ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই ঘরে ফেরার উত্সব কিন্তু ঈদে বাড়ি ফেরার আশায় বসে থাকা পুরো পরিবারকে যেন হতাশ করে দিয়েই প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই যান্ত্রিক কোলাহলপূর্ণ ঢাকাতে থেকে যেতে হয় কিছু মানুষকে। মায়ের হাতের রান্না কিংবা প্রিয় মানুষগুলোকে একটাবার চোখের দেখা দেখতে পাওয়া, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে নিজের মত ঈদ পালন থেকে অনেক কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন কিছু মানুষ। পারিপার্শ্বিক কিছু সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মাঝে মাঝেই।
পড়াশোনার জন্য নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল পরিবারের সাথে ঈদ করতে না পারার যন্ত্রণার কথা। ছুটি পেয়েও বিভিন্ন কারণে বাধ্য হয়ে থেকে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর ঈদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা তুলে ধরেন তাদের মনের কথা।
ঈদের আগে এদেশের বাস-ট্রেন-লঞ্চ টিকেট নিয়ে বিড়ম্বনার অভিজ্ঞতা এ শিক্ষার্থীদের প্রায় সবারই হয়েছে। রোজার সময় ক্লাস চলায় অনেকের পক্ষেই ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেটের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি, যার ফলে আটকে গেছে অনেকের বাড়ি ফেরা। আবার অনেকে শেষ মুহূর্তে টিকেট পাওয়ার আশায় ছিলেন। সে আশা বিফলে গেছে অনেকেরই। বেগম সুফিয়া কামাল হলে থাকা কামরুন্নাহারের কাছে জানা গেল তার ভোগান্তির কথা। তিনি জানালেন ঈদের ১০ দিন আগে থেকে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কোন লাভ হয়নি। আর টিকেট কাটার ক্ষেত্রে মেয়েরা আরো বেশি বিপত্তির সম্মুখীন হন বলে তিনি মনে করেন। বিভিন্ন রকম হয়রানির শিকার হয়ে টিকেট সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে এই প্রথমবার পরিবার-পরিজন ছেড়ে তার ঈদ কাটাতে হল ঢাকায়। আবার কেউ কেউ জানালেন অন্য কথা। ঈদের ছুটির পরই পরীক্ষা থাকায় বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। পরীক্ষার প্রস্তুতির কাছে বাড়ি ফেরা হার মেনেছে বেশ কয়েকজনের কাছে।
দূরদেশে ঈদ পালনের কষ্ট নিয়ে ঈদটা শুরু হলেও পরিবারের কাছে না থাকার দুঃখটা কিছুটা হলেও যেন লাঘব হয় সকালে হল প্রভোস্টের বাসায় যাওয়ার মাঝে। হলের সবাই মিলে একসাথে মজাটার শুরু যেন সেখানেই, খুশির ঈদকে সবাই মিলে আনন্দের মাঝে কাটানোর চেষ্টা থাকে সবার মাঝে। আর হলে থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে তাদের এই আনন্দে যোগ দেন শিক্ষকরাও। তারাও চেষ্টা করেন নানারকম আয়োজনের মাধ্যমে মন খারাপ থাকা তাদের সন্তানসম এই মানুষগুলোর মনে খুশির ছোঁয়া দিয়ে যাওয়ার। অনেকের দুপুরটা কেটেছে হলের ভেতরেই। ঈদ উপলক্ষে হলের রান্নাঘরেও থাকে বিশেষ আয়োজন, সবসময়ের একঘেয়েমী খাওয়ার বদলে সেদিন হলের ডাইনিংয়ে পোলাও-কোর্মা কিংবা ঐতিহ্যবাহী নানা সুস্বাদু মনোহর খাবারের উপস্থিতি দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের সাথে আনন্দে শামিল হন হলের কর্মচারীরাও।
বেগম রোকেয়া হলের প্রিয়াংকা বলেন, কিছু সময়ের জন্যে ভুলেই গিয়েছিলেন যে, তিনি বাড়িতে নেই, প্রিয়মুখগুলো ছাড়াই পার করে দিচ্ছেন বছরের অন্যতম খুশির একটা দিন। তিনি বললেন, ‘ভুলে থাকতে চাইলেও আসলে পরিবার ছেড়ে ঈদ করার খারাপ লাগাটা কিছুক্ষণ পরপর ঠিকই মনে চলে আসে, সকালে কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখাটাও তাই একটু কষ্টসাধ্যই ছিল বটে! ঈদের সকালে নতুন জামা পরে তৈরি হয়ে মা-বাবার আশীর্বাদ নিতে যাওয়ার তাড়াটা খুব মনে পড়েছে।’
ঈদের বিকেলটাও অনেকেই কাটিয়েছেন একসাথে। হলের সবাই মিলে একসঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আবার কেউ আলাদাভাবেও সময় পার করেছেন অন্যান্য বন্ধুদের সাথে। কুয়েত মৈত্রী হলের বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হয় ঈদের সন্ধ্যায় টিএসসিতে। তারা জানালেন সকাল থেকেই বন্ধুরা একসাথে ছিলেন। ঢাকা শহরের চিরচেনা ব্যস্ত রূপের বাইরে যে শান্ত পরিবেশটা শুধু ঈদের সময় পাওয়া যায় তার প্রমাণ পেলেন সারাদিন নগরীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বিচরণ করে। উম্মে হাবিবা জানালেন ঢাকায় তেমন কোন আত্মীয়-স্বজন নেই বলে সচরাচর সময়ে ক্যাম্পাসের গন্ডির মধ্যেই থাকা হয়। এবার সুযোগ পেয়ে তাই কার্জনহল বা কলাভবনের বাইরের জগতটাকে না হয় একটু ভিন্নভাবে দেখে নিলেন।
সন্ধ্যার পর থেকেই বাইরে ঘুরতে বের হওয়া সবাই আসতে আসতে হলে ফেরা শুরু করেন ঈদের দিন। এরপর বেশ বড় একটা সমাগম দেখা যায় হলের টিভি ঘরে। সবাই মিলে বিভিন্ন চ্যানেল এর ঈদের অনুষ্ঠান উপভোগ করার মুহূর্তগুলো মনে রাখার মতই অনেকের কাছে।
