সাম্প্রতিককালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার আটকের ঘটনার তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। যখনই স্বর্ণ আটক করা হয় তখন মামলা হয়, গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু কোন ঘটনায় তদন্ত কমিটি রহস্য উম্মোচন করতে পারে না। ফলে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আড়ালেই থেকে যায়। বন্ধ হয় না স্বর্ণের চোরাচালান। বিমান বন্দরে আটক হওয়া স্বর্ণের অধিকাংশ চালান আসছে দুবাই থেকে বলে সন্দেহ করছে শুল্ক বিভাগ। তারা এও মনে করে এই কাজের সঙ্গে বিমানের কিছু কর্মীও জড়িত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে স্বর্ণের বড় ধরনের ১১টি চালান আটক করা হয়। এ চালানগুলো থেকে ৭৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা মূল্যের ১৮২ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকেও সম্প্রতি দুই দফায় ২৪ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়, যার দাম সাড়ে ১১ কোটি টাকার উপরে। এ নিয়ে চলতি বছর দুইটি বিমান বন্দর থেকে ২০৬ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে। যার মূল্য ৮৯ কোটি টাকার উপরে।
এর মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে এ বছর দুই ফেব্রুয়ারি ১ কেজি ৩ শ’ গ্রাম, ২৮ মার্চ ৫ কেজি আড়াইশ’ গ্রাম, ৩১ মার্চ ২ কেজি ৫ শ’ গ্রাম, ১২ এপ্রিল ১ কেজি ৮ শ’ গ্রাম, ১৩ মে ৬ কেজি ৩ শ’ গ্রাম, ৬ জুলাই ২৫ কেজি ৩ শ’ গ্রাম, ২৪ জুলাই ১২৪ কেজি ১ শ’ গ্রাম, ৩০ জুলাই ৪টি চালানের মাধ্যমে ১৪ কেজি আড়াইশ’ গ্রাম এবং ৩১ জুলাই ৩ কেজি ১ শ’ গ্রাম স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এসব স্বর্ণের মূল্য ৬৮ কোটি ৫১ লাখ ৭ হাজার টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম কাস্টম সূত্র জানিয়েছে, গত ২৩ জুলাই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৮ কেজি সোনার বার এবং গত ৪ আগস্ট দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ৭ কেজি ২ শ’ গ্রাম স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এ দু’টি চালানে প্রায় ১১ কোটি টাকার স্বর্ণ পাচার করার চেষ্টা করেছিল চোরাকারবারীরা।
সূত্র জানায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের একটি এয়ারবাস গত ২৪ জুলাই কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমান বন্দর থেকে ছেড়ে দুপুর একটা ৫০ মিনিটে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমান থেকে যাত্রী ও মালামাল নামানোর পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুল্ক কর্তৃপক্ষ বিমানে তল্লাশী চালায়। এরপর তারা কার্গো হোল্ডের পাশে ডিকম্প্রেশন প্যানেলের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ১ হাজার ৬৫টি স্বর্ণের বার আটক করে। এগুলো ১৫টি কাপড়ের কাঁথার সেলাই করা বিশেষ ব্যাগের মধ্যে রাখা ছিল। তবে কারা বিপুল পরিমাণ এ স্বর্ণের বারগুলো এনেছিল এবং কোথা থেকে আনা হয়েছিল তার কোন তথ্য এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। বিমানের এই উড়োজাহাজটি ওই দিন সকাল ৮টা ৫ মিনিটে দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসে। এরপর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ এই স্বর্ণ দুবাই থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসা হয়। বিমানের কেবিন ক্রু ও ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার কর্মীদের সহযোগিতা ছাড়া এভাবে স্বর্ণের চালান আনা কোনভাবেই সম্ভব নয় বলে নিশ্চত হয়েছে শুল্ক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বিমানের এতো সুরক্ষিত জায়গায় কর্তব্যরত কেবিন ক্রুদের সহযোগিতা ছাড়া কোন যাত্রীর পক্ষে স্বর্ণের বারগুলো লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
এদিকে দুবাই বিমান বন্দর থেকে এ বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের চালান বিমানে ওঠানো হয়েছিল কিনা তা জানার জন্য বিমান কর্তৃপক্ষ দুবাই বিমান বন্দরের নিরাপত্তা প্রদানের কাছে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও চিঠির কোন জবাব আসেনি। এছাড়া ঘটনাটি তদন্তের জন্য প্রথমে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের একজন ম্যানেজারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে একজন জেনারেল ম্যানেজারের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করার হয়। কিন্তু তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। ঘটনার দিন দুবাই থেকে বিমানটি ঢাকায় আসার সময় যে সব কেবিন ক্রু দায়িত্বে ছিলেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়নি। এমনি ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু এবং সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার সময় বিমানে দায়িত্ব পালনকারী ক্রুদেরও জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ৬ জুলাই কুয়েত থেকে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দর আসা বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে উদ্ধার করা হয় ২৫ কেজি ৩ শ’ গ্রাম স্বর্ণের বার। এই স্বর্ণের বারের মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা। শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে খবর ছিল ওই ফ্লাইটে স্বর্ণে একটি চালান আসছে। ফ্লাইট থেকে সকল যাত্রী নেমে যাওয়ার পর শুল্ক কর্মকর্তারা বিমানটিতে তল্লাশী চালায়। এরপর একটি ছিটের নিচে থেকে ব্যাগের মধ্যে রক্ষিত ২৫ কেজি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। এনিয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। সে কমিটিরও কোন প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। এভাবে কোন তদন্তই ঠিক মতো না হওয়ায় পার পেয়ে যায় চোরাচালানিরা।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ২৩ জুলাই প্রায় ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ১৭ কেজি চোরাই স্বর্ণের বার এবং ৪০০ গ্রাম চোরাই স্বর্ণালংকারসহ দুবাই থেকে আসা মীর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ মোর্শেদ নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে কাস্টমস। এ সমস্ত স্বর্ণ ঢাকা বিমান বন্দর দিয়ে পাচার করার উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হয়েছিলো বলে গ্রেফতারকৃত যুবক ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বিমান বন্দর কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জানায়। সকাল ৯টায় যুবকটি যে ফ্লাইটে চট্টগ্রাম এসেছে সেটি ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করার কথা সকাল ১০টায়।
এর বাইরে গত ৪ আগস্ট দুবাই ছেড়ে আসা একটি বিমানের দুই যাত্রীর শরীর তল¬াশি করে প্রায় ৭ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে শুল্ক কর্মকর্তারা। এসব স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। আটককৃতরা হচ্ছে-চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা গ্রামের রাশেদুল ও পশ্চিম গুজরা গ্রামের মো. ইকবাল। তারা দু’জনই দুবাই প্রবাসী। আটক স্বর্ণের এই চালানে রয়েছে প্রতিটি ১০ তোল?া ওজনের ৫৩টি স্বর্ণের বার।
