সেই বাড়িটি

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৫
হেড স্যারের মাথাটা খারাপ হয়ে গেল কিনা আমরা বুঝতে পারছি না। একদিন তিনি বললেন, ইতিহাস পড়ে শেখার পাশাপাশি ঐতিহাসিক বিষয় নিজের চোখে দেখতে হবে। প্রতি মাসে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন প্রোগ্রামে যাবে। এর নিচের ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের নেয়া যাবে না। রাস্তা বা গাড়িতে পেশাব-পায়খানা করে দিতে পারে সেই ভয়ে। ওদের মাথায় কিছু থাকবে না— তাও তিনি বললেন। শুক্রবার দিন আমাদের যেতে হবে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। স্যার আগে থেকে কিছু বলেননি। এর আগে যে স্থানগুলোতে গিয়েছিলাম তখন তিনি সে স্থান সম্পর্কে আগেই ধারণা দিয়েছিলেন। আজকে ব্যতিক্রম দেখলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে বত্রিশ নম্বর বাড়িতে গেলেন। স্যার বললেন, আমি নিচে দাঁড়িয়ে আছি। তোমরা বাড়িটি ঘুরে এসো। তারপর আমাকে প্রশ্ন করবে, আমি উত্তর দেব। গেটেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দেখেছি। মনে মনে ভাবলাম, এটা হয়তো বঙ্গবন্ধুর বাড়ি হবে। এ বাড়ির ইতিহাস তো আমরা ছোটরা জানি না। মনে মনে খুশি হলাম, এই বয়সে জাতির জনকের বাড়ি দেখতে পারছি, এটা কি কম কথা! আমরা সিঁড়ি বেয়ে দোতলা গেলাম। হ্যাঁ, এটিই বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। এই বাড়িটি দেখার জন্য আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল। ভেবেছিলাম বড় হয়ে দেখতে যাব। কিন্তু হেড স্যারের মাথা বেঠিক হওয়াতে ছোট সময়েই দেখতে পারলাম। তিনি কাজটি খারাপ করেননি। তাঁকে হঠাত্ করেই কেন জানি আমার ভালো লাগল। অনেকগুণ শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। আমরা বিভিন্ন রুম ঘুরে ঘুরে দেখছি। ১৯৭৫ সালে যাঁদেরকে এ বাড়িতে হত্যা করা হয়েছিল তাঁদের ছবি দেয়ালে টানানো। রাসেলের ছবিটির দিকে তাকিয়ে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, আমাকে যদি কেউ মেরে ফেলে কেমন লাগবে? গা শিউরে উঠল। আমার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। পাশের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে দেখি ওদের চোখও পানিতে ছলছল করছে। বঙ্গবন্ধুকে যেখানে হত্যা করা হয়েছিল সে জায়গাটি কাঁচ দিয়ে ঢাকা। এখানে এসে যেন আর পা চলে না। বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস আমি শুনেছি। বইয়ে পড়েছি। আমরা সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কেউ যেন কারো দিকে তাকাতে পারছি না। বুকের ভেতরে একটা গুমোট কান্না শুধু ডানা মেলছে। আমরা সবাই নিচে নেমে এলাম। স্যারকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে। তাঁর মনও খুব খারাপ। চোখ দুটি টলমল করছে। আমি আমার বন্ধুদের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি তাদেরও চোখ টলমল করছে। আমরা স্যারের সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে প্রশ্ন করো। কেউ কথা বলল না। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেন এখনই কেঁদে ফেলবে। স্যারের বুকের ভেতরের কান্নাটা মনে হলো দলা পাকিয়ে গলায় এসে আটকে গেছে। তিনি বললেন, তোমরা কোনো প্রশ্ন করবে না? আমরা কেউ কিছু বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নেড়ে প্রকাশ করলাম, প্রশ্ন করব না। স্যার বললেন, তাহলে চলো ফিরে যাই। স্যারের পিছনে পিছনে আমরা সবাই ফিরে এলাম। মনে হলো সারা পৃথিবী হঠাত্ অতল অন্ধকারে চাপা পড়ে গেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। একটি গাছ থেকে পাতা ঝরারও শব্দ নেই। একটি পাখিও কোনো গান গাইল না। কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমার চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে বত্রিশ নম্বর সেই বাড়িটা। সে বাড়ির ছবিগুলোর নির্বাক তাকিয়ে থাকা।