এক দেশে ছিল এক অত্যাচারী আর উদাসীন রাজা। রাজা শুধু নিজের ভালোর কতা চিন্তা করে। প্রজাদের কি করে ভালো হবে? কি করে প্রজারা সুখে থাকবে সে চিন্তা তার ছিল না। আর রাজ্যটি ছিল এক অদ্ভুত ধরনের। রাজ্যটি পূর্ব-পশ্চিম দু’টি খণ্ডে বিভক্ত। এক অংশ সাগরের পূর্ব পাড়ে অন্য অংশ পশ্চিম পাড়ে। পূর্ব-রাজ্য আর পশ্চিম-রাজ্য।
পূর্বরাজ্যে এক সাধারণ প্রজার ঘরে জন্মেছিল এক ছেলে। খুব ডানপিটে আর সাহসী। ডানপিটে হলে হবে কি? মেধাবী ছিল সেই ছেলে। সবকিছু মনে রাখতে পারত, সহজে কিছু ভুলতো না। পড়াশোনা খেলাধূলো করে ছেলেটি বড় হয়ে উঠল।
বড় হয়ে দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে ছেলেটির মন কেঁদে উঠল। বিশেষ করে তার পূর্ব রাজ্যের মানুষ খুবই গরীব আর অভাবী। ছেলেটি ভাবতে শুরু করল এর কারণ কি? অবশেষে খুঁজে বের করল এর কারণ, রাজার অবহেলা-অনাচার আর অত্যাচারই এর মূল কারণ। ছেলেটি শপথ নিলো রাজার এই অত্যাচার অবহেলা থেকে দেশবাসীকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু কিভাবে! রাজার কত ক্ষমতা! কত শক্তি! সৈন্য-সামন্ত গোলাবারুদ! কিন্তু ছেলেটি ভয় পেলো না। চিন্তা করলো কৌশলে রাজার অত্যাচার থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে হবে। ছেলেটি দেখলো তার দেশবাসী বড় অসহায়, অশিক্ষা-অভাব-অনটনের মধ্যে বসবাস করে রাজার কর্তব্য রাজ্য শাসন সম্পর্কে তারা ভুলেই বসে আছে। ছেলেটি সিদ্ধান্ত নিল দেশবাসীকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। দেশবাসীকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে ছেলেটি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে লাগল। অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করল। এভাবে ছেলেটি দেশবাসীর কাছে হয়ে উঠল প্রিয় মানুষ, হয়ে উঠলেন সবার প্রিয়। এই প্রিয় মানুষটি দেশের মানুষের কাছে বিশেষ করে পূর্ব রাজ্যের জনগণের কাছে আরো প্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন। রাজার তা চক্ষুশূল হতে থাকলেন।
এক সময় রাজা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করল। প্রিয় মানুষটি কারাগারে দিন যাপন করতে শুরু করলেন। এদিকে বাড়িতে তার স্ত্রী ফুটফুটে শিশুর জন্ম দিলেন। পুত্র শিশু। প্রিয় মানুষটি জেলের ভেতর দিন কাটাতে লাগলেন। এদিকে মায়ের কোলে শিশু পুত্র দিনে দিনে বড় হতে থাকলো। তাদের প্রিয় মানুষকে জেলে ভরার কারণে দেশের মানুষ রাজার উপর ক্ষেপে উঠল। পূর্ব রাজ্যের মানুষ রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। শুরু হলো ভীষণ যুদ্ধ! একদিকে রাজার সৈন্য অন্য পক্ষে দেশের জনগণ। রাজার ঘরে কত অস্ত্রশস্ত্র আর দেশের জনগণের খালি হাত।
নয় মাস ধরে চলল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অবশেষে পূর্ব রাজ্যের জনগণের জয় হলো। পূর্ব রাজ্য স্বাধীন হয়ে গেল। রাজার রাজত্ব থেকে মুক্ত হলো। স্বাধীন পূর্ব রাজ্যের নতুন রাজা হলেন তাদের প্রিয় মানুষটি। তাকে তারা কারাগার থেকে মুক্ত কর আনলো। নতুন রাজা নতুন দেশ গড়ার কাজে মন দিলেন। পূর্ব রাজ্যের একটি নতুন নামও দিলেন ‘সোনার বাংলা’। রাজার চোখে স্বপ্ন নতুন রাজ্যকে তিনি খাঁটি ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তুলবেন। এখানে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকবে না। তার প্রজারা দরিদ্র থাকবে না। দুঃখ-কষ্টে থাকবে না মানুষ। থাকবে সুখে এবং শান্তিতে।
এদিকে নতুন রাজার রাজ্যসভার এক দুষ্টু মন্ত্রী তার খুব লোভ হলো, নতুন রাজাকে হটিয়ে নিজে কিভাবে রাজা হতে পারে। সে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করল। রাজারই কিছু বিপথগামী সৈন্যকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নিল ষড়যন্ত্রকারী মন্ত্রী।
একদিন খুব ভোরে বিপথগামী সৈন্যরা তাদের ব্যারাক থেকে বেরিয়ে রাজার বাড়ি ঘেরাও করে ফেললো। তারা রাজার বাড়ির সব প্রহরীদের মেরে রাজাকে মারার জন্যে এগিয়ে চললো। সৈন্যদের গোলাগুলি শুনে রাজা ততক্ষণে ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। রাজাতো ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী। তিনি হত্যাকারীদের দেখে একটুও ভয় পেলেন না। তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন। সৈন্যরা রাজাকে মারল, রানীকে মারল। সব রাজপুত্রদের মেরে ফেলল। শুধু বেঁচে রইল সেই ছোট রাজপুত্র। যাকে নিয়ে রাজার অনেক অনেক স্বপ্ন ছিল। রাজা আদর করে ছোট রাজপুত্রের নাম রেখেছিলেন এক দার্শনিকের নামে। ছোট রাজপুত্রের বয়স তখন দশ বছর। চোখের সামনে বাবা-মা-ভাই-ভাবীদের হত্যা করতে দেখে ছোট রাজপুত্র খুব ভয় পেয়ে গেল। রাজার যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল তার নাম মহিতুল, তিনি তখনো জীবিত। ছোট রাজকুমার বাড়ির নিচে তাকে দেখতে পেয়ে ছুটে আসল তার কাছে। জড়িয়ে ধরে বলতে থাকল—‘আমাকে ওরা মারবে নাতো ভাইয়া’। ছোট শিশুর সঙ্গে তো কারো শত্রুতা থাকতে পারে না ভেবে মহিতুল তাকে অভয় দিয়ে বলল, না ভাইয়া তোমাকে মারবে না। আর তক্ষুণি কালো কাপড়ে সারা শরীর ঢাকা দৈত্যের মতো এক সৈন্য এসে ছোট রাজকুমারকে কেড়ে নিয়ে চলল, রাজকুমার কেঁদে বললো, আমি মায়ের কাছে যাবো। পিচাশ সৈন্যটি বললো- ‘চল তোমাকে মায়ের কাছেই দিয়ে আসি।’ রাজপুত্র চলল কালো দৈত্যের সাথে তাকে বিশ্বাস করে। রাজবাড়ির দোতলায় উঠে মায়ের কাছে নেয়ার বদলে রাজপুত্রের বুকে গুলি চালালো দৈত্য সৈন্যটি। ‘নতুন রাজ্য গড়ার, সুখী রাজ্য গড়ার রাজার দেখানো সমস্ত স্বপ্ন নিয়ে চিরদিনের জন্যে ঘুমিয়ে পড়লো ছোট রাজকুমার। ‘সোনার বাংলার’ মানুষ আজো কাঁদে তাদের রাজা আর ছোট রাজকুমারের জন্যে।
