আমার কথা

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৬
অষ্টম শ্রেণিতে পড়তে যাই কক্সবাজার মডেল হাই স্কুলে। কাঁচা ইটবিছানো রাস্তায় বাসে করে কক্সবাজার যাওয়া ছিল খুবই কষ্টকর ও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তাই বাবার সঙ্গে সাম্পানে করে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ভয় ও রোমাঞ্চের মধ্যে কক্সবাজার পৌঁছি এক রাত কয়েক ঘন্টা পর। কক্সবাজার তখন মহকুমা শহর। রিকশা নেই, মোটরগাড়ি নেই, বিদ্যুত্ নেই, টিউবওয়েলের পানি খাওয়া আর পুকুরে গোছল। হাঁটাই একমাত্র ভরসা। পাহাড়ি এলাকা থেকে এবার চলে এলাম সাগর পাড়ে। সময়টা ১৯৫৫ সাল। গ্রামের এম,ই, স্কুলে দুটি বই পড়েছিলাম অশ্বিনী কুমার দত্তের জীবনী আর টম কাকার কুটির (Uncle Tomiscabin) এর অনুবাদ। নীল কালিতে ছাপা বই দুটি মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কক্সবাজার শহরে আমাদের স্কুলটি ছিল উঁচু জায়গায়। পুবে স্কুলের বিশাল মাঠ, দক্ষিণে নানা লোভনীয় টক ফলের গাছে ঘেরা অপূর্ব সুন্দর বৌদ্ধ কেয়ার। পশ্চিমে একটু এগুলেই সমুদ্রের গর্জন। কক্সবাজার মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী অজয় বড়ুয়া ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশালী সুদর্শন দীর্ঘদেহী একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি স্কুল লাইব্রেরী থেকে নিজ হাতে বই দিতেন। আমাদের গণিত শিক্ষক ছিলেন দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তিনি ক্লাস এইটে হাইজিনও পড়াতেন। ঐ পিরিয়ডে সপ্তাহে তিনদিন গল্প বলতেন ও বই পড়ে শোনাতেন। রবিন হুডের গল্প, টাইম মেসিন ও বিভূতিভূষণের ‘আম আঁটির ভেঁপু’ তার কাছ থেকেই প্রথম জানি। সাহিত্যের প্রতি একটা আকর্ষণ তিনি মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলেন। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কক্সবাজারের একটি বড়ো বই দোকান থেকে সবুজ রঙের কভারের, মোটা কাগজে সবুজ কালিতে ছাপা দু’ টাকা চার আনা দিয়ে একটি বই কিনি—‘পথের পাঁচালী’। লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটি পড়ি আর বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখি। কিছুদিন পর আরেকটি বই কিনি প্রবোধকুমার সান্যালের, ‘রাতের অতিথি’। ডিটেকটিভ বই। এ সময় দস্যু মোহন সিরিজের বই খুব চলতি ছিল। স্কাউটিং করি, ডিবেট করি। বক্তৃতা দিই, পুরস্কার পাই। কিন্তু মন পড়ে থাকে সাহিত্যে। বড় ভাই (জ্যেঠাত ভাই) ওহীদুল আলম ছিলেন বই নিমগ্ন এক মানুষ। তার টেবিলে বইয়ের স্তূপ থেকে চুরি করে পড়ি ‘শিশু সওগাত’, ‘সওগাত মহিলা সংখ্যা’। ‘বউঠাকুরানীর হাট’ ও ‘গোরা’ পড়তে চেষ্টা করি। তখন বুঝতে পারিনি। তবে উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রাজপথ’ বইটি মনে ছাপ ফেলেছিল। নবম শ্রেণিতে উঠে কিনি ‘দৃষ্টিপাত’—এ অদ্ভূত নতুন ধরনের লেখা। এভাবে বইয়ের সঙ্গে সখ্য গভীর থেকে গভীরতর হয়। ১৯৫৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় কচি-কাঁচার মেলার সদস্য হই। সে সময়কার কচি-কাঁচার পাতার পৃষ্ঠাগুলো মনের মধ্যে ভেসে ওঠে—ডাকপিয়নের ঝুলি, আজব হলেও গুজব নয়, দাদা ভাইয়ার চিঠি, নতুন সদস্যদের তালিকা। বিশেষ সংখ্যাগুলো ছিল অসাধারণ আকর্ষণীয়, রঙিন কালিতে ছাপা। দাদা ভাইয়ের চিঠির আকর্ষণ ছিল অতুলনীয়। কচি-কাঁচার মেলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হই ১৯৬৭তে। তখন আমি চাঁদপুর কলেজের তরুণ শিক্ষক। চাঁদপুর অংকুর কচি-কাঁচার মেলার আমি ছিলাম অন্যতম উপদেষ্টা। ১৯৭০-এর গোড়ার দিকে ঢাকা থেকে অংকুর জেলার বার্ষিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এলেন সতগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, খালাম্মা কবি সুফিয়া কামাল, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগম, আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীন, লুত্ফুল হায়দার চৌধুরী, কেন্দ্রীয় জেলার কর্মী মনসুর হাবীব, বুলবুল মহলানবিশ প্রমুখ। স্টিমার ঘাট থেকে তারা সরাসরি আমার বাসায় আসলেন। নাশতা খেলেন। খালাম্মা তো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেন। আমার স্ত্রীর মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন। ঐ স্মৃতি ভুলবার নয়। ১৯৭০-এর এপ্রিলে আমি ঢাকার সরকারি জগন্নাথ কলেজে যোগ দিই। দাদাভাইয়ের সঙ্গে এবার নিত্য যোগাযোগ হতে থাকে। ১৯৭২ সালে দাদাভাই বললেন, গেন্ডারিয়ায় মেলার একটা শাখা গড়তে। তখন ঐ এলাকায় আমি থাকি ১নং অক্ষয় দাস লেনে। জগন্নাথ কলেজে আমার কয়েকজন ছাত্র ও উত্সাহী কিছু কিশোরকে নিয়ে গড়ে তুলি গেন্ডারিয়া কিশোলয় কচি-কাঁচার মেলা। এ মেলার বয়স এখন ৪১ বছর। এটি এখন বিশাল প্রতিষ্ঠান। দেড় বিঘার বেশি জমির ওপর নৈশবিদ্যালয়, কচি কাঁচা বিদ্যানিকেতন, চারুকলা, সংগীত, আবৃত্তি শাখার ক্লাস চলে, রয়েছে স্থায়ী মঞ্চ ও বড় গ্রন্থাগার। এ মেলা যখন প্রতিষ্ঠা করি তখন একটা সাইনবোর্ড লাগানোর জায়গা ছিল না, আমার বাসাতেই লাগানো ছিল সাইনবোর্ড। দুলু, বকুল, জালাল মেলাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ছোটদের জন্য আমার প্রথম লেখা বের হয় দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল-এ ১৬ এপ্রিল ১৯৬০-এ। প্রথম কবিতা বের হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ বার্ষিকীতে ১৯৫৮-তে। বড়দের জন্য প্রথম গল্প বেরোয় সাপ্তাহিক ‘পাকিস্তানী খবর’-এ ১৫ জুন ১৯৬০। তারপর তো খেলাঘর এর পাতায়, ইত্তেহাদের সবুজ মেলায়, ছোটদের মাসিক নবারুণ-এ কত লেখা বেরোল। কর্মজীবনে আমি জগন্নাথ কলেজেই দীর্ঘ এগারো বছর কাটিয়েছি। তারপর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দীর্ঘদিন বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সম্পাদনার কাজ করেছি। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক হিসেবে অবসরে গেছি। ১৯৯৭ সালের শিক্ষা কমিশনের কাজ করেছি। এখন আমি শিক্ষা বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সাময়িকীর’ নির্বাহী সম্পাদক ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডুকেশন ওয়াচের সদস্য। আমার বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—সাহিত্যের কালাতীর্ণ কুশীলব, প্রসঙ্গ: ভাষা, বানান শিক্ষা, শিক্ষাভাবনা ও ভাষাচিন্তা, ফিরে দেখা, গল্পে গল্পে সুফিয়া কামাল, প্রসঙ্গ সাহিত্য: কতিপয় বিবেচনা, সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। প্রাপ্ত পুরস্কার: কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, চট্টগ্রাম অবসর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী সাহিত্য পুরস্কার, কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা সুবর্ণ জয়ন্তী পদক, চট্টগ্রাম সমিতি পদক, কক্সবাজার প্রেসক্লাব রজতজয়ন্তী উত্সব পদক ও সর্বশেষ অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার।