স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা

শামসুর রাহমান কবিচেতনা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:৩২
পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি শামসুর রাহমান মাহুতটুলীর নানার বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে ওঠেন ঢাকায় নাগরিক জলবায়ুতে। পিতা আলহাজ্ব মুখলেসুর রহমান চৌধুরী প্রথম জীবনে পুলিশের চাকুরি করেছেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যবসা, পরিশেষে একটি প্রেসের মালিক ছিলেন। ঢাকার পগোজ হাইস্কুলে শামসুর রাহমানের শিক্ষাজীবন শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বি.এ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও শেষ অবধি পরীক্ষা দেয়া হয়ে ওঠেনি। অগত্যা বি.এ পাস করেন। এম.এ পূর্বভাগ পাস করেছেন কিন্তু শেষপর্বের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হননি। লেখালেখির সূচনা হয় একটি গদ্য শোকগাঁথা দিয়ে। নেহার নামের এক ছোটবোনের মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছিন্নমুকুলের অনুকরণে রচনা করেন শোকগাঁথাটি। দি মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু । এরপর “দৈনিক পাকিস্তান”- এর সম্পাদক ছিলেন বহুদিন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতিও ছিলেন। তিনি আমৃত্যু লিখে গেছেন। পাকিস্তান আমলে চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৫৯), রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৬), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮) এবং নিজবাসভূমে (১৯৬৯)। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। বন্দী শিবির থেকে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি,এক ধরণের অহংকার, আমি অনাহারী, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, কবিতার সঙ্গে গেরোস্থালি প্রভৃতি প্রায় অর্ধশত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সমকালীন জীবন ও জগতের অবক্ষয়, নৈরাজ্য, বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে কাব্য রচনা শুরু করেছিলেন ত্রিশের দশক থেকেই। চল্লিশের দশকে এসে ঢাকা কেন্দ্রিক মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমপ্রসার ঘটতে থাকে। মধ্যবিত্তশ্রেণির পাশাপাশি সমপ্রসারিত হয় নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীন শ্রেণি। নগর জীবনে দেখা দেয় জটিলতা । একদিকে সুরম্য অট্টালিকার সারি। অন্য দিকে ছোট ছোট ঝুপড়ি, যার মধ্যে মাথা গুঁজে ঠাসাঠাসি করে দিনাতিপাত করে এক শ্রেণির মানুষ। গড়ে ওঠে জীর্ণ বস্তি। কানাগলি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বেড়ে যায় অপরাধ প্রবণতা । রবীন্দ্র-পরবর্তী কবিতায় ভেসে ওঠে রিক্ত শীর্ণ, বিবর্ণ নগরের চিত্র। ক্রমেই তা স্পস্ট হয়ে ওঠে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিতায়। শামসুর রাহমান নগর চেতনাকে তাঁর কবিতার প্রধান অবলম্বন করেছেন এর কারণ হিসেবে বলা যায়। তিনি ছিলেন এই শহরেরই আবাল্য অধিবাসী। এছাড়া তিরিশের নাগরিক চেতনাও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল বিশেষভাবে । সর্বোপরি “বাংলাদেশের কবিতার শরীর থেকে সরিয়ে দিতে চাইছিলেন অনাধুনিক গ্রামীনতার অপবাদ।” তিনি নারকীয় জীর্ণতা শীর্ণতার মধ্যে সৌন্দর্যানুসন্ধান করেছেন। আধুনিক কবিদের মধ্যে তিনিই প্রথম নগরপ্রেমি। তিনি নগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই নগরের হতশ্রী রূপের মধ্যে অমলিন সৌন্দর্য দর্শন করে মুগ্ধ হয়েছেন। তবে কখনো কখনো নগর সভ্যতার অন্তসারশূন্যতা দেখে কষ্ট পেয়েছেন। নগর জীবনকে তিনি বিধ্বস্ত বলেছেন। ঢাকা শহরকে বলেছেন “করুণ শহর ”। এখানে নিরাশার আঁঁধার জীবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আবার কখনো ঢাকা শহরের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন প্রাণময়তা। “সর্বব্যপী অন্ধকার ও মৃত্যুগন্ধভারাতুর মনোবিশ্ব ভেদ করে বেরিয়ে আসেন তিনি এবং প্রবেশ করেন রৌদ্র-অগ্নি-ব্যর্থতা-শ্লোগান-স্বপ্নশূন্যতা-বিক্ষোভ- কোলাহলপূর্ণ ঝাঁঝালো জীবনে। তিনি প্রথম কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় বলেছেন ঃ স্বর্গদীপ্ত প্রাণ নিয়ে এসে এ কোথায় কোনদেশ হারিয়ে ফেলেছি রূপ পশুর রোমশ অন্ধকারে? এখানে মরার খুলি ধূলায় গড়ায় চারিদিকে খেলার ঘুঁটির মতো অসহায়, ভবিষ্যত্হীন। শামসুর রাহমানের চোখে পরিবেশ ও পৃথিবী নরকেরই নামান্তর। এখানে নিমেষেই মাঠের বাগান ভরে ওঠে সকণ্টক ফনিমনসায় । তিনি বিনষ্ট সমাজকে ‘কবর’ মনে করেছেন। তবে ঢাকা শহরকে তিনি ভালবেসেছেন। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি তাঁকে অবসাদগ্রস্থ করেনি ।“রৌদ্র করোটিতে” কাব্যে নগর জীবনের যে চিত্র অংকিত হয়েছে তা যেন এক পার্থিব নরক। ভিখিরির চিত্কার, মাতালের প্রলাপ, পানের দোকানের অশ্লীল রঙিন জটলা, অন্ধ গলির বিমর্ষতা, শাহরিক কোলাহল। সব মিলিয়ে এক দুঃসহ জীবনধারা। এই শহরের রুক্ষ রিক্ত সৌন্দর্য শূন্যতা কবি মেনে নিয়েছেন। যেকোনো মতামত জানাতে ০১৭১৪৭০৫৭২৭ অথবা ইমেইল [email protected]