ভা ষ ণ .................................................

প্রত্যেক নারীকে তার নিজের প্রতিভা চেনার সুযোগ দিতে হবে

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৮
অনেক গুণী মানুষের ভিড়ে আমাকে জাতিসংঘের চতুর্থ নারী সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোয় আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকের দিনটি মা, গৃহিণী, স্ত্রী, সন্তান, বোন, চাকরিজীবী, নাগরিক, রাজনীতিবিদ হিসেবে নারীদের উদযাপনের দিন। এটা আমাদের মিলিত হওয়ার দিন; যেমন করে আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে মিলিত হই, যেভাবে সারা দুনিয়ার নারীরা একত্রে মিলিত হয়। দৈনন্দিন কাজের ভিড়ে সারা দুনিয়ার নারীরা একটি সাধারণ ভবিষ্যেক ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। এটা সংসার এবং সন্তানকেন্দ্রিক। আমরা আজ এখানে মিলিত হয়েছি এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেদের ভবিষ্যত্ রচনার ভিত গড়ার লক্ষ্যে। একে অপরকে সাহায্য করার লক্ষ্যে। বেইজিং সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা নারীদের শিক্ষা, শরীরের যত্ন, চাকরি, নাগরিক অধিকার আদায়ের উপর গুরুত্ব দিচ্ছি। অনেকে আমাদের এই সম্মেলনে নিয়ে নানা কানাঘুষা করেন। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— আপনারা আপনাদের বাড়িতে আপনাদের মা-বোন-স্ত্রীদের সাথে কথা বলুন, তাদের কথা শুনুন। আমাদের এই সম্মেলনের ফলপ্রসূতা বুঝবেন। অনেকে আছেন যারা নারীদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আপনারা আমাদের এই সম্মেলনের দিকে দেখেন। এখানে সারাবিশ্ব থেকে সকল পেশার নারীরা জড়ো হয়েছেন। তারা প্রত্যেকে সাবলম্বী। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারেন। নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। আমরা আমাদের এই আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের অধিকার আদায়ের পথে অনেকটা সফল হয়েছি। নিজের ঘরে নারীদের উপর নির্যাতন কমেছে। আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি নারীদের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে, তারা শিক্ষিত হলে, কর্মজীবী হলে সংসারের উন্নতি ঘটে, আর্থিক সঙ্গতি আসে। এভাবে পুরো জাতি উন্নয়নের মুখ দেখে। উন্নয়নে নারীদের অবদানের কথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। প্রায় আড়াই দশক ধরে আমি নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছি। এই দীর্ঘ সময়ে আমার নিজের দেশের বাইরেও বহু দেশের নারীদের সাথে মেশার, তাদের অবস্থা দেখার সুযোগ হয়েছে। আমি ইন্দোনেশিয়ার সেই মায়ের সাথে কথা বলেছি যিনি চাকরি করেন, নিজের সন্তানের পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন। বাড়িতে কাজের মানুষ রেখে সন্তানের লালন-পালনকে সহজতর করেছেন আর সংসারের খরচের ভারের একটা অংশ নিয়েছেন নিজের কাঁধে। আমি ডেনমার্কের সেই দম্পতির সাথে কথা বলেছি যারা দু’জনেই চাকরিজীবী। যারা মিলিতভাবে তাদের সন্তান পালন থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ এবং দায়িত্বগুলো ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। আমি আফ্রিকার সেই নারীদেরকে দেখেছি যারা তাদের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। আমি নিউ হ্যাম্পশায়ারের সেই নারীদেরকে দেখেছি যারা সেখানকার শিক্ষা বিস্তার এবং পুষ্টি নিয়ে কাজ করছেন। আমি বাংলাদেশ এবং ভারতের সেই নারীদের কথা বলতে পারি যারা বাড়িতে গরু পালন করে, ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে ভাগ্যে পরিবর্তন এনেছেন। আমরা এই সম্মেলনের মাধ্যমে নারীদের কণ্ঠকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাই। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। কিন্তু নারীদের ৭০ শতাংশই দরিদ্র যাদের দুই-তৃতীয়াংশেরই কোনো অক্ষরজ্ঞান নেই। আর দুঃখজনক হলেও সত্য— ঘরের কাজ নারীদেরকে করতে হলেও এই কাজগুলোর কোনো আর্থিক মূল্য তারা পায় না। সন্তান জন্মদান, প্রতিপালন, ঘরের কাজ এসব কাজগুলো আমাদের অর্থনীতির হিসেবের বাইরে। আমি এইসব নারীকে আহ্বান জানাই— আপনারা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে যোগ দিন। প্রশিক্ষণ নিয়ে এগিয়ে আসুন। নিজের একটি ক্যারিয়ার গড়ুন। সাবলম্বী হোন। প্রত্যেক নারীকে তার নিজের প্রতিভা চেনার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো নারীরা এই সুযোগগুলো তো পায়ই না বরং তারা প্রতিনিয়ত ন্যূনতম মানবাধিকারটুকু থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নারীদের উপর অন্যায়ের এই খড়গ ঝুলছে আদিকাল থেকেই। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই— নারীদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার নেই কারোর। আর এই অধিকার আদায়ের জন্য নারীদেরকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।