আদর্শের কারণেই ‘সাধারণ’ থেকে ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৩, ২২:৫২
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৮তম শাহাদাত্ বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টি-জেপি আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বঙ্গবন্ধু আদর্শের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করতেন। তিনি কখনও আপসের রাজনীতি করেননি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার মানসিকতা এবং নীতি-আদর্শই তাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি কোনো দল বা গোষ্ঠীর নয়, তিনি বাঙালি জাতির সম্পদ। তাই দলীয় বৃত্তের বাইরে দলমতের ঊর্ধ্বে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তার প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে। বক্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু যে গণতান্ত্রিক, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ আমরা এখনও গড়তে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ গড়তে সকলকে আদর্শিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন তারা । গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। সভায় তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু এমন একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন, যিনি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতি করতেন। জাতীয়তাবাদের চেতনায় স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য তিনি ধাপে-ধাপে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছিলেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে তিনি একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন। ’৭১ এর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশ সৃষ্টি হত না, আজও আমাদের পাকিস্তানের দাসত্ব করতে হত। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ১৫ আগস্ট শোক দিবসে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া জন্মদিনের কেক কাটেন। অত্যন্ত দুঃখ হয়। বঙ্গবন্ধু তাকেও (খালেদা জিয়াকে) অত্যন্ত স্নেহ করতেন, আদর করতেন। ১৬ ডিসেম্বর কিংবা ২৬ মার্চ আমরা আনন্দ করতে পারি। কিন্তু বিএনপি নেত্রী আনন্দের জন্য ১৫ আগস্টকে কেন বেছে নিলেন? যেখানে ’৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পরেও কয়েক বছর তিনি ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করেননি, এরপরে হঠাত্ কি করে তার জন্মদিন হয়ে গেল ১৫ আগস্ট ? এর কারণ, যে দলের নেতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জড়িত, তারা তো ১৫ আগস্ট শোক পালন করতে পারেন না, তাই ঐদিন আনন্দ করার জন্য তারা জন্মদিন বানিয়ে নিয়েছেন। শোকের দিনে তাদের এই উল্লাসের বিচার এদেশের জনগণ একদিন করবেই। তোফায়েল আহমেদ আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশ চেয়েছিলেন সে বাংলাদেশ আমরা এখনও পাইনি। তার লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ক্ষুধামুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তিনি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে সবাইকে ’৭১ এর চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমরা কখনও আপসের রাজনীতি শিখিনি। আজ যখন ক্ষমতায় থাকার জন্য কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আপসের রাজনীতি করতে দেখি, তখন অবাক ও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। কারণ এই রাজনীতি তো বঙ্গবন্ধু কখনও করেনও নি, শেখানও নি। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করে গেছেন, আমাদেরও সেটা-ই শিখিয়ে গেছেন। সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ক্ষমতাসীনদের জোটে প্রভাবশালী এমন শরীকও রয়েছেন, যিনি বা যার দল একসময় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধুও বলতেন না। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছি—সেই তিনি আজ শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, জাতির পিতাও বলছেন। একই জোটে এমন আরো দল আছে, যারা কিছুদিন আগেও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস কিংবা জন্মদিবস পালন করতো না। তবে জেপি সবসময়ই তা পালন করে। কারণ জেপি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ ও বিশ্বাস করে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, কর্মীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর কী রকম স্নেহ-ভালোবাসা ছিল, যারা তার সান্নিধ্যে যেতে পারেননি তারা তা বুঝবেন না। তিনি সারাজীবন অত্যন্ত সাদামাটা জীবন-যাপন করেছেন। ’৭৫ সালের পর জন্মগ্রহণকারীরা বঙ্গবন্ধুকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু ‘খাঁচাবন্দি’ না রেখে বঙ্গবন্ধুকে নতুন প্রজন্মের কাছে মেলে ধরতে হবে, তার রাজনীতি ও আদর্শ তুলে ধরতে হবে। সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ বলেন, জাতির পিতাকে দলের বৃত্তে আটকে রাখা যাবে না। কারণ তার সঙ্গে অন্য কারো তুলনা হয় না। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন, টুঙ্গীপাড়ার ‘মুজিব ভাই’ থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। এজন্য যেসব গুণাবলী দরকার, সেগুলো সবই তার মধ্যে ছিল, অন্যদের মাঝেও তিনি সেসব গুণাবলী সঞ্চারিত করেছেন। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি নিজেই ইতিহাস নির্মাণ করেছেন, স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বলেন, ’৭২ এর পর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কারও কারও ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু ’৭২ এর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যারা ভিন্নমত পোষণ করেছেন তারা হয় রাজাকার, না হয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। কারণ বাংলাদেশ নামটিও বঙ্গবন্ধুরই দেয়া। সেই দেশে আমরা রাজনীতি করব, মন্ত্রী হব, অথচ বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করব না, এটা মোনাফেকি। বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের প্রেস সচিব ও বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর সম্পাদক মাহবুবুল আলম বলেন, একটি দুর্নীতিমুক্ত শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই কুচক্রী মহল তাকে সরিয়ে দিয়েছে। অবশ্য যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন, তাকে কখনও বাঙালি জাতির হূদয় থেকে মুছে ফেলা যাবে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনী নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে, তার আদর্শ তাদের মাঝে সঞ্চার করতে হবে। জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর অবদান স্বীকার করলে তার কোনো লাভ নেই বরং জাতি হিসাবে আমাদেরই লাভ হবে। তার ছিল অসাধারণ বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা। যে কারণে তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার যে আদর্শ অনুকরণীয়, তা ছিল জনগণের প্রতি ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার কিংবা তার পরিবারের যত না ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ জাতির। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহিম বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য শুধু কী সামরিক ব্যক্তিরাই দায়ী? তখনকার জাসদ, গণবাহিনীসহ রাজনৈতিক শক্তির কী ভূমিকা ছিল তা-ও বের করা প্রয়োজন। দলটির অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যেদিন দলমতের ঊর্ধ্বে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো, সেদিনই তার প্রতি সঠিক মূল্যায়ন করা হবে। তা না হলে শুধু পোস্টারে তার ছবি ব্যবহার করে সম্মান দেখানো যাবে না। তবে যততত্র বঙ্গবন্ধুর এই ছবি ব্যবহার নিয়েও দেশে আইন থাকা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। জেপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবুর পরিচালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, কর্নেল (অব.) আব্দুল লতিফ মল্লিক, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, যুবসংহতির সভাপতি এম. এ কাইয়ুম, জেপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ বাঙাল প্রমুখ। জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, আজম খান, ভাইস চেয়ারম্যান মীর হারুনুর রশিদ, যুগ্ম-মহাসচিব জামিলুল হক বকুল, খলিলুর রহমান খলিল, মাহবুবুর রহমান লিপটন, আফজাল হোসেন, খন্দকার শাহীন আলদ্বীন রিজভী, গাজী আমিনুর রহমান রতন, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, প্রকাশনা সম্পাদক কে. এম মজিবুর রহমান মজনু, কৃষি সম্পাদক আব্দুল হালিম, শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী, যুগ্ম সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া আক্তার খানম রঞ্জু, কেন্দ্রীয় সদস্য মনির রেজা খান, যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন।