টাইটানিকের পথে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৪
উপজাতি এক পর্যটকের মাধ্যমে জানতে পারলাম ‘টাইটানিক’ নামে বাংলাদেশে একটি পাহাড় আছে। খবরটি জানার পর থেকেই মন আনচান শুরু করল সেখানে যাওয়ার জন্য। হঠাত্ দুই দিনের ছুটি মেলাতে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এলো। ‘দে ছুট’ ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা ছুট দিলাম টাইটানিক পাহাড় জয়ের জন্য। টাইটানিকে যেতে হলে কক্সবাজারগামী বাসে গেলে সুবিধা হয় বেশি। তাই রাতের বাসে চেপে বসলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। সবাই ভাবলেন সাগরের এত কাছাকাছি যাব আর তার নোনা জলে ডুব দিব না তা কি হয়? তাই প্রথম দিনটা কক্সবাজারে ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাটিয়ে দিলাম। পরের দিন ড্রাইভার রতনের মাইক্রোতে চড়ে কাকডাকা ভোরে যাত্রা শুরু করলাম। পথে একটি বাজারে ব্রেক, নাস্তা পর্ব হলো। আবারও পথ চলা শুরু হলো, এবার বান্দরবান জেলার লামার পথে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি উপর দিকে উঠছে। চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। প্রতিটি পাহাড়ে বসন্তের আগমনী ছোঁয়া, সবুজ গালিচায় মোড়ানো; যেন বাতাসে সবুজের মেলা। গাড়ি থামল মিরিঞ্চা পর্যটন কেন্দ্রের গেটে। জনপ্রতি দশ টাকার টিকেট কেটে প্রবেশ করলাম। ভেতরটা বেশ সাজানো গোছানো। প্রায় ত্রিশ একর পাহাড়ি ভূমিতে মিরিঞ্চার অবস্থান। পর্যটকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ছাউনি ও বেঞ্চ পাতানো রয়েছে। প্রতিটি পাহাড় দর্শনের জন্য কাঠের পাটাতন ও খাঁজ কাটা সিঁড়ি রয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারও রয়েছে। একসময় পেঁওছে গেলাম তার দোরগোড়ায়। ‘দে ছুট’ দলের চোখে-মুখে হাসি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই চোখ গিয়ে উঠল কপালে। কি অবাক বিস্ময়, এ দেখি শত বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির জাহাজ টাইটানিকের আদলে আমাদের এই টাইটানিক পাহাড়। জানি না স্রষ্টার এ কোন সৃষ্টি! বেশ কিছুক্ষণ ফটোসেশন হলো। অনুসন্ধানে জানতে পারলাম টাইটানিক জাহাজের আদলে হওয়াতে এই পাহাড়ের নাম ‘টাইটানিক’ রাখা হয়েছে। টাইটানিকের ওপর থেকে পাশ দিয়ে যাওয়া আলি কদমের পিচ করা রাস্তাটিকে মনে হয় যেন বৃহত্ কোনো অ্যানাকোন্ডা হেলেদুলে যাচ্ছে। টাইটানিক পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় পনের শ ফুট উঁচু। এর সামনে দাঁড়ালে মনে হবে যেন ফিল্মের সেই টাইটানিক জাহাজের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। দেখে দেহের ক্লান্তি মনের বিষণ্নতা দূর হয়ে যায় মুহূর্তেই। মিরিঞ্চা পর্যটন কেন্দ্র ত্যাগ করে ছুটছি এবার সুখ-দুখ পাহাড়ের সন্ধানে। লামা বাজারে আসতেই দেখি স্থানীয়দের আজ হাটবার। হাটে আদিবাসীরা ফরমালিনমুক্ত পেঁপে, কলা, তরমুজসহ আরও বিভিন্ন ফলের পসরা সাজিয়েছে। একটু-আধটু করে নানা ফলের স্বাদ নেওয়া হলো। পাহাড়ি ফলের স্বাদ যে নেবে একবার তাকে ফিরে আসতে হবে বারবার। মারমা, কুচি, মগ, চাকমা, মুরংদের সাথে এরইমধ্যে ভাবও জমিয়ে ফেললাম। কিন্তু সে ভাব বেশি আয়ু পেল না, কারণ যেতে হবে মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষা সুখ-দুঃখ পাহাড়ের সন্ধানে। মাইক্রো গিয়ে থামল আনসার ক্যাম্পের সামনে। নিবেদিতপ্রাণ একজন আনসার সদস্য পথ দেখিয়ে ঘাটে নিয়ে এল। তিন শ টাকা চুক্তিতে ছাইয়া নৌকা ভাড়া করা হলো। মাঝি নিয়ে গেল প্রথমে দুঃখ পাহাড়ে, এরপর সুখ পাহাড়ে। সুখ-দুঃখ পাহাড় পাশাপাশি। মাঝে দৃষ্টিনন্দন মাতামুহুরী। সুখ-দুঃখ নামকরণের ইতিহাস জানতে গিয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী শোনাল। অপার সৌন্দর্যের মাতামহুরী নদীর সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। একটি পুরোদিন ইচ্ছে করলে মাতামুহুরী নদীতে নৌ-ভ্রমণ করে কাটিয়ে দেওয়া যায়। ভরা বর্ষায় পাহাড়ি নদী মাতামুহুরীতে নৌ-ভ্রমণ খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণ, তবে হেঁটে গিয়েও সুখ-দুঃখ পাহাড় দেখা সম্ভব। সত্যি বলতে কি, সুখ-দুঃখ পাহাড় দেখতে গিয়ে মাতামুহুরীতে নৌকা নিয়ে না বেড়ালে ভ্রমণের আনন্দ অপূর্ণই থেকে যাবে। দুপুর গড়িয়ে গেল, খেতে হবে ঝুম চালের ভাত আর দেশি মুরগির ভুনা গোস্ত, তাই আবারও লামা বাজারে। পরিমাণের চেয়ে অতিমাত্রায় খেয়ে হোটেলের বেঞ্চেই চিত্পটাং। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর দেখলাম, হাতে এখনও অনেক সময়। বাস ছাড়বে রাত এগারোটায়। সুতরাং ঘুরে বেড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে, তাই গভীর অরণ্যের পাহাড়ি পথ ধরে কিয়াজু পাড়ার উদ্দেশ্যে গাড়ি টার্ন করালাম। গাড়ি চলছে, মাঝেমধ্যে চান্দের গাড়ির আনাগোনা। দু’পাশে গভীর গিরিখাত। আকাশ ছোঁয়া গর্জন গাছের সারি। সে এক ভিন্ন অনুভূতি। পথ চলতে চলতে প্রায় সন্ধ্যা তাই গাড়ি ঘুরালাম। আবারও মিরিঞ্চা পর্যটন কেন্দ্রে এসে গাড়ি থামল। উদ্দেশ্য টাইটানিক পাহাড়ে দাঁড়িয়ে রাতের ধ্রুব তারা দেখব। কিন্তু আমাদের ‘দে ছুট’ দলের কপালে তাও জুটে না। কারণ এক কথা দু কথায় শুরু হয়ে যায় মোস্তাক ও রবিনের হাস্যরসের চুটকি। আর সেই রস আরও রসালো করার জন্য তাতে তাল মেলায় ও জসিম ও আলাল। আমি আর আকতার যতটুকু সম্ভব ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্জন প্রকৃতির কাছাকাছি। দিনের আলোয় দেখা টাইটানিক পাহাড়ের সৌন্দর্য রাতেও অতুলনীয়। রাতের প্রকৃতিকে আলাদাভাবে অনুভব করা যায় এখানে দাঁড়িয়ে। নির্ধারিত সময়ের চাইতেও এক ঘণ্টা বেশিক্ষণ কাটিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের অনুরোধে টাইটানিকের মোহ ত্যাগ করতে হলো। বিদায় মিরিঞ্চা, বিদায় রাতের তারা ছোঁয়ার জন্য টাইটানিক পাহাড়ের বিশালতা।