবাহিনী এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় করতে হলে মিসরকে আরো অনেক দূর যেতে হবে বলে তাদের মত। কারণ এটি ছাড়া মিসর গণতান্ত্রিক পথে ফিরবে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মোহাম্মদ মুরসির মতো নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে যারা মুসলিম ব্রাদারহুডকে শিক্ষা দিতে চেয়েছে তাদের জন্য সামনে আরো কঠিন পথ রয়েছে। কারণ গত নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোট পাওয়া দলটির জনসমর্থন কায়রো থেকে শুরু করে পুরো দেশব্যাপী আছে। গত বুধবার কায়রোতে শুধু সরকারি হিসেবেই হাজারের কাছাকাছি মানুষ নিহত হবার পর অনেক সাধারণ মানুষ এসব বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলমান থাকবে বলে অনেকে মত দিয়েছেন।