রাজশাহী বিএনপিতে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২৩:১১
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে বিএনপির কোন্দল আবারো প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। গত শনিবার জেলা বিএনপির নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনুর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করেছেন। এদিকে কিছুদিন মহানগর বিএনপির সঙ্গে থাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল মনির ও তার সমর্থকরা আবার জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফার সঙ্গে একজোট হয়েছেন। ফলে জেলার রাজনীতিকে কেন্দ্র করে রাজশাহী মহানগর এবং জেলা বিএনপির নেতারা পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার চলমান আন্দোলনকে জোরদার না করে মহানগর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু তার অনুগত কয়েক নেতাকে জেলার কয়েকটি সংসদীয় এলাকায় প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী গণসংযোগে মাঠে নামিয়েছেন। এর মধ্যে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে চারঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ চাঁদকে তিনি আগামী নির্বাচনে দলের সংসদ সদস্য প্রার্থী ঘোষণা করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির পক্ষে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনির। মিজানুর রহমান মিনুর দিকে ইঙ্গিত করে কামরুল মনির বলেন, মহানগর বিএনপির একজন শীর্ষনেতা জেলার পবা-মোহনপুর এবং বাঘা-চারঘাট সংসদীয় আসনে দল মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য জেলা বিএনপির বিভিন্ন ইউনিট ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছেন। দলীয় প্রধান এবং দলের মনোনয়ন বোর্ড ছাড়া অন্য কেউ, কাউকে কোন সংসদীয় আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা এমনকি পরিচয়ও করিয়ে দিতে পারেন না। যা দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ড। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সরকারের নির্দেশে রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভা নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এর নিন্দা জানিয়ে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার দাবি জানানো হয়। জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত এর উন্নতির দাবিও জানানো হয়। এসব বিষয়ে মতামতের জন্য মিজানুর রহমান মিনুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও রিসিভ করেননি। একমঞ্চে নাদিম ও মনির পক্ষ দীর্ঘদিন থেকে রাজশাহী জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফা এবং সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনিরের দ্বন্দ্বের জের ধরে তাদের সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন চলছিল। কামরুল মনির ও তার সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ সম্পাদক ও নাদিম মোস্তফা জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে তার নিজের মতো করে সংগঠন পরিচালনা করে আসছিলেন।’ অপরদিকে সভাপতি নাদিম মোস্তফা ও তার সমর্থকদের অভিযোগ ছিল, ‘সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনির মিজানুর রহমানের ছায়ায় রাজনীতি করে আসছিলেন। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে দুইপক্ষের নেতাকর্মীদের একসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে দেখা যায়। তবে ‘জরুরি কাজে’ বাইরে থাকায় সভাপতি নাদিম মোস্তফা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি বলে দাবি করা হয়। তবে সংবাদ সম্মেলনের আগ-মুহূর্তে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝে কয়েকটি প্রশ্ন সংবলিত লিফলেট বিতরণ করা হয়। যেখানে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনিরকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক প্রশ্ন লেখা ছিল। তবে ওই লিফলেটে কারও নাম বা স্বাক্ষর ছিল না। বিএনপির একটি সূত্র দাবি করেন, সভাপতি নাদিম মোস্তফার পক্ষের লোকজন ওই লিফলেট ছড়িয়েছেন। লিখিত বক্তব্য নিয়ে লুকোচুরি সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে জেলা বিএনপির সভাপতি কামরুল মনির বলেন, সংবাদ সম্মেলনে কোনো লিখিত বক্তব্য তৈরি করা হয়নি। তার বক্তব্যই সংবাদ সম্মেলনের দলীয় বক্তব্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে লিখিত বক্তব্যের কপি ছড়িয়ে পড়ে। যাতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল মনির, সহ-সভাপতি মাইনুল আহসান পান্না ও সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমানের স্বাক্ষর ছিল। ওই লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, সরকার আন্দোলনরত বিরোধীদলের ভেতরে ঐক্য নষ্ট করার জন্য নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। এরই অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, রাজশাহী মহানগর বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ গুটিকয়েক নেতা রাজশাহী জেলা বিএনপি, জেলা যুবদল, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল, জেলা মহিলা দল, ছাত্রদল এবং রাজশাহী জেলার পবা-মোহনপুর, বাঘা-চারঘাট,বাগমারা, ভবানীগঞ্জ, তাহেরপুর, নওহাটা, কাটাখালী, কেশরহাট পৌর বিএনপি ও সব অঙ্গসংগঠনকে পাশ কাটিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা না মেনে দল ও জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। দলের চেয়ারপার্সনকে বাদ দিয়ে বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই নির্বাচনী আসনগুলোতে বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যে পরিকল্পনা নিয়েছেন জেলা বিএনপিসহ ওই সব এলাকার বিএনপি নেতৃবৃন্দ এর তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ আজিজুর রহমান, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল গফুর, উপদেষ্টা সৈয়দ শাহীন শওকত খালেক, সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু, মাইনুল আহসান পান্না, সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু, যুগ্ম-সম্পাদক মামুন অর রশীদ, আলাউদ্দিন আহমেদ, ফায়সাল কবির লিংকন, জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জল প্রমুখ। এছাড়া জেলা মহিলা দল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ জেলা বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।