পুষ্টিকর ফল আমড়ার চাহিদা দিন দিনই বাড়ছে। মৌসুমে বাজার ছাড়াও পথে পথে প্রচুর বিক্রি হয় এই আমড়া। এটি একটি অর্থকরী ফল হিসেবেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে আমড়ার চাষ ও উত্পাদন। পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলায় চলতি মৌসুমে আমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল আমড়ার ইংরেজী নাম গোল্ডেন অ্যাপেল। বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাসে আর রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের সর্বত্রই প্রতিনিয়ত হকারদের ডাক শোনা যায় “লাগবে স্যার বরিশালের আমড়া।” বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় এর ফলন বেশি বিধায় বরিশালের আমড়া বলেই পরিচিতি বেশি। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলায় আমড়া আবাদ হয় বেশি। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে আমড়ার চাষ হয়।
ওই এলাকায় এমন কোন বাড়ি পাওয়া যাবে না যে বাড়িতে কম করে হলেও একটি আমড়া গাছ নেই। রাস্তার পাশে বাড়ির উঠোনে একটি আমড়া গাছ লাগানো যেন প্রতিটি মানুষের নেশায় পরিণত হয়েছে। বহু মানুষ পতিত জমি কেটে আইল তৈরি করে, আবার কেউ কেউ ফসলী জমিতে আমড়ার বড় বড় বাগান সৃষ্টি করেছেন। কোন কোন চাষীর বাগান থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হয়। শ্রাবণ ভাদ্র মাসে পরিপক্ব আমড়া পাওয়া যায়। গ্রামের বেশির ভাগ এলাকায় আমড়া কেনা বেচার বেপারী রয়েছে। তারা ফালগুন চৈত্র মাসে কুড়ি দেখেই আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে ফেলেন। আবার অনেক চাষী ভরা মৌসুমে নিজেরাই বাজারে আমড়া বিক্রি করেন। আষাঢ় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত গাছ থেকে আমড়া পেড়ে বাজারে নিয়ে বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়। কাউখালী উপজেলার প্রধান বন্দর লঞ্চঘাট,দক্ষিণ বাজার, পাঙ্গাশিয়াসহ বিভিন্ন বড় বাজারে রয়েছে অসংখ্য আমড়ার আড়ত্।
ওইসব আড়তে বেপারীদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মেঘনাঘাট এলাকায় চালান করা হয়। সেখানে আড়তদাররা বিভিন্ন মোকামের খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারদের কাছে আমড়া বিক্রি করে।
জানা গেছে, পিরোজপুরে বিভিন্ন উপজেলায় বেপারীরা মাসে গৃহস্থদের অগ্রিম টাকা দিয়ে আমড়া গাছ কেনার পর শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করেন। পরে বস্তায় ভরে আমড়া কেনাবেচার সবচেয়ে বড় মোকাম কাউখালীতে বিক্রি করেন। সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে আমড়ার চালান পাঠিয়ে দেয়া হয়। পিরোজপুর জেলার আমড়া আকারে বড় এবং সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক।
কাউখালী এলাকার আমড়া চাষী আব্দুল কুদ্দুস জানান, মধ্যস্তত্বভোগীদের অধিক মুনাফার কারণে আমড়া উত্পাদনকারী গৃহস্থরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেপারীরা গৃহস্থদের কাছ থেকে এক বস্তা আমড়া ৭/ ৮শ’ টাকায় কিনে কাউখালী মোকামে বিক্রি করে থাকেন ১১শ’ থেকে ১২শ’ টাকায়। কাউখালীর ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, একটি আড়ত্ থেকে ঢাকা বা মুন্সিগঞ্জ এক বস্তা আমড়া পৌঁছাতে খরচ হয় ২১০ থেকে ২১৫ টাকা। এরপর আড়তে বিক্রয় মূল্যের শতকরা ১০ ভাগ আড়তদারী দিতে হয়। প্রতিটি বস্তায় বর্তমানে ৮০০ আমড়া বোঝাই করা হয়। বর্তমানে কাউখালীতে এক বস্তা আমড়ার দাম ১৫শ’ থেকে ১৬ শ’ টাকা। ঢাকায় বিক্রি হয় ১৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকায়।
কাউখালী উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুসিয়েল আলম রিয়াজ বলেন, আমড়ার বাগান করা বা চাষ করা খুবই সহজ। রোদেলা স্থানে উঁচু আইল করে সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করার ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ফসল ওঠে। রোগবালাই কম তবে চারা রোপণের সময় গর্তের মধ্যে কিছু দানাদার কীটনাশক প্রয়োগ করলে গাছ মরা রোগ হয় না। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমে এক ধরনের লেদা পোকা গাছের পাতা খেয়ে গাছ পাতা শূন্য করে ফেলে। গাছে মুকুল আসার আগে ১৫ দিন পর পর কীটনাশক প্রয়োগ করলে লেদাপোকার আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
