সফল নারী

‘আমার পরিশ্রম আমাকে ঠকায়নি’

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:১৬
প্রতিমা চৌধুরী কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে করেন স্নাতকোত্তর। এমফিল সম্পন্ন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মোহনীয় হাতছানি এড়িয়ে ২০০১ সালে যুক্ত হন রপ্তানিমুখী এক কোম্পানির সহকারী মার্কেটিং ম্যানেজার পদে। সেই কোম্পানি আগলে রাখার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি। দায়িত্ব ও কর্তব্য: কর্তব্যে সচেতন, কাজে নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতিফল হিসেবে সময়ের সাথে সাথে প্রতিমার হাতে ন্যস্ত হয় কোম্পানির গুরুভার। কর্তৃপক্ষের বিশ্বস্ততায় এক সময়ে কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে প্রতিমাকেই দেখভাল করতে হয় বিদেশি ক্রেতাদের। বিষয় কঠিন হলেও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্পিত দায়িত্ব সামলেছেন দক্ষতার সাথে। সংসার ও পেশা: একদিকে চাকরি অন্যদিকে সংসার, সন্তান। বাঙালি নারী সাধারণত দ্বিতীয় জীবন বেছে নিলেও প্রতিমা চৌধুরী দুই অংশে বিভক্ত করেননি জীবন উপাখ্যান। একহাতেই তুলে নেন দুই পর্ব। বিনিময়ে যে তাকে দিতে হবে কঠিন থেকে কঠোর পরিশ্রম সে গল্প ভুলে না গিয়েই নিজের প্রতি দৃঢ়তা আর হাসিমুখে গ্রহণ করেন নিজের দায়িত্বগুলো। ছোট্ট সন্তানকে যেমন তিনি সময় দিয়েছেন তেমনি অফিসও করেছেন পূর্ণ সময়। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে সন্তানকে খুব ভোরে স্কুলে দিয়ে তিনি অফিসে চলে এসেছেন অফিস সময়ের দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে। তেমনি বেলা শেষেও অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করেছেন যতক্ষণ না প্রয়োজনীয় কাজ শেষ না হতো। সময়ের সাত-পাঁচ: ২০০৭ সালে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রতিমা এ কোম্পানিটিকে মূল করে নিজে কিছু করার চেষ্টা করলে কোম্পানির মালিক চাচ্ছিলেন না প্রতিমা কিছু করুক। শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। কিছুটা সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে নিজের নকশা ও ছলে কাজ করিয়ে ডেলিভারি দিতে থাকেন প্রতিমা চৌধুরী, যা ছিল কষ্টসাধ্য। একসময় প্রতিমা ভাবেন, এভাবে অন্যের কাছ থেকে কাজ করিয়ে না নিয়ে নিজেই তো চাইলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারেন। ভাবনার সাথে সাধ্যেও মিল না হলে বিদেশি ক্রেতারাও প্রতিমার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। নিজের প্রতিষ্ঠান ‘জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ’: ২০০৭ সালের শেষের দিকে ছোট ছোট প্রচেষ্টায় প্রতিমা ‘জুট ল্যান্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি কোম্পানি দাঁড় করান। পূর্ব পরিচিত বায়ারদের সাথে যোগাযোগ করে পরিশ্রমের ঘাম ঝরিয়ে পেয়েও যান একজন ইতালিয়ান বায়ার যেখান থেকে পান ২৫ লক্ষ টাকার একটি অর্ডার। প্রথম দিকে প্রতিমা ভাড়া করা কারখানা থেকে রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমে কাজ করিয়ে নিলেও কিছু সময় পরেই গাজীপুরের মাওনাতে ক্রয় করেন একখণ্ড জমি। সে জমিতে গড়ে তোলেন ‘জুট ল্যান্ড বাংলাদেশে’র কারখানা। ঘর দাঁড়ালে ৩০টি মেশিন আর প্রায় ১০০ কর্মী নিয়ে শুরু করেন নিজের কারখানা থেকে উত্পাদন। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিমার রয়েছে প্রায় ৩০০০ প্রোডিওসার যারা প্রতিমার নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন পাটপণ্য তৈরি করে থাকেন। বর্তমানে প্রতিমার পাটপণ্য— বিভিন্ন নকশার ব্যাগ, কুশন কভারসহ পাটজাতীয় হরেক রকম পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। কেউ ছিল না পাশে: একাই এ পথ পাড়ি দিয়েছেন প্রতিমা চৌধুরী। কাজের প্রয়োজনে ঘুরেছেন ইতালি, আমেরিকা, সুইডেন, আফ্রিকা, ইন্ডিয়াসহ অনেক দেশে। একটি টাকাও অনুদান পাননি সরকার অথবা অন্য কোনো ফান্ড থেকে। নিজের হাতে গড়া পণ্য দেশের প্রতিনিধি হয়ে বিদেশে উপস্থাপনের জন্য পাননি দেশীয় কোনো সহায়তা বরং তার কাজের ভক্ত বিদেশি বায়াররাই তাকে নিয়ে গেছেন তার পণ্যের প্রদর্শনী করাতে। বিদেশে মডেল: প্রতিমা কেবল দেশের হয়ে লুপ্তপ্রায় বাংলার সোনালী আঁশ পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানিই করছেন না; মাতৃভূখণ্ডের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিদেশের মাটিতে। প্রতিমার নকশা পরিকল্পনা পরামর্শ নিয়ে আফ্রিকাতে অনেকেই কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন পাট নিয়ে। তারা কেবল রেডি পাট নিয়েই কাজ করতে নয় বীজ থেকে পাট, পাট থেকে পাট পণ্য করার স্বপ্ন দেখছে। প্রতিমার এক পরিচিত আফ্রিকান সে তার ছোট্ট একটি এরিয়ার নামই রেখেছে ‘জুট ভিলেজ’।