সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ না দিয়েই চলতি ২০১৩ শিক্ষা বর্ষে নবম শ্রেণীর গণিত বিষয়ে চালু হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি। ফলে প্রশিক্ষণ না পাওয়া ‘দুর্বল’ শিক্ষকরা অনুমান করে শ্রেণীকক্ষে সৃজনশীল পদ্ধতিতে গণিত পড়াচ্ছেন, নবম শ্রেণীর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করেছেন।
প্রশিক্ষণ না নিয়ে এভাবে শিক্ষাদান ও প্রশ্ন প্রণয়ন করার ফলে ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয় হতে পারে-এমন আশঙ্কা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, গণিতে সৃজনশীল বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে যা এখনো চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করছেন, চলতি বছরের মধ্যে এই প্রশিক্ষণ শেষ হবে। তিনি জানান, ‘আমরা প্রথমে প্রতি উপজেলার দুই জন করে শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পাশাপাশি প্রতি স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শিক্ষা বর্ষ শুরু হয়েছে। অথচ এখন আগস্ট মাসে এসেও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চলছে। তারা প্রশ্ন করেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই শিক্ষকরা কবে স্কুলে গিয়ে পড়াবেন। ২০১৫ সালে এই শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। নবম শ্রেণীতে সৃজনশীল বিষয়ে চর্চা না করে কীভাবে এসএসসিতে সৃজনশীল বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। এছাড়া যেসব স্কুলের শিক্ষক এখনো প্রশিক্ষণ পাননি তাদের অবস্থা কী হবে ?
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম মিয়া বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়নি। এখনো প্রশিক্ষণ চলছে। আশা করছি অচিরেই এ প্রশিক্ষণ শেষ হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষ না করে কেন আগে থেকেই গণিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হলো এমন প্রশ্নের কোন জবাব দেননি তিনি।
বরিশালের বাবুগঞ্জের খানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু জাফর জানান, তার প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকও গণিতে সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাননি। তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৪শ শিক্ষার্থী রয়েছে। গণিতে শিক্ষক রয়েছেন দুই জন। প্রশিক্ষণ না পেলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কীভাবে হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। সে আলোকেই গণিতে পড়ানোর চেষ্টা করছেন।’
শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়্যারম্যান ও রাজধানীর এ কে উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভুঁইয়া বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে গণিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় ২০১৫ সালে ফল বিপর্যয় হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে গণিতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তিনি বলেন, সরকারের উচিত একটি নতুন বিষয় চালুর আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া।
বর্তমান সরকারের সময়ে ২০০৯ সাল থেকে মাধ্যমিক স্তরে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ধাপে ধাপে গণিত ছাড়া বাকি সব বিষয়ে এ পদ্ধতি কার্যকর করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গণিতেও তা কার্যকর করা হয়।
আগামী ২০১৪ সালের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় অন্যান্য বিষয়ের মতো গণিতের পরীক্ষাও হবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় গণিত, উচ্চতর গণিত এবং ২০১৭ সালের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় উচ্চতর গণিত বিষয়ের পরীক্ষা এ নিয়মে হবে।
অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নীপা সুলতানা বলেন, ‘নবম শ্রেণীতে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় আমরা শংকিত। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এখনো শেষ হয়নি। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর এই শিক্ষকদেরই আবার অন্য সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে প্রচুর সময় চলে যাবে। শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ শেষে চলতি বছর আর শ্রেণী কক্ষে পাঠদান করতে পারবেন না। ফলে ভবিষ্যতে ফল বিপর্যয় হতে পারে।’ তিনি বলেন, চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিকের রসায়নে ফল খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। এভাবে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। নবম শ্রেণীতে এভাবে হঠাত্ করে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
